হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন

হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন প্রসঙ্গে শ্রেণি বৈষম্য, শ্রেণি শোষণ, খাদ্য, পশুপালন, পোশাক ও অলঙ্কার, গৃহস্থালির সরঞ্জাম, আমোদ প্রমোদ, সিল, লিপি ও সমাজে নারীর স্থান সম্পর্কে জানবো।

হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন

বিষয় হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন
স্নানাগার মহেঞ্জোদারো
শস্যাগার হরপ্পা
প্রধান খাদ্য গম ও যব
গৃহপালিত পশু গোরু, ভেড়া, ছাগল, মহিষ
হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন

ভূমিকা:- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব প্রাচীন সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল ভারত -এর হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতা। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ভারতের সিন্ধুনদের উপত্যকা অঞ্চলে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল।

সমাজজীবন

হরপ্পা সভ্যতায় খননকার্যের ফলে যেসব প্রত্নসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলির ওপর ভিত্তি করে এই সভ্যতার সামাজিক জীবনের প্রতি আলোকপাতের চেষ্টা করা হয়। প্রাপ্ত উপাদানগুলি থেকে হরপ্পা সভ্যতার বাসিন্দাদের খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহস্থালির দ্রব্য, অবসর বিনোদনের উপকরণ, সিলমোহর, লিপি প্রভৃতি সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়।

শ্রেণি-বৈষম্য

হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোর নগর-বিন্যাস দেখে ঐতিহাসিকগণ অনুমান করেছেন যে, হরপ্পার সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ছিল। বাড়িগুলির আয়তন ও কবরের প্রকারভেদ এই শ্রেণি-বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। হরপ্পা সভ্যতায় সমাজে সম্ভবত তিন শ্রেণির মানুষ বসবাস করত। যথা – উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত।

(১) উচ্চবিত্ত

উচ্চবিত্ত অর্থাৎ প্রথম শ্রেণিতে ছিল পুরোহিতরা। সমাজে পুরোহিত শ্রেণির আধিপত্য সবচেয়ে বেশি ছিল বলে মার্টিমার হুইলার মনে করেন। তারা ছিল শাসকগোষ্ঠীর মানুষ।

(২) মধ্যবিত্ত

মধ্যবিত্ত অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিল ধনী, বণিক, বুর্জোয়া, কারিগর ও যোদ্ধারা। ড. এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, সুমের ও মিশরের চেয়ে হরপ্পা সভ্যতায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তাদের অবস্থাও ছিল বেশ সচ্ছল।

(৩) নিম্নবিত্ত

নিম্নবিত্ত অর্থাৎ তৃতীয় শ্রেণিতে ছিল দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকরা। একেবারে নীচে ছিল অগণিত ক্রীতদাস।

শ্রেণিশোষণ

ঐতিহাসিক এ. এল. বাসাম-সহ অনেকেই এই সভ্যতায় শ্রেণি-বৈষম্যের অস্তিত্বের বিরোধিতা করেছেন। আবার অনেকে মনে করেন যে, প্রথম দুটি শ্রেণির দ্বারা সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ শোষিত হত।

(১) দারিদ্র্য

নিম্নশ্রেণির দরিদ্র মানুষ ভগ্ন কুটিরে বাস করত এবং পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলি যেমন চাষবাস, শস্য মাড়াই, বোঝা বহন, পয়ঃপ্রণালী পরিষ্কার প্রভৃতি করত। ঐতিহাসিক ডি. এন. ঝা মনে করেন যে, সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ দু-কামরাবিশিষ্ট বাড়িগুলিতে বাস করত। তিনি এগুলিকে বর্তমান কালের ‘কুলি লাইনের’ পূর্বাবস্থা বলে মন্তব্য করেছেন।

(২) উচ্চবিত্তদের আধিপত্য

খাদ্য উদ্‌বৃত্ত হলেও তা যে উৎপাদনকারীরা ভোগ করতে পারত না তা শস্যাগারের আবিষ্কার থেকে অনুমান করা যেতে পারে। ঐতিহাসিক গর্ডন চাইল্ড মনে করেন যে, শাসকশ্রেণি দুর্লভ তামার তৈরি অস্ত্রের অধিকারী ছিল। তারা এই অস্ত্রের দ্বারাই বাকি লোকেদের দমিয়ে রাখত। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, বলপ্রয়োগের দ্বারা নয়, ধর্মের দ্বারা হরপ্পার সমাজে এই শ্রেণিভেদকে চালু রাখা হত। মার্টিমার হুইলারের মতে, দুর্গের শাসকরা শহরের চারপাশের জমিতে আবাদকারী কৃষকদের ভূমিদাসে পরিণত করেছিল।

খাদ্য

হরপ্পা সভ্যতা মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। শহরগুলির চারদিকের গ্রামাঞ্চলের কৃষিজমিতে চাষবাস হত। মানুষ নিরামিষ ও আমিষ উভয় প্রকার খাদ্যই খেত। গম ও যব ছিল তাদের প্রধান খাদ্য। এছাড়া ভাত, ফলমূল, মটর, রাই, খেজুর, বাদাম, শাকসবজি, দুধ প্রভৃতি তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। তাদের আমিষ খাদ্যের মধ্যে ছিল মাছ, ডিম, মুরগি, গোরু, ভেড়া ও অন্যান্য পাখির মাংস ইত্যাদি।

