আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি

মোগল সম্রাট আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি ব্যবস্থায় শের শাহের অনুকরণ, কৃষক-স্বার্থ, খালিসা ও জায়গির জমির পৃথকীকরণ, টোডরমল ব্যবস্থা, টোডরমলের রাজস্ব নীতির উদ্দেশ্য, জাবতি, গল্লাবকস, নাসক রাজস্ব ব্যবস্থা, রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য কর্মচারী, আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থার গুরুত্ব ও ত্রুটি সম্পর্কে জানবো।

আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি (Revenue Policy of Akbar)

রাজস্ব মন্ত্রীটোডরমল
উল্লেযোগ্য রাজস্ব ব্যবস্থাজাবতি ব্যবস্থা
রাজস্বের পরিমাণউৎপন্ন ফসলের ১/৩ অংশ
আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি

ভূমিকা :- ভারতে মুসলিম শাসকদের মধ্যে শেরশাহ-ই প্রথম একটি সুনির্দিষ্ট ভূমি-রাজস্ব নীতি গড়ে তোলেন। তাঁর ভূমি-রাজস্ব নীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল জমি জরিপ এবং জমির উৎপাদিকা শক্তি অনুসারে রাজস্ব নির্ধারণ।

শের শাহের অনুকরণ

আকবর তাঁর রাজত্বের সূচনা-পর্বে শের শাহ-প্রবর্তিত ভূমি-রাজস্ব নীতি অনুসরণ করতেন এবং এগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই একটি সুনির্দিষ্ট ভূমি-রাজস্ব নীতি গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। বস্তুত মোগল ভূমি-রাজস্ব গড়ে ওঠে আকবরের আমলেই।

কৃষক-স্বার্থ

আকবরের ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনকল্যাণ। কৃষকদের স্বার্থের কথা মনে রেখেই তিনি একটি জনকল্যাণমুখী ও দুর্নীতিমুক্ত ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

খালিসা ও জায়গির জমির পৃথকীকরণ

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ান ইতিমাদ খাঁ খালিসা জমিকে জায়গির জমি থেকেপৃথক করে ফেলেন।

জমি জরিপ

১৫৭০-৭১ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ান মুজাফ্ফর খান কানুনগোদের সাহায্যে জমি জরিপ করে ফসলের উৎপাদন নির্ধারণের ব্যবস্থা করেন।

টোডরমল ব্যবস্থা

১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ান টোডরমল রাজস্ব সংগ্রহের জন্য নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থা টোডরমলের ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থাই মোগল ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা।

টোডরমলের রাজস্ব নীতির উদ্দেশ্য

টোডরমলের রাজস্ব নীতির তিনটি উদ্দেশ্য ছিল। যথা –

  • (১) আবাদি জমির নির্ভুল জরিপ।
  • (২) প্রত্যেক বিঘায় উৎপন্ন শস্যের গড় নির্ণয় করা।
  • (৩) প্রত্যেক বিঘার রাজস্বের হার নির্ধারণ করা।

তিন ধরনের রাজস্ব

জমি জরিপ করে জমির উৎপাদিকা শক্তি এবং জমিতে কতদিন ধরে চাষ হচ্ছে—এই সবতথ্যের ভিত্তিতে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে আঞ্চলিক ভিত্তিতে তিন ধরনের রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। যথা –

  • (১) জাবৎ বা জাবতি বা দহসালা ব্যবস্থা।
  • (২) গল্লাবকস ব্যবস্থা
  • (৩) নাসক ব্যবস্থা।

(১) জাবৎবা জাবতি ব্যবস্থা

‘জাবৎ’ ব্যবস্থার জন্যই টোডরমলের খ্যাতি। এই ব্যবস্থা অনুসারে জমির উৎপাদিকা শক্তি বিবেচনা করে জমিকে চারভাগে বিভক্ত করা হয় – ‘পোলাজ’, ‘পরৌতি’, ‘চাচর’ ও ‘বানজার’।

(ক ) উৎপাদন

‘পোলাজ’ জমিতে প্রতিবছর এবং সারা বছর চাষ হত। ‘পরৌতি’ জমিতে কিছুকাল চাষের পর উর্বরতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দুই বা এক বছরের জন্য জমি পতিত করে রাখা হত। ‘চাঁচর’ জমি তিন-চার বছর অনাবাদি থাকতো।’বানজার’ জমি চার-পাঁচ বছর এবং অনেক সময় তারও বেশি সময় ধরে অনাবাদি রাখা হত।

