জিওরদানো ব্রুনো

জিওরদানো ব্রুনো প্রসঙ্গে তার জন্ম, শিক্ষা, যাযাবর জীবন, জিওরদানো ব্রুনো কর্তৃক কোপারনিকাসের মতবাদ ব্যাখ্যা, জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদ প্রকাশ, জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদ, গ্ৰন্থ রচনা, জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদের প্রতি জনগণের আকর্ষণ, চার্চের সঙ্গে জিওরদানো ব্রুনোর বিরোধ ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

জিওরদানো ব্রুনো

ঐতিহাসিক চরিত্রজিওরদানো ব্রুনো
দেশইতালি
পরিচিতিদার্শনিক, জ্যোতির্বিদ
জন্ম১৫৪৮ খ্রি
গুরুকোপারনিকাস
গ্ৰন্থDe L’Infinito Universo et Mondi
মৃত্যু১৭ ফেব্রুয়ারি ১৬০০ খ্রি
জিওরদানো ব্রুনো

ভূমিকা :- পণ্ডিত রম্যা রঁলা বলেছেন, “কিছু মৃত ব্যক্তিত্ব জীবিত মানুষের তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত।” জিওরদানো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০ খ্রি.) ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব।

জিওরদানো ব্রুনোর পরিচিতি

তিনি ছিলেন একজন ইতালীয় দার্শনিক, ধর্মযাজক ও জ্যোতির্বিদ।

জিওরদানো ব্রুনোর প্রথম জীবন

ব্রুনোর প্রথম জীবনের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) জন্ম

জিওরদানো ব্রুনোর জন্ম হয়েছিল এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে যখন একদিকে মধ্যযুগের ধর্মীয় গোঁড়ামি অস্তিত্বশীল, আবার অন্যদিকে মুক্তিভিত্তিক আধুনিক যুগ তার পথচলার জন্য প্রস্তুত। এরূপ যুগসন্ধিক্ষণে ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রুনো ইতালির নেপলসের নিকটবর্তী নোলা নামে এক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

(২) জিওরদানো ব্রুনোর শিক্ষা

তিনি নেপলসের সেন্ট ডোমিনিকান স্কুলে পড়াশোনার সময় টমাস অ্যাকুইনাস নামে এক শিক্ষকের প্রভাবে ডোমিনিকান ধর্মযাজক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

(২) যাযাবর জীবন

তীব্র চিন্তাশীল কিন্তু মেজাজি ব্রুনো ধর্মযাজক হিসেবে যে মঠে যোগদান করেন, মঠের কর্তাদের সঙ্গে বিরোধের ফলে কিছুদিনের মধ্যেই সেই মঠ ত্যাগ করেন। পারিবারিক জীবনযাপনের কোনো চেষ্টা না করে এরপর তিনি সত্য বক্তব্য প্রচারের উদ্দেশ্যে ইউরোপের সর্বত্র যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ান।

জিওরদানো ব্রুনো কর্তৃক কোপারনিকাসের মতবাদ ব্যাখ্যা

কোপারনিকাসের জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত মতবাদকে সর্বাধিক জনপ্রিয় করে তোলেন তাঁর না-দেখা ভাবশিষ্য জিওরদানো ব্রুনো। উভয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত মতবাদ এক হলেও যেখানে কোপারনিকাস ছিলেন অন্তর্মুখী ও শান্ত স্বভাবের, সেখানে জিওরদানো ব্রুনো ছিলেন অনেকটাই বহিমুখী এবং অপ্রিয় স্পষ্টবাদী।

জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদ প্রকাশ

তাঁর মতবাদ নিয়ে তিনি একের পর এক বই প্রকাশ করতে থাকেন এবং বিভিন্ন স্থানে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। ইউরোপের বহু পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, ধনী ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যে মুগ্ধ হন। কিন্তু অপ্রিয় স্পষ্টবাদিতার ফলে তাঁর শত্রু-সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।

জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদ

কোপারনিকাসের মৃত্যুর পরবর্তীকালে তাঁর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠন-সংক্রান্ত তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তোলেন জিওরদানো ব্রুনো। তিনি প্রচার করেন যে, মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ সুষম ও অসীম নয়।

জিওরদানো ব্রুনোর গ্ৰন্থ রচনা

তিনি ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে De L’Infinito Universo et Mondi (অনন্ত মহাবিশ্ব ও বহুবিশ্ব নিয়ে) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে তিনি অনন্ত সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা ব্যক্ত করেন এবং বলেন যে, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়, আবার মহাবিশ্বের সংখ্যাও একটিমাত্র নয়।

জিওরদানো ব্রুনোর মতবাদের প্রতি জনগণের আকর্ষণ

ব্রুনোর প্রচারের ফলে কোপারনিকাসের মৃত্যুর দেড়শো বছর পর তাঁর মতবাদ সাধারণ মানুষ ও বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এককথায় ব্রুনো মানুষকে কোপারনিকাসের তত্ত্ব সম্পর্কে চিন্তা ও তর্ক করতে বাধ্য করান।

চার্চের সঙ্গে জিওরদানো ব্রুনোর বিরোধ

অচিরেই চার্চের সঙ্গে জিওরদানো ব্রুনোর বিরোধ তৈরি হয়।

(১) চার্চের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান

ব্রুনোর প্রচারকে খ্রিস্টান চার্চ তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচার হিসেবে দেখে এবং ব্রুনোকে তাঁর প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ব্রুনো চার্চের নির্দেশে কর্ণপাত না করে বরং চার্চের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও প্রচার চালাতে শুরু করেন। এতে চার্চ যারপরনাই ক্ষুখ হয়।

(২) জিওরদানো ব্রুনোর বিচার

ব্রুনো ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে ইতালির ভেনিসে প্রবেশ করলে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে রোমান ধর্ম-আদালত ইনকুইজিশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে খ্রিস্টান চার্চ তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনে এবং বিচারের নামে প্রহসন করে তাঁকে অভিযুক্ত করে।

জিওরদানো ব্রুনোর হত্যা

শেষপর্যন্ত চার্চের নির্দেশে জিওরদানো ব্রুনোকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ব্রুনোর নৃশংস হত্যার ঘটনায় ইউরোপের জ্ঞানীগুণী পণ্ডিতমহল স্তম্ভিত ও শিহরিত হয়ে ওঠে।

জিওরদানো ব্রুনোর ব্রোঞ্জমূর্তি

ইতালির ক্যাম্পো ডি ফিওরি নামক যে স্থানে ব্রুনোকে হত্যা করা হয় সেখানে এখন ব্রুনোর দীর্ঘ ব্রোঞ্জমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জিওরদানো ব্রুনোর মৃত্যু সম্পর্কে এর্নস্ট ক্যাসিরের মন্তব্য

প্রতিবাদী ব্রুনোর এই ভাবে শহিদের মৃত্যু বরণকে জার্মান দার্শনিক এর্নস্ট ক্যাসিরের চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রথম সোপান বলে অভিহিত করেছেন।

উপসংহার :- বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবাদ নিয়ে ব্রুনো যেসব চিন্তাভাবনা করেছিলেন সেগুলি বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই বলা হয় যে, ব্রুনো অসময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরও অনেক পরে জন্মগ্রহণ করলে বিশ্ব তাঁর কাছ থেকে আরও অনেক কিছুই পেত।

(FAQ) জিওরদানো ব্রুনো সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জিওরদানো ব্রুনো কে ছিলেন?

ইতালির একজন দার্শনিক, ধর্মযাজক ও জ্যোতির্বিদ।

২. জিওরদানো ব্রুনো কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

ইতালির নেপালস এর নিকটবর্তী নোলা শহরে।

৩. জিওরদানো ব্রুনো কার শিষ্য ছিলেন?

কোপার্নিকাস।

৪. জিওরদানো ব্রুনো রচিত বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কি?

De L’Infinito Universo et Mondi

Leave a Comment