তাইপিং বিদ্রোহের কারণ

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ প্রসঙ্গে তাইপিং বিদ্রোহের কারণ আফিমের চোরা চালান, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ রৌপ্যমুদ্রা ও তাম্রমুদ্রার ফারাক, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ দেশীয় হস্ত শিল্পের বিনাশ, তাইপিং বিদ্রোহের বাণিজ্যিক কারণ, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ জলদস্যুদের দস্যুবৃত্তি ত্যাগ, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ কৃষকদের অসন্তোষ, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ দুর্বল ও দুর্নীতিগ্ৰস্ত মাঞ্চু শাসন, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ মাঞ্চু সামরিক ব্যবস্থার ত্রুটি ও মাঞ্চু শাসনের দুর্বল ভিত্তি সম্পর্কে জানবো।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ

ঐতিহাসিক ঘটনাতাইপিং বিদ্রোহের কারণ
সূচনাকাল১৮৫০ খ্রি
স্থানচীন
সময়কাল১৮৫০-১৮৬৪ খ্রি
নেতাহুং শিউ চুয়ান
তাইপিং বিদ্রোহের কারণ

ভূমিকা :- ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আফিম যুদ্ধের পর চীনে বিদেশি পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। সামন্ততান্ত্রিক শোষণের সাথে বিদেশি পুঁজির আঘাত যুক্ত হয়ে চিনের মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। চিনা সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলি তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠেছিল এবং নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ আফিমের চোরা চালান

আফিমের চোরাই চালান চীনা অর্থনীতিকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, এ কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। আফিম আমদানির মূল্য হিসাবে চীন থেকে প্রভূত পরিমাণ রৌপ্য বিদেশে চলে যেত। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চীন থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টেইল মূল্যের রৌপ্য বিদেশে চলে যেত। হুং শিউ চুয়ান যখন বিদ্রোহের ডাক দেন, তখন তিনি আফিমের বিনিময়ে বছরে লক্ষ লক্ষ টাকার স্বর্ণ ও রৌপ্য নষ্ট করার জন্য চিং সরকারকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ রৌপ্যমুদ্রা ও তাম্রমুদ্রার ফারাক

  • (১) দেশের রৌপ্য বিদেশে চলে যাবার ফলে রৌপ্যমুদ্রা ও তাম্রমুদ্রার বিনিময় মূল্যে বিরাট ফারাক দেখা দিল। ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রতিটি রূপার টেইলের বিনিময় মূল্য ছিল ১০০০ তাম্রমুদ্রা। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই বিনিময় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৬০০ তাম্রমুদ্রা। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রতি রূপার টেইলের বিনিময় মূল্য হয় ২২০০ থেকে ২৩০০ তাম্রমুদ্রা।
  • (২) সুতরাং আফিমের চোরাই চালানের ফলে এই বিনিময় মূল্যের বৃদ্ধি ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়েছিল। কৃষকেরা এবং কুটিরশিল্পের কারিগরেরা তাঁদের মজুরি বা উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পেতেন তাম্রমুদ্রার মাধ্যমে। অথচ তাঁদের রৌপ্যমুদ্রার মাধ্যমে অথবা রৌপ্যমুদ্রার বিনিময় মূল্য অনুযায়ী কর দিতে হত।
  • (৩) ফলে করের হার অপরিবর্তিত থাকলেও করের বোঝা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তদুপরি সরকারি কর্মচারী ও ম্যান্ডারিনরা কর আদায়ের সময় পণ্যের মাধ্যমে দেয় কর এবং অর্থমূল্যের দেয় করের ‘বিকল্প দর’ নিরূপণে কারচুপি করত।
  • (৪) ফলে দরিদ্র কৃষক ও কারিগরদের ওপর করের চাপ আরও বেড়ে যেত। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মধ্য ইয়াংসি উপত্যকায় অবস্থিত প্রদেশগুলি কেন্দ্রীয় সরকারকে দেয় করের মাত্র ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দিতে পেরেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ দেশীয় হস্তশিল্পের বিনাশ

  • (১) প্রথম আফিম যুদ্ধে চীনের পরাজয়ের ফলে নানকিং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চীনের পাঁচটি বন্দর বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঐ বন্দরগুলি দিয়ে বিদেশি পণ্য চীনের অভ্যন্তরে স্রোতের মতো ঢুকতে থাকে। বিশেষত, বিদেশি সুতিবস্ত্র চীনের বাজার ছেয়ে ফেলে।
  • (২) চীনের হস্তনির্মিত সুতিবস্ত্রের চাহিদা হ্রাস পায়। কিছুদিনের মধ্যেই দেশীয় হস্তশিল্পের বিনাশ ঘটতে থাকে। দেশীয় হস্তশিল্পী ও কারিগরেরা কাজ হারাতে থাকেন। এইসব কর্মচ্যুত, জীবনযুদ্ধে পরাজিত ব্যক্তিরা পরবর্তীকালে তাইপিং বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের বাণিজ্যিক কারণ

  • (১) বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য পাঁচটি বন্দর, বিশেষত, সাংহাই বন্দর উন্মুক্ত হবার ফলে চীনের বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রের পরিবর্তন হয়েছিল। ইয়াংসি অঞ্চল থেকে পরিচালিত বৈদেশিক বাণিজ্য এখন সাংহাই অঞ্চল থেকে পরিচালিত হতে থাকে।
  • (২) আগে ইয়াংসি উপত্যকা থেকে বাণিজ্যপণ্য ক্যান্টন উপকূলবর্তী অঞ্চল ধরে দক্ষিণে নৌকায় বা কুলির মাধ্যমে পাঠানো হত। কিন্তু বিদেশি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্যান্টনের একচেটিয়া অধিকার বিলুপ্ত হবার পর মাল বহনের কাজে নিযুক্ত হাজার হাজার নৌকার মাঝি এবং কুলি বেকার হয়ে পড়েন।
  • (৩) জাঁ শ্যেনো বলেছেন, এই কর্মহীন মাঝি এবং কুলিদের মধ্য থেকে তাইপিং বিদ্রোহের সেরা কর্মীবাহিনী এসেছিল। বিদ্রোহের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইয়াং শিউ-চিং এবং শিয়াও চাও-কুই আগে ইয়াংসি অঞ্চলে কুলির কাজ করতেন।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ জলদস্যুদের দস্যুবৃত্তি ত্যাগ

  • (১) ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটিশ নৌবাহিনী চীনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে জলদস্যুবৃত্তি বন্ধ করার জন্য কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত জলদস্যু ও তাদের দুষ্কৃতকারী সঙ্গীরা দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে উপকূলবর্তী অঞ্চল ছেড়ে চীনের অভ্যন্তরে চলে আসে।
  • (২) একদল ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, অপরাধজগতের সাথে যুক্ত এই সমস্ত ব্যক্তিরা পরবর্তীকালে বিভিন্ন গুপ্ত সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন। মাঞ্চু-বিরোধী তাইপিং বিদ্রোহেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ কৃষকদের অসন্তোষ

  • (১) করভারে জর্জরিত কৃষকেরা কর দিতে অস্বীকার করায় তাঁরা রাজপুরুষদের নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। ফলে তাঁরা জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। চিনের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ বয়নশিল্পের ধ্বংসের ফলে কারিগরেরা বেকার হয়ে যান।
  • (২) কর্মচ্যুত কুলি, মাঝি ও অপরাধ জগতের লোকেরা কাজের সংস্থানের জন্য ভবঘুরে জীবনযাপন আরম্ভ করেন। কিন্তু চিনে তখন যেহেতু আধুনিক শিল্প গড়ে ওঠেনি, তাই তাঁদের কর্মসংস্থান সম্ভব হয়নি। এই কর্মহীন দরিদ্র মানুষেরা একটি মাঞ্চু-বিরোধী বিদ্রোহের জন্য তৈরি হয়েছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়

  • (১) প্রাকৃতিক বিপর্যয় চীনের অর্থনৈতিক দুর্গতি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। রাজপুরুষদের অদক্ষতা, খরা, নানা ধরনের কৃষির বিপত্তির ফলে ১৮৪০-এর দশকের শেষের দিকে চীনে কতকগুলি মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।
  • (২) ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে হেনান অঞ্চলে, ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে মধ্য ইয়াংসি উপত্যকায় এবং ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে হুনানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ জনজীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাইপিং বিদ্রোহের পটভূমিকা হিসাবে কাজ করেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ দুর্বল ও দুর্নীতিগ্ৰস্ত মাঞ্চু শাসন

  • (১) দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত মাঞ্চু শাসন তাইপিং বিদ্রোহের পথ প্রশস্ত করেছিল। বিদেশি আক্রমণ ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাগুলি প্রকট করে তুলেছিল। অধিকাংশ রাজপুরুষ ও ম্যান্ডারিনরা ছিল অসৎ।
  • (২) দক্ষিণ চীনে সেই সময় একটি প্রবাদবাক্য প্রচলিত ছিল, “জনতা ম্যান্ডারিনদের ভয়ে সন্ত্রস্ত, ম্যান্ডারিনেরা বিদেশি শয়তানদের ভয়ে সন্ত্রস্ত, আবার বিদেশি শয়তানেরা জনতার ভয়ে সন্ত্রস্ত।” যে সমস্ত রাজপুরুষ সৎ ছিলেন, তাঁরা শাসনকার্যের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে মাথা ঘামাতেন।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ মাঞ্চু সামরিক ব্যবস্থার ত্রুটি

  • (১) তাছাড়া, মাঞ্চু সামরিক ব্যবস্থাতে যথেষ্ট গলদ দেখা দিয়েছিল। উলান তাই নামে জনৈক উচ্চপদস্থ মাঞ্চ সামরিক নেতা মন্তব্য করেছিলেন, প্রথম আফিম যুদ্ধে অপমানজনক ভাবে পরাজিত হবার ফলে মাঞ্চু সামরিক বাহিনীর মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। সাধারণ সৈন্যরা নেতাদের নির্দেশ মানত না।
  • (২) এই বিশৃঙ্খলার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়া তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। মাঞ্চু শাসকদের অক্ষমতা ও দুর্নীতি দেশের মানুষের চোখে মাঞ্চু শাসন -এর ভাবমূর্তি ম্লান করেছিল। সেনাবাহিনীর বিশৃঙ্খলা মাঞ্চু শাসন-বিরোধী দরিদ্র ব্যক্তিদের বিদ্রোহ ঘোষণা করার সাহস জুগিয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ মাঞ্চু শাসনের দুর্বল ভিত্তি

দক্ষিণ চীনে মাঞ্চু শাসনের ভিত্তি কখনোই সুদৃঢ় ছিল না। তাছাড়া, ইয়াংসির দক্ষিণে ইউরোপীয়দের বসবাসের ফলে সেখানে পশ্চিমের প্রভাব পড়েছিল। বিশেষত, খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যাবলী তাইপিং বিদ্রোহীদের অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল। তাছাড়া ঐ অঞ্চলে দারিদ্র্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। সব মিলিয়ে দক্ষিণ চীনে মাঞ্চু-বিরোধী সংগ্রামের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল।

উপসংহার :- তাই জাঁ শোনো যথার্থই বলেছেন, “দক্ষিণ চীন ছিল তাইপিং বিদ্রোহের জন্মকালীন দোলনা” (South China was the cradle of the Taiping Rebellion.)

(FAQ) তাইপিং বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তাইপিং বিদ্রোহ কোথায় সংঘটিত হয়?

চিনে।

২. তাইপিং বিদ্রোহের সূচনা হয় কখন?

১৮৫০ সালে।

৩. তাইপিং বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ নেতা কে ছিলেন?

হুং শিউ চুয়ান।

৪. তাইপিং বিদ্রোহের সময়কাল কত?

১৮৫০-৬৪ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment