জুলাই বিপ্লবের কারণ

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সংঘটিত জুলাই বিপ্লবের কারণ হিসেবে পরস্পর বিরোধী ভাবধারা, অষ্টাদশ লুইয়ের মতাদর্শ, দশম চার্লসের ভূমিকা, প্রত্যক্ষ কারণ, জুলাই বিপ্লবের সূচনা ও জুলাই বিপ্লব সম্পর্কে জানবো।

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের কারণ

সময়কাল১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ
রাজাদশম চার্লস
প্রধানমন্ত্রীপলিগন্যাক
নেতাএডলফ থিয়ার্স
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের কারণ

ভূমিকা :- ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের পতনের পর ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ন্যায্য অধিকার নীতির ভিত্তিতে ফ্রান্সে প্রাচীন বুরবোঁ রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের ভ্রাতা অষ্টাদশ লুই (১৮১৪-১৮২৪ খ্রিঃ) সিংহাসনে বসেন।

পরস্পর-বিরোধী ভাবধারা

  • (১) এই সময় ফ্রান্সের রাজনীতি খুবই জটিল হয়ে ওঠে এবং ফ্রান্সে পরস্পর-বিরোধী মতাদর্শযুক্ত একাধিক রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হয়। ফ্রান্সের সিংহাসনে বুরবোঁ রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দেশত্যাগী অভিজাত ও যাজকেরা ফ্রান্সে ফিরে আসে।
  • (২) বিপ্লবের সময় তাদের ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের হধ্যে বণ্টন করা হয় এবং তাদের বিশেষ অধিকার লোপ করা হয়। স্বদেশ প্রত্যাগত এইসব অভিজাত ও যাজকেরা বিপ্লবী আমলের সকল সংস্কার বাতিল করে তাদের পূর্বতন অধিকার ও পুরাতনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।
  • (৩) এই উদ্দেশ্যে তারা রাজভ্রাতা ডিউক অব অর্টয়েস-এর নেতৃত্বে উগ্র রাজতন্ত্রী দল (Ultra Royalist Party) গড়ে তোলে। এই দলের বিরুদ্ধে ছিল উদারপন্থী দল ও প্রজাতন্ত্রী দল। তারা বিপ্লবী যুগের পরিবর্তনগুলিকে রক্ষা করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। এই দলগুলির পারস্পরিক সংঘাতে ফ্রান্সের অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।

অষ্টাদশ লুই-এর মতাদর্শ

  • (১) ফরাসি সম্রাট অষ্টাদশ লুই স্পষ্টই উপলব্ধি করেন যে, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রকেকখনোই পূর্বতন অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বা বিপ্লবী আমলের পরিবর্তনগুলিকেও অস্বীকার করা বা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
  • (২) এই কারণে তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, পুনঃস্থাপিত রাজতন্ত্রের সঙ্গে বিপ্লবী ভাবধারার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন।
  • (৩) এই উদ্দেশ্যে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি শাসনতান্ত্রিক সনদ জারি করে আইনের চোখে সবার সমানাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার, দ্বিকক্ষ-বিশিষ্ট আইনসভা এবং বিপ্লবী যুগের ভূমি-সংস্কার প্রভৃতি মেনে নেন।
  • (৪) তিনি বলতেন, “জনবিরোধী নীতি গ্রহণ করে আমি আর ভ্রমণকারী জীবনে ফিরে যেতে চাই ও না।” তাঁর আমলে দেশে মোটামুটি শান্তি বিরাজিত ছিল এবং জনগণের কাছেও তিনি সহনীয় ছিলেন।

দশম চার্লস

  • (১) ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে অষ্টাদশ লুই-এর মৃত্যু হলে তাঁর ভ্রাতা ডিউক অব আর্টয়েস তথা উগ্র রাজতন্ত্রী দলের ভূতপূর্ব নেতা দশম চার্লস ‘সম্রাট’ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। তিনি ঈশ্বর প্রদত্ত রাজতন্ত্র ও পুরাতনতন্ত্রের উগ্র সমর্থক ছিলেন।
  • (২) তাঁর লক্ষ্যই ছিল অষ্টাদশ লুই-অনুসৃত মধ্যপন্থাকে বিসর্জনদিয়ে স্বৈরশাসন, অভিজাততন্ত্র ও ক্যাথলিক গির্জার প্রাধান্য স্থাপন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি বরং কাঠ চেরাই করে জীবনধারণ করব, তবু ইংল্যান্ডের রাজার মতো (ক্ষমতাহীন) রাজা হব না।”
  • (৩) বিপ্লবের সময় যে সব অভিজাতদের জমি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তিনি তাঁদের ক্ষতিপূরণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে ধর্মযাজকদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং নির্বাসিত জেসুইটদের দেশে ফিরিয়ে এনে উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করেন।
  • (৪) এই প্রসঙ্গে ওয়েলিংটন মন্তব্য করেন, “এটি ছিল ধর্মযাজকদের দ্বারা, ধর্মযাজকদের মাধ্যমে, ধর্মযাজকদের জন্য সরকার” (“It was a government by the priests, through the priests and for the priests.”)।

প্রত্যক্ষ কারণ

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে দশম চার্লস পলিগন্যাক নামে জনৈক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জুলাই অষ্টাদশ লুই প্রদত্ত ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের সনদ বাতিল করে দেন। ২৫শে জুলাই পলিগন্যাক চারটি স্বৈরাচারী অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এর দ্বারা আইনসভা ভেঙে দেওয়া হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলোপ করা হয়, ভোটাধিকার সংকুচিত করা হয় এবং অল্পসংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের দিন ঘোষিত হয়।

বিপ্লবের সূচনা

এই অর্ডিন্যান্স জারির সঙ্গে সঙ্গে উদারপন্থী নেতা এডলফ থিয়ার্স-এর নেতৃত্বে প্যারিসের জনসাধারণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ মানুষ, ছাত্র ও শ্রমিকরা প্যারিসের রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পূর্বতন ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়।

জুলাই বিপ্লব

২৭শে জুলাই থেকে প্যারিসের জনতা পথে নামে। ২৮শে জুলাই বিদ্রোহী জনতা প্যারিসের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। ৩০শে জুলাই বিদ্রোহী জনসাধারণ দশম চার্লসকে সিংহাসনচ্যুত করে অলিয়েন্স বংশের লুই ফিলিপ-কে ফ্রান্সের রাজা বলে ঘোষণা করে।

উপসংহার :- এইভাবে মাত্র তিনটি গৌরবময় দিনের (২৭-২৯শে জুলাই) মাধ্যমে ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হয়। বিপ্লবী ভাবধারা ও জনগণ আবার স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের পতন ঘটায়।

(FAQ) জুলাই বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোথায় জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়?

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ফ্রান্সে।

২. জুলাই বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের রাজা কে ছিলেন?

দশম চার্লস।

৩. জুলাই বিপ্লবের পর কে ফ্রান্সের রাজা নির্বাচিত হন?

অর্লিয়েন্স বংশের লুই ফিলিপ।

Leave a Reply

Translate »