মুসোলিনির অভ্যন্তরীন নীতি

মুসোলিনির অভ্যন্তরীন নীতি প্রসঙ্গে ফ্যাসিস্ট প্রাধান্য, একদলীয় শাসন, ফ্যাসিস্ট প্রশাসন, শ্রমিক ও শিল্পনীতি, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

মুসোলিনির অভ্যন্তরীন নীতি

ঘটনামুসোলিনির অভ্যন্তরীণ নীতি
প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্ৰহণ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ
উপাধিইল-ডুচে বা একনায়ক
ল্যাটেরান চুক্তি১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যুদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে
মুসোলিনির অভ্যন্তরীন নীতি

ভূমিকা:- ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মুসোলিনি ইতালিতে ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। বিরোধী দলগুলির উপর নানা ধরনের অত্যাচার ও দমন-পীড়ন চলতে থাকে। বিরোধী নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ বা হত্যা করা হয়। এইভাবে সব রকম ফ্যাসিস্ট-বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফ্যাসিস্ট প্রাধান্য

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে গুণ্ডামি, সন্ত্রাস ও কারচুপির দ্বারা ফ্যাসিবাদী দল ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

আইন সভা বয়কট

নির্বাচনে সন্ত্রাসের সমালোচনা করায় ফ্যাসিস্ট দল জুন মাসে বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী নেতা গিয়াকোমে মাত্তেওতি-কে হত্যা করলে সব বিরোধী দল একযোগে আইনসভা বয়কট করে। এর ফলে ইতালির সংসদে ফ্যাসিস্টদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

একদলীয় শাসন ব্যবস্থা

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে যে নতুন সংবিধান প্রবর্তিত হয়, তার দ্বারা ইতালিতে অন্যান্য দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং ইতালীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট দলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসোলিনি ‘ইল-ডুচে’ বা একনায়ক উপাধি ধারণ করেন।

ফ্যাসিস্ট প্রশাসন

মুসোলিনির ফ্যিসিস্ট প্রশাসনের বিভিন্ন দিক গুলি হল :-

(১) নিজের হাতে দায়িত্ব

রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মুসোলিনি রাষ্ট্রযন্ত্রটি ভেঙে দেন নি বরং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন নি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইন প্রণয়ন, সরকারি আদেশ জারি করে শাসনের ব্যবস্থা, সকল উচ্চপদে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা তিনি নিজের হাতেই রাখেন।

(২) ফ্যাসিস্ট দল সর্বেসর্বা

একেবারে গ্রাম থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট দলের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। মুসোলিনির ব্যবস্থায় দেশের মধ্যে ফ্যাসিস্ট দলই ছিল সর্বেসর্বা।

(৩) ফ্যাসিস্ট গ্ৰ্যান্ড কাউন্সিল

প্রশাসনের নিম্নতম স্তরে ছিল ১০ হাজার ফ্যাসি, এবং এইভাবে ক্রমবিন্যস্ত এই ব্যবস্থার একেবারে শীর্ষে ছিল ২০ জন বিশিষ্ট ফ্যাসিস্ট নেতাকে নিয়ে গঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটি – ‘ফ্যাসিস্ট গ্র্যান্ড কাউন্সিল’।

(৪) স্থায়ী সভাপতি মুসোলিনি

এদের হাতে ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। এই কাউন্সিলের ক্ষমতা আবার কেন্দ্রীভূত ছিল সভাপতি মুসোলিনির হাতে। তিনি ছিলেন এর স্থায়ী সভাপতি। রাজনীতিতে প্রবেশ করতে গেলে দলীয় সদস্যপদ গ্রহণ ছিল বাধ্যতামূলক।

(৫) তরুণ ও যুব সংগঠন

ফ্যাসিস্টদের তরুণ ও যুব সংগঠন ‘বালিলা’, ‘অ্যাভান গার্ডিয়া’, ‘জিওভানি ফ্যাসিস্ট’ প্রভৃতির সদস্যদের দলীয় সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হত।

