মহারাণীর ঘোষণাপত্র

মহারাণীর ঘোষণাপত্রের সময়কাল, ঘোষণা পত্রের বিষয়, ঘোষণা পত্রের সীমাবদ্ধতা হিসেবে জাতি বিদ্বেষ, সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে বঞ্চনা, সরকারের বিভেদ নীতি, শিক্ষিত ভারতীয়দের প্রতি বিরূপতা, সরকারের সমাজ সংস্কার নীতি সম্পর্কে জানবো।

মহারাণীর ঘোষণাপত্র

*ঘোষণা পত্রের সময়কাল১ লা নভেম্বর ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ
ঘোষণা পত্রের  প্রতিষ্ঠাতামহারানী ভিক্টোরিয়া
*ঘোষণা পত্রের পাঠকলর্ড ক্যানিং
ঘোষণা পত্র পঠনের স্থানএলাহাবাদ
মহারাণীর ঘোষণাপত্র

ভূমিকা :- ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর মহারানি ভিক্টোরিয়া এক ঘোষণাপত্র মারফৎ ভারতের শাসনভার গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন এবং ভারতীয়শাসনব্যবস্থায় নতুন নীতি ও আদর্শের কথা ঘোষণা করে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেন।

ঘোষণা পত্রের বিষয়

এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে,

  • (১) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক কোনও ব্যাপারেই সরকার কোনও প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না।
  • (২) প্রত্যেক ভারতবাসী ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে।
  • (৩) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন সকল ভারতবাসীই সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবে।
  • (৪) এই ঘোষণাপত্র অনুসারে স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যক্ত হয়।
  • (৫) দেশীয় রাজন্যবর্গকে দত্তক গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়।
  • (৬) বলা হয় যে,সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী নয়।
  • (৭) দেশীয় রাজ্যগুলিকে আশ্বস্ত করা হয় যে, কোম্পানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত তাদের সব চুক্তি ও সন্ধিগুলিকে মেনে চলা হবে।

ঘোষণা পত্রের সীমাবদ্ধতা

বলা বাহুল্য, মহারানির এই সব প্রতিশ্রুতি ঘোষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয় নি।

(ক) জাতি বিদ্বেষ

  • (১) মহারানির ঘোষণাপত্রে ভারতীয় ও ইওরোপীয়দের প্রতি সমান আচরণ ও সমানাধিকারের কথা বলা হয়। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয় নি।
  • (২) ইংরেজরা নিজেদের ‘রাজার জাতি’ বলে মনে করত এবং ভারতীয়দের প্রতি তাদের আচরণ ছিল বিজেতা-সুলভ।
  • (৩) বিদ্রোহের সময় ভারতীয় ও ইউরোপীয় উভয় সম্প্রদায়ই পরস্পরের প্রতি নৃশংস ব্যবহার করে এবং এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততা, বিদ্বেষ ও সন্দেহ যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
  • (৪)বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ইউরোপীয়রা প্রকাশ্যেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে থাকে এবং ভারতীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহার ও ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়। ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

(খ) সরকারি চাকরি

  • (১) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রজার জন্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সমানাধিকার নীতি ঘোষণা করেও উচ্চপদস্থ চাকরিগুলির ক্ষেত্রে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
  • (২) ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স ছিল তেইশ বছর। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে পরীক্ষার্থীর বয়স কমিয়ে বাইশ, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে একুশ এবং ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে উনিশ করা হয়।
  • (৩) এত অল্প বয়সে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরি লাভ করা ভারতীয় যুবকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।
  • (৪) আসলে সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ইংরেজদের নিয়োগ করা।
  • (৫) পুলিশ, পূর্ত, চিকিৎসা, ডাক, শুল্ক প্রভৃতি বিভাগের উচ্চ বেতনের উচ্চ পর্যায়ের পদগুলি ইংরেজদের জন্যই একচেটিয়া করে রাখা হয়।

(গ) সরকারের বিভেদ নীতি

  • (১) ভারতীয়রা যাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে এই উদ্দেশ্যে মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে সরকার বিভেদ নীতি অবলম্বন করে।
  • (২) বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী ও অঞ্চলের মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বিষ্ট করে তোলা হয়। বিদ্রোহের অব্যবহিত পরেই ইংরেজ সরকার প্রকাশ্যে হিন্দু-তোষণ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করেছিল।
  • (৩) পরবর্তীকালে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে সরকার মুসলিম-তোষণ ও হিন্দু-বিদ্বেষের নীতি গ্রহণ করে।
  • (৪) দেশে শিল্প ও বাণিজ্যের অনগ্রসরতার জন্য সরকারি চাকরিই ছিল শিক্ষিত ভারতীয়দের একমাত্র অবলম্বন। সরকারি চাকরিকে কেন্দ্র করে সরকার সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিক-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়।

(ঘ) শিক্ষিত ভারতীয়দের প্রতি বিরূপতা

ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় মহাবিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল।ক্রমে শিক্ষিত ভারতবাসী ব্রিটিশ শাসনের সাম্রাজ্যবাদী স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় এবং নিজেদের অধিকার দাবি করতে থাকে।ফলে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষিত ভারতবাসী ও উচ্চশিক্ষার প্রতি বিরূপ হয়ে উঠতে থাকে।

(ঙ) জমিদারদের প্রতি সরকারের মনোভাব

  • (১) শিক্ষিত ভারতীয়দের প্রতি বিরূপ হয়ে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয় রাজা, মহারাজা, জমিদার, তালুকদার প্রভৃতি ভূস্বামীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে ভারতে ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ় করতে উদ্যোগী হয়।
  • (২) পদচ্যুত জমিদার ও তালুকদারদের বহু স্থানে জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং ভারতীয় সমাজের নেতা হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • (৩) শিক্ষিত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে নতুন একটি শক্তি হিসেবে জমিদারদের তুলে ধরা হয়। জমিদাররাও উপলব্ধি করে যে, ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্বের সঙ্গে তাদের ভাগ্যও জড়িত।

(চ) সরকার ও সমাজ সংস্কার নীতি

  • (১) ভারতবাসীর সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ইংরেজদের হস্তক্ষেপ মহাবিদ্রোহের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
  • (২) সুতরাং মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে ভারতবাসীর সমাজ ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে সরকার উদাসীনতার নীতি গ্রহণ করে।
  • (৩) এই উদাসীনতা সর্বদা তারা বজায় রাখে নি। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বহু ক্ষেত্রে তারা জাতিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।

উপসংহার :- মহারানির ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলি বহুলাংশে ‘ঘোষণাপত্র’-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই কারণে মহারানির শাসনকালকে অনেকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত করেছেন। এই সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে ভারতীয়দের মনে শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ, হতাশা ও ঘৃণা সঞ্চার হয়, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নানাভাবে সঞ্জীবিত করে।

(FAQ) মহারাণীর ঘোষণাপত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মহারানীর ঘোষণা পত্র কবে জারি করা হয়?

১ লা নভেম্বর, ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে।

২. মহারানীর ঘোষণা পত্র কে পাঠ করেন?

লর্ড ক্যানিং।

৩. মহারানীর ঘোষণা পত্র কোথায় পাঠ করা হয়?

ভারতের এলাহাবাদে।

Leave a Reply

Translate »