আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব

আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আকবর, জাতীয় চেতনা সঞ্চার, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ, উদারনীতি, পদাবলী সাহিত্যের বিকাশ, জনহিতকর কাজ, স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা, বাঙালি জাতির সর্বজনীন আতিথ্য লাভ ও বঙ্গদেশে নবজাগরণের সূচনা সম্পর্কে জানবো।

আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব

বিষয়আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব
সুলতানআলাউদ্দিন হুসেন শাহ
সময়কাল১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি:
বংশহুসেন শাহী বংশ
উত্তরসূরিনসরৎ শাহ
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব

ভূমিকা :- আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বঙ্গদেশের এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিংহাসন আরোহণ করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। অতঃপর তিনি বিভিন্ন রাজ্য নিজের রাজ্যভুক্ত করেন এবং দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর অপ্রতিহত ক্ষমতায় বঙ্গদেশ শাসন করেন। এটা কম কৃতিত্বের পরিচায়ক নয়।

নতুন দিগন্ত

বলা হয় তাঁর বঙ্গদেশের সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে The Augustan age of Lakhnauti began with the establishment of the power of the Hussain Shahi dynasty towards the close of the 15th Century’

গৌরবময় অধ্যায়

বঙ্গদেশের ইতিহাসে আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল শান্তি, সমৃদ্ধি, রাজ্যজয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক গৌরবময় অধ্যায়।

বঙ্গদেশের আকবর

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বঙ্গদেশের সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাকে বঙ্গদেশের আকবর বলা হয়। তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বঙ্গদেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল। তিনি যদিও বেশিরভাগ সময়েই যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন, তাতে দেশের শান্তি ব্যাহত হয় নি।

জনপ্রিয়তার চরম সাক্ষ্য

তাঁকে অনেক সময়েই যুদ্ধ উপলক্ষ্যে রাজ্যের বাইরে অবস্থান করতে হত। তবুও তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে কেউই তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন নি। এটা তাঁর জনপ্রিয়তার চরম সাক্ষ্য বহন করে।

রাজনৈতিক বিচক্ষণতা

দিল্লির পরাক্রান্ত সুলতান সিকান্দার লোদির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া, চরম রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক। জৌনপুরের রাজ্যচ্যুত সুলতানকে আশ্রয়-দান করায়, তাঁর চরিত্রের মহানুভবতারও পরিচয় পাওয়া যায়।

জাতীয় চেতনার সঞ্চার

ইলিয়াস শাহী বংশ যে উদারতার সূচনা করেছিল, হুসেন শাহ তাকে অব্যাহত রাখতে যত্নবান হন। তিনি ছিলেন উদারতার মূর্ত প্রতীক। আধুনিক অর্থে না হলেও বঙ্গদেশে একটা জাতীয় চেতনা সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হুসেন শাহ বঙ্গদেশের বাঙালি জাতীয়তার ভাগীদার হয়েছিলেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ

  • (১) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তাঁরই রাজত্বকালে চৈতন্যদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এই ধর্মপ্রচার হিন্দুদের সামাজিক ও ধর্মনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
  • (২) হিন্দুদের প্রতি হুসেন শাহের উদার দৃষ্টিভঙ্গি বঙ্গদেশের নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হুসেন শাহের মতো উদার শাসক ব্যতীত বঙ্গদেশে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের সঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের সমুন্নতি ও বঙ্গ-সাহিত্যের উন্নতি সম্ভব ছিল না।
  • (৩) যদিও ড. রমেশ মজুমদার বঙ্গ-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে হুসেন শাহকে স্বীকার করেন না, তিনি এই যুগের যে কোনো প্রকার ধর্মসমন্বয়ের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
  • (৪) প্রায় সকল ঐতিহাসিকই একমত যে ডঃ মজুমদারের এই সিদ্ধান্ত বিভিন্ন তথ্যের আলোকে কিছুটা একপেশে। কিন্তু তার মত মেনে নিলে হিন্দুর লেখা জঙ্গনামা ও মুসলমানের লেখা বৈষ্ণব পদগুলির যথাযথ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
  • (৫) তাঁর রাজনৈতিক কৃতিত্বকে ছোটো করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। তবুও হুসেন শাহের রাজত্বকাল বঙ্গ-সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে এবং তাঁর রাজনৈতিক কার্যাবলী ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

উদারনীতি

  • (১) হুসেন শাহের সৌভাগ্য তারই রাজত্বকালে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ঘটেছিল। হুসেন শাহ বারবক শাহের সৃষ্ট উদারনীতিকে সযত্নে লালন করেছিলেন। তিনিও হিন্দুদের উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করতেন। এই বিষয়ে তাঁর ‘উজির’ গোপীনাথ বসু, রাজ-চিকিৎসক মুকুন্দ দাস, সেনাপতি গৌর মাল্লিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
  • (২) এছাড়া ছুটি খান, সনাতন, রূপ গোস্বামী প্রমুখ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হুসেন শাহের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। হুসেন শাহের রাজত্বকালের গৌরবময় ভূমিকাতে এঁদের অবদান ছিল অপরিসীম।
  • (৩) রূপ গোস্বামী বিদ্যমাধব ও ললিত মাধব নামক সংস্কৃত ভাষায় দু’খানি গ্রন্থ রচনা করেন। সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু ‘শ্রীমদ্ভাগবত’ বাংলায় অনুবাদ করেন। এই কাজের জন্য তিনি সুলতানের প্রশংসা পেয়েছিলেন।
  • (৪) আরবি-ফারসি সাহিত্যের যুগেও তিনি বঙ্গভাষার ও সংস্কৃতির পরম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। চৈতন্যদেবের অসাধারণত্ব হুসেন শাহ স্বীকার করেছিলেন। চৈতন্যচরিত গ্রন্থগুলি, বিশেষ করে চৈতন্যভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত, বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল তাঁর রাজত্বকালেই রচিত হয়েছিল।

পদাবলী সাহিত্যের বিকাশ

বাংলা সাহিত্যের একটি পর্ব, অর্থাৎ পদাবলী সাহিত্যের সঙ্গে হুসেন শাহের নাম চিরদিন ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এছাড়া, মালাধর বসু, বিজয় গুপ্ত, যশোরাজ খান হুসেন শাহের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন।

কবি পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা

  • (১) হুসেন শাহের আমলেই চট্টগ্রামের সামন্তরাজা পরাগল খান-এর পৃষ্ঠপোষকতায় জনৈক পণ্ডিত পরমেশ্বর ‘মহাভারত’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। হুসেন শাহের সঙ্গে বিদ্যাবাচস্পতির যোগাযোগ ছিল।
  • (২) আবার কয়েকজন কবি, বিশেষ করে যশোরাজ খান, দামোদর কবিরঞ্জন হুসেন শাহের রাজকর্মচারী ছিলেন। তাঁদের কাব্যসৃষ্টির পিছনে হুসেন শাহের সহযোগিতা ছিল। কয়েকজন মুসলমান পণ্ডিত হুসেন শাহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন।

জনহিতকর কাজ

বিদ্বান ও ধর্মজ্ঞানীদের প্রতি যেমন তিনি অনুরাগ দেখিয়েছিলেন তেমনি রাজ্যের প্রতিটি জেলায় মসজিদ ও হাসপাতাল তৈরি করেছিলেন। এই ব্যাপারে কুতুব-উল-আলম নামে জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তির সমাধি নির্মাণ এবং তাঁর নামে একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল তৈরি করেছিলেন। এইসব দিক বিবেচনা করে অনেক পণ্ডিত হুসেন শাহকে বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠ সুলতান বলে অভিহিত করেছেন।

হাবিবুল্লাহের অভিমত

ড. হাবিবুল্লাহ্ হুসেন শাহকে আকবরের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “the name of Hussain Saha, the good is still remembered from the frontiers of Orissa to the Brahmaputra.”

চরম উৎকর্ষ লাভ

প্রকৃতপক্ষে হুসেন শাহের রাজত্বকালেই বাঙালি জাতি চরম সমৃদ্ধি লাভ করে। তাই ড. হবিবুল্লাহ্ বলেছেন, বাঙালির যে সাহিত্যিক-প্রতিভা এতদিন বাধাপ্রাপ্ত ছিল, তা হুসেন শাহী বংশের উদার শাসননীতির আশ্রয়েই উন্মুক্ত হয় এবং বেগবতী নদীর মতো প্রবাহিত হয়ে চরম উৎকর্ষ লাভ করে।

স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা

  • (১) হুসেন শাহ স্থাপত্যশিল্পেরও পরম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গৌড় নগরীতে হুসেন শাহের স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শনগুলি দেখা যায়। গৌড় নগরীর গুণমন্ত মসজিদ, পরমাবারি মসজিদ, ছোটো সোনা মসজিদ স্থাপত্য-শিল্পের অন্যতম নিদর্শন।
  • (২) তবে এগুলি নির্মাণের সাল-তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। হুসেন শাহের সমাধিতোরণও উৎকৃষ্ট শিল্পের কারুকার্যের নিদর্শন।

বাঙালি জাতির সর্বজনীন আতিথ্য লাভ

এই সমস্ত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, হুসেন শাহের মতো বঙ্গদেশের কোনো সুলতানই বাঙালি জাতির এমন সর্বজনীন আতিথ্য পান নি। বাঙালি জাতিও তাঁকে ‘নৃপতি-তিলক’, ‘জগৎ-ভূষণ’ প্রভৃতি উপাধি দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন।

অধ্যাপক রায়ের অভিমত

The Delhi Sultanate গ্রন্থে অধ্যাপক এন. বি. রায় ঠিকই বলেছেন, “His reign may justly be looked upon as the most glorious in Medieval Bengal.”

হুসেন শাহের দুর্ভাগ্য

ড. হবিবুল্লাহ্ বলেছেন, হুসেন শাহের দুর্ভাগ্য যে, তাঁর সময়ে আবুল ফজলের মতো একজন জীবনীকার ছিলেন না। যদি থাকতেন তা হলে মহান সম্রাট আকবরের মতো হুসেন শাহের জীবনের মহত্ত্ব আমাদের কাছে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারত।

বঙ্গদেশে নবজাগরণের সূচনা

প্রকৃতপক্ষে তাঁরই রাজত্বকালে বঙ্গদেশে নবজাগরণের সূচনা হয়। তাঁর মহৎ ব্যক্তিত্ব, দয়া ও ন্যায়বিচারের জন্য সমসাময়িক লেখকগণ তাঁকে কৃষ্ণের অবতার বলে অভিহিত করেছেন। তাই অনেকে তাকে বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতান বলে অভিহিত করেছেন।

উপসংহার :- স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর সুবিখ্যাত History of Bengal গ্রন্থে ঠিকই বলেছেন যে, “Posterity remembers him not only for the material advantages he conferred on the people, but for his liberalism and catholicity of mind of which it is hard to find a parallel in Muslim India until the age of the great Akbar.”

(FAQ) আলাউদ্দিন হুসেন শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বাংলার আকবর কাকে বলা হয়?

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ।

২. হুসেন শাহের রাজত্বকাল কত?

১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ।

৩. গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করান কে?

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ।

৪. শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের সময় বাংলার সুলতান কে ছিলেন?

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ।

Leave a Comment