বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি

বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতি অনাগ্ৰহ, অষ্টমার্গের সামাজিক অর্থ, অহিংস নীতি, জাতিভেদ প্রথা অস্বীকার, কর্মকেই শ্রেষ্ঠত্ব দান, সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও নারী সমাজের স্বাধীনতা সম্পর্কে জানবো।

বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি

বিষয় বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি
প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ
ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক
সমকালের অন্য ধর্ম জৈন ধর্ম
পূর্ববর্তী ধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্ম
বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি

ভূমিকা :- ভারতে প্রায় সমকালে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে। গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেন বৌদ্ধ ধর্ম ও মহাবীর প্রচার করেন জৈন ধর্ম। তৎকালীন সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল।

ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতি অনাগ্রহ

  • (১) গৌতম বুদ্ধ তাঁর ধর্মমতে বেদের প্রচলিত ধর্ম বা বৈদিক প্রথা অনুসারে যজ্ঞ করার কথা বলেন নি। তিনি দেব-দেবী বা স্বর্গের কথাও বলেন নি। প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিধি-বিধানগুলির তিনি প্রত্যক্ষভাবে নিন্দা করেন নি বা তার অসারতা সম্পর্কে বিতর্কে যান নি।
  • (২) বুদ্ধ তাঁর ধর্মমতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিধি-বিধানকে গ্রহণ করেন নি। এ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ না করে তিনি প্রকৃতপক্ষে এই ধর্মমতকে অগ্রাহ্য করেছেন। নিষ্ফলা বিতর্কে সময় নষ্ট না করে, যা করা উচিত বলে তাঁর মনে হয়েছে তিনি মানুষকে তাই করতে বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এর ফলে মানুষের মঙ্গল হবে। প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের অন্তসারশূন্যতা ও ব্যয়বহুলতার জন্য জনসাধারণের মধ্যে হতাশা তিনি দেখেছিলেন।
  • (৩) যাগ-যজ্ঞ, পুজোয় বহু অর্থ ব্যয় হত। সাধারণ গৃহস্থদের পক্ষে এত ব্যয় করা সম্ভবপর ছিল না। চিন্তাশীল লোকেরা এই আড়ম্বরপূর্ণ যজ্ঞের অসারতা বুঝেছিলেন। বুদ্ধ তাঁর ধর্মে দেখিয়ে দেন ব্রাহ্মণ্যধর্মের আচার অনুষ্ঠান না করেও কিভাবে আত্মাকে পার্থিব দুঃখভোগের হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

অষ্টমার্গের সামাজিক অর্থ

  • (১) মুক্তির পথ হিসেবে বুদ্ধ যে অষ্টমার্গ বা অষ্টপথের নির্দেশ দেন তার সামাজিক মূল্য খুব বেশী ছিল। ধর্মানন্দ কোশাম্বী বুদ্ধের প্রচারিত অষ্টমার্গের সামাজিক মূল্য বিচার করেছেন। তাঁর মতে, বুদ্ধ এই শিক্ষা দেন যে, কেবল নিজ সুখ বা মুক্তি যথেষ্ট নয়।
  • (২) সমাজের ক্ষতিসাধন না করে নিজের মুক্তি লাভের উপায় বের করা ছিল অষ্টমার্গের বৈশিষ্ট্য। এজন্য বুদ্ধ বলেছেন যে, আসক্তিই হল দুঃখের কারণ। আসক্তি বা তৃষ্ণা থেকে মুক্তি মানুষের মনে শান্তি আনতে সক্ষম। প্রতি ব্যক্তি অপরের ক্ষতি না করে নিজ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে সঙ্কল্প করবে এটাই ছিল বুদ্ধের নির্দেশ।

অহিংসা নীতি

অহিংসাকে তিনি অনেক বেশী মর্যাদা দিয়েছেন। কারণ হিংসা সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মিথ্যা কথা বলা, পরস্ব অপহরণ, ক্ষমতার লোভ হল হিংসার প্রকাশ। এই সকল আচরণ সমাজকে দুর্বল করে দেয়। এজন্য বুদ্ধ অহিংসা, সৎ-আচরণ, সৎ-জীবনের কথা বার বার বলেছেন।

