ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল

ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল প্রসঙ্গে অনুপ্রেরণা, দুটি লক্ষ্য, গোষ্ঠী বিভাগ, কুসংস্কার নির্মূলে অক্ষম, হিন্দু-মুসলিম মিলন প্রচার, হিন্দু মুসলিম কাছাকাছি, রাজাদের উপর প্রভাব, হিন্দু সমাজে জাগরণ ও ঐক্য, কথ্য ভাষার উপর প্রভাব ও সাহিত্যের উপর প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

ভারতে ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল

ঐতিহাসিক ঘটনাভক্তি আন্দোলনের ফলাফল
সুলহ-ই-কুলআকবর
দোহাকবীর
আভঙ্গতুকারাম
ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল

ভূমিকা :- ভারতীয় জনজীবনে ভক্তি আন্দোলন গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কেবলমাত্র সমকালীন ধর্মীয় জীবনই নয়, তার সাথে সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনেও ভক্তিবাদের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

ভক্তি আন্দোলনের অনুপ্রেরণা

আনুষ্ঠানিক পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের বাইরে একেশ্বরবাদী ভক্তিবাদ, ঈশ্বরের প্রতি প্রেম, আবেগ ও আত্মসমর্পণ সমাজের সকল শ্রেণীকে বিশেষত নিপীড়িত শ্রেণীকে অনুপ্রাণিত করে।

ভক্তি আন্দোলনের দুটি লক্ষ্য

প্রথম দিকে রক্ষণশীলতা দূর করায় ভক্তি আন্দোলনের দুটি লক্ষ্য ছিল। যথা – হিন্দু পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ প্রভৃতির সংস্কার এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন। প্রথম লক্ষ্যটি কিছুটা পুরিত হওয়ার পর আন্দোলন এই লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে।

ভক্তি আন্দোলনের গোষ্ঠী বিভাগ

বিভিন্ন ভক্তিবাদী সম্প্রদায় নিজ নিজ গোষ্ঠীতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে হিন্দু সমাজে রক্ষণশীলতা, জাতিভেদ, পৌত্তলিকতা দূর করে সাম্য স্থাপনের পরিবর্তে ভক্তিমার্গীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়কেই শ্রেষ্ঠ মনে করে। ভক্তি আন্দোলন তার মূল লক্ষ্য হতে চ্যুত হয়। ভক্তিমার্গীরা শিখ, নিম্বার্ক, গৌড়ীয়, কবীর-পন্থী প্রভৃতি বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়।

কুসংস্কার নির্মূলে ভক্তি আন্দোলন অক্ষম

হিন্দু পৌত্তলিকতা, রক্ষণশীলতা ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবে কিছুটা সংযত হয়। কিছুটা সংযত হলেও কিন্তু হিন্দুধর্মের এই কুসংস্কারগুলিকে ভক্তি আন্দোলন নির্মূল করতে পারে নি।

ভক্তি আন্দোলনের ফলে হিন্দু-মুসলিম মিলন প্রচার

  • (১) ভক্তি আন্দোলন তার দ্বিতীয় লক্ষ্য, অর্থাৎ হিন্দু ও ইসলামের মিলন প্রচার করে। এই আন্দোলন উভয় সম্প্রদায়ের বিবেকবান, যুক্তিবাদী মানুষের মনে বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করে। এর ফলে একটি স্তরে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সংযোগ ও আদান-প্রদান ঘটে।
  • (২) কিন্তু এই প্রচেষ্টা রক্ষণশীলদের প্রভাবে বিশেষ সফল হয়নি। গোঁড়া উলেমারা রাম ও রহিম এর ভক্তিবাদীদের এই তত্ত্বকে মানতে রাজী ছিলেন না। সুতরাং তাঁরা বিশুদ্ধ কোরাণীয় ইসলামের ওপরেই জোর দেন। অপরদিকে গোঁড়া হিন্দু পণ্ডিতও “রাম ও রহিম এক” একথা মানতেন না।

ভক্তি আন্দোলনের ফলে হিন্দু-মুসলিম নৈকট্য

রক্ষণশীল গোষ্ঠী হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের বিরোধিতা করেন। তথাপি একথা সত্য যে, ভক্তি আন্দোলন দুই প্রধান সম্প্রদায়কে খুবই কাছে আনতে পেরেছিল এবং দুই সম্প্রদায়ের ধর্মের মানবিক ও ভালো দিকগুলি তুলে ধরেছিল। ভক্তি আন্দোলনের এই মঙ্গলজনক প্রগতিশীল দিকটা উপেক্ষা করা যায় না।

রাজাদের উপর ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব

ভক্তি আন্দোলনের ফলে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, জয়নাল আবেদিন প্রমুখ সুলতান হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনের জন্য চেষ্টা করেন। এর ফলে পরবর্তী কালে সম্রাট আকবর সুলহ-ই-কুল নীতি গ্রহণ করেন।

ভক্তি আন্দোলনের ফলে হিন্দু সমাজে জাগরণ ও ঐক্য

  • (১) কোনো কোনো লেখক বলেন যে, ভক্তি আন্দোলনের ফলে হিন্দু সমাজে যে নতুন আবেগ ও মানবিকতা দেখা দেয় তা হিন্দু সমাজকে বলীয়ান করে। সকল মানুষ সমানভাবে ঈশ্বরের করুণা পেতে অধিকারী – ভক্তি গুরুদের এই বাণী নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মনে নতুন বল আনে।
  • (২) নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা যারা সামন্ততান্ত্রিক ও জাতিভেদ জনিত নির্যাতনে শোষিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের দিকে ঝুঁকেছিল তারা এই মনোভাব ত্যাগ করে। হিন্দু সমাজের ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি পায়।

কথ্য ভাষায় ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব

ভক্তি আন্দোলনের ফলে বিভিন্ন কথ্য ভাষা অগ্রগতি হয়। ভক্তিমার্গের সাধকরা মানুষের মুখের ভাষায় তাদের ধর্ম প্রচার করতেন। এজন্য কথ্য ভাষার সমাদর বাড়ে। ভক্তিগীতি ও ভক্তিমার্গের সাধকদের বাণী ও তাদের জীবনীগুলি কথা ভাষায় রচিত হয়।

সাহিত্যের উপর ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব

ভক্তি আন্দোলনের ফলে সাহিত্যের প্রভূত অগ্রগতি হয়। বাংলায় পদাবলী সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। তাছাড়া চৈতন্যের জীবনীগুলি বিশেষত কৃষ্ণদাসের চৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্য ভাগবত, মুরারি গুপ্তের কড়চা প্রভৃতি গ্রন্থ রচিত হয়। হিন্দী সাহিত্যে কবীরের দোহা ও গুরুমুখী ভাষায় নানকের ভজন, মারাঠী সাধক নামদেব, তুকারামের আভঙ্গ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার :- ভক্তি আন্দোলন কিছুকাল ভারত -এর সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করে। উত্তর ও দক্ষিণ ভারত সমানভাবে ভক্তি আন্দোলনে প্লাবিত হয়।

(FAQ) ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বাংলার কোন সুলতান হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনের প্রয়াস করেন?

হুসেন শাহ।

২. কাশ্মীরের কোন সুলতান হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনের প্রয়াস করেন?

জয়নাল আবেদিন।

৩. কাশ্মীরের আকবর কাকে বলা হয়?

জয়নাল আবেদিন।

৪. সুলহ-ই-কুল নীতি কে গ্ৰহণ করেন?

মোগল সম্রাট আকবর।

Leave a Comment