তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তাইপিং বাহিনীর অবরোধ ভঙ্গ, তাইপিং বাহিনীর নানকিং দখল, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় রাজপুরুষের দক্ষতা, হুনান সেনাবাহিনী, কমিউনিস্ট পার্টির মন্তব্য, কৌশলগত ভ্রান্তি, মতাদর্শ গত ত্রুটি, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের দুর্বলতা, ভাবাদর্শ ও অসংলগ্নতা, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় কর্মসূচি থেকে বিচ্যুতি, বলপূর্বক রসদ সংগ্রহ, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় দলাদলি, কূটনৈতিক বুদ্ধির অভাব, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় বিদেশি সমর্থন সম্পর্কে মত, ভাড়াটে বাহিনী এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা

ঐতিহাসিক ঘটনাতাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা
সূচনাকাল১৮৫০ খ্রি
অবসান১৮৬৪ খ্রি
স্বর্গরাজ্যের রাজধানীনানকিং
বিদ্রোহ দমনসেং কুয়ো ফান
তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা

ভূমিকা :- ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কোয়াংসি প্রদেশের জিন তিয়েন গ্রামে “তাইপিং তিয়েন কুও” বা মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাইপিং বিদ্রোহ আরম্ভ হয়। বিদ্রোহীরা উত্তরমুখী অভিযান আরম্ভ করেন। মাঞ্চু বাহিনী বিদ্রোহীদের গতি রুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়।

তাইপিং বাহিনীর অবরোধ ভঙ্গ

১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মাঞ্চু বাহিনী ইউঙ্গান শহরে বিদ্রোহীদের অবরুদ্ধ করে। কিন্তু ছয় মাস অবরুদ্ধ থাকার পর তাইপিং বাহিনী অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে এসে পুনরায় উত্তরে অগ্রসর হতে থাকে। এইসব অঞ্চলের দরিদ্র, করভারে জর্জরিত কৃষকেরা তাইপিং বিদ্রোহীদের সাদরে গ্রহণ করেন এবং সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ে তাঁদের সাথে যোগ দেন। তাইপিংদের সাম্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবের জন্য তাঁরা বিপুল জনসমর্থন লাভ করেছিলেন।

তাইপিং বাহিনীর নানকিং দখল

দরিদ্র মানুষের সহানুভূতি এবং নিজেদের আধুনিক সামরিক কৌশলকে পুঁজি করে তাইপিং বিদ্রোহীরা ইয়াংসি উপত্যকার বিখ্যাত শহর নানকিং দখল করেন। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে বিদ্রোহীরা নানকিং-এ স্বর্গরাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় রাজপুরুষের দক্ষতা

বিদ্রোহের প্রাথমিক পর্বে বিদ্রোহীরা অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছিলেন। তাঁদের অবাধ অগ্রগতি মাঞ্চু শাসনের অবসান অনিবার্য করে তুলেছিল। কিন্তু একদল রাজপুরুষের কর্মদক্ষতা তাইপিংদের দুর্বার গতি রুদ্ধ করতে সমর্থ হয়। তাইপিং বিদ্রোহ দমনে যে রাজপুরুষ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁর নাম সেং কুয়ো ফান (জেং গুয়ো ফান)।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় হুনান সেনাবাহিনী

রাজপুরুষ সেং তাইপিংদের প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে নিজস্ব তাগিদে একটি রক্ষিবাহিনী তৈরি করেছিলেন। এই বাহিনী হুনান সৈন্যবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। তাইপিংদের আদর্শকে আঘাত করার জন্য সেং হুনান বাহিনীকে নতুন ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রচার করেন যে, বিদ্রোহীরা চীনের প্রাচীন ঐতিহ্য ধ্বংস করতে চাইছেন। এই বাহিনী সেং-এর ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত হয়। এর আগে কোনো মাঞ্চু রাজপুরুষ এই ধরনের ব্যক্তিগত বাহিনী গঠন করতে পারেন নি।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় কমিউনিস্ট পার্টির মন্তব্য

  • (১) চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পরবর্তীকালে তাইপিং বিদ্রোহের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছে, সেং-এর ব্যক্তিগত বাহিনীর মধ্যেই বিংশ শতকের চীনে সমরনায়কদের উত্থানের বীজ নিহিত ছিল।
  • (২) আধুনিক ঐতিহাসিক জ্যাক গ্রে তাঁর সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত গ্রন্থ, Rebellions and Revolution : China from 1800s to the 1980s-এ বলেছেন, হুং শিউ চুয়ান যদি মাও সে-তুং-কে অনুপ্রাণিত করে থাকেন, তবে চিয়াং কাই-শেকও সেং কুয়ো ফানের দ্বারা সমানভাবেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় কৌশলগত ভ্রান্তি

  • (১) কৌশলগত ভ্রান্তি তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা অনিবার্য করে তুলেছিল। নানকিং দখলের পরই বিদ্রোহীদের উত্তরমুখী অভিযান চালিয়ে পিকিং দখল করে নেওয়া এবং মাঞ্চু রাজদরবার আক্রমণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তাঁরা তা করেন নি। উপরন্তু ইয়াংসি নদীর দু-ধারে মাঞ্চু সম্রাটের সৈন্যরা দুটি বিশাল শিবির পেতেছিল। এগুলি ধ্বংস করার কোনো প্রচেষ্টাই তাইপিংরা করেন নি।
  • (২) “ছোটো তরবারি সমিতি” নামে একটি গুপ্ত সমিতি ১৮৫৩-৫৪ খ্রিস্টাব্দে সাংহাই দখল করে। এই সমিতি তাইপিংদের সাহায্য করতে চেয়েছিল। এই সাহায্যের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে হুং মারাত্মক ভুল করেছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় মতাদর্শগত দুর্বলতা

  • (১) মতাদর্শগত দুর্বলতা তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতাকে ত্বরান্বিত করেছিল। তাইপিং আদর্শে খ্রিস্টান ধর্মের সুগভীর প্রভাব ছিল। এই প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই তাও ধর্মাবলম্বী বা বৌদ্ধরা ভালো চোখে দেখেন নি। আবার হুং যেহেতু নিজেকে যীশুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেহেতু পশ্চিমিরাও কখনোই তাইপিং-দের প্রতি সহানুভূতিশিল ছিল না।
  • (২) ইম্যানুয়েল সু বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের ধর্মীয় আদর্শ চিনা এবং বিদেশি উভয়কেই সমানভাবে বিরুদ্ধাচারী করেছিল (Indeed, their religious ideology alienated both Chinese and Westerner alike.)। তাছাড়া, তাদের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কনফুসীয় আদর্শ অনুযায়ী সামাজিক স্তরভেদের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
  • (৩) বিদ্রোহীদের মন্দির ও মূর্তি ভাঙার বিষয়টিও সাধারণ মানুষ ভালো মনে গ্রহণ করেন নি। ফলে তাইপিং-রা চীনের প্রাচীন ঐতিহ্য নষ্ট করছে – প্রতিবিপ্লবীদের পক্ষে এই ধরনের প্রচার চালানো সহজ হয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের দুর্বলতা

  • (১) তাইপিংদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের দুর্বলতা স্বর্গরাজ্যের পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে তাইপিংদের দক্ষিণের রাজা ফেং উন-শান এবং পশ্চিমের রাজা শিয়াও চাও-কুই যুদ্ধে নিহত হন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রাচ্যের রাজা ইয়াং শিউ-চিং একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন।
  • (২) ইয়াং-এর প্রভাব খর্ব করার জন্য উত্তরের রাজা ধনী জমিদার ওয়েই চ্যাং-হুই নিজের এলাকার ধনী ব্যক্তিদের নিয়ে আর একটি গোষ্ঠী তৈরি করেন। হুং শিউ চুয়ান এমতাবস্থায় ওয়েই-এর প্রভাবাধীন হয়ে পড়েন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা এবং দক্ষ সংগঠক ইয়াং-এর উত্থানে ওয়েই ঈর্ষান্বিত হন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইয়াং এবং তাঁর গোষ্ঠীভুক্ত অন্তত সাত হাজার জনকে হত্যা করেন।
  • (৩) তাইপিংদের কাছে এটি ছিল একটি বিরাট বিপর্যয়। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা বলেছেন, ওয়েই যেহেতু একসময় জমিদার ছিলেন, তাই তিনি শেষপর্যন্ত তাঁর শ্রেণীচরিত্রের বাইরে আসতে পারেন নি। একই বছর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে ওয়েই নিহত হন। এঁদের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের সংকট তাইপিং বিপ্লবীদের দুর্বল করেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় ভাবাদর্শ ও অসংলগ্নতা

  • (১) তাইপিং ভাবাদর্শ এবং জীবনযাপনের মধ্যে অসংলগ্নতা তাইপিংদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। নানকিং-এ মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পর তাদের মধ্যে অনেকগুলি দোষ দেখা দিয়েছিল। তাইপিং আদর্শ অনুযায়ী এক পুরুষের একজন স্ত্রী – এটিই ছিল যথার্থ বৈবাহিক সম্পর্ক। কিন্তু ক্ষমতালাভের পর বহু তাইপিং নেতাই প্রচুর সংখ্যক উপপত্নী রাখতে শুরু করেন।
  • (২) তাইপিংরা মতাদর্শের দিক দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁরা সমতাভিত্তিক একটি ভূমিব্যবস্থাও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে নেতৃত্বের একটা বিরাট অংশ প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। যে আদর্শ হাজার হাজার দরিদ্র কৃষককে তাইপিং বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল, সেই আদর্শ থেকে নেতাদের বিচ্যুতি তাইপিংদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় কর্মসূচি থেকে বিচ্যুতি

  • (১) ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৫ সালের মধ্যে নানকিং অভিযানের পরই ‘মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য’ তার জঙ্গি চরিত্র অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। সাধারণ মানুষের মনোবলের ওপর নির্ভর করে একটা যৌথ উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার কর্মসূচী থেকে ক্রমে তাইপিংরা বিচ্যুত হয়েছিলেন।
  • (২) নিজেদের বিজিত এলাকার ওপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তাইপিং ব্যবস্থা একটি রাজনৈতিক-সামরিক ব্যবস্থায় পর্যবসিত হয়েছিল। জঙ্গি গণ-আন্দোলনের সাহায্যে তাইপিংরা মধ্য চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করেছিলেন।
  • (৩) সাম্রাজ্যিক বাহিনী যে মুহূর্তে ঐ অঞ্চল আক্রমণ করেছিল, সেই আক্রমণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাইপিংদের ছিল না। তাইপিংরা তাঁদের বিজিত অঞ্চল পরিত্যাগ করে পালিয়ে যেতে থাকেন। স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধের অভাব রাজশক্তির পক্ষে অভ্যুত্থান দমনের কাজ অনেকটাই সহজ করে তুলেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় বলপূর্বক রসদ সংগ্রহ

  • (১) মধ্য চীনের এই সমৃদ্ধিশালী অঞ্চলে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ও হস্তশিল্প কেন্দ্র ছিল। তা সত্ত্বেও লি শিউ চেং সহ বহু তাইপিং সৈন্যাধ্যক্ষই স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ বলপূর্বক আদায় করতে শুরু করেছিলেন।
  • (২) অত্যাচারী ভূস্বামী ও কর আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের তাইপিং পদ্ধতি ক্রমে শিথিল হয়ে পড়ে। ১৮৫৩ সালের ভূমি আইনে কাল্পনিক সমতাবাদের যে প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়েছিল, তা উধাও হয়ে যায়। তাইপিং ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং মাঞ্চু-বিরোধী প্রচারের তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছিল। ফলে তাইপিংদের থেকে জনসমর্থন ক্রমশ প্রত্যাহৃত হতে থাকে।
  • (৩) সাধারণ মানুষের তাইপিংদের প্রতি হতাশাকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠেন সেং কুয়ো ফানের মতো দক্ষ রাজপুরুষরা। সেং কুয়ো ফানের কৃতিত্বে তাইপিং মতাদর্শে বিশ্বাসী বহু চীনা রাজানুগত এবং নয়া-কনফুসীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তাইপিং বিদ্রোহ দমনে সেং কুয়ো ফানের কৃতিত্বের কথা আগেই বলা হয়েছে।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় দলাদলি

১৮৫৬ সালের পর তাইপিংদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও দলাদলির সুযোগে সেং তাদের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্য লাভ করেন। তরুণ তাইপিং সেনানায়ক লি শিউ চেং সুদক্ষ সামরিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বিপ্লবকে রক্ষা করার আন্তরিক প্রয়াস চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর একক প্রচেষ্টায় স্বর্গরাজ্যকে বেশিদিন বাঁচানো সম্ভব ছিল না। তাইপিং বিদ্রোহ দমন করার জন্য সেং একটি সুপরিকল্পিত ও সর্বাত্মক আক্রমণ চালান, যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাইপিংরা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় কূটনৈতিক বুদ্ধির অভাব

কোনো কোনো ঐতিহাসিক অভিযোগ করেছেন, বিদেশিদের সঙ্গে আচরণে তাইপিংদের কূটনৈতিক বুদ্ধির অভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। তাঁদের মতে, তাইপিং অভ্যুত্থানের প্রাথমিক পর্বে বিদেশিরা তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করেন নি। তাইপিংরা কিন্তু বিদেশিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন নি; বরং তাঁরা চেয়েছিলেন বিদেশিরা তাঁদের অনুগত থাকুক। এই কূটনৈতিক ভ্রান্তির ফলেই পরবর্তীকালে বিদেশিরা তাইপিং বিদ্রোহের সক্রিয় বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় বিদেশি সমর্থন সম্পর্কে মত

  • (১) এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগের চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একথা স্পষ্টই উপলব্ধি করা যায় যে, বিদেশি শক্তিবর্গের পক্ষে তাইপিং অভ্যুত্থানকে সমর্থন করা স্বাভাবিক ছিল না।
  • (২) তাইপিং বিপ্লবীরা যে সাম্যভিত্তিক কৃষক কল্পরাজ্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ছিল পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের লুণ্ঠনের নীতির পরিপন্থী। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের পক্ষে নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদেই তাইপিংদের বিরোধিতা করা স্বাভাবিক ছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় ভাড়াটে বাহিনী

সাংহাইয়ের ধনী চীনা বণিকরা বিদ্রোহীদের অগ্রগতি রোধ করার জন্য জনৈক আমেরিকান সেনানায়ক ফ্রেডারিখ টাউনশেন্ড ওয়ার্ডের নেতৃত্বে একটি বিদেশি ভাড়াটে বাহিনী (Mercenary) গড়ে তোলেন ৷ এই ভাড়াটে বাহিনী তাইপিং বিদ্রোহ দমন করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতায় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ভূমিকা

১৮৬২ সাল নাগাদ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে তাইপিং বিদ্রোহ দমন করার জন্য মাঞ্চু বাহিনীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন লিন্ডলে নামে এক ইংরেজ।

উপসংহার :- ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে মাঞ্চু বাহিনী নানকিং পুনর্দখল করে। তাইপিং বিদ্রোহের অবসান ঘটে। বন্দী হওয়ার আগেই তাইপিং বিদ্রোহের মহান নেতা হুং শিউ চুয়ান আত্মহত্যা করেন।

(FAQ) তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তাইপিং বিদ্রোহের সময়কাল কত?

১৮৫০-৬৪ খ্রিস্টাব্দ।

২. তাইপিং বাহিনী স্বর্গরাজ্যের রাজধানী স্থাপন করে কোথায়?

নানকিং এ।

৩. তাইপিং বিদ্রোহ দমনে কোন রাজপুরুষ দক্ষতা দেখিয়েছেন?

সেং কুয়ো ফান।

৪. তাইপিং বিদ্রোহের অবসান ঘটে কখন?

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment