স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক সংগঠন

স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক সংগঠন প্রসঙ্গে ভারতের করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা, আর্থিক সমস্যার কারণ, সার্বিক সংকটের মুখোমুখি ভারত ও ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গুলি সম্পর্কে জানবো।

স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক সংগঠন

ঐতিহাসিক ঘটনাস্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক সংগঠন
স্বাধীনতা লাভ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ খ্রি
প্রথম প্রধানমন্ত্রীজওহরলাল নেহরু
প্রাকৃতিক দুর্যোগ১৯৫০ খ্রি
যোজনা কমিশন১৯৫০ খ্রি
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা১৯৫১ খ্রি
স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক সংগঠন

ভূমিকা :- ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের পর ভারত প্রথম থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। গান্ধিজি যথার্থই বলেছিলেন যে, স্বাধীনতা লাভের পর “যে এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে সে এক কাটার মুকুট পরবে।”

ভারতের করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা

দেশভাগ, উদ্‌বাস্তু সমস্যা, দারিদ্রা প্রভৃতি সমস্যায় জীর্ণ সদ্য-স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই করুণ ছিল। এজন্য ড. এস. গোপাল স্বাধীনতার ঊষালগ্নের এই সংকটকালকে ‘বিষণ্ণ প্রভাত’ বলে অভিহিত করেছেন।

অর্থনৈতিক সমস্যা

স্বাধীন ভারতে নানাবিধ সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে অর্থনৈতিক সমস্যা। স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাধ্যমে ভারতবাসী রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পায় নি। দেশবাসীর দারিদ্র্য, অনাহার, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, চিকিৎসার অভাব প্রভৃতি বিষয়গুলি ভারতের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে। বিভিন্ন কারণে ভারতের এই আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন –

(১) খাদ্যসংকট

দেশভাগের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে ভারতের খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পেলে সমস্যা আরও তীব্র হয়। এরই মধ্যে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক উদ্‌বাস্তু ভারতে আশ্রয় নিলে খাদ্যসংকট প্রায় বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছোয়।

(২) বেকারত্ব

দেশভাগের ফলে কাঁচামাল উৎপাদনকারী অধিকাংশ কৃষিজমি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে ভারতের শিল্প-কারখানাগুলি কাঁচামালের অভাবে ধুঁকতে থাকে। ফলে ভারতীয় শিল্পে মন্দা দেখা দেয় এবং সর্বত্র বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া, বিপুল সংখ্যক উদ্‌বাস্তু আগমনের ফলে বেকার সমস্যা তীব্রতর হয়।

(৩) শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাব

ভারতীয়দের অর্থনৈতিক দরিদ্রতার ফলে একদিকে সমাজ যেমন অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে, তেমনি অন্যদিকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুব্যবস্থার অভাব সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শিক্ষাগ্রহণ ও সুচিকিৎসার সুবিধাপ্রাপ্তি থেকে দূরে সরে থাকতে বাধ্য হয়।

(৪) আর্থিক দুরবস্থা

ভারতে দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই সময় ব্রিটিশ শক্তি ভারতে সীমাহীন অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে এদেশকে নিঃস্ব করে দেয়। ফলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই আর্থিক ব্যবস্থা চরম আকার ধারণ করে।

(৫) দেশভাগের ফলশ্রুতি

দেশভাগের ফলে এই সংকট আরও বৃদ্ধি পায়। পাটকলগুলি ভারতের অংশে (কলকাতা সন্নিকটে) পড়লেও পাট উৎপাদনের কৃষিজমিগুলি পূর্ববঙ্গে পড়ে। বস্ত্র কারখানাগুলি ভরতের আমেদাবাদ এ বোম্বাইয়ে পড়লেও তুলা উৎপাদক অঞ্চলগুলি পাকিস্তানে পড়ে। খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে ভারতে খাদ্যসংকট দেখা দেয়।

(৬) উদ্‌বাস্তু সমস্যা

দেশভাগের ফলে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্‌বাস্তু হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে ভারতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, কর্মসংস্থান প্রভৃতির আরও অভাব দেখা দেয়। এভাবে ভারত এক গভীর অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার হয়।

সার্বিক সংকটের মুখোমুখি ভারত

অর্থনৈতিক সমস্যা সদ্য-স্বাধীন ভারতকে এক সার্বিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এজন্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও বহু ভারতীয়ের ধারণা হয় যে, এই স্বাধীনতা মিথ্যা, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়!’ তবে ড. অমলেশ ত্রিপাঠী মনে করেন যে “এ আজাদি একেবারে ঝুটা না হলেও জন্মসূত্রে প্রতিবন্ধী।”

ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

স্বাধীন ভারতের আর্থিক সমস্যা দূরীকরণে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্ৰহণ করা হয়। যেমন –

(১) পরিকল্পনা কমিশন

অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে শামিল করার উদ্দেশ্যে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু সক্রিয় উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতীয় পরিকল্পনা কমিশন’ বা ‘যোজনা কমিশন’ গঠিত হয়। এর ফলে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে আরম্ভ করে।

(২) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে ভারতে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর ফলে অতি দ্রুত ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে।

(৩) নমনীয়তা

ভারতের পরিকল্পিত অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর নমনীয়তা। ভারতের পরিকল্পিত অর্থনীতিতে প্রয়োজনভিত্তিক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। যেমন – প্রথম পরিকল্পনায় কৃষি এবং দ্বিতীয় পরিকল্পনায় ভারী শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

উপসংহার :- এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর (শাসনকাল ১৯৪৭-১৯৬৪ খ্রি.) সক্রিয় উদ্যোগে ভারতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে।

(FAQ) বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তর সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতের স্বাধীনতার ঊষালগ্নের সংকটকালকে ‘বিষন্ন প্রভাত’ বলে অভিহিত করেছেন কে?

এ এস গোপাল।

২. প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরুর শাসনকাল কত ছিল?

১৯৪৭-৬৪ খ্রিস্টাব্দ।

৩. স্বাধীন ভারতের সব থেকে বড় সমস্যা কি কি ছিল?

আর্থিক সংকট ও উদ্বাস্তু সমস্যা।

৪. ভারতীয় পরিকল্পনা কমিশন বা যোজনা কমিশন কখন কার উদ্যোগে গঠিত হয়?

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে।

৫. ভারতে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয় কোন বছর থেকে?

১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment