পাগলপন্থী বিদ্রোহ

পাগলপন্থীদের পরিচয়, নতুন ধর্মমত প্রচার, পাগলপন্থী বিদ্রোহের কারণ, নেতৃত্ব, বিদ্রোহের প্রসার, বিদ্রোহীদের ঘোষণা, বিদ্রোহের অবসান, বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

পাগলপন্থী বিদ্রোহ

সময়কাল ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দ
স্থান ময়মনসিংহ জেলা
নেতৃত্ব করম শাহ, টিপু শাহ, জানকুপাথর ও দোবরাজপাথর
ফলাফল ব্যর্থতা
পাগলপন্থী বিদ্রোহ

ভূমিকা :- উনিশ শতকে বাংলায় যেসব কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত পাগলপন্থী বিদ্রোহ।

পরিচয়

ময়মনসিংহ জেলার শেরপুর পরগনার রাজবংশী, হাজং, হাত্রি দালু, মুসলিম-সহ সমাজের বিভিন্ন অংশের লোকেরা ফকির করিম শাহ এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু শাহ-র নেতৃত্বে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এটি পাগলপন্থী বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

নতুন ধর্মমত প্রচার

করম শাহ নামে জনৈক ফকির ও সুফি সাধক এই উপজাতির গোষ্ঠীর মধ্যে ‘পাগলপন্থী’ বা ‘বাউল ধর্ম’ নামে এক নতুন ধর্মমত প্রচার করেন। এই ধর্মের মূলকথা ছিল সাম্য, সৌভ্রাতৃত্ব ও সত্যনিষ্ঠ ।

আন্দোলনের কারণ

পাগলপন্থী আন্দোলনের প্রধান কারণগুলি ছিল –

  • (১) ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধে (১৮২৪-২৬ খ্রি.) ইংরেজদের যে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় হয়েছিল তা পূরণ করার উদ্দেশ্যে সরকার ময়মনসিংহ জেলার কৃষকদের খাজনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
  • (২) ব্রিটিশদের সহযোগী জমিদাররাও কৃষকদের ওপর তীব্র শোষণ চালায়।
  • (৩) ব্রিটিশ শাসন ময়মনসিংহের চিরাচরিত গ্রামীণ কাঠামো ভেঙে দেয়।

নেতৃবৃন্দ

পাগলপন্থীরা করম শাহ, টিপু শাহ, জানকুপাথর ও দোবরাজপাথর প্রমুখের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেছিল।

আন্দোলনের প্রসার

করিম শাহ এই বিদ্রোহ শুরু করলেও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু শাহর নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। টিপু ৫ হাজার অনুগামী নিয়ে শেরপুরের জমিদারকে আক্রমণ করেন। বিদ্রোহীরা থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়, শহরে লুঠপাট চালায় এবং ময়মনসিংহের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘেরাও করে।

বিদ্রোহীদের ঘোষণা

বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে যে, –

  • (১) তারা আর জমিদারের আধিপত্য মানবে না।
  • (২) তারা সামরিক রাস্তা তৈরির কাজ করবে না বা এই কাজে কোনো ধরনের সাহায্যও করবে না।
  • (৩) তারা ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না বলেও জানিয়ে দেয়।

বিদ্রোহের অবসান

১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে টিপু গারাে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এই বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে।

বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য

পাগলপন্থী বিদ্রোহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল –

  • (১) পাগলপন্থী বিদ্রোহ ছিল অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ও জমিদারের বিরুদ্ধে এক তীব্র জেহাদ।
  • (২) ওলন্দাজ ঐতিহাসিক উইলেম শেন্ডেল মনে করেন যে, পাগলপন্থীরা এক ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পেলেও এই বিদ্রোহ ছিল জমিদার-বিরোধী বিদ্রোহ।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের স্বীকৃতি

শেষপর্যন্ত এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা জমিদার ও ব্রিটিশ-বিরোধী বিদ্রোহের স্বীকৃতি পায়

গুরুত্ব

পাগলপন্থী বিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। যেমন –

  • (১) এই বিদ্রোহে কৃষকদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।
  • (২) এই বিদ্রোহ ভবিষ্যতে বড়ো ধরনের বিদ্রোহের পথ প্রস্তুত করে।

উপসংহার :- ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হলেও পাগলপন্থীরা যেভাবে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জেহাদ গড়ে তুলেছিল, তা সত্যই বিস্ময়কর। অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরির মতে, পাগলপন্থীদের আন্দোলন জমিদার ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।

(FAQ) পাগলপন্থী বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাগলপন্থী বিদ্রোহ কখন হয়?

১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে।

২. পাগলপন্থী বিদ্রোহ কোথায় হয়?

ময়মনসিংহ অঞ্চলে।

৩. পাগলপন্থী বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম লেখ।

ফকির করিম শাহ, টিপু শাহ।

Leave a Reply

Translate »