পশুপালন

গোরু, ভেড়া, ছাগল, মহিষ, উট, শূকর প্রভৃতি ছিল হরপ্পার অধিবাসীদের গৃহপালিত পশু। সম্ভবত মহিষ ও ষাঁড়কে চাষের কাজে লাগানো হত। তবে ঘোড়াকে তারা পোষ মানাতে পেরেছিল কি না সে বিষয়ে সংশয় আছে। বাঘ, হাতি, বাইসন, গন্ডার, ভল্লুক, খরগোশ প্রভৃতি পশুর সঙ্গেও তারা পরিচিত ছিল।

পোশাক ও অলংকার

সিন্ধুর অধিবাসীরা সুতি ও পশমের পোশাক পরিধান করত। দেহের ঊর্ধ্বাংশ ও নিম্নাংশের জন্য তারা দুইখণ্ড বস্ত্র ব্যবহার করত। স্ত্রী-পুরুষ সকলেই লম্বা চুল রাখত। পুরুষরা হার, বালা, দুল প্রভৃতি অলংকার ব্যবহার করত। নারীরা নানা ধরনের খোঁপা বাঁধত। তারা সোনা, রুপা ও দামি পাথরের বিভিন্ন অলংকার ব্যবহার করত। অলংকারের মধ্যে ছিল কানের দুল, চুড়ি, আংটি, নথ, কোমরবন্ধ, মালা, পায়ের মল প্রভৃতি। এখানকার বাসিন্দারা সুরমা, সুগন্ধি ও নানা ধরনের প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারও করত।

গৃহস্থালির সরঞ্জাম

সিন্ধু সভ্যতায় মাটি, পাথর, তামা, ব্রোঞ্জ, কাঠ প্রভৃতির তৈরি বাসনপত্র ও গৃহস্থালির নানা সামগ্রী পাওয়া গেছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল থালা, বাটি, জগ, আয়না, চিরুনি, কাঁচি, ছুঁচ, ক্ষুর, চেয়ার, টুল, খাট, মাদুর ইত্যাদি। পাথর, তামা, ব্রোঞ্জ প্রভৃতির তৈরি সেই সময়ের কুঠার, বর্শা, তির, ধনুক ইত্যাদি অস্ত্র পাওয়া গেছে।

আমোদ-প্রমোদ

হরপ্পা সভ্যতার মানুষ আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে অবসর সময় কাটাত। এখানে শিশুদের জন্য নানা ধরনের খেলনা, পুতুল, মূর্তি, ঝুমঝুমি ইত্যাদি পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষের আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম ছিল নৃত্য-গীত, পাশা জাতীয় খেলা, শিকার, ষাঁড়ের লড়াই, রথচালনা, মাছ ধরা ইত্যাদি। অর্ধনগ্ন নারীমূর্তিগুলির শৈল্পিক দেহভঙ্গিমা লক্ষ। করে ঐতিহাসিক এ. এল. বাসাম ও স্যার মার্টিমার হুইলার মন্তব্য করেছেন যে, সমাজে দেবদাসী প্রথা ও নৃত্য-গীতের প্রচলন যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক ছিল।

সিল

সিন্ধু উপত্যকায় তামা, ব্রোঞ্জ ও পোড়ামাটির তৈরি অন্তত দুই হাজার সিল পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, মূলত ব্যাবসাবাণিজ্যের জন্যই এই সিলগুলি তৈরি হত। হরপ্পার সিলমোহর সুসা ও মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন নগরে আবিষ্কৃত হয়েছে। সিলগুলিতে অঙ্কিত জীবজন্তু ও জলযানের চিত্র থেকে অনুমান করা যায় যে, সিন্ধুবাসী এইসব জীবজন্তু ও জলযানের সঙ্গে পরিচিত ছিল।

লিপি

সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত সিলমোহরগুলিতে বিভিন্ন চিত্রলিপি উৎকীর্ণ রয়েছে। এগুলি সিন্ধুলিপি নামে পরিচিত। এগুলি দেখতে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা হায়ারোগ্লিফিক লিপির মতো। এতে ২৭০টি অক্ষর আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু আজও ‘সিন্ধুলিপি’র পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কোনোদিন এই লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হলে হরপ্পা সভ্যতার বহু অজানা ইতিহাস জানা যাবে।

সমাজে নারীর স্থান

সিন্ধু সভ্যতায় সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজে নারীদের বিশেষ সম্মান ছিল। খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত বেশ কিছু অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি দেখে ঐতিহাসিকগণ অনুমান করেন যে, এই সভ্যতায় মেয়েরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করত। এছাড়া সিন্ধু সভ্যতার সমাজে প্রাপ্ত নারীমূর্তিগুলির কোনো কোনোটির কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সেই সমাজে নারীজাতির সম্মান ও প্রতিপত্তির প্রমাণ দেয়।

উপসংহার:- কোনো কোনো পন্ডিতের মতে বালুচিস্তানের গ্রামীণ মেহেরগড় সভ্যতার উত্তরসূরি হিসেবে হরপ্পা বা সিন্ধুর নগর সভ্যতার ঘটেছিল। তবে হরপ্পার বিভিন্ন দিকের মতই সমাজ জীবন সম্পর্কেও সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।

(FAQ) হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হরপ্পার অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য কি ছিল?

গম ও যব।

২. হরপ্পায় প্রাপ্ত লিপির নাম কি?

সিন্ধুলিপি।

৩. হরপ্পা সভ্যতার মানুষ কোন পশুর সঙ্গে পরিচিত ছিল না?

ঘোড়া।

৪. হরপ্পা সভ্যতার গৃহপালিত পশুর নাম লেখ।

গোরু, ভেড়া, ছাগল, মহিষ।

Leave a Reply

Translate »