মৌর্য যুগের শিল্পকলা

মৌর্য যুগের শিল্পকলা প্রসঙ্গে পাটলিপুত্রের স্থাপত্য, প্রস্তর শিল্প, স্তূপ স্থাপত্য, গুহা শিল্প, ভাস্কর্য, প্রতীক ব্যবহার, সারনাথ স্তম্ভ, শিল্পে উচ্চ শ্রেণির প্রভাব, মৌর্য শিল্পে বৈদেশিক প্রভাব ও বৈদেশিক প্রভাবের বিরোধিতা সম্পর্কে জানবো।

মৌর্য যুগের শিল্পকলা

বিষয় মৌর্য যুগের শিল্পকলা
প্রভাব গ্ৰিক ও পারসিক
পাটলিপুত্র প্রাসাদ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
সারনাথ স্তম্ভ অশোক
জাতীয় প্রতীক সিংহ চতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ
মৌর্য যুগের শিল্পকলা

ভূমিকা :- প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতার পর থেকে খ্রিস্ট পূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত কার্যত ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যের সামান্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। মৌর্য যুগ থেকে ভারতীয় শিল্প স্থাপত্যের প্রভূত অগ্রগতির সাক্ষ্য হিসেবে বহু নিদর্শন পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিকদের মন্তব্য

ডঃ বাগচি ও অধ্যাপক শাস্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে, “স্থাপত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে মৌর্যযুগ বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।” ডি.ডি. কোশাম্বি বলেছেন যে, “সিন্ধু সভ্যতার স্থাপত্য থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য যাকে ভারতীয় সংস্কৃতির কম মূল্যবান অংশ বলা যায় না, তা অশোকের সময় থেকেই শুরু হয়েছে।”

পাটলিপুত্রের স্থাপত্য

  • (১) মেগাস্থিনিসের বর্ণনা থেকে আমরা পাটলিপুত্রে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রাসাদের গঠন সম্পর্কে জানতে পারি। চন্দ্রগুপ্তের মূল প্রাসাদটি ছিল কাঠের তৈরি। তখনকার যুগে বিহারের গাঙ্গেয় উপত্যকার জঙ্গলে দামী কাঠ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। সুতরাং চন্দ্রগুপ্তের বিরাট প্রাসাদ তৈরী করতে কাঠের অভাব হয়নি।
  • (২) অর্থশাস্ত্রের নির্দেশ ছিল যে, প্রাসাদ কাঠের তৈরি হলে ভাল হয়। মেগাস্থিনিস এই প্রাসাদের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। প্রাসাদের থামগুলিতে সোনা-রূপার পাত লাগান ছিল, তার গায়ে সোনার তৈরি লতা ও রূপার পাখী খোদাই করে বসান ছিল।
  • (৩) প্রাসাদের সংলগ্ন উদ্যান ও দীঘি ছিল। পাটলিপুত্র দুর্গের বর্ণনায় মেগাস্থিনিস বলেছেন যে, দুর্গের বাইরে পরিখা ছিল। প্রাচীরে ৬৪ টি সিংহ দরজা এবং ৫৭০ টি তোরণ ছিল। প্রাচীর ছিল কাঠের তৈরি।

প্রস্তর শিল্প

  • (১) অশোকের প্রাসাদ ছিল চন্দ্রগুপ্তের চেয়েও বিশাল আর পাথরের তৈরি। ডি. ডি. কোশাম্বী বলেছেন যে, অর্থশাস্ত্রে যে ধরণের রাজপ্রাসাদের কথা বলা হয়েছিল তা ব্যবহারের ও নিরাপত্তার দিক থেকে উপযোগী ছিল। কিন্তু তাতে জাকজমক ও শিল্পশৈলী বিকাশের ক্ষেত্র ছিল কম।
  • (২) অর্থশাস্ত্রে কাঠ ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল। অশোক অর্থশাস্ত্রের এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিশাল পাথরের প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রাসাদের বিরাট আয়তন দেখে ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ফা-হিয়েন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান। তিনি কল্পনা করেন যে, দৈত্য ও দানবের সাহায্য না নিলে এরূপ বিরাট স্থাপত্য তৈরি করা সম্ভব নয়।
  • (৩) প্রাসাদে যে পাথরগুলি ব্যবহার করা হয়, তাকে পালিশ করে অসম্ভব মসৃণ করে ফেলা হয়েছিল। তার ফলে পাথরগুলি আয়নার মত ঝকঝকে হয়ে যায়। পাটনার কাছে কুমরাহারে ঐ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। মেঝে, ছাদ ছিল কাঠের তৈরি, থামগুলি ছিল পাথরের। ডঃ আর.সি. মজুমদারের মতে, ভারতীয় ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শিল্পে পাথরের ব্যবহার অশোকের আমল থেকেই শুরু হয় এ কথা বলা চলে।