অহিংসার সামাজিক ব্যাখ্যা

  • (১) যুদ্ধের অহিংসার একটি বিরাট সামাজিক দিক ছিল বলে ওয়ার্ডার নামে ঐতিহাসিক বলেছেন। লোহার লাঙল আবিষ্কারের ফলে গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষির দ্রুত বিস্তার ঘটে। ভারী লাঙ্গল ২০-২৪ টি বলদ দিয়ে টানার ব্যবস্থা করা হত।
  • (২) গভীর ও নিবিড় চাষের ফলে ফসল খুব বেশী ফলত এবং দরিদ্র লোকেরা পেট ভরে খেতে পেত। কিন্তু যাগ-যজ্ঞে গৃহপালিত পশুকে বলি দেওয়া হত, বিশেষত গোহত্যা হত। একটি অশ্বমেধ যজ্ঞে কম করে ৬০০ ষাঁড় বধ করা হত। এর জন্য কৃষকদের খুবই ক্ষতি সহ্য করতে হত।
  • (৩) গরুর অভাবে চাষের জন্যে লাঙ্গল টানার অসুবিধা হত, গাড়ি টানারও অসুবিধা হত। এই কারণে বৌদ্ধধর্মে প্রাণী হত্যার নিষেধাজ্ঞা এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুত্তনিপাতে বুদ্ধ পশুহত্যাকে নিন্দা করেছেন। এটা প্রধানত দরিদ্র কৃষকদের দিকে চেয়ে তিনি করেছেন।

জাতিভেদ প্রথা অস্বীকার

বৌদ্ধধর্মের আর একটি দিক হল জাতিভেদ প্রথা ও নারী জাতির মর্যাদা সম্পর্কে বুদ্ধের প্রগতিশীল দৃষ্টি। বুদ্ধ জাতিভেদ প্রথাকে অস্বীকার করেন। ব্রাহ্মণ্যধর্মে জাতিভেদের ফলে যে সামাজিক বৈষম্য ও অশান্তি দেখা দিয়েছিল, বুদ্ধ সে সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাই তিনি জাতিভেদ প্রথাকে অস্বীকার করে সকল মানুষের সমান অধিকার স্বীকার করেন।

কর্মকেই শ্রেষ্ঠত্ব দান

  • (১) কর্মের দ্বারাই মানুষের পরিচয়, জন্মের দ্বারা নয়, এই তত্ত্বে তিনি বিশ্বাস করতেন। এই কারণে তিনি সৎ-আচরণের ওপর জোর দেন। এর ফলে লোকে পরিশ্রম দ্বারা জীবিকা অর্জন করে। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং নিশ্চিন্তে তারা মৃত্যুবরণ করতে পারে।
  • (২) বুদ্ধ বলেন যে, “জন্মের দ্বারা ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হয় না, কর্মের দ্বারা ব্রাহ্মণ ও শূদ্র হয়।” তিনি তাঁর শিষ্যমণ্ডলীতে বহু নিম্নবর্ণের লোকেদের স্থান দেন। এদের মধ্যে ছিলেন কুকুর ভক্ষণকারী এবং মেথর। কিন্তু বুদ্ধের প্রভাবে এরা অতি উন্নত জীবনে পৌঁছে যান।
  • (৩) খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য গহপতি শ্রেণীর হাতে বেশ টাকা-পয়সা জমে। বৈশ্য বণিকরা বাণিজ্য দ্বারা শ্রেষ্ঠী বা ধনীতে পরিণত হয়। ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজে এই শ্রেণীগুলি অর্থবান এবং সম্পদ উৎপাদনকারী হলেও বংশগত কারণে তাদের নীচুশ্রেণী বলে গণ্য করা হত। বুদ্ধ এই সকল শ্রেণীকে তার ধর্মমতে দীক্ষা দেন।
  • (৪) ধনী শ্রেষ্ঠী ও গৃহপতিদের তিনি কুলপুত্ত অর্থাৎ মহান বংশে জন্মগ্রহণকারী আখ্যা দেন। জাতিভেদের ঊর্ধ্বে নতুন শ্রেণীতে স্থান লাভ করে তারা খুবই সন্তুষ্ট হয়। কৃতজ্ঞচিত্তে বুদ্ধকে তারা অকাতরে সকল কিছু দান করতে ইচ্ছা করে।
  • (৫) অবদান শতক থেকে জানা যায় শ্রাবন্তিনগরে দুর্ভিক্ষ হলে বুদ্ধ তাঁর বিখ্যাত ধনী শিষ্য অনাথ পিণ্ডকে তাঁর কোষাগার দরিদ্রদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে বলেন।

সমাজতান্ত্রিক চিন্তা

  • (১) সমাজের নিম্নবর্ণের অবহেলিত মানুষদের কথা বুদ্ধ ভুলেন নি। ধর্মানন্দ কোশাম্বীর মতে, বুদ্ধ অষ্টমার্গে বলেন যে, সম্যক দৃষ্টি অর্থাৎ অপরের ক্ষতি না করে, অপরকে বঞ্চিত না করে নিজ জীবিকা অর্জন করাই শ্রেষ্ঠ পথ।
  • (২) দীর্ঘনিকায়ে বলা হয়েছে যে, দারিদ্রাই দুর্নীতি ও অপরাধের কারণ। সুতরাং অপরাধ দূর করার জন্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে কৃষক, শ্রমিক ও বণিকদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
  • (৩) বুদ্ধ চক্রবর্তি ব্রত বলে একটি ব্রতের কথা বলেছেন, যার অর্থ হল রাজা দরিদ্র ব্যক্তিদের কাজের সুযোগ দিবেন। যে রাজা এই ব্রত পালন করবেন তিনি। রাজ চক্রবর্তী থেকে সমর্থ হবেন।

নারী সমাজের স্বাধীনতা

  • (১) নারীদের সম্পর্কে বুদ্ধের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল। তিনি নারীদের গৃহকোণ ছেড়ে সমাজে, সকল রকম কাজে যোগদানের সমান অধিকার স্বীকার করেন। তিনি নারীদের তার সংঘে যোগ দিয়ে ভিক্ষুনী সংঘ গঠনের অধিকার দেন।
  • (২) গণিকাদের সমাজে ঘৃণার চোখে দেখা হলেও বুদ্ধ এদের সম্পর্কে সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টি নেন। তিনি গণিকা আম্রপালীকে ভিক্ষুনী ব্রতে দীক্ষা দেন।
  • (৩) বুদ্ধ বৃজি প্রজাতন্ত্রে সমাজ পরিচালনার জন্য সাতটি নিয়ম বেঁধে দেন। তাঁর পঞ্চম নিয়ম ছিল যে, “স্ত্রীলোকের সম্মান রাখতে হবে। বিবাহিত বা অবিবাহিত কোন স্ত্রীলোকের ওপর অত্যাচার করা চলবে না।” তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত বৃজির লোকেরা এই নিয়ম গ্রহণ করে।

উপসংহার :- বুদ্ধ প্রাকৃত বা অর্ধমাগধী ভাষায় অর্থাৎ জনগণের ভাষায় তার ধর্মমত প্রচার করতেন। এতে সকল লোকে তাঁর কথা বুঝতে পারত। এর ফলে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

(FAQ) বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক চিন্তা ও পটভূমি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক কে?

গৌতম বুদ্ধ।

২. বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থের নাম কি?

ত্রিপিটক।

৩. বৌদ্ধ ধর্মে আর্যসত্য কটি?

চারটি।

৪. প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি কোথায় আয়োজিত হয়?

রাজগৃহে।

৫. গৌতম বুদ্ধ কোন ভাষায় তার ধর্মমত প্রচার করেন?

প্রাকৃত ভাষা।

Leave a Reply

Translate »