সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন প্রসঙ্গে সাধারণ সভা, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, অছি পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচারালয় ও দপ্তর সম্পর্কে জানবো।

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন

বিষয় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন
প্রতিষ্ঠা ২৪ অক্টোবর, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ
উদ্দেশ্য বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা
প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ
প্রেক্ষাপট প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন

ভূমিকা :- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির পর বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিপুঞ্জ ছয়টি প্রধান সংস্থার মাধ্যমে তার কার্যাবলী পরিচালনা করে থাকে।

জাতিপুঞ্জের সংগঠন

জাতিপুঞ্জের সনদের ৭ নং ধারায় এই সংস্থাগুলির উল্লেখ আছে। এই সংস্থাগুলি হল –

  • (ক) সাধারণ সভা,
  • (খ) নিরাপত্তা পরিষদ,
  • (গ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ,
  • (ঘ) অছি পরিষদ,
  • (ঙ) আন্তর্জাতিক বিচারালয় এবং
  • (চ) দপ্তর।

(ক) সাধারণ সভা

  • (১) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সব সদস্যকে নিয়ে ‘সাধারণ সভা’ গঠিত। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রের পাঁচজন প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন এবং প্রয়োজনে আরও কিছু উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞও সঙ্গে রাখা যায়। কিন্তু প্রত্যেক রাষ্ট্রের ভোট মাত্র একটিই।
  • (২) প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ সভার অধিবেশন বসে, তবে নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ সভার অধিকাংশ সদস্যের অনুরোধে বিশেষ অধিবেশন ডাকা যেতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘সাধারণ ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট, কিন্তু ‘গুরুত্বপূর্ণ” বিষয়ে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়।
  • (৩) সনদে উল্লিখিত যে কোনও বিষয় নিয়ে সাধারণ সভা আলোচনা করতে পারে, তবে এই সভার সুপারিশগুলি গ্রহণ করা সম্বন্ধে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। এই সভা হল একটি পরিদর্শক, সমালোচক ও আলোচনা সভা মাত্র। এর আইন প্রণয়নের কোনও ক্ষমতা নেই বা এর সুপারিশগুলিও আইন নয়।
  • (৪) এই সভা হল বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলির আলোচনা সভা এবং এই সভায় আলোচিত বিষয়গুলির মাধ্যমে জনমত প্রতিফলিত হয়। এই সভা জাতিপুঞ্জের বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নির্বাচন, বিভিন্ন সংস্থার বার্ষিক রিপোর্ট পর্যালোচনা, বাজেট নিয়ে আলোচনা ও তা পাস প্রভৃতি কাজ করে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ৫১টি সদস্য-রাষ্ট্র নিয়ে এর কাজ শুরু হলেও বর্তমানে ২০০ বেশি রাষ্ট্র এর সদস্য।

(খ) নিরাপত্তা পরিষদ

  • (১) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হল নিরাপত্তা পরিষদ। এটিই হল মূলত জাতিপুঞ্জের কার্যনির্বাহক সমিতি। পাঁচটি স্থায়ী ও ছয়টি অস্থায়ী – মোট এগারোটি সদস্য-রাষ্ট্র নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত।
  • (২) আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সোভিয়েত রাশিয়া ও কমিউনিস্ট চীন – এই পাঁচটি রাষ্ট্র হল এর স্থায়ী সদস্য। বাকি ছয়টি অস্থায়ী সদস্য ‘সাধারণ সভা’ কর্তৃক দু’বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১০ করা হয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা হয়েছে ১৫ – পাঁচটি রাষ্ট্র স্থায়ী এবং দশটি রাষ্ট্র অস্থায়ী সদস্য।
  • (৩) স্থায়ী সদস্যদের যে কেউ ‘ভেটো’ দিয়ে যে কোনও প্রস্তাব বাতিল করে দিতে পারে, অর্থাৎ কোনও প্রস্তাব গ্রহণ করতে গেলে স্থায়ী সদস্যদের একমত হওয়া দরকার। নিরাপত্তা পরিষদের মূল কাজ হল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা।
  • (৪) আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিষদ যে কোনও বিষয় সম্পর্কে তদন্ত, সালিশী, বিচার ও শাস্তিদান করতে পারে। শাস্তি হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমে অভিযুক্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক বয়কট’ নীতি গ্রহণ করে সব সদস্য রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত রাষ্ট্রটির সঙ্গে সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলে। এই ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে নিরাপত্তা পরিষদ সদস্য-রাষ্ট্রগুলির সামরিক বাহিনীর সাহায্য নিয়ে অভিযুক্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়।

(গ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ

  • (১) বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং অগ্রগতির উদ্দেশ্যে জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভার পরিচালনাধীনে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ’ গঠিত হয়েছে। জাতিপুঞ্জের সনদের দশম অধ্যায়ে এই সংস্থার গঠনতন্ত্র ও কার্যাবলী বর্ণিত হয়েছে।
  • (২) সাধারণ সভা কর্তৃক নির্বাচিত ১৮ জন সদস্য নিয়ে এই পরিষদ গঠিত। এর সদস্যরা তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হন। প্রতি তিন বছর অন্তর এর এক-তৃতীয়াংশ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৫৪।
  • (৩) এই পরিষদের কাজ হল – বিশ্বের সব রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করে সুপারিশ-সহ সাধারণ সভায় পেশ করা‌। সব দেশের জনগণের মানবাধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
  • (৪) এই পরিষদের কর্ম-পরিধি এত বিস্তৃত যে, এর অধীনে অন্তত ১৩টি সংস্থা আছে। সেগুলির মধ্যে খাদ্য ও কৃষি পরিষদ (FAO), আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (IMF), আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা (ILO), বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিপুঞ্জের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

(ঘ) অছি পরিষদ

  • (১) নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ও সাধারণ সভা কর্তৃক নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে অছি পরিষদ গঠিত। মৌলিক কিছু পার্থক্য থাকলেও জাতিপুঞ্জের অছি-ব্যবস্থা হল জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট ব্যবস্থার অনুরূপ।
  • (২) জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট-ভুক্ত দেশগুলি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধাবসানে অক্ষশক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুন্নত দেশগুলিকে অছি পরিষদের অধীনে স্থাপন করা হয়। কারণ এই সকল অঞ্চলের অধিবাসীরা তখনও স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত ছিল না।
  • (৩) এই অনুন্নত দেশগুলিকে জাতিপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণে এবং কয়েকটি বৃহৎ রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রেখে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই ছিল অছি পরিষদের লক্ষ্য।
  • (৪) অছি ভুক্ত দেশগুলির অধিকাংশই আফ্রিকায় অবস্থিত। ক্যামেরুন, টোগোল্যান্ড, সোমালিল্যান্ড, টাঙ্গানাইকা প্রভৃতি দেশে অছি-ব্যবস্থা স্থাপিত হয়।

(ঙ) আন্তর্জাতিক বিচারালয়

  • (১) আন্তর্জাতিক বিবাদের নিষ্পত্তি, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আইনগত বিবাদ মেটানোর উদ্দেশ্যে হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ডস) হেগ শহরে জাতিপুঞ্জের অধীনস্থ একটি আন্তর্জাতিক বিচারালয় স্থাপিত হয়েছে।
  • (২) সদস্যদের পক্ষে এই বিচারালয়ের রায় মানা বাধ্যতামূলক, তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে আপিল করা যেতে পারে। ১৫ জন বিচারপতিকে নিয়ে এই বিচারালয় গঠিত। বিচারপতিরা নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ সভা কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

(চ) দপ্তর

  • (১) দপ্তর বা সেক্রেটারিয়েট হল জাতিপুঞ্জের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। একজন মহাসচিব, আটজন সহকারী মহাসচিব এবং প্রায় ১০ হাজার কর্মচারী নিয়ে নিউইয়র্ক শহরে জাতিপুঞ্জের এই সদর দপ্তর বা প্রধান কার্যালয় অবস্থিত।
  • (২) জাতিপুঞ্জের সনদে এই সংস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, এই ‘দপ্তরের’ দক্ষতার উপরেই জাতিপুঞ্জের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভরশীল। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ সভা মহাসচিবকে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ করে এবং জাতিপুঞ্জের সব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ তাঁর মাধ্যমেই কার্যকর করা হয়।
  • (৩) মহাসচিব হলেন জাতিপুঞ্জের মুখ্য প্রশাসক। সমস্ত দপ্তরের কাজকর্ম পরিচালনা করা, কাজের রিপোর্ট তৈরি করা, আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখা, সদস্য-রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করা, কর্মসূচি প্রণয়ন করা, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা – এই সবই তাঁর কর্তব্যের অঙ্গীভূত।
  • (৪) বিশ্বের কোথাও শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, মহাসচিব সেখানে শান্তি স্থাপনে উদ্যোগ নিতে পারেন বা এই বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন।

উপসংহার :- নরওয়ের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রিগভি লি (Trygve Lie) ছিলেন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রথম মহাসচিব এবং বর্তমান মহাসচিব হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী বান কি-মুন।

(FAQ) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংগঠন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয় কবে?

২৪ অক্টোবর, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে।

২. কি উদ্দেশ্যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়?

আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা।

৩. কোন যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

৪. কয়টি সংস্থা নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়?

৬ টি।

৫. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রথম মহাসচিব কে ছিলেন?

ট্রিগভি লি।

৬. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বর্তমান মহাসচিবের নাম কি?

বান কি মুন।

Leave a Reply

Translate »