হাথিগুম্ফা শিলালিপি

হাথিগুম্ফা শিলালিপি -র প্রাপ্তিস্থান, উৎকীর্ণ কাল, উৎকীর্ণকারী রাজা, ভাষা ও লিপির ব্যবহার, পংক্তি সংখ্যা, জেমস প্রিন্সেপের পাঠোদ্ধার, লিপির ছাঁচ প্রস্তুত, লিপি প্রকাশ, কলিঙ্গ রাজা খারবেলের বর্ণনা ও লিপির বক্তব্য সম্পর্কে জানবো।

হাথিগুম্ফা শিলালিপি

উল্লিখিত রাজাকলিঙ্গ রাজা খারবেল
প্রাপ্তিস্থানউড়িষ্যা রাজ্যের উদয়গিরি পাহাড়
ব্যবহৃত ভাষাপ্রাকৃত ভাষা
ব্যবহৃত লিপিব্রাহ্মী লিপি
হাথিগুম্ফা শিলালিপি

ভূমিকা :- মানব সভ্যতা ও তার প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য শিলালেখর গুরুত্ব সর্বাধিক। প্রাচীন কালের রাজারা তাদের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন শিলা গাত্রে উৎকীর্ণ করে রাখতেন। এরকমই একটি প্রাচীন লিপি হল হাথিগুম্ফা শিলালিপি।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির প্রাপ্তিস্থান

এই লিপিটি ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ভুবনেশ্বর শহরের নিকটে উদয়গিরি পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত হাথিগুম্ফা নামক চৌদ্দ নম্বর গুহার দেওয়ালে উৎকীর্ণ রয়েছে।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির ভাষা ও লিপির ব্যবহার

এই হাথিগুম্ফা শিলালিপিতে মধ্য-পশ্চিম প্রাকৃত ভাষায় ও ব্রাহ্মী লিপি ব্যবহৃত হয়েছে।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির উৎকীর্ণ কাল

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে হাথিগুম্ফা শিলালিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির উৎকীর্ণকারী

প্রাচীন ভারতের কলিঙ্গ রাজ্যের রাজা খারবেল কর্তৃক এই লিপিটি উৎকীর্ণ হয়।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির আবিষ্কার

১৮২০ সালে স্টারলিং ভুবনেশ্বরের কাছে উদয়গিরি পর্বতের একটি গুহা থেকে এই শিলালিপি আবিষ্কার করেন।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির পংক্তি সংখ্যা

হাথিগুম্ফা শিলালিপিতে ১৭ টি পংক্তি আছে।

প্রিন্সেপের পাঠোদ্ধার

জেমস প্রিন্সেপ এই লিপির পাঠোদ্ধার করলেও লিপিতে উল্লিখিত শাসকের নাম ঐর বলায় তার পাঠোদ্ধার ত্রুটিযুক্ত বলে মনে করা হয়।

লিপির ছাঁচ প্রস্তুত

১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে এইচ. লক হাথিগুম্ফা লিপির একটি ছাঁচ প্রস্তুত করেন। এটি বর্তমানে কলকাতা শহরের ভারতীয় সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত আছে।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির প্রকাশ

আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে কর্পাস ইন্সক্রিপ্টিওনাম ইন্ডিক্যারাম নামক পত্রিকায় এই লিপিটি প্রকাশ করেন।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির পরিবর্তিত পাঠোদ্ধার প্রকাশ

রাজেন্দ্রলাল মিত্র ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে অ্যান্টিকুইটিজ অব ওড়িশা নামক পত্রিকায় লিপিটির সামান্য পরিবর্তিত পাঠোদ্ধার প্রকাশ করেন।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির সঠিক পাঠোদ্ধার

গুজরাটি পণ্ডিত ভগবানলাল ইন্দ্রজী প্রথম এই শিলালিপির সঠিক পাঠোদ্ধার করেন, যা তিনি ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রাচ্যবিদদের কংগ্রেসে উপস্থাপন করেন। ভগবানলাল ইন্দ্রজী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি, লিপিতে উৎকীর্ণ শাসকের নাম খারবেল ঘোষণা করেছিলেন।

ভিনসেন্ট স্মিথের উদ্যোগ

ভগবানলাল ইন্দ্রজীর পাঠোদ্ধারে কিছু সন্দেহের অবকাশ থাকায় ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ কাশীপ্রসাদ জয়সওয়ালকে এই শিলালিপির পাঠোদ্ধারের জন্য অনুরোধ করলে তিনি দুই বছর ধরে এই লিপি পাঠোদ্ধার ও সংস্কার করেন।

