ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকার

ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার -এর সংজ্ঞা, সীমাহীন বা অবাধ নয়, বাধা নিষেধে সক্ষম, ছয়টি মৌলিক অধিকার, লক্ষ্য, ধারা, সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার ও সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার সম্পর্কে জানবো।

ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকার

উৎসমার্কিন সংবিধান
অধ্যায়তৃতীয়
ধারা১২-৩৫ নং ধারা
সংখ্যা৬ টি
মৌলিক অধিকার

ভূমিকা :- ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ধারণাটি মার্কিন সংবিধানের Bill of rights থেকে নেওয়া হয়েছে।

মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা

সাধারণভাবে নাগরিকদের অধিকার সমূহের মধ্যে যেগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য সেগুলিকেই মৌলিক অধিকার বা Fundamental Rights বলা যায়।

দুর্গাদাস বসুর বক্তব্য

অধ্যাপক দুর্গাদাস বসুর ভাষায়, “A fundamental right is one which is protected and granted by the written Constitution of the State.”

সীমাহীন বা অবাধ নয়

মৌলিক অধিকার হল সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত ও রাষ্ট্র কর্তৃক বাস্তবায়িত দাবি। কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলি ব্যক্তিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হলেও এই অধিকারগুলির কোনোটিই সীমাহীন বা অবাধ নয়।

বাধা নিষেধে সক্ষম

কিছু ক্ষেত্রে সংবিধান নিজে এবং কিছু ক্ষেত্রে সংসদ -এও এই অধিকারগুলির ওপর বাধানিষেধ আরোপ করতে সক্ষম।

ছয়টি মৌলিক অধিকার

ভারতীয় সংবিধান -এ মোট ৬ টি মৌলিক অধিকার বর্ণিত রয়েছে। এগুলি হল সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার।

লক্ষ্য

ভারতের মৌলিক অধিকার ভারতের প্রকৃত গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, সবরকম অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটানো।

ধারা

ভারতের সংবিধানে তৃতীয় অধ্যায়ের ১২ নং থেকে ৩৫ নং ধারার মধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের ৬ টি মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ রয়েছে।

সাম্যের অধিকার

ভারতের সংবিধানে ১৪ থেকে ১৮ নং ধারায় সাম্যের অধিকার লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

১৪ নং ধারা

ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় আইনের দৃষ্টিতে সাম্য অথবা আইন সমূহ দ্বারা সমানভাবে সংরক্ষিত হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। এই অনুচ্ছেদে উল্লেখিত অধিকার দুটি হল আইনের দৃষ্টিতে সমতা অধিকার এবং আইনের দ্বারা সংরক্ষিত হবার অধিকার।

১৫ নং ধারা

রাষ্ট্র কোনো নাগরিকদের প্রতি কেবলমাত্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ, জন্মস্থান বা নারী-পুরুষ ভেদে পৃথক আচরণ করতে পারে না। কোনো নাগরিক আবার উপরোক্ত কারণগুলোর কোনটির জন্য দোকান, সাধারণের ব্যবহার্য রেস্তোরা, হোটেল এবং সরকারি অর্থে পরিচালিত কূপ, পুষ্করিণী, স্নানাগার বা সমাগম স্থানে ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।

১৬ নং ধারা

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ ও সমান অধিকারের কথা বলা আছে। জাতি, ধর্ম স্ত্রী-পুরুষ বর্ণ, বংশ ও জন্মস্থান ইত্যাদি বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও কেবলমাত্র এই কারণগুলির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরি লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। আবার এইসব কারণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।

১৭ নং ধারা

অস্পৃশ্যতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অস্পৃশ্যতার সাথে জড়িত যে কোনো আচরণ দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। অস্পৃশ্যতার অজুহাতে কোনো ব্যক্তিকে অযোগ্য বলে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে তা আইন অনুসারে দন্ডনীয় হবে। এই উদ্দেশ্যে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ‘অস্পৃশ্যতা-সংক্রান্ত’ অপরাধ আইন পাস করা হয়েছে।

১৮ নং ধারা

বিদ্যাবিষয়ক বা সামরিক খেতাব ভিন্ন রাষ্ট্র অন্য কোনো খেতাব দান করতে পারবে না। আবার বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের নিকট থেকে ভারতীয় নাগরিক কোনো কোনো খেতাব গ্রহণ করতে পারবে না। সরকারি খেতাব জনগণের মধ্যে কৃত্রিম শ্রেণীর বৈষম্য সৃষ্টি করে বলে এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে বিশেষ অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতার অধিকার

ভারতের সংবিধানের ১৯ থেকে ২২ নং ধারায় স্বাধীনতার অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে।

১৯ নং ধারা

মূল সংবিধানে সাত প্রকার স্বাধীনতার কথা উল্লেখ ছিল। ১৯৭৮ সালে ৪৪ তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এর সংখ্যা হ্রাস করে ছয় প্রকার করা হয়েছে। যেমন –

  • (১) বাক্ স্বাধীনতা।
  • (২) শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র ভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার।
  • (৩) সমিতি বা ইউনিয়ন গঠনের অধিকার।
  • (৪) ভারতের সর্বোচ্চ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার।
  • (৫) ভারতের যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপনের অধিকার।
  • (৬) যে কোনো বৃত্তি অবলম্বন করার অধিকার।

২০ নং ধারা

সংবিধানের ২০ নং ধারায় অপরাধ ও অপরাধী সংক্রান্ত তিনটি অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

