স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা

স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় আইনসভা, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, সামরিক আধিপত্য, বিদেশ নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইসলামী শাসন ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল্যায়ন সম্পর্কে জানবো।

স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনাপাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
স্বাধীনতা দিবস১৪ আগস্ট
উচ্চকক্ষসিনেট
নিম্নকক্ষজাতীয় পরিষদ
নিয়মতান্ত্রিক শাসকরাষ্ট্রপতি
সরকারের প্রধানপ্রধানমন্ত্রী
স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা

ভূমিকা :- ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। মুসলিম লিগ নেতা মহম্মদ আলি জিন্নার নেতৃত্বে স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভা

সংবিধান অনুসারে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় আইনসভায় দুটি কক্ষ রয়েছে – একটি উচ্চকক্ষ এবং অন্যটি নিম্নকক্ষ। উচ্চকক্ষের নাম হল সিনেট এবং নিম্নকক্ষের নাম হল জাতীয় পরিষদ।

  • (১) উচ্চকক্ষ সিনেটের আসন সংখ্যা ১০০। এর মধ্যে ৮৮ জন চারটি প্রদেশ থেকে এবং অবশিষ্ট ১২ জন ইসলামাবাদ ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হন। সিনেটে ২০ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হয়।
  • (২)  নিম্নকক্ষ জাতীয় সভার আসন সংখ্যা ৩৪২। এর মধ্যে মহিলারা অন্তত ৬০টি আসনে এবং অমুসলিমরা ১০টি আসনে নির্বাচিত হতে পারে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি

সংবিধান অনুসারে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি।

  • (১) সংবিধান অনুসারে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি অবশ্যই মুসলিম হবেন। আইনসভার দুটি কক্ষের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচক সংস্থা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করে।
  • (২) তিনি হলেন পাকিস্তানের নিয়মতান্ত্রিক শাসক। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তিনি কার্য পরিচালনা করেন। তবে তিনি এককভাবে জাতীয় সভাকে স্থগিত করতে পারেন।
  • (৩) তাঁর শাসনকালের মেয়াদ ৫ বছর। তিনি একাদিক্রমে সর্বোচ্চ দু-বার এই পদে নিযুক্ত হতে পারেন।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী

  • (১) পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিম্নকক্ষ জাতীয় সভার সদস্যদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিযুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রীই হলেন পাকিস্তানের প্রকৃত শাসক। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাজে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত হয় একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় মন্ত্রীপরিষদ।
  • (২) তবে জিয়া-উল-হক পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে চরম ক্ষমতা দেওয়া হয়। এতে বলা হয় যে, রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সভা পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বা এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী সংবিধান অনুসারে সরকার চালাতে ব্যর্থ হয়েছেন তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করতে পারেন।

পাকিস্তানের সামরিক আধিপত্য

পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে দেখা যায়, সেখানকার বহু সেনাপ্রধান পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান পারভেজ মুশারফ কোনো নির্বাচনে জয়লাভ না করেও ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন এবং তিনি দীর্ঘদিন সরকার ও সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দেশ শাসন করেছেন।

পাকিস্তানের বিদেশনীতি

  • (১) মহম্মদ আলি জিন্না মিত্রতাপূর্ণ বিদেশনীতি গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে জিন্না কর্তৃক গৃহীত নীতির ভিত্তিতে পাকিস্তান সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ বিদেশনীতি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি অনুসরণ করে।
  • (২) বিশ্বে মৈত্রী ও সহযোগিতার প্রসার ঘটাতে পাকিস্তান সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স, সার্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা (ECO) প্রভৃতি সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ করেছে।

পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে উন্নতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে আমেরিকা চিন, রাশিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশের সঙ্গে পাকিস্তান সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এ ছাড়া পাকিস্তান ‘ভ্রাতৃপ্রতিম ইসলামি রাষ্ট্র’ তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।

পাকিস্তানে ইসলামি শাসন

স্বাধীন দেশ পাকিস্তানে বসবাসকারী জনসংখ্যার ৯৫-৯৭% মুসলিম সম্প্রদায় এবং ৩-৫% হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়। স্বভাবতই সেই কারণে পাকিস্তানের রাষ্ট্রধর্ম হল ইসলাম। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘আল্লার’ প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয়েছে। আংশিক চাঁদ এবং পাঁচটি তারকা হল ইসলামের প্রতীক। পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় প্রতীকে ইসলামের এই প্রতীকের ব্যবহার ইসলামধর্মের প্রতি পাকিস্তানের গভীর শ্রদ্ধাকেই প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া সংবিধানগতভাবেই পাকিস্তান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল্যায়ন

  • (১) গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিচারে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সফল বলা সম্ভব নয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য বারবার ব্যাহত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গুপ্তহত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান, সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় প্রভৃতি ঘটনা পাকিস্তানের রাজনীতির ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ ব্যাপার।
  • (২) সাম্প্রতিককালে পারভেজ মুশারফের রাষ্ট্রপতি পদ লাভ, বেনজির ভুট্টোকে হত্যা, সন্ত্রাসবাদী ওসামা বিন লাদেনকে গোপনে আশ্রয়দান প্রভৃতি ঘটনাই এর প্রমাণ। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি জিয়া-উল-হক ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে ইসলামি আইন প্রবর্তন করেছেন।

উপসংহার :- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাজনৈতিক কাঠামোয় ইসলামের ব্যাপক আধিপত্যের ফলে সেখানকার সংখ্যালঘু অমুসলিম জনগণ দেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে।

(FAQ) স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস কবে?

১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সাল।

২. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চকক্ষের নাম কি?

সিনেট।

৩. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভার নিম্নকক্ষের নাম কি?

জাতীয় পরিষদ।

৪. পাকিস্তানের নিয়ম তান্ত্রিক শাসক কে?

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি।

৫. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান কে?

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

Leave a Comment