অটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

অটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তুর্কি ভাষার চর্চা, হস্তলিপি বিদ্যা, সাহিত্য, স্থাপত্য ও চিত্রকলা, ললিত কলা, জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি, ধর্ম সহিষ্ণুতা ও সাম্রাজ্যের পতন সম্পর্কে জানবো।

অটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

ঐতিহাসিক ঘটনাঅটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি
হস্তলিপিবিদ্যাদিওয়ামী
তুর্কি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতাতেভফিক ফিকরেট
শ্রেষ্ঠ স্থপতিমিরার সিনান
মিদ্দাহশ্রুতিনাটক
পেলিভানকুস্তিগীর
অটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

ভূমিকা :- বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ভাষাভাষী গোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে বিশাল অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অটোমান সাম্রাজ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছিল। তবে সাম্রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ইসলামীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য ছিল। অটোমান সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়গুলি কোনো না কোনোভাবে আধুনিক যুগেও প্রচলিত আছে। তবে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলিতেও বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে।

অটোমান সাম্রাজ্যে তুর্কি ভাষার চর্চা

  • (১) অটোমান শাসনকালে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা থেকে তুর্কি ভাষার উৎপত্তি হয়। এই ভাষায় ব্যাকরণের ক্ষেত্রে তুর্কি রীতি এবং শব্দাভিধানের ক্ষেত্রে আরবি ভাষার বেশি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘ এক সহস্রাব্দের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক তুর্কি ভাষায় লিখন বিদ্যার বিকাশ ঘটে।
  • (২) আরবি লিপির ভিত্তিতে অলংকারবহুল অক্ষরের মাধ্যমে তুর্কি ভাষায় লেখার প্রথা চালু হয়। তুর্কিদের নিজস্ব ভাষা ও লিপির উদ্ভবের পর সরকারিভাবে এই ভাষা ও লিপি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যে আন্দোলনও গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তুর্কি প্রশাসনে এই ভাষার ব্যবহার শুরু হয়।

অটোমান সাম্রাজ্যে হস্তলিপিবিদ্যা

  • (১) অটোমান শাসনকালে হস্তলিপিবিদ্যার যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে। হস্তলিপিবিদ্যার উৎকর্ষের ক্ষেত্রে বাগদাদের হস্তলিপি-বিশারদ ইয়াকুত আল-মুসতাসিমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খ্রিস্টীয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে হৌসম রৌমী কর্তৃক উদ্ভাবিত আরবীয় হস্তলিপিবিদ্যায় ‘দিওয়ানী’ নামে অটোমান রীতি গড়ে ওঠে।
  • (২) ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান সুলেমানের আমলে এই রীতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে। অটোমান সম্রাটদের শাসনকালে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য হস্তলিপিবিদগণ ছিলেন সইদ কাশিম গুবারি, সেহ হামদুল্লা, আহমেদ কারাহিসারি, হাফিজ ওসমান প্রমুখ।

অটোমান সাম্রাজ্যের সাহিত্য

অটোমান সম্রাটদের আমলে তুর্কি ভাষায় কাব্যচর্চা ও গদ্যসাহিত্য রচনা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। যেমন –

(১) কাব্যচর্চা

তুর্কি রাজদরবার ছিল কাব্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুলেমান ও পরবর্তী সুলতানরা তুর্কি সাহিত্যের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তেভফিক ফিকরেট। গ্রুপদি যুগের পারসিক কাব্যধারা তুর্কি কাব্যচর্চাকে বিশেষ প্রভাবিত করেছিল। সুলতান সুলেমান নিজেও পারসি ও তুর্কি ভাষায় সুন্দর কবিতা লিখতেন। তাঁর প্রিয় পুত্র মেহমেদের মৃত্যুতে (১৫৪৩ খ্রি.) তিনি এক মর্মস্পর্শী শোকগাথা রচনা করেন। তাঁর কিছু কিছু কবিতা তুর্কি ভাষায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে।

(২) গদ্যসাহিত্য

এই সময় সর্বাধিক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় তুর্কি গদ্যসাহিত্যে। তুর্কি গদ্যসাহিত্যে প্রথমদিকে আরবি সাহিত্যের বেশি প্রভাব থাকলেও উনিশ শতক থেকে এতে ইউরোপীয় সাহিত্যের, বিশেষ করে ফরাসি সাহিত্যের প্রভাব পড়ে। তুর্কি সাহিত্যিক সেমসেটিন সামি-র উপন্যাস ‘তাসুক-উ-তালাত ভি ফিৎনাৎ’ তুর্কি ভাষায় প্রথম বিখ্যাত উপন্যাস হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তুর্কি গদ্যসাহিত্যের অপর জনপ্রিয় লেখকরা ছিলেন আহমেট মিথটি ও হালিত জিয়া উসাক্লিগিল।

অটোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্য ও চিত্রকলা

অটোমান শাসনকালে স্থাপত্যকর্ম, চিত্রকলা ও অন্যান্য কয়েকটি শিল্পে উৎকর্ষ এসেছিল। যেমন  –

(ক) স্থাপত্য ও ভাস্কর্য

  • (১) পূর্বতন সেলজুক স্থাপত্য রীতির দ্বারা আটামান স্থাপত্যরীতি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। অটোমান স্থাপত্যের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ষোড়শ শতকের সুবিশাল অট্টালিকাগুলিতে। এই যুগের শ্রেষ্ঠ স্থপতি ছিলেন সুলেমানের আমলের মিরার সিনান । তিনি সাম্রাজ্য জুড়ে তিন শতাধিক অট্টালিকা নির্মাণ করেন।
  • (২) তাঁর তত্ত্বাবধানে নির্মিত ইস্তানবুলের সুবিখ্যাত সুলেমানীয় মসজিদ এবং অ্যাড্রিয়ানোপলের সেলিমিয়া মসজিদ তাঁর শিল্পদক্ষতার অনন্য স্বাক্ষর বহন করে। মিরার সিনানের ছাত্র সেড়েফার মেহমেট আগা সপ্তদশ শতকে নীল মসজিদটি নির্মাণ করেন। এটি ধ্রুপদি অটোমান স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়।
  • (৩) সুলতান সুলেমান কনস্ট্যান্টিনোপলে বেশ কিছু মসজিদ, সেতু, প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মাণের একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করে এই নগরীকে ইসলামীয় সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেন। এ ছাড়া তিনি মক্কা, দামাস্কাস, বাগদাদ-সহ ইসলামি দুনিয়ার নগরীগুলিকে স্থাপত্যকর্মের দ্বারা সাজিয়ে তোলেন।

(খ) চিত্রকলা

  • (১) এই যুগে চিত্রশিল্পেরও যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল। অটোমান সাম্রাজ্যে পঞ্চদশ শতকে নাক্কাসানি-ই-রুম নামে গ্রিক চিত্রকরদের একটি অ্যাকাডেমি এবং পরবর্তীকালে পারসিক চিত্রকরদের একটি অ্যাকাডেমি গড়ে ওঠে। বাস্তব বিষয়ের উপর তারা বেশি গুরুত্ব দিতেন।
  • (২) অটোমান চিত্রশিল্পের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল সুলতান সুলেমানের চিত্র, বিভিন্ন শাসকদের চিত্র, সুফি সাধকদের চিত্র ইত্যাদি। নাক্কাস ওসমান, মাট্রকসি নাসুহ, আলি সেলেবি, মোল্লা কাশিম, হাসান পাশা প্রমুখ ছিলেন এই যুগের উল্লেখযোগ্য চিত্রশিল্পী।

অটোমান সাম্রাজ্যের ললিতকলা

সংগীত, নৃত্য, নাটক, ক্রীড়া প্রভৃতির চর্চা অটোমান সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। যেমন –

(১) সংগীত

অটোমান রাজদরবারে বিশেষ ধরনের সংগীতের ধারার বিকাশ ঘটেছিল। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীতে ব্যান্ড-সহ সংগীতের প্রচলন ছিল।

(২) নৃত্য

সুলতানদের হারেমে মহিলা ও শিশুদের নৃত্য অটোমান সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ ছিল।

(৩) নাটক

মিদ্দাহ্ নামে শ্রুতিনাটক এবং ছায়া থিয়েটারের প্রচলনও ছিল। শ্রুতিনাটকের অভিনেতারা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে নাটক পরিবেশন করত।

(৪) ক্রীড়া

অটোমান সমাজে বিভিন্ন খেলাধুলার প্রচলন ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল গায়ে অলিভ তেল মেখে কুস্তি করা। এই কুস্তিগিররা পেলিভান নামে পরিচিত ছিল। ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে থ্রেসে শুরু হয় ধারাবাহিক দৌড় প্রতিযোগিতা যা দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল। এ ছাড়া জেরিড নামে বর্শা ছোঁড়ার খেলা প্রচলিত ছিল।

অটোমান সাম্রাজ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি

অটোমান সাম্রাজ্যে বহু বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার ফলে দেশে শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটে। এই সময় সাম্রাজ্যে জ্ঞান ও দর্শনের বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। ইসলামীয় সুবর্ণ যুগের বিকাশে অটোমান সাম্রাজ্যের শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যেমন –

(১) জ্যোতির্বিদ্যা

বিজ্ঞানের যেসব শাখায় এই সময়ে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল জ্যোতির্বিদ্যা। তুর্কি পণ্ডিত নাসির আল-দিন-তুসি বুধ গ্রহের যে চিত্র পরিকল্পনা করেছিলেন তাকে আরও যথার্থরূপে তুলে ধরেন তুর্কি জ্যোতির্বিদ কুস্কু। এই সময় তুর্কি জ্যোতির্বিদরা সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কথাও বলেন।

(২) চিকিৎসাবিদ্যা

এই যুগে চিকিৎসাবিদ্যারও অগ্রগতি ঘটে। সেরাফেদ্দিন সাবুনকুওগ্লু এই যুগে চিকিৎসা বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তুর্কি ভাষায় ‘Imperial Surgery’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যেখানে অসংখ্য চিত্র-সহ অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন পদ্ধতির আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি অন্যান্য বিষয়েও কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন।

(৩) আলোকবিদ্যা

এই যুগে আলোকবিদ্যার উপর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচিত হয় যেখানে দৃষ্টি, প্রতিবিম্ব, বিভিন্ন আকারের লেন্স প্রভৃতি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।

অটোমান সাম্রাজ্যে ধর্মসহিষ্ণুতা

অটোমান সম্রাটরা তাঁদের সাম্রাজ্যে ধর্মসহিষুতার নীতি গ্রহণ করেন। বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করলেও সুলতানরা নিজেদের মুসলিম ধর্ম অন্য ধর্মের প্রজাদের প্রতি জোর করে চাপিয়ে দেন নি।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতন

খ্রিস্টান ইউরোপ, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের আক্রমণ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনকে অনিবার্য করে তোলে। শেষপর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের জাতীয়তাবাদী নেতা কামাল আতাতুর্ক বা কামাল পাশা সর্বশেষ অটোমান সুলতান ষষ্ঠ মহম্মদকে (১৯১৮-১৯২২ খ্রি.) সিংহাসনচ্যুত করে (১লা নভেম্বর, ১৯২২ খ্রি.) তুরস্কে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। এভাবে দীর্ঘ ৬২৩ বছরের (১২৯৯-১৯২২ খ্রি.) প্রাচীন তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

উপসংহার :- সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে সুলতান সুলেমানের রাজত্বকালে অটোমান সাম্রাজ্য সুবর্ণ যুগের প্রবেশ করেছিল। তিনি পূর্বতন কনস্ট্যান্টিনোপল নগরীকে আধুনিক ইস্তাম্বুল নগরীতে পরিণত করে তুর্কি ও ইসলামী দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

(FAQ) অটোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালে কোন ভাষার উৎপত্তি হয়?

তুর্কি।

২. আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

তেভফিক ফিকরেট।

৩. তুর্কি ভাষায় প্রথম বিখ্যাত উপন্যাসের নাম কি?

‘তাসুক-উ-তালাত ভি ফিৎনাৎ’।

৪. অটোমান সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ স্থপতি কে ছিলেন?

মিরার সিনান।

Leave a Comment