  • (১) অপরাধ যে সময়ে করা হয় সেই সময়কার প্রচলিত আইন অনুসারে যে শাস্তি দেওয়া যেত জতার অধিক শাস্তি অপরাধীকে দেওয়া যাবে না।
  • (২) একজন ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য একাধিকবার শাস্তিও দেওয়া যাবে না।
  • (৩) কোনো ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।

২১ নং ধারা

জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ কথাটির অর্থ হল আদালত শুধু বিচার করবে যে পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে কিনা তা কোনো বিধিবদ্ধ বা বৈধ আইন অনুসারে করা হয়েছে কিনা।

২২ নং ধারা

এই ধারায় গ্রেফতার ও আটক সম্পর্কে কয়েকটি অধিকারের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, কাউকে যতসম্ভব শীঘ্র কারণ না দেখিয়ে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা যাবে না। আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করার অধিকার থাকবে।

শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার

ভারতের সংবিধানের ২৩ ও ২৪ নং ধারায় শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।

২৩ নং ধারা

২৩ ক ধারা অনুযায়ী কাউকে বিনা পারিশ্রমিকে বা বাধ্যতামূলক ভাবে বেকার খাটানো যাবে না । ২৩ খ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র জাতীয় স্বার্থে যে কোনো ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক ভাবে বেগার খাটাতে পারে।

২৪ নং ধারা

শিশু শ্রমিক নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে ১৪ বছরের কম বয়স্ক শিশুদের কোনো কারখানা, খনি বা অন্য কোনো বিপদজনক কাজে নিযুক্ত করা যাবে না।

ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার

ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ নং ধারায় ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার বর্ণিত আছে।

২৫ নং ধারা

ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার অনুসারে সব ব্যক্তিদের বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মবিশ্বাস, ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্ম প্রচারে স্বাধীনতা থাকবে। ভারতের নাগরিক ও ভারতের বসবাস কারি বিদেশীরা সংবিধান প্রদত্ত এই অধিকারের সুযোগ লাভ করবে। ধর্মীয় অনুশাসন অনুসারে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে।

২৬ নং ধারা

প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের অধিকার গুলি রাষ্ট্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেমন –

  • (১) ধর্ম ও দানের উদ্দেশ্যে প্রতিস্থাপন ও রক্ষা করার।
  • (২) নিজ নিজ কর্ম বিষয়ক কার্যাবলীর ব্যবস্থা করার।
  • (৩) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন করার ও মালিক হবার।
  • (৪) আইন অনুসারে ওই সম্পত্তি পরিচালনা করার অধিকার ভোগ করবে। তবে এই অধিকার গুলি অবাধ বা নিরঙ্কুশ নয়।

২৭ নং ধারা

কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্ম সম্প্রদায়ের উন্নতি অথবা সংরক্ষণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে কোনো প্রকার কর প্রদান করতে বাধ্য করা যাবে না। ধর্ম সংক্রান্ত ব্যাপারে রাষ্ট্র যাতে নিরপেক্ষ বজায় রেখে চলে এবং বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায় যাতে জোর করে তা চাপিয়ে দিতে না পারে সে জন্য সংবিধানে উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২৮ নং ধারা

সম্পূর্ণভাবে সরকারি অর্থ দ্বারা পরিচালিত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ম শিক্ষা দেওয়া যাবে না। ধর্মীয় উপাসনায় যোগদান করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। ধর্মীয় শিক্ষায় যোগদান কারী ব্যক্তি নাবালক বা নাবালিকা হলে তাদের অভিভাবকদের সম্মতি আগেই গ্রহণ করতে হবে।

 শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার

ভারতের সংবিধানের ২৯ ও ৩০ নং ধারায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার বিষয়ে উল্লেখ আছে।

২৯ নং ধারা

ভারতে কোনো অঞ্চলের অধিবাসীদের নিজস্ব ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি থাকে তবে সেই ভাষা, লিপি বা সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার অধিকার সেই অঞ্চলের অধিবাসীরা ভোগ করবে। সরকার পরিচালিত বা সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবলমাত্র ধর্ম, বংশ, বর্ণ বা ভাষার জন্য কাউকে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

৩০ নং ধারা

ধর্মভিত্তিক বা ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠান ও পরিচালনা করার অধিকার ভোগ করবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত, কেবলমাত্র এই কারণে সরকারি সাহায্যের ব্যাপারে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না।

সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার

ভারতের সংবিধানের ৩২ ও ২২৬ নং ধারায় সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

৩২ নং ধারা

সুপ্রিম কোর্ট মৌলিক অধিকার গুলি বলবৎ করার জন্য পাঁচ ধরনের লেখ জারি করেছে। এগুলি হল-

  • (১) বন্দী প্রত্যক্ষীকরণ,
  • (২) পরমাদেশ,
  • (৩) প্রতিষেধ,
  • (৪) অধিকারপৃচ্ছা,
  • (৫) উৎপ্রেষণ।

২২৬ নং ধারা

সংবিধানের ২২৬ নং ধারায় প্রত্যেক রাজ্যের হাইকোর্ট এইসব লেখ আদেশ বা নির্দেশ জারি করার ক্ষমতা ভোগ করে।

উপসংহার :- মূল ভারতীয় সংবিধানে সাত প্রকারের মৌলিক অধিকারের উল্লেখ থাকলেও ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৪ তম সংশোধনীর দ্বারা সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

(FAQ) ভারতের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতের সংবিধানে কয়টি মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছে?

৬ টি

২. ভারতের সংবিধানের কত নং ধারায় মৌলিক অধিকার গুলি লিপিবদ্ধ আছে?

সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ১২-৩৫ নং ধারায়

৩. সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয় কখন?

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৪ তম সংশোধন দ্বারা

Leave a Reply

Translate »