মারাঠা শক্তির পতনের কারণ

মারাঠা শক্তির পতনের পতনের কারণ হিসেবে সময়কাল, মারাঠা রাজ্যের অন্তর্দন্দ্ব, নেতৃত্বের বদল, আদর্শবাদের অভাব, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয়, বর্ণপ্রথা, সামরিক দুর্বলতা, কূটনীতি ও গুপ্তচর ব্যবস্থা সম্পর্কে জানবো।

মারাঠা শক্তির পতনের কারণ

সময়কাল১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ
শেষ পেশোয়াদ্বিতীয় বাজিরাও
ভারতের ইতিহাসের জলবিভাজিকা১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ
মারাঠা শক্তির পতনের কারণ

ভূমিকা :- ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পর মারাঠা শক্তির পুনরুত্থান শুরু হয়। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের এক বিশাল অংশে মারাঠা প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকী স্বয়ং মোগল সম্রাটও তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

ইংরেজদের আবির্ভাব ও আক্রমণ

ইংরেজদের আবির্ভাবে মারাঠা অগ্রগতি প্রতিহত হয় এবং ইংরেজদের আক্রমণের ফলেই তাদের পতন ঘটে।

গ্রান্ট ডাফের অভিমত

ঐতিহাসিক গ্রান্টডাফ বলেন যে, “মারাঠাদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের দ্রুত জয় এবং মারাঠাদের দ্রুত পতন ছিল বিস্ময়কর।”

মারাঠা শক্তির পতনের কারণ

ইংরেজদের কাছে মারাঠাদের পরাজয় এবং মারাঠা শক্তির পতনের পশ্চাতে নানা কারণ বিদ্যমান।

(ক) মারাঠা রাজ্যে অন্তর্দন্দ্ব

  • (১) মারাঠা রাষ্ট্র কোনও সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র ছিল না। ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেন যে, তাদের ঐক্য ছিল সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম ও আকস্মিক এবং সেই কারণেই সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।’
  • (২) মধ্যভারতের এক বিশাল অংশে মারাঠা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও, মারাঠা রাজ্যকে একটি শক্তি-সংঘ ব্যতীত অন্য কিছু বলা যায় না।
  • (৩) ইন্দোরে হোলকার, নাগপুরে ভোঁসলে, বরোদায় গাইকোয়াড়, গোয়ালিয়রে সিন্ধিয়া এবং ধার অঞ্চলে পাওয়ার বংশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বংশগুলি আইনত পেশোয়ার কর্তৃত্বাধীন হলেও তারা পেশোয়াকে আমল না দিয়ে কার্যত স্বাধীনভাবেই রাজত্ব চালাত এবং তারা সর্বদাই পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকত।
  • (৪) এই সব মারাঠা সামন্তরাজা মারাঠা জাতির সামগ্রিক স্বার্থকে কখনোই ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে স্থান দেন নি। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সময় সিন্ধিয়া ও ভোঁসলে যখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত, তখন হোলকার ও গাইকোয়াড় ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। মারাঠা নেতৃবৃন্দের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও স্বার্থপরতা তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

(খ) নেতৃত্বের বদল

  • (১) প্রায় একই সময়ে পর পর কয়েকজন যোগ্য নেতা—যথা অহল্যাবাঈ, তুর্কোজি হোলকার, নানা ফড়নবীশ, মাহাদজি সিন্ধিয়া প্রমুখ দূরদর্শী ও বিচক্ষণ মারাঠা নেতার মৃত্যু মারাঠা রাষ্ট্রে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে।
  • (২) পরবর্তী প্রজন্মের যে সব নেতার আবির্ভাব হয়, তাঁরা ছিলেন অপদার্থ, অকর্মণ্য, স্বার্থপর, হীনমনা ও ইন্দ্রিয়াসক্ত। জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে উদাসীন এই সব স্বার্থান্ধ নেতাদের উত্থান মারাঠাদের পতনকে সুনিশ্চিত করে তোলে।
  • (৩) ইংরেজদের কূটনীতির কাছে তাঁরা নাবালক ছিলেন। এলফিনস্টোন্ বলেন যে, “একটি সফল যুদ্ধ চালানোর জন্য সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র সবই মারাঠাদের ছিল। তাদের সব কিছুই তৈরি ছিল। তাদের কেবল একজন নেতার অভাব ছিল।”

