বজবজের যুদ্ধ

বজবজের যুদ্ধ প্রসঙ্গে পাঞ্জাবি শিখদের কানাডা যাওয়ার ইচ্ছা, কোমাগাতামারু জাহাজের যাত্রা, গুরুদিৎ সিং এর উদ্দেশ্য, পাঞ্জাবি শিখদের কানাডা যাওয়ার ইচ্ছা, প্রবাসী ভারতীয়দের আন্দোলন, শিখদের মধ্যে বৈপ্লবিক প্রচার, ভারতের ইংরেজ সরকারকে উচ্ছেদের আহ্বান, ইউরোপে যুদ্ধের সূত্রপাত, কোমাগাতামারু জাহাজের বজবজে অবতরণ, বজবজের যুদ্ধ ও যুদ্ধের ফল সম্পর্কে জানবো।

বজবজের যুদ্ধ

ঐতিহাসিক যুদ্ধবজবজের যুদ্ধ
সময়কাল২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪ খ্রি:
বিবাদমান পক্ষইংরেজ ও শিখ
স্থানবজবজ
জেলাদক্ষিণ ২৪ পরগনা
বজবজের যুদ্ধ

ভূমিকা :- পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার গুরুদিৎ সিং নামে এক শিখ দীর্ঘকাল ধরে সিঙ্গাপুর ও মালয়ে ঠিকাদারী ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময় তিনি পাঞ্জাবে ফিরে আসেন এবং বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এর পর তিনি এক নূতন উদ্দেশ্য নিয়ে হংকং-এ ফিরে যান।

পাঞ্জাবি শিখদের কানাডা যাওয়ার ইচ্ছা

এই সময় বহু পাঞ্জাবী শিখ জীবিকা অর্জনের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কুলি ও শ্রমিকের কাজে নিযুক্ত ছিল। কিন্তু এই সকল স্থানে মজুরির হার অত্যন্ত নীচু বলে তারা অধিক মজুরির আশায় কানাডা গমনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের কানাডা গমনের জন্য জাহাজ সংগ্রহের ভার গ্রহণ করেন গুরুদিৎ সিং ।

কানাডার উদ্দেশ্যে কোমাগাতামারু জাহাজের যাত্রা

কলকাতায় কোনো জাহাজ সংগ্রহ করতে না পেরে তিনি হংকং থেকে কোমাগাতামারু নামে একটি জাপানী জাহাজ ভাড়া করেন। জাহাজটি হংকং, সাংহাই, মোজি ও ইয়োকোহামা থেকে শিখদের নিয়ে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল কানাডার ভাঙ্কুভার বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

গুরুদিৎ সিং-এর উদ্দেশ্য

সম্ভবত দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুদিৎ সিং এই কাজে উদ্যোগী হন – প্রথমত, প্রাচ্য প্রবাসী শিখদের জীবিকার্জনের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, কানাডা সরকারের অত্যাচারমূলক ‘বিদেশীদের প্রবেশাধিকার সম্পর্কিত আইন’-এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।

কানাডা সরকারের আইন

কানাডা সরকারের বিশেষ আইন অনুসারে দুশ ডলার জমা না দিলে এবং দেশ থেকে সরাসরি কানাডায় না আসলে, বিদেশীরা কানাডায় প্রবেশ করতে পারত না। তাছাড়া কানাডায় প্রবেশ করবার পরেও বিদেশীদের বহু উৎপীড়নমূলক সরকারী আইন মেনে চলতে হত এবং এই সকল আইন বিশেষত ভারতীয়দের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা হত।

প্রবাসী ভারতীয়দের আন্দোলন

এই সকল আইনের বিরুদ্ধে কানাডার প্রবাসী ভারতীয়রা দীর্ঘ কাল থেকে আন্দোলন করে আসছিল। কানাডার প্রবাসী শিখদের এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলাই ছিল গুরুদিৎ সিং-এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

কানাডার শিখদের আন্দোলনের উগ্ৰ রূপ

শিখদের নিয়ে ‘কোমাগাতামার’ জাহাজ ভাঙ্কুভার বন্দরে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে কানাডার শিখদের এই আন্দোলন উগ্র আকার ধারণ করে।

শিখদের মধ্যে বৈপ্লবিক প্রচার

ইতিমধ্যে বিভিন্ন বন্দরে গদর সমিতির প্রচারকগণ ‘কোমাগাতামারু’ জাহাজের শিখদের মধ্যে বৈপ্লবিক প্রচারের কাজ চালাতে থাকেন। জাহাজের শিখগণ প্রয়োজন হলে যাতে পুলিশের সাথে যুদ্ধ করতে পারে তার জন্য বহু রিভলভারও সংগ্রহ করা হয়।

কানাডার ভাঙ্কুভার বন্দরে নামতে শিখদের বাধা

  • (১) ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে মে জাহাজটি ভাঙ্কুভার বন্দরে প্রবেশ করে। যেহেতু জাহাজের সকল আরোহীর নিকট প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না এবং যেহেতু তারা সরাসরি ভারতবর্ষ থেকে আসে নি, সেহেতু কানাডা সরকার শিখদের বন্দরে নামতে দিতে অস্বীকার করে।
  • (২) আরোহীরা কানাডা সরকারের নিকট তীব্র প্রতিবাদ জানালেও কোনো ফল হল না। কানাডার প্রবাসী ভারতীয়রা আরোহীদের বন্দরে নামবার ব্যবস্থার জন্য বাইশ হাজার ডলার চাঁদা তুলে দিল। কিন্তু তাতেও তাদের বন্দরে নামবার অনুমতি পাওয়া গেল না।

বিদ্রোহের আকার ধারণ

কানাডা সরকারের এই অত্যাচারে কানাডা প্রবাসী ভারতীয় ও জাহাজের আরোহী ভারতীয়দের মধ্যে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠে। গদর সমিতির প্রচারকদের প্রচারে এই বিক্ষোভ ক্রমশ বিদ্রোহের আকার ধারণ করে।

পরাধীন মানুষের চরম শত্রু ইংরেজ

‘গদর’ পত্রিকা এবং বহু পুস্তিকা ও ইস্তাহারে কানাডা সরকারকে তথা সকল দেশের ইংরেজ সরকারকে, বিশেষত ভারতের ইংরেজ সরকারকে সকল পরাধীন মানুষের চরম শত্রু বলে অভিহিত করা হয়।

ভারতের ইংরেজ সরকারকে উচ্ছেদের আহ্বান

সরকারের বিরুদ্ধে এই বলে বিদ্রোহের আহ্বান জানান হয় যে, সকল দেশের ইংরেজ সরকারই এক এবং তাদের এই দুঃখ-লাঞ্ছনার জন্য ভারতের ইংরেজ সরকারই প্রধানত দায়ী। সুতরাং সকল ইংরেজ সরকারকে, বিশেষত ভারতের ইংরেজ সরকারকে সশস্ত্র বিদ্রোহের দ্বারা উচ্ছেদ করতে হবে।

কোমাগাতামারু জাহাজের নোঙ্গর তুলতে বাধ্য করা

  • (১) কানাডার প্রবাসী শিখ ও কোমাগাতামারু জাহাজের আরোহীদের মধ্যে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ উঠতে দেখে কানাডা সরকার ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে। তারা জাহাজটিকে অবিলম্বে কানাডা ত্যাগ করবার নির্দেশ দেয়।
  • (২) নির্দেশ পালনে বাধ্য করবার জন্য একটি বিরাট পুলিশ বাহিনী জাহাজে আরোহণ করবার চেষ্টা করলে আরোহীরা গুলি বর্ষণ করে পুলিশ বাহিনীকে বাধা দেয়। পুলিস-বাহিনী পরাজিত হয়ে পলায়ন করে।
  • (৩) এই খণ্ডযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর পরাজয়ের ফলে কানাডার শাসকগণ ভয় পেয়ে কোমাগাতামারু জাহাজকে বন্দর ত্যাগে বাধ্য করবার জন্য কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ প্রেরণ করে। অবশেষে যুদ্ধ জাহাজের কামানের মুখে কোমাগাতামারু নোঙ্গর তুলতে বাধ্য হয়।

শিখদের কানাডায় নামতে না দেবার ফল

কিন্তু জাহাজের আরোহীদেরকে কানাডায় নামতে না দেবার ফল হল ভীষণ। কারণ, জাহাজের শিখগণ তাদের যথাসর্বস্ব বিক্রি করে কানাডায় জীবিকার্জনের আশায় এসেছিল। তাদের দৃঢ় ধারণা ছিল যে, ভারতের ইংরেজ সরকার তাদের সাহায্য করবে। কিন্তু সাহায্য না করে ইংরেজ সরকার জাহাজটি ভারতে ফেরৎ পাঠাবার জন্য কানাডা সরকারকে অনুরোধ করে।

ভারত অভিমুখে কোমাগাতামারু জাহাজের যাত্রা

শিখদের এই ব্যর্থতার ফলে এবার তাদের বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে ভারতের ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তাদেরকে উন্মাদ করে তোলে। গদর বিপ্লবীরা এই বিক্ষোভকে বিদ্রোহের আকারে রূপায়িত করবার চেষ্টা করতে থাকেন। জাহাজের আরোহীরা বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে ভারত অভিমুখে যাত্রা করে।

