শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রসঙ্গে অযোগ্য উত্তরাধিকার, আফগান অভিজাতদের মধ্যে সংঘাত, অযোগ্য ও দুশ্চরিত্র আদিল শাহ, আফগান অধিপতিদের সংঘাত, আফগান জাতির মর্যাদায় আঘাত, আফগানদের চরিত্রের অবনতি, কৃষি ও কৃষক সম্পর্কে উদাসীনতা, শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা, আর্থিক অবস্থা ও স্বৈরাচারিতা সম্পর্কে জানবো।

শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

বিষয়শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ
সময়কাল১৫৪০-১৫৫৫ খ্রি:
প্রতিষ্ঠাতাশেরশাহ
শেষ সুলতানআদিল শাহ
শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

ভূমিকা :- ভারতবর্ষ-এর মধ্যযুগের শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাসে আলাউদ্দিন খলজি ও মহান আকবর-এর মধ্যবর্তী সময়ে শের শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যই এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এই শাসনই ভারতবর্ষে প্রথম গণমুখী শাসন।

শূর সাম্রাজ্যের সাম্রাজ্যের পতন

মাত্র পনেরো বছরের মধ্যে শের শাহের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শূর সাম্রাজ্যের গৌরবময় শাসনের অবসান ঘটে। শূর সাম্রাজ্যের পতনের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। নিম্নলিখিত কারণগুলি শূর সাম্রাজ্যের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

শূর সাম্রাজ্যের অযোগ্য উত্তরাধিকার

শের শাহের উত্তরাধিকারীরা ছিলেন অযোগ্য এবং তাঁর সাম্রাজ্যের পুনর্গঠনের কাজকে চালিয়ে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁরা সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের সমর্থনকে সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

শূর সাম্রাজ্যে আফগান অভিজাতদের মধ্যে সংঘাত

  • (১) শেরশাহের উত্তরাধিকারীরা আফগান অভিজাতদের মধ্যে সংঘাতের সূচনা করে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করেছিলেন।
  • (২) শের শাহ যে আফগান অভিজাতদের সমবেত করে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিলেন, তাঁর উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহ সেই আফগান অভিজাতদের মর্যাদা ও শক্তির মেরুদণ্ডে আঘাত দিয়ে সমগ্র আফগান জাতিকে শূর সাম্রাজ্যের চরম বিরোধীতে পরিণত করেন।
  • (৩) শের শাহের উত্থানের পিছনে আফগান জাতির অবদানকে অনুধাবন না করে আফগান সাম্রাজ্যের এই স্তম্ভগুলি ভেঙে দেন। খাবাস খানের মতো বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী ছাড়া সাম্রাজ্যকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

দিল্লির শূর সাম্রাজ্যের অযোগ্য ও দুশ্চরিত্র শাসক আদিল শাহ

  • (১) মহম্মদ আদিল আরও অযোগ্য ও দুশ্চরিত্র ছিলেন। স্বভাবতই আদিলের শাসন আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তিনি আফগান প্রধানদের প্রতি শুধুমাত্র নির্মম ও অসম্মানজনক ব্যবহার করেন নি, তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখতেও ব্যর্থ হন।
  • (২) আদিল নিজের আত্মীয় ও শূরবংশের ব্যক্তিদের বিভিন্ন উচ্চপদ দেন। তাতে সমগ্র আফগান জাতি চরম বিদ্রোহী হয়ে পড়ে এবং এই বিদ্রোহের ফলেই শূর সাম্রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। হিমুর উত্থান আফগান অভিজাতদের আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলে।

শূর সাম্রাজ্যে আফগান অধিপতিদের সংঘাত

মহম্মদ আদিলের শাসনকালে পাঁচজন আফগান অধিপতি ক্ষমতা দখলের এক পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা একথা বিস্মৃত হয়েছিলেন যে, মুঘলরা হুমায়ুন-এর নেতৃত্বে যে-কোনো মুহূর্তে তাদের হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করে আফগান শক্তিকে ভারতবর্ষের রাজনীতি থেকে চিরকালের মতো বিলুপ্ত করতে পারে।

শূর সাম্রাজ্যের পতন সম্পর্কে ত্রিপাঠীর মন্তব্য

বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আর. পি. ত্রিপাঠী বলেছেন, শের শাহ আফগান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে যেভাবে উৎসাহিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, ইসলাম শাহ আফগান জাতির ঐক্যবদ্ধতাকে সেভাবে উৎসাহিত না করে ধ্বংস করেন।

শূর সাম্রাজ্যের অভিজাতদের মানসিকতা

নিজেরা আফগান জাতি সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও, আফগান জাতির মানসিকতাকে বুঝতে ভুল করেছিলেন। আফগান অভিজাতদের মানসিকতা শূর সাম্রাজ্যের পতনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে বিবেচিত হয়।

