আলিগড় আন্দোলন

আলিগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা, আলিগড় আন্দোলন, আন্দোলনের নেতা, থিওডোর বেকের পত্রিকা প্রকাশ, মুসলিম সংগঠন প্রতিষ্ঠা, আলিগড় আন্দোলনের আদর্শ, আন্দোলনের মৌলিক নীতি, শিক্ষা বিস্তারে আলিগড় আন্দোলনের প্রভাব, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের প্রভাব, আলিগড় আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও অবদান সম্পর্কে জানবো।

আলিগড় আন্দোলন (The Aligarh Movement)

প্রধান কেন্দ্রআলিগড় কলেজ
জনকস্যার সৈয়দ আহমদ খান
নেতৃত্বচিরাগ আলি, কবি আলতাফ হোসেন আলি, মৌলানা শিবলি নোমানি, নাজির আহম্মদ
উদ্দেশ্যমুসলিম সমাজের উন্নতি সাধন
আলিগড় আন্দোলন

ভূমিকা :- পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়কে যুক্তিবাদী আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে যে আন্দোলনের সূচনা করেন তা আলিগড় আন্দোলন নামেপরিচিত।

আলিগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আহমদ আলিগড়ে ‘অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় (১৯২০ খ্রিঃ)।

আলিগড় কলেজের প্রতি সরকারের মনোভাব

সরকার এই কলেজটিকে প্রচুর অর্থদান করত। বড়লাট এবং প্রাদেশিক গভর্নররা প্রায়ই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতেন। বড়লাট লর্ড নর্থব্রুক ব্যক্তিগতভাবে এই কলেজকে দশ হাজার টাকা দান করেন।

আলিগড় আন্দোলন

পরবর্তীকালে আলিগড় কলেজকে কেন্দ্র করেই মুসলিম সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিবর্তিত হয়। মুসলিম সমাজের এই জাগরণ আলিগড় আন্দোলন নামে খ্যাত। হিন্দু-বিদ্বেষ, বাঙালি-বিদ্বেষ, কংগ্রেস-বিরুেষ এবং ইংরেজদের তোষণই ছিল এই আন্দোলনের প্রধান মূলধন।

আলিগড় আন্দোলনের নেতা

এই আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতাদের ছিলেন চিরাগ আলি, কবি আলতাফ হোসেন আলি, মৌলানা শিবলি নোমানি, নাজির আহম্মদ, কবি হালি, শিক্ষাবিদ খুদা বক্স।

কংগ্রেস প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে তুলনা

হিউম, ওয়েডারবার্ন এবং কটন জাতীয় কংগ্রেসের কাছে যা ছিলেন, আলিগড় কলেজের প্রথম তিন অধ্যক্ষ-থিয়োডোর বেক, মরিসন এবং আর্চিবোল্ডও আলিগড় মুসলিম আন্দোলনে তাই ছিলেন।

রাজনৈতিক প্রচার কেন্দ্রের মূল কেন্দ্র

সৈয়দ আহমদের সুহৃদ ও পরিচালক, আলিগড় কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ থিয়োডোর বেক-এর পরিচালনাধীনে আলিগড় কলেজ এই ধরনেররাজনৈতিক প্রচারকার্যের মূলকেন্দ্রে পরিণত হয়।

থিওডোর বেকের পত্রিকা প্রকাশ

অধ্যক্ষ বেক সম্পাদিত ইন্‌স্টিটিউট গেজেট’ নামক কলেজ পত্রিকা মারফৎবাঙালি-বিদ্বেষ, হিন্দু বিদ্বেষ ও কংগ্রেস-বিদ্বেষ প্রচার করা হত।

ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা

১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে বেকের উদ্দোগে আলিগড়ে ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে হিন্দু সদস্যও ছিল এবং এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল এটাই প্রমাণ করা যে, জাতীয় কংগ্রেস হিন্দুদের একমাত্র সংগঠন নয়।

মুসলিম সংগঠন প্রতিষ্ঠা

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মূলত বেকের উদ্যোগেই ‘মহামেডান ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন অব আপার ইন্ডিয়া’ নামে কেবল মুসলিমদের নিয়ে আরেকটি সংগঠন স্থাপিত হয়।

আলিগড় আন্দোলনের আদর্শ

মুসলিম স্বার্থ রক্ষা ও ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করাই ছিল সৈয়দ আহমদ ও থিওডোর বেক প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলির লক্ষ্য। সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর পর এই আদর্শেই আলিগড় আন্দোলন পরিচালিত হতে থাকে।

আলিগড় আন্দোলনের মৌলিক নীতি

চারটি মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে আলিগড় আন্দোলন পরিচালিত হয়। এগুলি হল –

  • (১) হিন্দু মুসলিম পরস্পর-বিরোধী স্বার্থযুক্ত দু’টি যুদ্ধরত জাতি।
  • (২) স্বায়ত্তশাসন বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ সরকারি পদে নিয়োগ মুসলিম স্বার্থবিরোধী।
  • (৩) ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলিমদের স্বার্থ সুরক্ষিত—এই কারণে সরকার-বিরোধী সর্বপ্রকার রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে তারা দূরে থাকবে।
  • (৪) যেহেতু ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলিম-স্বার্থ নিরাপদ, সেহেতু তারা কেবল সাংস্কৃতিক উন্নয়নেই নিজেদের নিয়োজিত করবে এবং হিন্দু রাজনৈতিক বিক্ষোভকারীদের খর্ব করার জন্য যেটুকু প্রয়োজন, তারা ঠিক সেটুকুই রাজনীতিতে অংশ নেবে।

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের প্রভাব

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে স্যার সৈয়দ আহমদ খান ও তার প্রতিষ্ঠিত আলিগড় আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেমন –

  • (১) ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে স্যার সৈয়দ আহমদ খান গাজিপুরে একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (২) ইংরেজি ভাষায় লেখা মূল্যবান কিছু কিছু বই উর্দু ভাষায় অনুবাদ করে তা মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করার উদ্দেশ্যে তিনি বিজ্ঞান সমিতি নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন ।
  • (৩) তিনি মুসলমানদের মন থেকে পাশ্চাত্যের ভয় ভীতি দূর করার জন্য ও মুসলমানদের মধ্যে উদারনৈতিক ভাবধারা প্রচারের জন্য ‘তাহজিব-উল-আখলার্ক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন।
  • (৪) তিনি কমিটি ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন ।
  • (৫) অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আলিগড়ে তিনি মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজটিই পরে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়।
  • (৬) আলিগড় আন্দোলন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের আধুনিক যুগোপযোগী ভাবধারায় দীক্ষিত করেছিল।
  • (৭) এই আন্দোলন ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে যুক্তিবাদের প্রসার ঘটিয়ে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামি পরিত্যাগেও সাহায্য করেছিল।
  • (৮) এই আন্দোলন মুসলিম সমাজে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি, পর্দা প্রথার অপসারণ ও নারী শিক্ষা প্রসারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের ফলাফল

রাজনৈতিক দিক দিয়েও আলিগড় আন্দোলনবিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। যেমন –

  • (১) আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে।
  • (২) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা রুখতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে স্যার সৈয়দ আহমদ খান ‘এডুকেশানাল কংগ্রেস’, ‘ইউনাইটেড পেট্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ নামে তিনি কংগ্রেসের তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা গঠন করেন ।
  • (৩) আলিগড় আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করার অপূর্ব সুযোগ পায় এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ নীতিকে তোষণ করতে শুরু করে। বঙ্গভঙ্গ ছিল ইংরেজ সরকারের সাম্প্রদায়িক বিভেদ নীতির প্রথম দৃষ্টান্ত।
  • (৪) সর্বোপরি আলিগড় আন্দোলনের কার্যকলাপ পরাধীন ভারতের রাজনীতিতে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়।

সীমাবদ্ধতা

স্যার সৈয়দ আহমদের সংস্কার-প্রচেষ্টা বিশেষ ফলপ্রসূ হয় নি। এর কারণ গুলি হল –

  • (১) গোঁড়া মৌলবি ও মোল্লারা তাঁর সংস্কার-প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় তাঁর ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের সকল উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
  • (২) এই আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ দরিদ্র ও পশ্চাদপদ মুসলিমদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। উত্তরপ্রদেশের কিছু জমিদার, উচ্চবিত্ত মানুষ ও চাকুরিজীবীর স্বার্থই ছিল এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি।
  • (৩) উচ্চবংশজাত অভিজাত মুসলিম পরিবারের সন্তানরাই আলিগড় কলেজে লেখাপড়ার সুযোগ পেত—সর্বসাধারণের জন্য এই কলেজের দ্বার উন্মুক্ত ছিল না।
  • (৪) মুসলিম আদর্শে মূলত মুসলিম ছাত্রদের জন্যই এই কলেজ তৈরি হয়। কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যও ছিল মুসলিম-স্বার্থ সংরক্ষণ। বৃহত্তর ভারতীয় আদর্শ বা ভারতীয় ঐক্যের চিন্তা তাদের ছিল না।

সমালোচনা

দ্বিজাতি তত্ত্ব ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ প্রচারের জন্য আলিগড় আন্দোলন ও তার প্রবর্তক উভয়েই ঐতিহাসিকদের দ্বারা নিন্দিত হয়েছেন। বলা হয়ে থাকে যে, সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির জন্যও এই আন্দোলন দায়ী ছিল। এই অভিযোগগুলি অস্বীকার করার উপায় নেই।

অবদান

সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে যে, হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য এছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এই আন্দোলন হতাশাক্লিষ্ট মুসলিম মানসে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনার সঞ্চার করে মুসলিম সমাজকে বহুলাংশে কুসংস্কার ও গোঁড়ামি-মুক্ত করে এই সমাজে আধুনিকতা এনে দেয়।

উপসংহার :- আলিগড় আন্দোলনের অবদান প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করে বলেছেন যে, ‘উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিন্দুদের কাছে যা ছিল, আলিগড় আন্দোলনও ছিল মুসলিমদের কাছে ঠিক তাই’।

(FAQ) বারাসাত বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আলিগড় আন্দোলন কী?

আলিগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা করে স্যার সৈয়দ আহমদ খান সমাজে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের সার্বিক উন্নয়ন ঘটানাের জন্য যে সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেন তা ইতিহাসে আলিগড় আন্দোলন নামে পরিচিত।

২. আলিগড় আন্দোলন কে শুরু করেছিলেন?

স্যার সৈয়দ আহমদ খান।

৩. আলিগড় আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র কোথায় ছিল?

আলিগড় কলেজ।

৪. আলিগড় আন্দোলনের দুজন নেতার নাম লেখ।

চিরাগ আলি, কবি আলতাফ হোসেন আলি, মৌলানা শিবলি নোমানি, নাজির আহম্মদ।

Leave a Reply

Translate »