ইউরোপে যুদ্ধের সূত্রপাত

ইতিমধ্যে ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায়। কোমাগাতামারু ব্রিটিশ অধিভুক্ত হংকং-এ পৌঁছালে যুদ্ধের অজুহাতে আরোহীদের হংকং বন্দরে অবতরণ করতে দেওয়া হল না। আরোহীরা প্রাচ্যের পূর্ব কর্মস্থলে ফিরে যাবার আবেদন জানাল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের সেই আবেদনেও কর্ণপাত করল না। আরোহীদের সিঙ্গাপুরে নামবার চেষ্টাও ব্যর্থ হল।

বিদ্রোহীদের ভারতে শাস্তিদানের সিদ্ধান্ত

ইতিমধ্যে ভারত সরকার এই বিদ্রোহীদের ভারতবর্ষে নিয়ে গিয়ে এদের শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকৃতপক্ষে ভারত সরকারই জাহাজটিকে ভারতবর্ষের দিকে নিয়ে চলল।

কোমাগাতামারু জাহাজের বজবজে অবতরণ

কোমাগাতামারু জাহাজটি ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগর পার হয়ে হুগলী নদীতে প্রবেশ করে এবং ২৯শে সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার সময় বজবজে এসে নোঙ্গর ফেলে।

সরকারের চক্রান্ত

পূর্ব থেকেই একটি স্পেশাল ট্রেন বজবজে অপেক্ষা করছিল। কোমাগাতামারু জাহাজের যাত্রীদের সেই স্পেশাল ট্রেনে করে পাঞ্জাব নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু জাহাজের যাত্রীরা ততক্ষণে সরকারের চক্রান্ত বুঝে ফেলে, সরকারের চক্রান্তে বাধা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়।

সরকারের সৈনবাহিনী প্রস্তুত

শিখরা ট্রেনে চড়তে অস্বীকার করে সকলে একত্রে পায়ে হেঁটে কলকাতার দিকে যাত্রা করে। এরা যে ট্রেনে চাপতে অস্বীকার করে কলকাতা পৌঁছাবার চেষ্টা করবে শাসকগণ তার পূর্বেই বুঝতে পেরেছিল। সুতরাং তারা বিদ্রোহীদের বাধা দেবার জন্য একটি সৈন্যবাহিনীও প্রস্তুত রেখেছিল।

বজবজের যুদ্ধ

শিখরা কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করা মাত্র সৈন্যবাহিনী তাদের বাধা দেয়। সৈন্যরা পথ রোধ করে দাঁড়ানো মাত্র সশস্ত্র শিখরা রিভলভার থেকে গুলিবর্ষণ আরম্ভ করে। দেখতে না দেখতে বজবজ এক রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই ঘটনা বজবজের যুদ্ধ বা কোমাগাতামারু ঘটনা নামে পরিচিত।

বজবজের যুদ্ধের ফল

  • (১) উভয় পক্ষেই বহু লোক হতাহত হয়। শিখদের পক্ষে আঠার জন নিহত হয়। যুদ্ধ চলবার সময় গুরুদিৎ সিং আঠাশ জন অনুচরসহ পলায়ন করেন। বিদ্রোহীদের একত্রিশ জনকে জেলে আটক করে রাখা হয় এবং অবশিষ্ট সকলকে বলপূর্বক ট্রেনে চাপিয়ে পাঞ্জাবে নিয়ে এসে নজরবন্দী করে রাখা হয়।
  • (২) কোমাগাতামারু ও বজবজের ঘটনার এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল না। এই সংবাদ দাবাগ্নির মত সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিল। সমগ্র পাঞ্জাবে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল।

উপসংহার :- গদর সমিতির নেতারা অনেকেই ইতিমধ্যে ভারতবর্ষে এসে পৌঁছেছিলেন, আর পাঞ্জাবেও পূর্ব থেকেই বিদ্রোহ ধূমায়িত হয়ে উঠছিল। বজবজের যুদ্ধের ঘটনায় সেই ধুম অগ্নিশিখায় পরিণত হল।

(FAQ) বজবজের যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বজবজের যুদ্ধ কখন হয়?

১৯১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর।

২. বজবজের যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়?

শিখ ও ইংরেজ।

৩. বজবজের যুদ্ধের সাথে জড়িত জাহাজের নাম কি?

কোমাগাতামারু।

৪. বজবজের যুদ্ধে শিখদের নেতৃত্বে কে ছিলেন?

গুরুদিৎ সিং।

Leave a Comment