স্তূপ স্থাপত্য

অশোকের আমলে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অন্যান্য প্রকার বিকাশও ঘটেছিল। তিনি বহু স্তূপ তৈরি করেছিলেন আজীবিক, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য। প্রবাদ আছে যে, তিনি মোট ৮৪ হাজার স্তূপ নির্মাণ করেন। সাঁচির স্তূপ ও তোরণ অশোকের পরে তৈরি হলেও তাতে মৌর্য শিল্পের প্রভাব আছে বলে কোশাম্বী বলেছেন।

গুহা শিল্প

গয়ার কাছে বারবার পাহাড়ে আজীবিক গুহাগুলি মৌর্য যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের উৎকর্ষের পরিচয় দেয়। অশোক পাহাড় কেটে বহু গুহা তৈরি করেন। এই গুহাগুলির দেওয়াল ছিল মসৃণ। সুদাম গুহা, নাগার্জুনি গুহা প্রভৃতি অশোকের গুহা শিল্পের নিদর্শন। দশরথের আমলে সুড়ঙ্গের আকারে গোপীগুহা খোদাই করা হয়। গুহার দেওয়ালগুলি আয়নার মত মসৃণ ও ঝকঝকে।

ভাস্কর্য

  • (১) অশোকের ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর স্তম্ভগুলিতেই সর্বাপেক্ষা বেশী প্রকাশ পেয়েছে। স্তম্ভের গায়ে তার লিপি খোদাই করা থাকত। অশোকের কোনো কোনো স্তম্ভের গায়ে লিপি খোদাই নেই, শুধুমাত্র স্তম্ভ আছে।
  • (২) আবার সকল স্তম্ভের শিল্প-সুষমা সমান স্তরের নয়। এজন্য অনেকে মনে করেন যে, অশোকের আগে হয়ত কয়েকটি স্তম্ভ ছিল যা এখন অশোকের নামে চালু আছে। অশোক হয়ত আগের তৈরি স্তম্ভের গায়ে তার লিপি খোদাই করে দেন।
  • (৩) যাই হোক, অশোক বেশ কয়েকটি স্তম্ভ নির্মাণ করেন এতে সন্দেহ নেই। কারণ বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য তিনি ধর্ম স্তম্ভ স্থাপন করেন বলে দাবী করেছেন। অশোকের স্থাপিত স্তম্ভগুলির মধ্যে লৌরিয়া-নন্দনগড় ও কোলহুয়ার স্তম্ভ অক্ষত অবস্থায় আছে। বাকি সকল স্তম্ভের কম বেশী ক্ষতি হয়েছে।
  • (৪) অশোকের স্তম্ভগুলি ছিল মসৃণ এবং চূড়ায় নানা প্রকারের সজ্জা। ঘণ্টার আকৃতি চূড়া বা উল্টানো পদ্ম, অথবা সিংহমূর্তি ও কারুকার্য করা। স্তম্ভগুলির চূড়া বা বোধিকা আলাদা তৈরি করে স্তম্ভের মাথায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
  • (৫) স্তম্ভটির সঙ্গে চূড়াকে জুড়বার জন্য ভেতরে গর্ত করে তামার খিল দেওয়া আছে। লোহার খিল দিলে মরিচা পড়ে পাথর ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তামার খিল ব্যবহার করা হয়েছে।
  • (৬) লৌরিয়া-নন্দনগড় স্তম্ভটি ৩২ ফুট ২ ইঞ্চি উঁচু। গোড়া থেকে মাথার দিকে ধীরে ধীরে সরু হয়ে গেছে। স্তম্ভটির তলার ব্যাস হল ৩৫ ইঞ্চি এবং মাথায় ২৭ ইঞ্চি। এর ওপর চূড়াটি বসান হয়েছে।