(গ) আদর্শবাদের অভাব

  • (১) স্যার যদুনাথ সরকারের মতে, মারাঠা রাষ্ট্রের পশ্চাতে কোনও আদর্শবাদ বা নৈতিক ভিত্তি ছিল না। মারাঠা প্রশাসন ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত — উৎকোচ, গুপ্তহত্যা, শোষণ, মারামারি প্রভৃতি এর সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
  • (২) মারাঠা রাজন্যবর্গ ‘হিন্দু পাদ পাদশাহি’ আদর্শ ত্যাগ করে হিন্দু রাজন্য বর্গের ওপর আক্রমণ, হিন্দু রাজ্য লুণ্ঠন এবং বলপূর্বক ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখি’ আদায়ের নীতি গ্রহণ করলে মারাঠা শাসন তার নৈতিক ভিত্তি এবং উত্তর ভারতের হিন্দু জনসাধারণের শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।
  • (৩) অপরদিকে, মারাঠা রাজন্যবর্গের হিন্দুয়ানির আদর্শ মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মনে ভীতির সঞ্চার করে। এই কারণে ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামে মারাঠারা কোনও প্রতিবেশি মিত্ররাজ্যের সাহায্য পায় নি।

(ঘ) অর্থনৈতিক দুর্বলতা

  • (১) পর্বতসঙ্কুল ও অনুর্বর মহারাষ্ট্রের কৃষিব্যবস্থা উন্নত ছিল না। মারাঠা নেতৃমণ্ডলী শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি ঘটিয়ে সুদৃঢ় অর্থনীতি গড়ে তোলার কোনও চেষ্টা করেন নি।
  • (২) এই অবস্থায় প্রতিবেশি রাজ্য থেকে বলপূর্বক ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখি’ আদায় করে তারা তাদের আর্থিক ঘাটতি পূরণ করত। এই দু’টি কর আদায় করার জন্য তাদের বিশাল সেনাবাহিনী রাখতে হত, যাদের বেতন দেওয়াই ছিল এক কঠিন সমস্যা।
  • (৩) বেতনের অভাবে সেনাদল প্রায়ই বিদ্রোহ ঘোষণা করত। সামন্ততন্ত্র শাসিত মহারাষ্ট্রে কৃষকদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। জায়গিরদার, প্যাটেল ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীদের লক্ষ্যই ছিল প্রজা-শোষণের মাধ্যমে অধিকতর রাজস্ব আদায়।
  • (৪) কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় পেশোয়া উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হন এবং প্রজারা পেশোয়া-বিরোধী হয়ে ওঠে। এই সব অর্থনৈতিক দুর্বলতা মারাঠাদের পতনের পথকে প্রশস্ত করে।

(ঙ) সামাজিক অবক্ষয়

  • (১) মারাঠা সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত অবক্ষয় এবং জনসাধারণের মধ্যে প্রগতিশীল শিক্ষা ও মূল্যবোধ প্রসারে নেতৃমণ্ডলীর অনীহা মারাঠা শক্তির পতনের অন্যতম কারণ। আর. ভি. নাদকানী-র মতে, সামাজিক অনগ্রসরতা ও অবক্ষয়ের মধ্যেই মারাঠাদের পতনের কারণ লুকিয়ে আছে।
  • (২) মদ্যপান, ইন্দ্রিয়াসক্তি ও নৈতিক অধঃপতন সামাজিক পরিবেশকে কলুষিত করেছিল। মারাঠা নেতৃমণ্ডলীও এই দোষগুলি থেকে মুক্ত ছিলেন না।
  • (৩) এছাড়া, নানা ধরনের কুসংস্কার, ডাইনিপ্রথা, বহুবিবাহ, শিশুবিবাহ, জ্যোতিষের প্রতি প্রবল আস্থা সামাজিক অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

(চ) বর্ণ প্রথা

  • (১) মারাঠা রাষ্ট্রে কোনও সামাজিক সংহতি ছিল না এবং এই সামাজিক সংহতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল বর্ণপ্রথা।
  • (২) ব্রাহ্মণদের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করা হত বলে পেশোয়ার সরকারকে অনেকে ‘ব্রাহ্মণ-রাজ’ বলে অভিহিত করেন।
  • (৩) ঐতিহাসিক রাণাডে বলেন যে, অষ্টাদশ শতকে প্রধান সেনা নায়কদের নিযুক্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতা নয়—গোষ্ঠী ও বর্ণই ছিল প্রধান বিবেচ্য।

(ছ) সামরিক দুর্বলতা

  • (১) মারাঠা রাষ্ট্রের সামরিক ভিত্তিও ছিল দুর্বল। পেশোয়াদের শাসনাধীনে মারাঠা সেনাদল তার জাতীয় চরিত্র হারায়। উত্তর ভারতীয় হিন্দু-মুসলিম, তেলেগুভাষী মানুষ, গোয়ার খ্রিস্টান অধিবাসী ও আরবদের নিয়ে গঠিত মারাঠা সেনাদল ছিল কার্যত একটি বহুজাতীয় সংগঠন।
  • (২) বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষদের নিয়ে গঠিত এই সেনাদলে কোনও ঐক্য বা সংহতি ছিল না। ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন-এর মতে মারাঠাদের চূড়ান্ত পতনের জন্য সামরিক বাহিনীর জাতীয় চরিত্রনাশই সর্বাপেক্ষা বেশি দায়ী ছিল।
  • (৩) চিরাচরিত অশ্বারোহী বাহিনী ও গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতি ত্যাগ করে মারাঠারা ইওরোপীয় রণকৌশল গ্রহণ করেছিল, কিন্তু এতেও তারা সুশিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে নি।
  • (৪) মারাঠা গোলন্দাজ বাহিনী ইউরোপীয় ও ফরাসি সেনাপতিদের দ্বারা পরিচালিত হত। বিপদের সময় তাদের কাছ থেকে যথাযোগ্য সাহায্য পাওয়া যায় নি — বরং তারা অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজ পক্ষে যোগদান করে।
  • (৫) যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে মারাঠারা তখনও নির্ভর করত পুরোনো যুগের বর্শা, তরবারি প্রভৃতির ওপর। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণা ছিল না।
  • (৬) মারাঠা বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন দ্বিতীয় বাজিরাও এবং দৌলত রাও সিন্ধিয়া। বলা বাহুল্য, যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁরা কোনও কৃতিত্ব দেখাতে পারেন নি। যশোবন্ত রাও হোলকার হঠকারিতা ও অতিরিক্ত দুঃসাহসের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে সেনাদল পরিচালনায় অক্ষম ছিলেন।
  • (৭) অপরপক্ষে, ইংরেজ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন স্যার আর্থার ওয়েলেসলি, লর্ড লেক প্রমুখ বিখ্যাত সমরনায়কেরা।

(জ) উন্নত কূটনীতি ও গুপ্তচর ব্যবস্থা

  • (১) কূটনীতি ও গুপ্তচর বৃত্তির দিক থেকেও ইংরেজরা মারাঠাদের থেকে অনেক উন্নত ছিল। ইংরেজরা মারাঠা নেতৃবৃন্দের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংঘর্ষ এবং অন্যান্য ভারতীয় রাজন্যবর্গ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ সংবাদ রাখত।
  • (২) এর ফলে তারা ভারতীয় রাজন্যবর্গের শক্তি, দুর্বলতা, সামরিক অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিল, যার ফলে ভারতে আধিপত্য স্থাপন করা তাদের পক্ষে সহজতর হয়।

উপসংহার :- প্রথম ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ, দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ, তৃতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ -এই তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারাঠা রাজ্য গ্রাস করলে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ সম্পূর্ণরূপে মারাঠা শক্তির পতন ঘটে।

(FAQ) মারাঠা শক্তির পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মারাঠা শক্তির পতন ঘটে কখন?

১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে।

২. ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে মারাঠাদের পতনকে ভারতের ইতিহাসে জলবিভাজিকা বলেছেন কে? – ডঃ পার্সিভাল স্পীয়ার

ডঃ পার্সিভাল স্পীয়ার।

৩. মারাঠাদের শেষ পেশোয়া কে ছিলেন?

দ্বিতীয় বাজিরাও।

৪. মারাঠা রাজ্যকে ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন কে?

লর্ড হেস্টিংস বা লর্ড ময়রা।

Leave a Reply

Translate »