মনসবদারি ব্যবস্থা

মনসবদারি ব্যবস্থা -র প্রবর্তক, প্রবর্তনের কারণ, মনসবদারি প্রথা, মনসবদার, মনসবদারদের স্তর, সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ, মনসবদার ও সেনা নিয়োগ, মনসবদারি প্রথার বৈশিষ্ট্য, জাট ও সওয়ার প্রচলন, মনসবদারদের শ্রেণীবিভাগ, সেনাদের শ্রেণীবিভাগ, মনসবদারদের বেতন, মনসবদারদের ত্রুটি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

মনসবদারি ব্যবস্থা (The Mansabdari System)

প্রবর্তকআকবর
অর্থপদমর্যাদা
জাট ও সওয়ার প্রচলন১৫৯৫-৯৬ খ্রিস্টাব্দ
মনসবদারি ব্যবস্থা

ভূমিকা :- মোগল আমলে সামরিক ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল আকবর প্রবর্তিত মনসবদারি প্রথা। ভারতে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার বহু পূর্ব থেকেই ‘মনসব’ কথাটি মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলিতে প্রচলিত ছিল।

প্রবর্তক

চেঙ্গিজ খাঁ ও তৈমুর লঙের শাসনব্যবস্থায় এই প্রথার অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।ভারতে সুলতানি আমলেও এই ব্যবস্থা একটু অন্যভাবে প্রচলিত ছিল। সুতরাং আকবরই’যে এর প্রবর্তক তা বলা যায় না।

আকবরের উদ্ভাবন

মোগল যুগে যে মনসবদারি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তা আকবরের নিজস্ব উদ্ভাবন। এই ব্যবস্থার মূল নীতিগুলি আগে থেকে চালু থাকলেও, মোগল যুগে মনসবদারির সংগঠন ও নিয়ম-কানুন সর্বপ্রথম আকবরই উদ্ভাবন করেন।

প্রবর্তনের কারণ

আকবরের পূর্বে সামরিক, বেসামরিক সকল উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে বেতনের পরিবর্তেজায়গির দেওয়া হত। জায়গির-প্রাপ্ত সকল কর্মচারী যুদ্ধকালে সম্রাটকে সেনা সরবরাহ করতেন। কালক্রমে এই ব্যবস্থায় নানা দুর্নীতি প্রবেশ করে।

  • (১) দুর্নীতিগ্রস্ত জায়গিরদাররা সঠিক সংখ্যক সেনা রাখতেন না এবং তাঁরা সম্রাটকে অপদার্থ, বৃদ্ধ সেনা ও ঘোড়া সরবরাহ করতেন।
  • (২) যথেচ্ছভাবে জায়গির বিতরণের ফলে ‘খালিসা’ জমি কমে যায় এবং এর ফলে সরকারি রাজস্ব বিপুলভাবে হ্রাস পায়।
  • (৩) সুলতানি যুগের শেষ দিকে জায়গির প্রথা বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে এবং জায়গিরদাররা নিজ নিজ এলাকায় প্রভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে স্বয়ং সম্রাটের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়াতেন।

মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন

এই সব ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে আকবর জায়গিরদারি প্রথার বিলোপ ঘটিয়ে মনসবদারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

মনসবদারি প্রথা

এই প্রথা ছিল মোগল শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই প্রথা অনুসারে সাম্রাজ্যের সকল পদস্থ কর্মচারী বেসামরিক কাজকর্মের সঙ্গে সামরিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য ছিলেন।

মনসবদার

‘মনসব ‘ কথাটির অর্থ হল পদমর্যাদা এবং যিনি এই পদমর্যাদার অধিকারী, তাঁকে বলা হত ‘মনসবদার’। এই প্রথা অনুসারে প্রত্যেক মনসবদারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সেনা ও ঘোড়া রাখতে হত এবং পদমর্যাদা অনুসারে তাঁদের বেতন স্থির হত।

মনসবদারদের স্তর

‘আইন-ই-আকবরী-র মতে পদমর্যাদা ও দায়িত্ব অনুসারে মনসবদাররা ৬৬টি স্তরে বিভক্ত ছিল। বাস্তবে কিন্তু ছিল ৩৩টি স্তর। তাঁরা ১০ থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত যে কোনও পরিমাণ সৈন্যের মনসবদার হতে পারতেন।

রাজপরিবারে মনসব

রাজপরিবারের লোকেরা ১০ হাজার পর্যন্ত মনসব পেতেন। টোডরমল, মানসিংহ, কুলিচ খাঁ প্রমুখের ক্ষেত্রে অবশ্য নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল। মনসবদাররা যুদ্ধকালে সম্রাটকে সেনা পাঠাতে বাধ্য ছিলেন।

সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ

মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, অপসারণ—সব কিছুই সম্রাটের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ মনসবদারি পেতেন না, কর্মনিপুণতার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হত।

মনসবদার ও সেনা নিয়োগ

এই মনসবদার নিয়োগ এবং মনসবদারের অধীনস্থ সেনাবাহিনী গঠন নিয়েও কিছু আইন কানুন ছিল।

  • (১) আকবরের নির্দেশ ছিল যে সাম্রাজ্যের কোনও একটি বিশেষ জাতিগোষ্ঠী নয়, সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে যেন সেনাবাহিনী গঠিত হয়। অনুরূপভাবে মনসবদার নিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্রাট এই নীতি অনুসরণ করতেন।
  • (২) কোনও বিশেষ জাতিগোষ্ঠী প্রভাবশালী হয়ে উঠলে সম্রাট তার নেতাদের মনসব দিয়ে প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করতেন। এভাবেই ইরানি, তুরানি, হিন্দুস্থানি, রাজপুত, দক্ষিণী এই সব গোষ্ঠী বা দল-উপদল তৈরি হয়। আকবর সর্বদা এই সব গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করতেন।

মনসবদারি প্রথার বৈশিষ্ট্য

মনসবদারি প্রথার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য গুলি হল –

  • (১) প্রতিটি মনসবদার নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা রাখত এবং প্রয়োজনে সম্রাটকে সৈন্যের যোগান দিত।
  • (২) অশ্ব ও সেনা সংখ্যার ভিত্তিতে মনসবদারি ব্যবস্থা ৩৩ টি স্তরে বিভক্ত ছিল। মনসবদাররা ১০ থেকে ১০০০০ সৈন্য পর্যন্ত রাখার অধিকার পেতেন। আকবরের রাজত্বের শেষদিকে এই সংখ্যা ১২০০০ পর্যন্ত ওঠে।
  • (৩) ৫০০০ এর বেশি মনসবদারকে বলা হত আমীর। কেবলমাত্র রাজ পরিবারের সদস্যরাই  ৫ হাজারের বেশি মনসব রাখতে পারতেন।
  • (৪) মনসবদার প্রথা বংশানুক্রমিক ছিল না। কর্মনিপুণতার মাধ্যমে এই মর্যাদা অর্জন করতে হত।
  • (৫) মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বরখাস্ত করা সবকিছুই সম্রাটের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত।

জাট ও সওয়ার প্রচলন

মনসবদারদের যে পরিমাণ সেনা রাখার কথা, তা তাঁরা রাখতেন না। এই জন্য আকবর তাঁর রাজত্বকালের ৪০ তম বর্ষে ১৫৯৫-৯৬ খ্রিস্টাব্দে ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’ পদ দু’টি চালু করেন।

(১) জাট

‘জাট’ হল মনসবদারের ব্যক্তিগত পদমর্যাদা ও তাঁর প্রাপ্ত বেতনের পরিচায়ক।

(২) সওয়ার

‘সওয়ার’ হল মনসবদারের অধীনস্থ সেনার সংখ্যার পরিচায়ক।

মনসবদারদের শ্রেণীবিভাগ

মনসবদারদের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। যেমন –

  • (১) যে মনসবদার তার ‘জাট’ মর্যাদার সমান সংখ্যক সওয়ার রাখতেন তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণীভূক্ত।
  • (২) যিনি অর্ধেক বা তার বেশি সওয়ার রাখতেন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত।
  • (৩) যিনি ‘জাট’ মর্যাদার অর্ধেকেরও কম সওয়ার রাখতেন তিনি তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত মনসবদার ছিলেন।

পুরস্কার প্রদান

মনসবদাররা যাতে বেশি সংখ্যক সওয়ার রাখেন, তার জন্য তাঁদের পুরস্কৃত করার নীতি গৃহীত হয়। বাস্তবে কিন্তু কোনও মনসবদারের পক্ষেই ‘জাট’ মর্যাদার বেশি সংখ্যক সওয়ার রাখা সম্ভব হত না।

সৈন্যদের বিভাগ

প্রতিটি সৈনিকের অধীনস্থ ঘোড়ার সংখ্যার ভিত্তিতে সৈন্যদের তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হত। যথা –

  • (১) যার অধীনে একটি ঘোড়া থাকত তাকে বলা হত ‘এক আস্পা’ বা ইয়াক-আস্পা’।
  • (২) যার অধীনে দু’টি ঘোড়া থাকত তাকে বলা হত ‘দু আস্পা’।
  • (৩) যার অধীনে তিনটি ঘোড়া থাকত তাকে বলা হত শি-আস্পা’।
  • (৪) অনেক সময় আবার দু’জন সেনার অধীনে একটি ঘোড়া থাকত। তাদের বলা হত ‘নিম আস্পা’।

বেতন

সেইসময় মনসবদারদের বেতন নেহাৎ কম ছিল না।

  • (১) একশ ‘জাট’ পদাধিকারী মনসবদারের মাসিক বেতন ছিল ৫০০ টাকা।
  • (২)’এক হাজারী’ মনসবদারের মাসিক বেতন ছিল ৪,৪০০ টাকা।
  • (৩) পাঁচ হাজারী মনসবদারের মাসিক বেতন ছিল ৩০,০০০ টাকা।

বেতন ব্যয়

এই মাসিক বেতন থেকে মনসবদারকে সেনাদের বেতন, ঘোড়া, হাতি প্রভৃতি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতি ব্যয় মেটাতে হত।

দাগ ও হুলিয়া

মনসবদাররা যাতে উপযুক্ত মানের অশ্ব ও সেনা নিজ বাহিনীভুক্ত করেন, সেজন্য আকবর ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করেন। পূর্বে আলাউদ্দিন ও শেরশাহ -এর আমলে ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথা প্রচলিত ছিল।

মনসবদারি ব্যবস্থার ত্রুটি

এই মনসবদারি ব্যবস্থার ত্রুটিগুলিও উপেক্ষণীয় নয়। অধ্যাপক কুরেশী -র মতে, মোগল সাম্রাজ্যের পতনে মনসবদারি প্রথার ত্রুটিগুলির যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

  • (১) এই ব্যবস্থা ছিল অতি জটিল। এই কারণে তা বহুলাংশে সম্রাটের ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আকবরের পরবর্তীকালে এই ব্যবস্থায় ভাঙ্গন ধরে।
  • (২) প্রথমদিকে ভালভাবে শুরু হলেও কালক্রমে এই ব্যবস্থায় নানা জটিলতা এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। এর ফলে এই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • (৩) অধিকাংশ ক্ষেত্রে মনসবদারদের সেনাবাহিনী ছিল অযোগ্য। সম্রাটকে বেশি সংখ্যা দেখাবার উদ্দেশ্য অনেক সময়ই ভিখারী, ভবঘুরে প্রভৃতিদের সৈনিক সাজিয়ে আনা হত। তাদের দ্বারা যুদ্ধ করা সম্ভব ছিল না।
  • (৪) সাধারণ ঘোড়াকে যুদ্ধের ঘোড়া হিসেবে হাজির করা হত। এই সব অব্যবস্থা দূর করার উদ্দেশ্যে আকবর দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে বাধ্য হন।
  • (৫) মনসবদারদের সেনারা সম্রাটকে চিনত না। তাঁদের আনুগত্য ছিল স্থানীয় সর্দারদের প্রতি।
  • (৬) এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক পদস্থ কর্মচারীকে বেসামরিক কাজের সঙ্গে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হত। সকল বেসামরিক কর্মচারী সামরিক কার্যে দক্ষ ছিলেন না বা সকল সামরিক কর্মচারীর পক্ষে প্রশাসনিক সকল দিকে দক্ষ হওয়া সম্ভব ছিল না।

মনসবদারি ব্যবস্থার গুরুত্ব

এই মনসবদারি প্রথার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

  • (১) মনসবদার পদ বংশানুক্রমিক না হওয়ায় অযোগ্য লোকের পরিবর্তে ঐ পদে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের সুবিধা ছিল।
  • (২) মনসবদার পদ এবং এর সঙ্গে যুক্ত জায়গির বংশানুক্রমিক না হওয়ায় সামন্ত প্রথার উদ্ভব হওয়া সম্ভব হয় নি।
  • (৩) এই প্রথার ফলে প্রশাসনে বিদেশি অভিজাতদের প্রাধান্য খর্ব হয় এবং বাদশা এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারতেন।
  • (৪) এই প্রথার ফলে মোগল রাজতন্ত্র যে শক্তিশালী হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।

উপসংহার :- মনসবদারি ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্ব থাকলেও এর ত্রুটি গুলি মোগল সাম্রাজ্যের পক্ষে হিতকর হয় নি।তাই আরভিন বলেন যে, মোগল সামরিক ব্যবস্থার মধ্যেই মোগলদের ধ্বংসের বীজ নিহিত ছিল।

(FAQ) মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মনসবদারি ব্যবস্থা কে চালু করেন?

মোগল সম্রাট আকবর।

২. মনসবদারি ব্যবস্থা কবে প্রচলিত হয়?

১৫৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দে।

৩. মনসব কথার অর্থ কী?

পদমর্যাদা।

৪. কে, কবে জাট ও সওয়ার প্রচলন করেন?

মোগল সম্রাট আকবর ১৫৯৫-৯৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »