গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা -র সম্পাদক, প্রকাশকাল, পত্রিকার ধরণ, প্রধান কার্যালয়, পত্রিকার মূল্য, নামকরণ, প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, লেখক গোষ্ঠী, পত্রিকায় প্রকাশিত তৎকালীন সমাজচিত্র সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা

ধরণসাপ্তাহিক পত্রিকা
মালিকমথুরানাথ মৈত্রেয়
প্রকাশকহরিনাথ মজুমদার
প্রকাশকাল১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ
ভাষাবাংলা
গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা

ভূমিকা :- ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাভাষায় প্রকাশিত ৩৬টি সংবাদপত্রের মধ্যে ১৯ টিই ছিল কলকাতার বাইরের। এই সব আঞ্চলিক এবং গ্রামীণ সাময়িকপত্র এবং সংবাদপত্রের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল গ্রামবার্তা প্রকাশিকা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার ধরণ

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গ্রামবার্তা প্রকাশিকা ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার প্রকাশকাল

১৮৬৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার দ্বারা এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার সম্পাদক ও কর্ণধার

এই পত্রিকার কর্ণধার এবং সম্পাদক ছিলেন হরিনাথ মজুমদার, যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার প্রধান কার্যালয়

প্রাথমিকভাবে এটি কলকাতার গিরিশ বিদ্যারত্ন প্রেসে ছাপা হয়েছিল। ১৮৬৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মথুরানাথ প্রেসে স্থানান্তরিত হয়। এরপর কুষ্টিয়া থেকে সংবাদ পরিবেশন করা হতো। তবে বর্তমানে আর পত্রিকাটির অস্তিত্ব নেই।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার মূল্য বা দাম

যখন পত্রিকাটি মাসিক ছিল তখন এর দাম ছিল পাঁচ আনা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার নামকরণ

মূলত গ্রাম এবং গ্রামবাসীদের অবস্থা প্রকাশের জন্য এর নাম হয় গ্রামবার্তা প্রকাশিকা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার প্রেক্ষাপট

  • (১) হরিনাথ মজুমদার ব্রিটিশ মালিকানাধীন একটি নীল উৎপাদন কারখানার কর্মচারী ছিলেন। চাকরি ছেড়ে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার একটি ছোট শহর কুমারখালীতে চলে আসেন।
  • (২) তিনি ছাত্রদের পড়াতে শুরু করেন এবং নিজের পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৬৪ সালের জুন-জুলাই মাসের দিকে এই সংবাদপত্রটি পাক্ষিক এবং ১৮৭১ সালের এপ্রিল-মে এর দিকে এটি সাপ্তাহিক হয়ে ওঠে।
  • (৩) ১৮৭৩ সালে, কুমারখালি প্রেসের মালিক মথুরানাথ মৈত্রেয় হরিনাথ মজুমদারকে প্রেসটি দান করেন। প্রেসের মালিক ছিলেন ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের পিতা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার লক্ষ্য

এই পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেব ও জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার উদ্দেশ্য

এই গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য গুলি হল –

  • (১) গ্রামীণ সমাজের নির্যাতিত মানুষদের কথা ও সংবাদ তুলে ধরা।
  • (২) গ্রামসমাজের ওপর জমিদার, মহাজন, নীলকর এবং পুলিশি অত্যাচারের স্বরূপ উন্মোচন করা।
  • (৩) গ্রামোন্নয়ন, গ্রামজীবনের সমস্যা ও সংস্কৃতির নানা দিক গুলিকে তুলে ধরা।
  • (৪) গ্রামসমাজ সম্পর্কে নির্লিপ্ত শহুরে শ্রেনীকে গ্রামীন সমাজ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার লেখক গোষ্ঠী

এই পত্রিকায় দর্শন, সাহিত্য ও অন্য সংবাদ প্রকাশিত হত। প্রখ্যাত লেখক মীর মোশারফ হোসেন, জলধর সেন তাঁদের লেখক জীবনের সূত্রপাত করেছিলেন এই পত্রিকায়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, অক্ষয় কুমার মৈত্র, প্রসন্নকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় লালন ফকিরের গান প্রকাশ

লেখক মীর মোশাররফ হোসেন প্রেস বিল্ডিং-এর অভ্যন্তরে তার বিখ্যাত উপন্যাস বিষাদ সিন্ধুর কিছু অংশ লিখেছিলেন। এই উপন্যাস এবং কুষ্টিয়ার লালনের গান এই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় গ্রামীন মানুষের দাবি প্রকাশ

এই গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় নদী ও জলনিকাশী সংস্কার, ডাক ও পুলিশ সংস্কার ইত্যাদি গ্রামীণ মানুষের দাবিদাওয়া উপস্থাপিত করা হয়েছিল। ডাকঘরে মানি অর্ডারের ব্যবস্থা প্রচলনের কথাও বলা হয়েছিল।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার কৃষকদের পাশে অবস্থান

পাবনা কৃষক বিদ্রোহের সময় কলকাতার সোমপ্রকাশ পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা প্রজাদের পক্ষ নেয়নি, কিন্তু গ্রামবার্তা প্রকাশিকা অসহায় প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা

দেশীয় শিল্পের উন্নতি ও বিকাশের কামনা করেছে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা। এদেশের তন্তুবায় সম্প্রদায়ের দুরবস্থা এবং সরকারের উদাসীনতায় এই পত্রিকা নীরব থাকতে পারেনি।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় প্রকাশিত তৎকালীন সমাজচিত্র

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা থেকে সমসাময়িক কালের সমাজ সম্পর্কে জানা যায়।

(১) সমাজে নারীদের অবস্থা

এই পত্রিকা থেকে সমাজে নারীদের দুরবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। নারীশিক্ষার প্রসারে গ্রামবার্তা প্রকাশিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

(২) জমিদারদের অত্যাচার

এই পত্রিকা থেকে জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের চরম অত্যাচার নির্যাতন ও শোষণের কথা জানা যায়। চড়া হারে রাজস্ব, অতিরিক্ত রাজস্ব, কারণে-অকারণে জমি থেকে উচ্ছেদ ইত্যাদির কথা তুলে ধরে এই পত্রিকা।

(৩) মহাজনদের শোষণ

গ্রামের অসহায় মানুষ কীভাবে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করে সর্বস্বান্ত হচ্ছিল তা এই পত্রিকা থেকে জানা যায়।

(৪) নীলকরদের অত্যাচার

জমিদার, মহাজনদের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের নানা সংবাদ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

(৫) পুলিশের অত্যাচার

গ্রামীণ সমাজে পুলিশি নির্যাতন, থানায় অসহায় দরিদ্র মানুষদের প্রতিকার না পাওয়াপাওয়া এবং ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটদের অত্যাচারের খবর তুলে ধরা হয় এই পত্রিকায়।

(৬) শিক্ষাপ্রসার

সেই সময় নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা ছিল প্রচুর। এর মধ্যে নারীশিক্ষার হার ছিল অত্যন্ত কম প্রায় ছিল না বললেই চলে। পত্রিকায় শিক্ষা প্রসার বিশেষত নারীশিক্ষা প্রসারের উপর গুরুত্ব দিয়ে  বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা

বাংলাদেশ সরকার প্রেসটি সংরক্ষণের জন্য একটি জাদুঘর নির্মাণের জন্য ৬ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে।

উপসংহার :- সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় হরিনাথ ছিলেন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্টের প্রতিবাদে তিনি লেখেন“সংবাদপত্র আমাদিগের ব্যবসা নহে। তবে প্রজা কাঁদে, সেই ক্রন্দন লইয়া রাজদ্বারে ক্রন্দন করি, ভাবি রাজপুরুষগণ শুনিলে, প্রজা আর কাঁদিবে না। তাহাদের কাঁদিবার কারণ দূর হইবে।”

(FAQ) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?

হরিনাথ মজুমদার।

২. গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা কবে প্রকাশিত হয়?

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে।

৩. গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক কাকে বলা হয়? – হরিনাথ মজুমদারকে।

হরিনাথ মজুমদারকে।

Leave a Reply

Translate »