হরিনাথ মজুমদার

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার -এর জন্ম, পিতৃপরিচয়, শিক্ষা, বিদ্যালয় স্থাপন, শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ঠাকুর পরিবারের বিরোধিতা, পেশা, গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা প্রকাশ, স্বরচিত গান, রচনা সমগ্ৰ ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

হরিনাথ মজুমদার

জন্ম২২ জুলাই, ১৮৩৩
মৃত্যু১৬ এপ্রিল, ১৮৯৬
পেশাবাউল শিল্পী, লেখক
হরিনাথ মজুমদার

ভূমিকা :- হরিনাথ মজুমদার যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে সমধিক পরিচিত, তিনি ছিলেন একধারে সাহিত্যশিল্পী, সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক, সাধক ও ধর্মবেত্তা।

জন্ম

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালি (বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলা) কাঙাল হরিনাথ জন্মগ্রহণ করেন।

পিতৃপরিচয়

খুব ছোটবেলায় তার পিতা-মাতা লোকান্তরিত হন। তার পিতার নাম হরচন্দ্র মজুমদার।

শিক্ষা

বাল্যকালে কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজি স্কুলে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। কিন্তু অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষায় বিশেষ অগ্রসর হতে পারেননি।

নিজ গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন

গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু, গোপাল স্যান্যাল প্রমুখ বন্ধুদের সাহায্যে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে নিজ গ্রামে একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হরিনাথ মজুমদার। বেশ কিছুদিন তিনি ঐ বিদ্যালয়েই বিনাবেতনে শিক্ষকতার করেন।

বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন

১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তারই সহায়তায় কৃষ্ণনাথ মজুমদার কুমারখালিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।

শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন

সারাজীবন ধরে তিনি অবহেলিত গ্রামবাংলায় শিক্ষাবিস্তারের জন্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের মাধ্যমে আন্দোলন করেছেন।

ঠাকুর পরিবারের বিরোধিতা

হরিনাথ ছিলেন আপোষহীন। তিনি ঠাকুর পরিবারের কৃষক-প্রজা বিরোধী আচরণের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এজন্য একাধিকবার তাঁকে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। কথিত আছে ঠাকুর পরিবারের লাঠিয়াল বাহিনী কাঙাল হরিনাথকে আক্রমণ করলে লালন ফকিরের দলবল তাকে রক্ষা করেছিল।

লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক ছিলেন কাঙাল হরিনাথ

ফকির চাঁদ বাউল

তিনি বাউল সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। সর্বসমক্ষে তিনি ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন।

পেশা

অত্যাচারিত, অসহায়, নিষ্পেষিত কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষার হাতিয়ারস্বরূপ সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন হরিনাথ মজুমদার। অল্পশিক্ষা নিয়েই তিনি দারিদ্র্য ও সচেতনতা বিষয়ক লেখনি সংবাদপত্রে প্রকাশ করতেন।

সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার লেখক

প্রথমে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত -এর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লিখতেন। প্রাচীন সংবাদপত্র হিসেবে বিবেচিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা প্রকাশ

১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কুমারখালি এলাকা থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। মাসিক এ পত্রিকাটি কালক্রমে প্রথমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়।

পত্রিকার বিষয়বস্তু

এই পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হত। কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কেচ্ছা-কাহিনীও প্রকাশিত হত। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও দেশী জমিদারদের অব্যাহত হুমকিও তাকে এই কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

সাময়িক পত্র প্রকাশের প্রেরণা

আশৈশব জমিদার, মহাজন, কুঠিয়াল ও গোরা পল্টনের অত্যাচার ও উৎপীড়ন প্রত্যক্ষ করে হরিনাথের মনে যে প্রতিকার চিন্তা জাগ্ৰত হয় সেখান থেকেই তিনি সাময়িকপত্র প্রকাশের প্রেরণা লাভ করেন।

গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক

কাঙাল হরিনাথ যথার্থ অর্থেই ছিলেন গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক।

বাউল সঙ্গীত

হরিনাথ মজুমদার আধ্যাত্মিক গুরু ও মহান সাধক ফকির লালনের গানের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। ধর্মভাব প্রচারের জন্য ১৮৮০ সালে তিনি নিজস্ব একটি বাউল সঙ্গীতের দল প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি কাঙ্গাল ফকির চাঁদের দল নামে পরিচিতি ছিল।

স্বরচিত গান

তাঁর স্বরচিত গানগুলিও আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর ছিল। তাঁর রচিত বাউল সঙ্গীতগুলি ফকির চাঁদের বাউল সঙ্গীত নামে সুপ্রসিদ্ধ ছিল। ধর্ম সাধনার অঙ্গরূপে তিনি বহু সহজ সুরের গান রচনা করে সদলবলে সেই গান গেয়ে বেড়াতেন। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হ’ল গানটি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।

রচনা সমগ্র

গদ্য এবং পদ্য রচনাতেও হরিনাথ মজুমদার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর মুদ্রিত গ্রন্থের সংখ্যা আঠারোটি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘বিজয় বসন্ত’ (১৮৫৯), ‘চারু-চরিত্র’ (১৮৬৩), ‘কবিতা কৌমুদী’ (১৮৬৬), ‘কবিকল্প’ (১৮৭০), ‘অক্রুর সংবাদ’ (১৮৭৩), ‘চিত্তচপলা’ (১৮৭৬), ‘কাঙ্গাল-ফিকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলী’ (১২৯৩-১৩০০ বঙ্গাব্দ), ‘দক্ষযজ্ঞ’, ‘বিজয়া’, ‘পরমার্থগাথা’, ‘মাতৃমহিমা’, ‘ব্রহ্মাণ্ডবেদ’।

রচিত গানের প্রভাব

হরিনাথের গানগুলি অনেক লেখক, সঙ্গীত বোদ্ধাদের মন জয় করে ও ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অন্যতম।

সুযোগ্য শিষ্য

সাহিত্যকর্মে তার সুযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, দীনেন্দ্রনাথ রায়, জলধর সেন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ পরবর্তী জীবনে যথেষ্ট খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন।

প্রয়াণ

১৬ই এপ্রিল, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই বিখ্যাত লেখক, শিক্ষানুরাগী ও সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন। তার মৃত্যুতে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকা মন্তব্য করেছিল যে, “নদীয়া জেলাবাসী একজন মহান ব্যক্তিত্বকে হারালো”।

শ্রদ্ধার্ঘ্য

২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কুষ্টিয়ায় তার স্মরণে “কাঙাল হরিনাথ জাদুঘর” প্রতিষ্ঠা করে।

উপসংহার :- তার বাস্তুভিটা আজ খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর। স্মৃতি বলতে অবশিষ্ট রয়েছে ঐতিহাসিক ছাপার যন্ত্র, এমএন প্রেস, হাতমেশিন, বাংলা টাইপ ও হরিনাথের কিছু পাণ্ডুলিপি।

(FAQ) হরিনাথ মজুমদার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?

হরিনাথ মজুমদার।

২. কে কেন কাঙাল হরিনাথ নামে পরিচিত?

শৈশবেই পিতামাতাকে হারিয়ে অনাথ হয়ে যান এবং দারিদ্র্য কখনই তাঁকে ছেড়ে যায় নি বলে হরিনাথ মজুমদার কাঙাল হরিনাথ নামে পরিচিত ছিলেন।

Leave a Reply

Translate »