প্রতীক ব্যবহার

  • (১) স্তম্ভগুলির চূড়ায় নানা প্রতীক ব্যবহার করা হত। লৌরিয়া-নন্দনগড় স্তম্ভের চূড়ার মঞ্চে আহাররত রাজহংস খোদাই আছে। সাধারণত স্তম্ভের চূড়ায় পশুমূর্তি যথা ষাঁড়, সিংহ, হাতি, ঘোড়া ও চক্রের প্রতীক ব্যবহার করতে দেখা যায়।
  • (২) লৌরিয়া আরারাজে গরুড় প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রতীকগুলির ব্যাখ্যা পণ্ডিতরা নানাভাবে দেন। এক শ্রেণীর পণ্ডিতের মতে, স্তম্ভের চূড়ায় প্রাণীর মূর্তি গ্রীক ও পারসিক ভাস্কর্যের প্রভাব স্মরণ করিয়ে দেয়। সিংহ মূৰ্তি নিঃসন্দেহে গ্রীক এবং পারসিক প্রভাবের ফল।
  • (৩) অনেকে বলেন যে, এই পশু মূর্তিগুলি ভারতীয় ঐতিহ্য বহন করছে। অধ্যাপক সরসীকুমার সরস্বতীর মতে, হরপ্পা সভ্যতায় ষাঁড় বা বৃষের ছাপযুক্ত সিলমোহর ছিল।
  • (৪) ধৌলির পাথর খোদাই করে হাতির মূর্তিও ভারতীয় ঐতিহ্যের স্মারক। অশ্ব হল সূর্যের, বৃষ হল ইন্দ্রের প্রতীক। সুতরাং অশোক ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করেছেন একথা বলা চলে। তাছাড়া পশু মূর্তিগুলির মধ্যে সিংহের ক্ষেত্রে বৈদেশিক প্রভাবের অভিযোগ যতটা খাটে অন্য পশু মূর্তিগুলির বেলা তা খাটে না।

সারনাথ স্তম্ভ

  • (১) সারনাথের সিংহ শীর্ষস্তম্ভ অতি বিখ্যাত। স্বাধীন ভারত সরকার এটি জাতীয় প্রতীক হিসেবে নিয়েছেন। চূড়াটি ৭ ফুট উঁচু। চূড়ার নীচের দিক ঘণ্টার আকৃতি অথবা ওল্টানো পদ্মের মত। এর ওপরে চারটি পশুর মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। যথা – হাতি, ঘোড়া, ষাঁড় ও সিংহ। বৈদিক মতে, এটা চারটি দিকের প্রতীক।
  • (২) প্রতিটি প্রাণীর প্রতীকের পাশে ছিল একটি করে চক্র। এই চক্রে ছিল ২৪ শিক। এই চারটি প্রাণীর প্রতীকের ওপরে চারটি সিংহ মূর্তি। মূর্তিগুলি পরস্পরের দিকে পিছন করে দাঁড়ান অবস্থায় খোদাই করা। সিংহগুলির পিঠের ওপর একটি চক্র। তাতে ৩২টি শিক। এটি হল ধর্মচক্র।
  • (৩) সারনাথের এই স্তম্ভচূড়া সম্পর্কে স্যার জন মার্শাল বলেছেন যে, “চূড়ার সিংহগুলির প্রভুত্বব্যঞ্জক শক্তির প্রকাশ, তাদের স্ফীত শিরাগুলির চিহ্ন এবং মাংসপেশীর আত্মপ্রকাশ প্রমাণ করে যে আদিম যুগের শিল্পের অনেক উর্দ্ধে মৌর্য শিল্পসত্বা পৌঁছে গিয়েছিল।”
  • (৪) ভিনসেন্ট স্মিথ বলেছেন যে, “প্রাচীন যুগে প্রস্তুর মূর্তির ভাস্কর্যে এই সুন্দর ভাস্কর্যের তুল্য বা এর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোনো ভাস্কর্য দেখা যায়নি।

