মহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ

মহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ প্রসঙ্গে ব্রিটিশের মতে মুসলমানদের গুপ্ত চক্রান্ত, মুসলমানদের কাছে ব্রিটিশ শাসন বিধর্মীয় শাসন, মহাবিদ্রোহে দিল্লীর মুসলিম সমাজ, অযোধ্যার মুসলিম সমাজ, উত্তর পশ্চিম প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের মুসলিম সমাজ, মহাবিদ্রোহে ধর্মীয় শক্তি ও মুসলমানদের অসহযোগের ঘটনা সম্পর্কে জানবো।

মহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ

ঐতিহাসিক ঘটনামহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ
সময়কাল১৮৫৭ খ্রি:
ভারতের সম্রাটদ্বিতীয় বাহাদুর শাহ
অযোধ্যার নেতাবেগম হজরত মহল
সদর আমিনস্যার সৈয়দ আহমেদ খান
মহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ

ভূমিকা :- ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ব্যাপকভাবে মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল। যদিও আনুগত্যহীনতা ও বিরক্তির স্ফুলিঙ্গ প্রথমে হিন্দু সিপাহিদের মনেই প্রজ্বলিত হয়েছিল। তবু এই আন্দোলনের প্রসার ঘটিয়েছিল মুসলমানেরা, পরিচালনারও ভার নিয়েছিল তারা।

ব্রিটিশের মতে মুসলমানদের গুপ্ত চক্রান্ত

  • (১) ধর্মীয় দুর্দশার বোঝা তাদের পথ দেখিয়েছিল রাজনৈতিক ক্ষমতায় উত্তরণের। ব্রিটিশের মতে মুসলমানদের গুপ্ত চক্রান্তই এই বিদ্রোহকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিল। ব্রিটিশদের অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মুসলমানেরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর ক্ষতিকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।
  • (২) বিদ্রোহী মুসলমানেরা তাই স্বপ্ন দেখেছিল মোগল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের। তাই তারা বাহাদুর শাহকে গ্রহণ করল ‘প্রতীক’ রূপে তাদের ব্রিটিশ বিরোধী অভিযানকে দৃঢ় করে তুলতে।

মুসলমানদের কাছে ব্রিটিশ শাসন বিধর্মীয় শাসন

১৮৫৬ সালে অযোধ্যাকে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে সংযোজন মুসলমানদের উত্তেজিত ও ব্রিটিশ বিরোধী করে তুলেছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রিটিশ শাসন ছিল মুসলমানদের কাছে বিধর্মীয় শাসন।

মহাবিদ্রোহে দিল্লীর মুসলিম সমাজ

  • (১) এই বিদ্রোহের মূলে মুসলমানদের সক্রিয় অংশ ছিল তার অনেক প্রমাণও পাওয়া যায়। দেশী অশ্বারোহী বাহিনীর নিম্নপদস্থ অধিকাংশ আরোহীই ছিলেন মুসলমান। তাঁরা কুচকাওয়াজ করে মীরাট থেকে দিল্লী এসে উপস্থিত হল বাহাদুর শাহকে তাঁদের বিদ্রোহের নেতার পদে অভিষিক্ত করতে।
  • (২) বাহাদুর শাহ ইউরোপীয়দের একেবারেই সুনজরে দেখতেন না‌। কারণ তারা তাঁর কর্মচারীবর্গ ও ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিতে চেষ্টা করে। তিনি সম্রাট রূপে ঘোষিত হয়েই প্রধান সেনাপতির পদে প্রতিষ্ঠিত করলেন মিরজা মোগল নামে এক মোগল শাহজাদাকে।
  • (৩)  দিল্লী ও তার আশেপাশের জায়গীরদারদের সম্রাটের রাজসভায় ডাকা হল। এইসব জায়গীরদারদের মধ্যে প্রধান ছিলেন রহমান খান, আহম্মদ খান ও জিয়া-উদ্-দিন আহম্মদ। মোগল সম্রাটের নামে একটি ঘোষণাও প্রচারিত হল। এই ঘোষণায় বলা হয় “নিজের ধর্মকে যারা রক্ষা করতে চান তাঁরা যেন সকলেই সৈন্যদলে যোগ দেন।”

মহাবিদ্রোহে অযোধ্যার মুসলিম সমাজ

  • (১) অযোধ্যার ঘটনাবলী এই বিদ্রোহে মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সাক্ষ্য দেয়। অযোধ্যার নির্বাসিত রাজার নাবালক পুত্র বিয়জিদ কাদিরকে কেন্দ্র করে সিপাহিরা একত্রে সমাবেশ রচনা করেন।
  • (২) মুসলমানদের বিদ্রোহের কেন্দ্র ছেড়ে না যাওয়ার জন্য আগ্রার চীফ কমিশনার ফ্রেজার কর্তৃক হুঁসিয়ারী জ্ঞাপন করা হয়। বেগম হজরত মহল ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাঁর পুত্রের সহযোগী হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের আহ্বান করেন।

মহাবিদ্রোহে উত্তর পশ্চিম প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের মুসলিম সমাজ

