ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব

ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে ফিরোজের গুনাবলি, আকবরের সঙ্গে তুলনার অযৌক্তিকতা, উদারতা, জনকল্যাণমুখী নীতি, অবক্ষয়শীল যুগের প্রতিনিধি, ধর্মান্ধতা, সংগঠক হিসেবে ব্যর্থতা, বিদ্রোহ দমনে অক্ষমতা ও অযোগ্য সমরনায়ক সম্পর্কে জানবো।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব
সুলতানফিরোজ শাহ তুঘলক
প্রশংসাআফিফ, বরণী
তুলনাআকবর
দার-উল-শাফাবিনামূল্যে চিকিৎসা
ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব

ভূমিকা :- সমকালীন ঐতিহাসিক আফিফ ও বরণী সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন নীতির উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তাকে ন্যায়পরায়ণ, সদাশয় লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফিরোজ শাহের এইরূপ প্রশংসার ওপর নির্ভর করে স্যার হেনরী এলিয়ট তাকে “সুলতানি যুগের আকবর” বলে মন্তব্য করেছেন।

ফিরোজের গুণাবলী

  • (১) ফিরোজের ব্যক্তিগত চরিত্রে প্রশংসনীয় দিক নিশ্চয় ছিল। তার পূর্ববর্তী সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের মত তিনি নিষ্ঠুর, উগ্র স্বভাবের লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন উদারচেতা, নরম স্বভাবের লোক।
  • (২) মহম্মদের মত খামখেয়ালী ও উদ্ভাবনী নীতির প্রতি তিনি আসক্ত ছিলেন না। মুসলিমদের প্রতি তার দরদ ছিল আন্তরিক। মুসলমানের রক্তপাত তিনি পছন্দ করতেন না। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়, দয়াশীল।

আকবরের সঙ্গে তুলনার অযৌক্তিকতা

  • (১) আকবরের সঙ্গে ফিরোজ শাহের তুলনা অযৌক্তিক। আকবরের মত কোনো প্রগতিশীল, মৌলিক জাতীয় নীতি গ্রহণে ফিরোজ অপারগ ছিলেন। আকবর যেভাবে হিন্দু-মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি সমদর্শী নীতি নেন, ফিরোজ তার থেকে দূরে ছিলেন।
  • (২) আকবরের যেরূপ সাংগঠনিক প্রতিভা ছিল, ফিরোজের মধ্যে তার কিছুই ছিল না। আকবর যেভাবে তার সামরিক দক্ষতায় এক সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করেন ফিরোজ তার ধারে-কাছে আসতে পারেন নি। ভিনসেন্ট স্মিথও আকবরের সঙ্গে ফিরোজের তুলনা অবাস্তব বলেছেন।

উদারতা

ফিরোজের ব্যক্তিগত চরিত্রে বহু গুণ ছিল সন্দেহ নেই। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলমান, প্রজাহিতৈষী সুলতান। তিনি যতদূর সম্ভব কম রক্তপাত করে তার শাসন চালান।

জনকল্যাণমুখী নীতি

  • (১) দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য তিনি দেওয়াই-ই-খয়রাত, বিনামুল্যে চিকিৎসার জন্য দার-উল-শাফা স্থাপন করেন। তিনি কৃষির উন্নতির জন্য সেচখাল খোদাই করেন এবং কৃষকদের ওপর করের চাপ কমান।
  • (২) তিনি স্থানীয় ও অন্তঃশুল্ক লোপ করে মাল চলাচলের সুবিধা করেন। এর ফলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। তিনি বিদ্বান ও পণ্ডিতদের সমাদর করতেন। আফিফ, বরণী প্রমুখ পণ্ডিতদের তিনি দরবারে স্থান দেন। তার মানবতাবাদ ছিল খাদহীন।

অবক্ষয়শীল যুগের প্রতিনিধি

ফিরোজের ব্যক্তিগত গুণ যাই থাক, তার মৌলিক, প্রগতিশীল, সৃজনশীল দৃষ্টি ছিল না। তিনি ছিলেন তার অবক্ষয়শীল যুগের প্রতিনিধি। তিনি রাষ্ট্রকে মজবুত ও শক্তিশালী করার জন্য কোন উদ্যম দেখান নি। স্থিতাবস্থা বহাল থাকলেই তিনি খুশী হতেন।

ধর্মান্ধতা

  • (১) রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনি উলেমা ও অভিজাত শ্রেণীকে তোষণ করে চলতেন। উলেমাদের প্রভাবে তিনি আলাউদ্দিন ও মহম্মদের আমলের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আদর্শ থেকে সরে আসেন। তিনি রাষ্ট্রকে ইসলামীয় ধাচে গড়ার চেষ্টা করেন।
  • (২) এর ফলে রাজ্যশাসন ব্যবস্থায় উলেমারা হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। তাঁর রাজত্বের শেষ ১৫ বছর তিনি কিছুটা ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাবে পড়েন। তিনি অনেক ক্ষেত্রে অ-মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন।

সংগঠক হিসেবে ব্যর্থতা

ফিরোজ রাষ্ট্র সংগঠক হিসেবে ব্যর্থ ছিলেন। সাময়িকভাবে তার প্রজাহিতৈষণা ও দয়াশীলতা জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী দুর্নীতিপরায়ণ কায়েমী স্বার্থগুলিকে তিনি দমনে অক্ষমতা দেখান। এজন্য রাষ্ট্রকে মজবুত ও শক্তিশালী করার স্থলে তিনি দুর্বল করে ফেলেন।

নমনীয় আপোষ নীতি

তার নমনীয় আপোষ নীতির ফলে কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও স্বার্থপরতা দ্রুত বাড়ে। ফিরোজ তা দেখে অথবা জেনে ইচ্ছাকৃত উদাসীন থাকতেন। তার মত দুর্বল শাসকের পক্ষে এই দুর্নীতির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।

শাসন ব্যবস্থায় দুর্নীতি

ফিরোজের গুণগ্রাহী ঐতিহাসিক আফিফ বলেছেন যে,

  • (১) তাতার খান নামে কর্মচারী টাকশালের অধ্যক্ষ হিসেবে মুদ্রায় রূপার ভাগ কম দিত। ফিরোজ তা জেনে চুপ করে থাকেন।
  • (২) সরকারী কারখানায় দুর্নীতি দমনে তিনি ব্যবস্থা নেন নি।
  • (৩) রাজস্ব কর্মচারীরা তহবিল তছরূপ করলেও তিনি প্রতিকার করেননি।
  • (৪) সেনাদলের প্রধান দেওয়ান ই- আরজ-ইমাদ-উল-মুলক বশির দুর্নীতি দ্বারা ১৩ কোটি মুদ্রা জমা করেন। এই মুদ্রার পরিমাণ ছিল ফিরোজের সমগ্র দুই বছরের রাজস্বের সমান।
  • (৫) কৃষকরা যেমন গোলায় শস্য মজুত রাখে, বশির মাটিতে থাকা বাধাই কূপ খুঁড়ে এই অর্থ মজুত করেন। ফিরোজ এই দুর্নীতির কথা জানলেও তার প্রতিবিধান করেন নি। তার নীতি ছিল “ঘুমন্ত কুকুরকে খোঁচা দিয়ে না জাগান”। এই তোষণ নীতি ও দুর্বলতার জন্য সর্বস্তরে ভাঙন দেখা দেয়।

সেনাদল ধ্বংস

  • (১) ফিরোজের শাসন নীতির দুর্বলতার অপর দিক ছিল যে, তিনি সুলতানি সেনাদলকে ধ্বংস করে ফেলেন। দিল্লী সুলতানির মেরুদণ্ড ছিল এই সেনাদল। ফিরোজ জাগীর প্রথা ও বংশানুক্রমিক নিয়োগ প্রথা দ্বারা এই সেনাদলকে নষ্ট করে ফেলেন।
  • (২) এর ফলে তাকে মালিক ও আমীরদের প্রাদেশিক সামন্ত সেনার ওপর নির্ভর করতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে ফিরোজের রাজত্বকালে কোন বৈদেশিক আক্রমণ ঘটেনি। নতুবা সুলতানি সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এই দুর্বলতার জন্য সাম্রাজ্য ভেঙে যায়।

জাগীরদারী প্রথা প্রবর্তন

ফিরোজ জাগীরদারী প্রথা প্রবর্তন করে কর্মচারীদের দুর্নীতিযুক্ত করে ফেলেন। তিনি অসংখ্য ক্রীতদাস ক্রয় করেন। এদের ভরণ-পোষণের জন্য তাঁর বহু অর্থ ব্যয় হয়।

বিদ্রোহ দমনে অক্ষমতা

সুলতানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যে প্রদেশগুলি বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে সেই প্রদেশগুলিকে তিনি দমন করে কেন্দ্রের অধীনে আনার জন্য কোনো আন্তরিক চেষ্টা করেন নি। একমাত্র সিন্ধুদেশ ছিল তার ব্যতিক্রম।

অযোগ্য সমরনায়ক

  • (১) সমরনায়ক হিসেবে ফিরোজ ছিলেন অযোগ্য। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি বশত মুসলমানের রক্তপাতে অনিচ্ছুক ছিলেন। আফিফের মতে, মুসলিম রমনীদের অসম্মান ঘটার ভয়ে তিনি বাংলার বিদ্রোহী নেতা হাজি ইলিয়াসকে দমন না করে দিল্লী ফিরে যান।
  • (২) এর ফলে বাংলা সুলতানী সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, ফিরোজ সামরিক দুর্বলতাকে চাপা দেওয়ার জন্যে ধর্মীয় অজুহাত দেখান।

উপসংহার :- ফিরোজ শাহ দয়ালু ও প্রজাহিতৈষী সুলতান ছিলেন একথা সত্য, কিন্তু মধ্য যুগে সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য যে দৃঢ়তার দরকার ছিল তার অভাবে তিনি সাম্রাজ্যে ভাঙন ঘটান।

(FAQ) ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দিল্লীর কোন সুলতান দয়ালু ও প্রজাহিতৈষী ছিলেন?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

২. কোন সুলতান অসংখ্য ক্রীতদাস ক্রয় করেন?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

৩. সুলতানী যুগের আকবর কাকে বলা হয়?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

Leave a Comment