দিল্লির শূর সাম্রাজ্যের আফগান জাতির মর্যাদায় আঘাত

শেরশাহ আফগান জাতির ঐক্যের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেন নি। অথচ তাঁর উত্তরাধিকারীরা ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা হেতু আফগান জাতির মর্যাদায় আঘাত দিয়ে তাদের সাম্রাজ্যের শত্রুতে পরিণত করেন। পারস্পরিক সংঘাত ও ঈর্ষা আফগান ঐক্যবোধকে ধ্বংস করে।

শূর সাম্রাজ্যের আফগানদের চরিত্রের অবনতি

  • (১) শেরশাহের উত্তরাধিকারীরা আফগানদের চরিত্রেরও অবনতি ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা তাদের আত্মমর্যাদাও বিনষ্ট করেছিলেন। হিমু যখন আফগানদের কাপুরুষ বলেছিলেন, তখন তাঁরা এই অপমানকেও হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছিলেন।
  • (২) এই আফগানরা তাদের কথার মূল্য পর্যন্ত দিত না। এরকম চারিত্রিক অবনতি হওয়া অভিজাতরা সাম্রাজ্য রক্ষা করতে পারে না। ইতিহাসে দেখা যায়, সেই জাতিরই উত্থান ঘটে যাদের নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা থাকে।
  • (৩) স্বভাবতই আফগান অভিজাতদের এই চারিত্রিক অবনতি শুর সাম্রাজ্যের পতনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে বিবেচিত হয়।

কৃষি ও কৃষক সম্পর্কে শূর সাম্রাজ্যের শাসকদের উদাসীনতা

  • (১) শেরশাহের উত্তরাধিকারীরা কৃষি ও কৃষকদের ভাগ্য সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। কৃষি ও কৃষককে রক্ষার জন্য তাঁরা কিছুই করেন নি। এরই ফলে কৃষকরাও শূর সাম্রাজ্যের ভাগ্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে।
  • (২) অভিজাতরা ক্রমেই অত্যাচারী হয়ে ওঠে এবং কৃষকদের ওপর অনেক সময় অত্যাচার করে। জনসাধারণের এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সাম্রাজ্যই দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না।

শূর সাম্রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা

শেরশাহের শাসনতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত তাঁর উত্তরাধিকারীরা ভুলে গিয়েছিলেন। শের শাহ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিধান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই দুর্গগুলি ধ্বংস ও দেশদ্রোহিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

শূর সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা

নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় প্রচুর অর্থও আত্মসাৎ হয়। এই দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

শূর সাম্রাজ্যের শাসকদের স্বৈরাচারিতা

  • (১) এই সময় আফগানরা জনসাধারণের প্রতি ন্যায়বিচার করে নি। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারিতার দ্বারা দেশ শাসিত হয়। সব রকমের শাস্তিই জনসাধারণের প্রাপ্য ছিল। জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা ছিল না।
  • (২) রাষ্ট্রের এমন কোনো শাসনতান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল না, যারা এইরকম পরিস্থিতি থেকে জনসাধারণকে মুক্তি দিতে পারে। এমনকি সামরিক কোনো শ্রেণী ছিল না, যে এই পরিস্থিতি থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করে গর্ব অনুভব করতে পারে। তখন কোথাও শৃঙ্খলা ছিল না। এইজন্য দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

শূর সাম্রাজ্যের গুরুত্ব

  • (১) শূর সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও ভারতবর্ষের ইতিহাসে শূরবংশের গুরুত্ব আছে। কারণ, এই বংশই শের শাহের মতো এক মহান শাসককে উপহার দিয়েছিল, যিনি ভারতবর্ষে অন্যান্য মহান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা ও শাসকদের সঙ্গে একই আসনে বসবার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
  • (২) তিনিই জনকল্যাণকে রাষ্ট্রীয় কার্যে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। অনেকাংশে তিনি মুঘল ও ব্রিটিশ শাসকদেরও কোনো কোনো শাসনতান্ত্রিক বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

উপসংহার :- শূরবংশ যদি শের শাহের মতো আর একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী পেত, তাহলে শূরবংশের অবসান ঘটতে বিলম্বিত হত। যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবেই শূরবংশের পতন ত্বরান্বিত হয়।

(FAQ) শূর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শূর বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

শেরশাহ।

২. শূর বংশের সময়কাল কত?

১৫৪০-১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দ।

৩. শূর বংশের শেষ সুলতান কে ছিলেন?

আদিল শাহ।

৪. শূর বংশের পর দিল্লিতে কোন বংশ সাম্রাজ্য স্থাপন করে?

মুঘল বংশ।

Leave a Comment