  • (১) গ্রামাঞ্চলের ঘটনাগুলিও বিদ্রোহে মুসলমানদের প্রকৃতি ও আচরণের পরিচয় দেয়। আলিগড়ে তন্তুবায়দের মতো নিম্নশ্রেণীর মুসলমানেরাও জেহাদের ধ্বনি তোলে। ঘিয়া মহম্মদ খাঁ নামে একটি লোক আলিগড়ে নিজেকে বাহাদুর শাহের সুবাদার বলে দাবি করে।
  • (২) ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ কর্তৃক রোহিলাখণ্ড অধিকারের ফলে সেখানকার মুসলমানরা ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়। খান বাহাদুর খাঁ বাহাদুর শাহের পক্ষ থেকে নবাবনাজিম উপাধি গ্রহণ করলেন এবং মুবারক শাহকে বদাউনের শাসনকর্তা রূপে নিয়োগ করলেন।
  • (৩) এলাহাবাদে অত্যাচারিত অভিজাত মুসলমানেরা এবং শহরবাসী মুসলমানেরা ঐক্যবদ্ধ হল। সম্রাটের নামে তত্ত্বাবধানের ভার গ্রহণ করেন মৌলভী লিয়াক‍ৎ আলি।

মহাবিদ্রোহে ধর্মীয় শক্তি

  • (১) মুসলিম ধর্মের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও এই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করেন। ফৈজাবাদের মৌলভী আহম্মদ আল্লা শাহ ১৮৫৮ সালে ক্যাম্পবেলের বাহিনী অযোধ্যা জয় করতে গেলে সেই বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করেন। মুজাফফর নগরের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন মৌলানা রহমত উল্লা।
  • (২) ওয়াহাবিদের সন্দেহের চোখে দেখা হত এবং পাটনাতে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৮৫৭ সালের জুলাই মাসে টংক থেকে একজন মুসলমান সেনাপতি আসেন তারই নেতৃত্বে মুসলমান সৈন্যরা দিল্লী আক্রমণের সময় বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন।
  • (৩) মুসলিম উইলায়াতিরা ও গুজরাটের দখলদারেরা বিরূপতা ও বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বরোদার দোহাদ দুর্গের মুসলিম বিদ্রোহ সৈন্যদের মধ্যে দেখা দেয়। কিছু পরে সুন্থে আর একটি বিদ্রোহ দেখা দেয়। এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মুস্তাফা খাঁ।

মহাবিদ্রোহে মুসলমানদের অসহযোগের ঘটনা

  • (১) একথা উল্লেখযোগ্য যে মুসলমানেরা বিদ্রোহের সূত্রপাতের সময় কোন উদ্যম দেখান নি। মূল সিপাহি বিদ্রোহ হিন্দু সিপাহিদের দ্বারাই উদ্ভাবিত হয়েছিল। অসামরিক অভ্যুত্থান বেশীর ভাগ জায়গাতেই হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত হয়।
  • (২) ব্যক্তিগত, জাতিগত, শ্রেণীগত ও আঞ্চলিক বিভেদ মুসলমানদের পৃথক পৃথক ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। হায়দ্রাবাদের নিজাম ও রামপুর, করনাল, মুরাদাবাদ এবং ঢাকার নবাবদের মতো অভিজাত শ্রেণী ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যই রক্ষা করেছিলেন।
  • (৩) আবার অপর দিকে ফারাক্কাবাদ ও ডাণ্ডার নবাবেরা বিদ্রোহে যোগ দেন। মুসলিম রাজকর্মচারীরাও অনুরূপভাবে বিভক্ত ছিলেন। আলিগড় ও রোহিলাখণ্ডে তাদের বেশীর ভাগই বিদ্রোহে যোগ দেন। কিন্তু সৈয়দ আহম্মদ (তখন বিজনোরে সদর আমিন রূপে নিযুক্ত ছিলেন) ব্রিটিশের সঙ্গে সহযোগিতাই করার চেষ্টা করেন।
  • (৪) এমনকি পাটনাতে, যেখানে মুসলমানদের আনুগত্যহীনতার একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল, সেখানে টেলরের প্রধান সাহায্যকারী হয়েছিলেন মুসলমানরা। এদের মধ্যে ছিলেন মৌলা বক্‌স, শাহ কবীর, রমজান আলি এবং উলিয়াৎ খাঁ।
  • (৫) বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ শাসনে আধিক ও অন্যান্য দুর্দশা ভোগ করলেও বিদ্রোহী কোনও মনোভাব প্রকাশ করেন নি।
  • (৬) পাঞ্জাবে মুসলমানরা সীমান্তের মুসলমান উপজাতিদের সঙ্গে মিলিত হয়ে দিল্লীর নিকট ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। এই মুসলমান সেনাদল রেইকী প্রমুখ ব্রিটিশ রাজপুরুষদের আস্থা ও প্রশংসা অর্জন করতে সমর্থ হয়।