খারবেল সম্পর্কে বর্ণনা

হাথিগুম্ফা শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, চেদি রাজবংশের কলিঙ্গাধিপতি মহারাজা মহামেঘবাহন খারবেল পনেরো বছর বয়সে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং চব্বিশ বছর বয়সে সিংহাসনলাভ করেন।

হাথিগুম্ফা শিলালিপির বক্তব্য

  • (১) কলিঙ্গ রাজ খারবেল তার রাজত্বের প্রথম বছরে তিনি ঝড়ে বিনষ্ট নগর ও প্রাসাদ সংস্কার করেন এবং প্রচুর স্বর্ণ মুদ্রা ব্যয় করে প্রজাদের মঙ্গল সাধন করেছিলেন।
  • (২) রাজত্বের দ্বিতীয় বছরে তিনি রাজা সাতকর্ণীকে অবহেলা করে অশ্ব, হস্তী, পদাতিক ও রথ বিশিষ্ঠ চতুরঙ্গ সেনা পাঠিয়ে কন্থবেণা নদী পেরিয়ে মুসিকনগর অবরোধ করেন।
  • (৩) রাজত্বের তৃতীয় বছরে তিনি নৃত্যগীত ও নাট্যাভিনয় প্রভৃতি দ্বারা প্রজাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন।
  • (৪) তিনি তার রাজত্বের চতুর্থ বছরে পূর্ব কলিঙ্গ রাজাদের নির্মিত বিদ্যাধরা পয়ঃপ্রণালী অতিক্রম করলে রথিক ও ভোজকদের প্রধানদের মুকুট ও রাজছত্র ভূলুন্ঠিত হয়। তাদের ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত হয় এবং তারা পদানত হতে বাধ্য হন।
  • (৫) রাজত্বের পঞ্চম বছরে তিনি তিনশ বছর পূর্বে নন্দরাজ কর্তৃক উদ্ঘাটিত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থাকে তনসুলিয়ের পথে কলিঙ্গ নগরী পর্যন্ত খনন করিয়েছিলেন।
  • (৬) তার রাজত্বের সপ্তম বছরের বর্ণনা লিপিতে অস্পষ্ট হলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে যে, এই বছর তার রাণী গর্ভবতী হন।
  • (৭) তার রাজত্বের অষ্টম বছরে তিনি গোরথগিরি নামক পাহাড় সহ রাজগৃহ আক্রমণ করেছিলেন, যার ফলে যবন রাজ দিমিত অবরুদ্ধ সেনা ত্যাগ করে মথুরা শহরে পলায়ন করেন।
  • (৮) মনে করা হয় যে, রাজত্বের দশম বছরে তিনি ভারতবর্ষ জয় করতে যাত্রা করেন।
  • (৯) রাজত্বের একাদশ বছরে তিনি রথযাত্রায় কাঠের তৈরী কেতুভদ্রের মূর্তি বের করেছিলেন।
  • (১০) তার রাজত্বের দ্বাদশ বছরে তিনি উত্তরাপথের রাজাদের মনে ত্রাস সঞ্চার করে বহসিতমিত বা বৃহস্পতিমিত্র (পুষ্যমিত্র শুঙ্গ) নামক মগধরাজকে তার পাদবন্দনা করতে বাধ্য করেন বলে জানা যায়।
  • (১১) রাজত্বের চতুর্থ বছরের কিছু অংশ, সপ্তম, নবম এবং ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ বছরের বর্ণনা অস্পষ্ট বলে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবুও কাশীপ্রসাদ জয়সওয়াল কিছু অংশের পাঠোদ্ধারে সক্ষম হয়েছিলেন।

লিপিতে উল্লেখিত নন্দ রাজ

এই লিপিতে যে নন্দ রাজের কথা বলা হয়েছে তা সম্রাট অশোক ছাড়া কেউ নয়। অশোকেই প্রথম সম্রাট যিনি গৌতম বুদ্ধমহাবীর -এর পরবর্তীকালে কলিঙ্গের চেদিরাজকে পরাজিত করেন।

উপসংহার :- লিপির বহু স্থান অস্পষ্ট হলেও বলা যায় যে, খারবেলের এই হাতিগুম্ফা শিলালিপি ভারত ইতিহাস রচনার এক অমূল্য উপাদান।

(FAQ) হাথিগুম্ফা শিলালিপি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হাথিগুম্ফা শিলালিপি থেকে কোন রাজার কথা জানা যায়?

কলিঙ্গ রাজা খারবেল

২. হাথিগুম্ফা শিলালিপি কখন উৎকীর্ণ করা হয়?

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে

৩. হাথিগুম্ফা শিলালিপিতে উৎকীর্ণ শাসকের নাম খারবেল প্রথম কে ঘোষণা করেন?

গুজরাটি পণ্ডিত ভগবানলাল ইন্দ্রজী।

Leave a Reply

Translate »