সারনাথ স্তম্ভের শিল্পরীতি

  • (১) সারনাথের স্তম্ভের ৪টি সিংহমূর্তি তাদের উন্নত গ্রীবা, প্রকটিত মাংসপেশী এবং সুষম থাবাগুলি দেখে কানিংহাম প্রভৃতি সমালোচক এই ভাস্কর্যে গ্রীক প্রভাবের কথা স্মরণ করেছেন। ভিনসেন্ট স্মিথও এই ভাস্কর্যে বৈদেশিক প্রভাবের ব্যাপারে নিঃসংশয়।
  • (২) ডঃ নীহার রঞ্জন রায় এর মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু গ্রীক রীতির অনুকরণ লুকিয়েছিল বলে মনে করেন। তার মতে উড়িষ্যার ধৌলির হাতিটির মূর্তি খোদাইয়ের মধ্যে অশোকের যে বিনয়, যে নম্রতা ও যে সুষমা প্রকাশিত হয়, সারনাথের সিংহ মূর্তির গর্বোদ্ধত গ্রীবা ভঙ্গিতে তা লুপ্ত।
  • (৩) এখানে আড়ম্বর, অহমিকার প্রকাশ লক্ষ্যণীয়। ডঃ সরস্বতী এই অভিমত স্বীকার করেননি। তিনি বলেন যে, এই সিংহমূর্তিগুলি প্রকৃতভাবে ভারতীয়। অন্ততঃপক্ষে ভারতীয় প্রভাব এক্ষেত্রে স্পষ্ট হল সিংহমূর্তিগুলির নমনীয়তায় ও নম্রতায়।

অন্যান্য শিল্প

  • (১) মৌর্য যুগের মৃৎশিল্পের নানা ধরণ ছিল। উত্তর ভারতে কালো রং-এর পালিশ করা মৃৎপাত্রের প্রচলন ছিল। পাটলিপুত্র ও কোশাম্বির মৃৎশিল্পের খুব খ্যাতি ছিল। মৌর্য মুদ্রার মধ্যে ছেনি দ্বারা চিহ্ন করা রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রার বিশেষ প্রচলন ছিল।
  • (২) গ্রীকদের অনুকরণে পেচক চিহ্নিত মুদ্রারও চলন ছিল। এই মুদ্রা প্রধানত গ্রীকদের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করা হত। দুর্গাপ্রসাদ নামে এক গবেষক মৌর্য মুদ্রার রাসায়নিক পরীক্ষা করে এর কাল সম্পর্কে নিঃসংশয় হয়েছেন। মৌর্য মুদ্রায় খাদ থাকত বলে জানা যায়।
  • (৩) কোনো কোনো মৌর্য মুদ্রায় সূর্যের চিহ্ন খোদাই থাকত এবং কোনো মুদ্রায় আধখানা চাঁদের মূর্তি খোদাই থাকত। কোশাম্বীর মতে, প্রথম চিহ্নটি থেকে মৌর্য সার্বভৌমত্ব বুঝা যেত, আর দ্বিতীয়টি থেকে মৌর্য বংশের প্রতীক বোঝা যেত। মৌর্য মুদ্রায় রাজার নাম বা সন তারিখ খোদাই থাকত না।

শিল্পে উচ্চ শ্রেণির প্রভাব

  • (১) মৌর্য শিল্পের প্রকৃতি আলোচনা করে পণ্ডিতেরা বলেন যে, উচ্চশ্রেণীর স্বচ্ছল ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রতীকি ছিল মৌর্য শিল্প। সমাজের নিম্নশ্রেণীর জীবনযাত্রার কোনো প্রতীকি শিল্প এখনও পাওয়া যায়নি।
  • (২) মৌর্য শিল্পের বিষয়বস্তু কেবল ধর্মীয় অর্থাৎ ধর্ম প্রচার ছিল তা বলা যায় না। পাটলিপুত্রের প্রাসাদ মৌর্য সম্রাটদের ভোগ-বিলাসবহুল জীবনের সাক্ষ্য দেয়।
  • (৩) অনুমান করা যায় যে, উজ্জয়িনী, তক্ষশিলা প্রভৃতি নগরেও বড় বড় প্রাসাদ ছিল। মৌর্য শিল্প ও ভাস্কর্য কেবলমাত্র ধর্মীয় বিষয়বস্তুর মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। মৌর্য শিল্পকলার মধ্যে জীবনবোধেরও পরিচয় পাওয়া যায়।

বৈদেশিক প্রভাব

মৌর্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে বৈদেশিক প্রভাব ছিল কিনা এই বিষয়ে বিতর্ক আছে। যেমন –

  • (১) মার্শাল বলেন যে, পারখাম শৈলীর মূর্তির ওপর কোনো বৈদেশিক প্রভাব নেই। এটি সম্পূর্ণ ভারতীয় রীতি। সারনাথের স্তম্ভে পারসিক প্রভাব দেখা যায়। তাঁর মতে, পারখাম মূর্তি ও সারনাথের স্তম্ভ ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পের আলফা এবং ওমেগা হিসেবে গণ্য করা যায়।
  • (২) হ্যাভেলের মতে, মৌর্য শিল্প, স্থাপত্যে আর্য ও অনার্য শিল্প-রীতির সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তবে বেশীর ভাগ সমালোচকের মত হল এই যে, পাটলিপুত্রের কাঠের তৈরি প্রাসাদ পারসিক সম্রাটের পারসিপেলিস প্রাসাদের অনুকরণে তৈরি করা হয়।
  • (৩) পারসিক ও গ্রীক শিল্পরীতি মৌর্য শিল্পনীতিকে প্রভাবিত করে। অশোক পারসিক সম্রাটদের মতই পাথরের ফলকের গায়ে তাঁর লিপি খোদাই করতেন। অশোকের প্রাসাদ পারসিক সম্রাট প্রথম দরায়ুসের আবাদান প্রাসাদের অনুকরণে তৈরি হয়। অশোকের সারনাথের স্তম্ভ চূড়ার ঘণ্টার আকৃতি হল পারসিক ভাস্কর্যের অনুকরণ।

বৈদেশিক প্রভাবের বিরোধিতা

হ্যাভেল ও কয়েকজন ভারতীয় শিল্প সমালোচক এই মতের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের যুক্তি গুলি হল –

  • (১) মৌর্য ভাস্কর্যে যে প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে তা পারসিক নয়। সারনাথের স্তম্ভ চূড়ায় যাকে ঘন্টার আকৃতি বলা হচ্ছে তা হল আসলে উল্টানো পদ্ম। এটা হল ভগবান বিষ্ণুর নীল পদ্মের প্রতীক।
  • (২) পারসিক পাথরের থামগুলি ছাদকে ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হত। অশোকের স্তম্ভগুলি একক এবং এগুলির সঙ্গে কোনো অট্টালিকার সম্পর্ক নেই।
  • (৩) পারসিক স্তম্ভগুলিকে কোনো বাণী প্রচারের জন্য অশোকের মত ব্যবহার করা হয়নি।
  • (৪) অশোকের শিল্পরীতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল যা গ্রীক-পারসিক রীতিতে দেখা যায়নি।

উপসংহার :- মৌর্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের ওপর কোনো স্থায়ী প্রভাব রাখে বলে অনেকে মনে করেন না। যেহেতু মৌর্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে বিশেষত স্তম্ভ ও তার চূড়ায় গ্রীক-পারসিক প্রভাব স্পষ্ট এবং যেহেতু তা সম্রাটের বাক্তিগত ইচ্ছা অনুযায়ী ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় তার সঙ্গে ভারতীয় জনগণের মনের সায় ছিল না। এই শিল্প সমাজের গভীরে যেতে পারেনি বলে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন।

(FAQ) মৌর্য যুগের শিল্পকলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য শিল্পকলায় কোন কোন বিদেশী প্রভাব দেখা যায় বলে মনে করা হয়?

গ্ৰিক ও পারসিক।

২. পাটলিপুত্রে কাঠের প্রাসাদ তৈরি করেন কে?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

৩. অশোক নির্মিত স্তূপের সংখ্যা কত?

৮৪ হাজার।

৪. সারনাথ স্তম্ভ কে তৈরি করেন?

সম্রাট অশোক।

Leave a Reply

Translate »