রাসবিহারী বসু

রাসবিহারী বসুর জন্ম, বংশ পরিচয়, শৈশব, শিক্ষা, বিবাহ, যোগদান, ত্রাণকার্যে যোগদান, কর্মজীবন, আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত, বড়লাট হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা হামলার পরিকল্পনা, দেশ ত্যাগ, জাপানে আগমন, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ প্রতিষ্ঠা, আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রতিষ্ঠা, সম্মাননা ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

রাসবিহারী বসু

জন্ম২৫ মে, ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দ
পিতামাতাবিনোদবিহারী বসু ও ভুবনেশ্বরী দেবী
জাতীয়তাভারতীয়
প্রতিষ্ঠানযুগান্তর, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ, আজাদ হিন্দ ফৌজ
আন্দোলনভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন
মৃত্যু১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ
রাসবিহারী বসু

ভূমিকা :- ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন অন্যতম বিপ্লবী নেতা ছিলেন রাসবিহারী বসু। তিনি ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের স্রষ্টা এবং ভারতীয় বিপ্লবীদের ইতিহাসেইতিহাসে এক বিশিষ্ট চরিত্র।

জন্ম

রাসবিহারী বসু ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ শে মে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলায় অবস্থিত সুবলদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷

বংশ পরিচয়

তার পিতা ছিলেন বিনোদবিহারী বসু এবং তাঁর মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী। তিনকড়ি দাসী ছিলেন তাঁর ধাত্রী মাতা৷ তাঁর পিতামহ ছিলেন কালীচরণ বসু৷

শৈশব

  • (১) রাসবিহারী বসু এবং তাঁর ভগিনী সুশীলা সরকারের শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছিল সুবলদহ গ্রামের বিধুমুখী দিদিমণির ঘরে। বিধুমুখী ছিলেন কালিচরণ বসুর বাল্যবিধবা ভ্রাতৃবধূ।
  • (২) রাসবিহারী বসু শৈশবে লাঠিখেলা শিখেছিলেন সুবলদহ গ্রামের শুরিপুকুর ডাঙায়। শোনা যায় যে, তিনি ইংরেজদের মূর্তি তৈরি করতেন এবং লাঠি খেলার কৌশলে সেই মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেলতেন।
  • (৩) তিনি তার ঠাকুরদা কালিচরণ বসু এবং তার শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী গল্প শুনে তার বিপ্লবী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
  • (৪) তিনি ছিলেন গ্রামবাসীদের নয়নের মণি।  তিনি ডাংগুলি খেলতে খুব ভালোবাসতেন।
  • (৫) তিনি শৈশবে সুবলদহ গ্রামে ১২-১৪ বছর ছিলেন। এছাড়াও তিনি পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে প্রয়োজনে সুবলদহ গ্রামে এসে আত্মগোপন করতেন।

শিক্ষা

  • (১) রাসবিহারী বসুর শৈশবের পড়াশোনা সুবলদহের গ্রাম্য পাঠশালায়। সেই পাঠশালা বর্তমানে সুবলদহ রাসবিহারী বসু প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত।
  • (২) তিনি মর্টন স্কুল ও ডুপ্লে কলেজের ছাত্র ছিলেন।

বিবাহ

জাপানে অবস্থানকালে ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দের রাসবিহারী বসু জাপানি সোমা পরিবারের কন্যা তোশিকো সোমাকে গোপনে বিবাহ করেন৷ তাদের দুই সন্তানের নাম হল তেৎসুকো হিগুচি বসু ও মাশাহিদে বসু (ভারতীয় নাম ভারতচন্দ্র)৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মাত্র ২৪ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে মাশাহিদের মৃত্যু ঘটে৷

কর্মজীবন

পরবর্তীকালে তিনি দেরাদুনে যান এবং সেখানে বন্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে হেড ক্লার্ক হিসেবে কাজে যোগদান করেন। দেরাদুনে তিনি গোপনে বাংলা, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন।

ত্রাণকার্যে যোগদান

১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই-আগষ্ট মাসে দামোদর নদের উপচে পড়া জলে বর্ধমানে ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয়। রাসবিহারী ত্রাণকাজের জন্য সুবলদহ গ্রামে ফিরে আসেন। এই সময় যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘ যতীন) এই ত্রাণ কার্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাঘ যতীন সমস্ত বিপ্লবী নেতা-কর্মীদের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াবার ডাক দেন।

আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত

জীবনের প্রথম দিকে তিনি নানা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং আলিপুর বোমা বিস্ফোরণ মামলায় ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে অভিযুক্ত হন।

বড়লাট হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা হামলা

বিপ্লবী হিসেবে তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব ছিল বড়লাট হার্ডিঞ্জের ওপর প্রাণঘাতী হামলা। বিপ্লবী কিশোর বসন্ত বিশ্বাস তাঁর নির্দেশে ও পরিকল্পনায় দিল্লিতে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে হার্ডিঞ্জকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়েন। এই ঘটনায় পুলিশ তাকে কখনোই গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

বিপ্লবী আন্দোলনের পরিকল্পনা

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বাঘা যতীন, রাসবিহারী বসু বিপ্লবী আন্দোলনের পরিকল্পনা করেন। কৃপাল সিং নামে এক বিপ্লবীর বিশ্বাসঘাতকতায় পরিকল্পনা ব্যহত হয় এবং রাসবিহারী বসু আত্মগোপন করেন।

পাসপোর্ট সংগ্রহ

তিনি নিজেই পাসপোর্ট অফিস থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয়, রাজা প্রিয়নাথ ঠাকুর ছদ্মনামে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।

দেশ ত্যাগ

১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ মে কলকাতার খিদিরপুর বন্দর থেকে জাপানি জাহাজ ‘সানুকি-মারু’ সহযোগে ছদ্মনামে ভারত ত্যাগ করেন।

জাপানে আগমন

রাসবিহারী বসু দেশ ত্যাগ করে জাপানে চলে আসেন। জাপানের মাটিতে বসেও তিনি দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখলেন ও এক নতুন পরিকল্পনা নিলেন।

জাপানের সহযোগিতা

তারই তৎপরতায় জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের পাশে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন যোগায়।

ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লীগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮-২৯ মার্চ টোকিওতে তাঁর ডাকে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ বা ভারতীয় স্বাধীনতা লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি এই সম্মেলনে একটি সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেন।

আজাদ হিন্দ ফৌজের ভিত্তি স্থাপন

ভারতের বাইরে যে সব ভারতীয় বাস করত তাদের নিয়ে একটি জাতীয় সেনাবাহিনী সংগঠনের প্রস্তাবে সকলে সম্মত হন। এই প্রস্তাবের ফলেই ১৯৪২ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের ভিত্তিস্থাপিত হল।

নেতাজীর হাতে দায়িত্ব অর্পণ

১৯৪৩ সালের ২ রা জুলাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আবির্ভূত হলেন সিঙ্গাপুরে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সমস্ত দায়িত্ব নেতাজীর ওপর দিয়ে রাসবিহারী বসু নিশ্চিন্ত হন।

সম্মাননা

  • (১) জাপান সরকার ১৯৪৩ সালে রাসবিহারী বসুকে সম্মানসূচক “সেকেন্ড অর্ডার অব দি মেরিট অব দি রাইজিং সান” খেতাবে ভূষিত করে৷
  • (২) ১৯৬৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার তার স্মৃতিরক্ষার্থে ৩.৩৪ X ২.৪০ সেন্টিমিটারের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

মৃত্যু

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি জাপানে রাসবিহারী বসুর মৃত্যু হয়।

উপসংহার :- অকুতোভয় বর্ণময় জীবনের ধারক রাসবিহারী বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে তিনি বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন।

(FAQ) রাসবিহারী বসু সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ” কে গঠন করেন?

রাসবিহারী বসু।

২. ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ এর সভাপতি ছিলেন কে?

রাসবিহারী বসু।

৩. আজাদ হিন্দ ফৌজে’র প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

রাসবিহারী বসু।

Leave a Reply

Translate »