মহাবিদ্রোহে মুসলমানদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলের মত

ক্যাম্পবেলের মতে-

  • (১) এই বিদ্রোহ মূলতঃ ছিল হিন্দুস্থানী বিদ্রোহ। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের প্রভাবশালী হিন্দু ও মুসলিমদের দ্বারাই এটা পরিচালিত হয়েছিল। তাই একে ধর্মীয় বিদ্রোহ না বলে অভিজাত সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ বলাই সঙ্গত। সাধারণ মুসলমানরা এতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন নি।
  • (২) এই বিবরণে প্রদর্শিত হয়েছে যে বিহার ও বেনারসের মুসলমানরা ও জমিদারেরা বিদ্রোহে যোগ দেন নি। প্রকৃত নিষ্ঠাবান ও গোঁড়া মুসলমানরাও যেমন বাংলার ফরাজি ও মালাবারের মোপলারাও বিদ্রোহী হয় নি। প্রধান প্রধান মুসলিম ঈশ্বরতত্ত্ববেত্তারাও সক্রিয় সহানুভূতি দেখান নি।
  • (৩) এমনকি বিদ্রোহের প্রধান কর্মকেন্দ্র উত্তর-পশ্চিম প্রদেশেও সাধারণ মুসলমানরা সরকারের অনুগত ছিলেন। কিন্তু এ কথাও ক্যাম্পবেল কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে যে বিদ্রোহী রাজকর্মচারীদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের।
  • (৪) কিন্তু বাহাদুর শাহের বিদ্রোহে জড়িত হওয়া কোনক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ তিনি বিদ্রোহীদের দ্বারা মীরাট থেকে ব্যবহৃত হয়েছিলেন।

মহাবিদ্রোহে মুসলমানদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ক্যানিংয়ের মত

মূলতঃ হিন্দুদের দ্বারাই এই উত্থান সংঘটিত হয়েছিল বলে ক্যানিং কর্তৃক একেবারেই স্বীকৃত হয়নি। বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি ভারমন স্মিথের কাছে প্রেরিত পত্রে এই তথ্য পাওয়া যায় যে হিন্দু আন্দোলন দিয়ে আরম্ভ হলেও স্থানীয় অসন্তোষের সঞ্চয়ের জন্যই ক্রমে ক্রমে মুসলমানেরাও এসে যোগদান করেছিল “It was not more Mussalman than Hindoo” – পত্রাংশে ক্যানিং এরূপ উক্তি করেন। ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুসলমানদের দ্বারা গঠিত ছিল ও বহুলাংশে তারাই এই বিদ্রোহের জন্য দায়ী।

মহাবিদ্রোহে মুসলমানদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে বাউরিং-এর মত

  • (১) ১৮৫৯ সালে বাউরিং কর্তৃক রচিত একটি ঘটনা ও মূল্য নির্ণায়ক বিবরণী ক্যানিংয়ের নিকট প্রদত্ত হয়। মুসলমানেরাই বিদ্রোহের প্রধান পরিচালক ছিল এরূপ মত এই বিবরণীতে অস্বীকার করা হয়। একথা স্বীকৃত হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন অংশের মুসলমানেরা সরকারের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন না।
  • (২) এই ধারণাও স্বীকৃত হয় যে মুসলমানেরা ব্রিটিশ শাসনের চেয়ে মুসলমান শাসনই পছন্দ করবে। যাই হোক, এ সম্বন্ধে তাঁর সন্দেহ ছিল না যে মুসলমানেরা এই বিদ্রোহে আংশিক দায়িত্ব নিয়েছিল এবং তাও বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার পরে।
  • (৩) বাউরিং-এর মতে ব্যারাকপুরে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার আগে মুসলিমদের সহযোগিতার কোনো নিদর্শন নেই। এমনকি দিল্লী দখলও আকস্মিকভাবে সংঘটিত হয়েছিল, পূর্ব-পরিকল্পিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দিল্লীর জনসাধারণ ও সিপাহিরা মীরাট থেকে বিদ্রোহী সৈন্যদের আগমনের জন্যও প্রস্তুত ছিল না।
  • (৪) বাংলার মুসলমানদের নিষ্ক্রিয়তা ও পাঞ্জাবী মুসলিমদের সক্রিয় আনুগত্য বাউরিং তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেন। প্রধান প্রধান মুসলমান নবাবদের মধ্যে যাঁরা আনুগত্য দিয়ে সরকারের সেবা করেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজাম, মুর্শিদাবাদের নবাব ও রামপুরের নবাব

উপসংহার :- পরিশেষে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিদ্রোহের নায়কত্ব নিয়ে ছিলেন নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা, অভিজাত মুসলমানেরা নয়। পরবর্তীকালে স্যার সৈয়দ আহমেদ মুসলমানদের একটি পুরুষাক্রমে অনুগত সম্প্রদায় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেন।

(FAQ) মহাবিদ্রোহে মুসলিম সমাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মহাবিদ্রোহ কখন সংঘটিত হয়?

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. অযোধ্যায় মহাবিদ্রোহের নেতা কে ছিলেন?

বেগম হজরত মহল।

৩. বিদ্রোহীরা কাকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করেন?

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ।

৪. মহাবিদ্রোহের সময় বিজনোরে সদর আমিন কে ছিলেন?

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান।

Leave a Comment