সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ

মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মিত সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ -এর প্রাপ্তি স্থান, স্থাপনা কাল, স্থানান্তর, সিংহ মূর্তি, পাথরের ব্যবহার, প্রানীর অস্তিত্ব, ধর্মচক্র, আবিষ্কার ও জাতীয় প্রতীক রূপে গৃহীত হওয়া সম্পর্কে জানবো।

সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ

নির্মাতামৌর্য সম্রাট অশোক
প্রাপ্তিস্থানভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের সারনাথ
উচ্চতা২.১৫ মিটার
জাতীয় প্রতীক রূপে গৃহীত২৬ জানুয়ারি ১৯৫০
সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ

ভূমিকা :- ভারতের প্রাচীন একটি ভাস্কর্য্যে  চারটি এশীয় সিংহ পরস্পরের দিকে পিঠ করে চারদিকে মুখ করে বসে রয়েছে। এটিই সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ।

নির্মাতা

মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য -এর পৌত্র ও বিন্দুসার -এর পুত্র সম্রাট অশোক এই সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ নির্মাণ করান।

নির্মাণের সম্ভাব্য কারণ

সম্রাট অশোক তাঁর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্ত্রী বিদিশার পরামর্শে সারনাথে গৌতম বুদ্ধ -এর দীক্ষাস্থলকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন।

জাতীয় প্রতীক

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই ভাস্কর্য্যের রৈখিক প্রতিরূপ ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

স্থাপনা কাল

আনুমানিক ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে সারনাথ নামক স্থানে একটি অশোক স্তম্ভের শীর্ষে এই ভাস্কর্য্যটি স্থাপন করা হয়।

স্থানান্তর

অশোক স্তম্ভটি সেই স্থানে রাখা হলেও স্তম্ভশীর্ষটিকে বর্তমানে সারনাথ সংগ্রহালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

সিংহ মূর্তি

২.১৫ মিটার উচ্চ এই স্তম্ভশীর্ষটি অন্যান্য স্থানে প্রাপ্ত অশোক স্তম্ভগুলির স্তম্ভশীর্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যার অধিকাংশে চারটির বদলে একটি সিংহের মূর্তি রয়েছে।

পাথরের ব্যবহার

পালিশকরা একটি একক বেলেপাথর খোদাই করে এই স্তম্ভশীর্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। অশোক স্তম্ভটি ও স্তম্ভশীর্ষটি দুটি আলাদা পাথরের টুকরো দ্বারা নির্মিত।

প্রানীর অবস্থান

এই স্তম্ভশীর্ষে চারটি এশীয় সিংহ পরস্পরের দিকে পিঠ করে চারদিকে মুখ করে বসে আছে। চারটি সিংহ যে ভিত্তিভূমির ওপর দন্ডায়মান সেখানে একটি হাতি, একটি ঘোড়া, একটি ষাঁড় ও একটি সিংহের মূর্তি খোদিত আছে।

ধর্মচক্র

ভিত্তি ভূমির প্রানীদের মধ্যে একটি করে ধর্মচক্র খোদিত আছে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি একটি ঘণ্টাকৃতি পদ্মের ওপর স্থাপিত। সম্ভবত এই স্তম্ভশীর্ষের ওপর একটি ধর্মচক্র ছিল, যার কিছু টুকরো ঐ স্থানে পাওয়া গেছে।

থাইল্যান্ডে প্রতিরূপ

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত সারনাথের অশোক স্তম্ভ ও এই স্তম্ভশীর্ষের একটি প্রতিরূপ থাইল্যান্ডের ওয়াট উমোং মন্দিরে রাখা আছে, যেখানে ধর্মচক্র বা অশোক চক্র স্তম্ভশীর্ষের ওপরে আছে।

আবিষ্কার

ইংরেজ প্রকৌশলী ফ্রেডরিখ অস্কার ইমানুয়েল ওয়ের্টেল ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের শীতকালে সারনাথ অঞ্চল খননের দায়িত্ব পান।

  • (১) প্রথমে তিনি মূল স্তূপের পশ্চিমে অশোকের আমলের এক স্থাপত্যের ওপর নির্মিত গুপ্ত যুগের একটি মন্দিরের অবশেষ খুঁজে পান। এরই পশ্চিম দিকে অশোক স্তম্ভের নিচের ভাঙ্গা অংশটি তিনি আবিষ্কার করেন।
  • (২) অশোক স্তম্ভটির বাকি অংশ তিনটি ভাগে আলাদা আলাদা পড়ে থাকতে দেখা যায়। তারপর অশোক স্তম্ভটির শীর্ষ ভাস্কর্য্য খোঁজার চেষ্টা করা হয় এবং নিকটেই তা পাওয়া যায়।

সাঁচীর তুলনায় উৎকৃষ্ট

সাঁচী থেকে প্রাপ্ত অনুরূপ সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষের থেকে সারনাথে আবিষ্কৃত ভাস্কর্য্যটি তুলনামূলক ভাবে যথেষ্ট ভালো অবস্থায় ছিল।

সংরক্ষণ

এই উৎখনন স্থানে দ্রুত সারনাথ সংগ্রহালয় স্থাপন করে আবিষ্কৃত প্রত্নসামগ্রীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

জাতীয় প্রতীক রূপে গৃহীত

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান -এ জাতীয় প্রতীক হিসেবে অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষের মুদ্রণরূপ গৃহীত হয়।

  • (১) জাতীয় প্রতীক রূপে গৃহীত রূপটিতে চতুর্থ সিংহটি দেখা যায় না। কারণ এটি স্তম্ভশীর্ষের পিছনে অবস্থিত, তাই সামনে থেকে দৃষ্টিগোচরে আসে না।
  • (২) সিংহের পায়ের তলায় ভিত্তিভূমির কেন্দ্রে আছে ধর্মচক্র। ডানদিকে ষাঁড় ও বাঁদিকে লম্ফমান ঘোড়া দেখা যায়। বাঁয়ে ও ডানে একদম ধারে ধর্মচক্রের দুটি ধার দেখা যায়।
  • (৩) জাতীয় প্রতীকের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল দেবনাগরী হরফে খোদিত সত্যমেব জয়তে (সংস্কৃত: सत्यमेव जयते) নীতিবাক্যটি। এই লেখাটি মূল স্তম্ভশীর্ষে দেখা যায় না।

উপসংহার :- গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার পর সম্রাট অশোক ধর্ম যাত্রা শুরু করেন এবং তার নির্দেশে নির্মিত হয়েছিল বিভিন্ন স্থাপত্য ও ভাষ্কর্য।

(FAQ) অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ কোথায় পাওয়া যায়?

সারনাথে।

২. বর্তমানে সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ কোথায় সংরক্ষিত আছে?

সারনাথের যাদুঘরে।

৩. অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষের গুরুত্ব কী?

বর্তমানে এটি ভারতের জাতীয় প্রতীক রূপে গৃহীত হয়েছে।

Leave a Reply

Translate »