(খ) রাজস্ব নির্ধারণ

উৎপাদন অনুসারে প্রথম তিন শ্রেণীর জমিকে উত্তম, মধ্যম ও অধম তিন পর্যায়ে বিভক্ত করে উৎপাদনের আনুমানিক গড়পড়তা হিসেব তৈরি করে উৎপাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব স্থির করা হত। এই রাজস্ব নগদ টাকা বা শস্যে দেওয়া যেত। জমির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বও বৃদ্ধি পেত।

(গ) জমি বন্দোবস্ত

এই প্রথা অনুসারে জমি সরাসরি রায়তের সঙ্গে বন্দোবস্ত করা হয়। জায়গিরদারি জমিগুলিও ‘জাবৎ’ প্রথার অধীনে আনা হয়—সরকারি কর্মচারীরা রাজস্ব আদায়ের পর জায়গিরদার তার প্রাপ্য পেত।

(ঘ) পাট্টা দান

রায়তদের জমির ‘পাট্টা’ দেওয়া হত এবং তাতে জমির শ্রেণী, দেয় রাজস্বের পরিমাণ ও জমির পরিমাণ লেখা থাকত।

(ঙ) প্রচলিত অঞ্চল

বিহার, এলাহাবাদ, মালব, অযোধ্যা, দিল্লি, লাহোর, মুলতান, রাজপুতানা অর্থাৎ উত্তর ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

(২) ‘গল্পাবক্‌স’ বা ‘বাতাই’ ব্যবস্থা

ফারসি শব্দ ‘গল্পাবক্‌স’ ভাগচাষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। হিন্দি ভাষায় এই পদ্ধতি ‘বাটাঈ’ বা ‘ভাওয়ালি’ নামে পরিচিত।

(ক) রাজস্বের পরিমাণ

এই ব্যবস্থা অনুসারে উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ সরকারকে রাজস্ব হিসেবে দিতে হত।

(খ) শস্য ভাগ

এই প্রথায় জমি জরিপ হত না। এই পদ্ধতি অনুসারে চাষি ও সরকারের মধ্যে তিনভাবে শস্য ভাগ-বাঁটোয়ারা হত।যথা –

  • (i) ‘রসি বাটাই অর্থাৎ শস্য কাটা ও মাড়ানোর পর দুই পক্ষের সামনে তা ভাগাভাগি হত।
  • (ii) ‘ক্ষেত বাটাই’ অর্থাৎ বীজ বোনার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও কৃষকদের মধ্যে ক্ষেত ভাগাভাগি হত।
  • (iii) ল্যাঙ্ক বাটাই’ অর্থাৎ উৎপাদিত শস্য মাঠে তিনটি স্তূপে ভাগ করে সরকার রাজস্ব হিসেবে একভাগ নিতেন।
(গ) প্রচলিত অঞ্চল

এই ব্যবস্থা সিন্ধুদেশ, কাবুল, কাশ্মীর ও কান্দাহারে প্রচলিত ছিল।

(ঘ) ত্রুটি

অনেকেই ‘গল্পাবক্‌স’ পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন, কিন্তু এই ব্যবস্থায় পাহারাদার ও ‘বক্সী’ নিয়োগের ফলে সরকারের প্রচুর ব্যয় হত এবং এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সরকারি কর্মচারীদের সততার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

(৩) নাসক ব্যবস্থা

এই ব্যবস্থা ছিল অনুমান নির্ভর।

(ক) রাজস্ব নির্ধারণ

এই ব্যবস্থা অনুসারে জমি জরিপ হত না বা জমির উৎপাদিকা শক্তিও দেখা হত না। ক্ষেতে সরেজমিনে শস্যের ফলন দেখে সরকারি কর্মচারী মোটামুটি একটি অনুমানের ওপর রাজস্ব স্থির করতেন।

(খ) রাজস্ব আদায়

সরকার সরাসরি রায়তেরকাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন।

(গ) প্রচলিত অঞ্চল

এই প্রথা বাংলাদেশ, গুজরাট ও কাথিয়াবাড় অঞ্চলে প্রচলিত ছিল।

রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার কর্মচারী

রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সাম্রাজ্যে বেশ কিছু কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। এরা হলেন –

  • (১) রাজধানীতে ছিলেন প্রধান দেওয়ান এবং এছাড়া প্রত্যেক ‘সুবা’ বা প্রদেশে একজন করে দেওয়ান নিযুক্ত ছিলেন। তাঁদের ওপর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব অর্পিত ছিল।
  • (২) প্রত্যেক সরকারে একজন করে ‘আমিন’থাকতেন। তাঁর কাজ ছিল জমি জরিপের তদারকি, নিয়মিত খাজনা আদায়েরব্যবস্থা করা, অনিচ্ছুক প্রজাকে খাজনা দিতে বাধ্য করা, কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন করা, কর ফাঁকি রোধ করা, বিদ্রোহী কৃষকদের মোকাবিলা করা, কৃষি-জমির উৎকর্ষের মান স্থির করা এবং খাজনা আদায়ের সময় কৃষকরা যাতে সরকারি কর্মচারীদের হাতে নিপীড়িত না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা।
  • (৩) আমিনকে সাহায্য করতেন বিতকচি, পোদ্দার, কানুনগো, মুকাদ্দম, পাটোয়ারী প্রভৃতি কর্মীরা। জেলা স্তরে বিতকচি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী।
  • (৪) জেলা-স্তরে রাজস্ব আদায়, জরিপের কাজের তদারকি, নিজ এলাকার মোট আবাদি জমি ও তার রাজস্ব, কৃষকদের সঙ্গে সরকারের বন্দোবস্ত সম্পর্কিত কাগজপত্রের সংরক্ষণ ও কানুনগো-দের কাজকর্মের তদারক করা বিতকচির দায়িত্বভুক্ত ছিল।
  • (৫) মুকাদ্দম কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে রসিদ দিতেন। এছাড়া, পোদ্দার, পাটোয়ারী প্রভৃতি নানা ধরনের কর্মচারী ছিলেন।

গুরুত্ব

আকবরের ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, বিশেষত ‘জাবৎ’ প্রথা ঐতিহাসিকদের দ্বারা উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কৃষকদের অনেক সুবিধা হয়। যেমন –

  • (১) জমি জরিপের ভিত্তিতে সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত হয়। এতে কোনও মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।
  • (২) রায়ত তার দেয় রাজস্বের হার জানত এবং তা ছিল স্থায়ী—কেউই তা পরিবর্তন করতে পারত না। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীরা রায়তের কাছ থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে পারত না, কারণ রাজস্বের পরিমাণ ‘পাট্টা’য় লেখা থাকত।
  • (৩) ‘পাট্টা’-র মাধ্যমে জমির ওপর রায়তের অধিকার স্বীকৃত হওয়ায় তাকে অন্যায়ভাবে স্বত্বচ্যুত করা যেত না।
  • (৪) জমিতে স্থায়ী স্বত্ব পেয়ে রায়ত কৃষির উন্নতিতে নজর দেয়।
  • (৫) দুর্ভিক্ষ ও অজন্মার সময় কর মকুব ও কৃষকদের অর্থ সাহায্য করার ব্যবস্থা থাকায় কৃষকদের খুব উপকার হয়।
  • (৬) এই ব্যবস্থায় সরকারের আয়ও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
  • (৭) এই ব্যবস্থায় সরকার পূর্ব থেকেই তাঁর রাজস্বের পরিমাণ জানতেন। এর ফলে সরকারকে কম রাজস্ব দিয়ে প্রতারিত করা যেত না।

ত্রুটি

এই ব্যবস্থার বেশ কিছু ত্রুটিও ছিল। যেমন –

  • (১) স্মিথ-এর মতে, প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও কর্মচারীরা ছিল স্বেচ্ছাচারী। তারা প্রজাদের কাছ থেকে বাড়তি কর আদায় করত।
  • (২) ভূমি রাজস্ব হিসেবে ফসলের ১/৩ অংশ এমনিতেই খুব বেশি। শাহজাহানের আমলে তা হয় ১/২ অংশ।
  • (৩) স্যার যদুনাথ সরকার বলেন যে, দরিদ্র কৃষক দিল্লির রাজকোষের জন্য খাজনা দিত, কিন্তু বিনিময়ে সে কিছুই পেত না।

উপসংহার :- নানা ত্রুটি ও অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থার যথেষ্ট ইতিবাচক দিক ছিল। ঐতিহাসিক স্মিথ -এর মতে আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল বাস্তববাদী ও সুনিশ্চিত।

(FAQ) আকবরের ভূমি রাজস্ব নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আকবর কার ভূমি রাজস্ব নীতি অনুসরণ করতেন?

শের শাহের।

২. আকবরের রাজস্ব মন্ত্রীর নাম কী?

টোডরমল।

৩. আকবরের রাজত্বকালে রাজস্বের পরিমাণ কত ছিল?

উৎপন্ন ফসলের ১/৩ অংশ।

Leave a Reply

Translate »