(৬) চাকরিতে নিয়োগ

সরকারি, আধা-সরকারি-সমস্ত চাকরি এবং সেনাবাহিনীতে কেবল ফ্যাসিস্টদেরই নিয়োগ করা হত। ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সরকারি কর্মচারীদের বরখাস্ত করা হয় এবং দলের মাধ্যমেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।

(৭) রাষ্ট্রদ্রোহিতা

বাক্‌-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং ফ্যাসিবাদী সংবাদপত্র ব্যতীত সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করা হয়। ফ্যাসিবিরোধী সব সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। ফ্যাসিস্ট দলের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হত।

(৮) জনগণের ভূমিকা বাতিল

স্বায়ত্তশাসনমূলক সব প্রতিষ্ঠানে জনগণের ভূমিকা বাতিল করা হয় এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সব নির্বাচন বাতিল করা হয়। রোমে অবস্থানকারী ‘পোডেস্টাস’ নামক একশ্রেণির কর্মচারীর হাতে পৌর-প্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বভার অর্পিত হয়।

(৯) মুসোলিনির লক্ষ্য

মুসোলিনির লক্ষ্য ছিল সমস্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপন। রাষ্ট্রই হবে সকল ক্ষমতার আধার, উৎস ও অধিকারী। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্র বলতে মুসোলিনি বুঝতেন নিজেকে ও তাঁর দলকে।

(৬) তিনি শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেন। এই সময় ট্রেন চলত ঘড়ির কাঁটা ধরে। তাঁর আমলে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটে। জল, স্থল ও বিমান বাহিনীর আধুনিকীকরণ ঘটিয়ে তিনি ইতালির সামরিক শক্তির উন্নতি ঘটান।

শ্রমিক ও শিল্পনীতি

মুসোলিনির লক্ষ্য ছিল সকলের সহযোগিতায় ইতালিকে একটি ‘কর্পোরেট রাষ্ট্র’ (যৌথ রাষ্ট্র) হিসেবে গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে তিনি,

  • (১) ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এক আইন দ্বারা ১৩টি সিন্ডিকেট বা কর্পোরেশন গঠন করেন। এগুলির মধ্যে ৬টি ছিল মালিক শ্রেণির, ৬টি শ্রমিক শ্রেণির এবং ১টি ছিল বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত। এই ১৩টি সিন্ডিকেটই মুসোলিনির নির্দেশ অনুসারে চলত।
  • (২) ট্রেড ইউনিয়নগুলি ভেঙে দিয়ে শ্রমিক আদালত গঠন করা হয়। এখানে শ্রমিক-মালিক বিবাদের নিষ্পত্তি করা হত। কারখানায় ধর্মঘট, লক আউট প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল।
  • (৩) শ্রমিক ও মালিকদের সিন্ডিকেটগুলি শিল্প-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি, মজুরির হার, আমদানি-রপ্তানি নীতি প্রভৃতি স্থির করত।

কৃষি

তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে নজর দেন। এক্ষেত্রে কৃষির উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন –

  • (১) তিনি কৃষিকাজে উৎসাহ প্রদান করেন এবং তাঁর আগ্রহে বহু জলাভূমি, পতিত ও অনাবাদি জমিকে চাষের অধীনে আনা হয়। তিনি ‘কৃষি বিপ্লবের’আহ্বান জানান। তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকার্যের উপর গুরুত্ব দেন এবং উন্নত বীজ, সার, লাঙ্গল ও প্রপাতি ব্যবহারে উৎসাহ দেন।
  • (২) ব্যাঙ্ক থেকে কৃষি ঋণেরও ব্যবস্থা করা হয়। জলপাই ও অন্যান্য ফলের চাষ কমিয়ে দিয়ে গম উৎপাদনের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। মুসোলিনি একে ‘গমের যুদ্ধ’ বলেছেন। গমের পর ধান, যব, তুলো, তামাক প্রভৃতি অন্যান্য শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির দিকেও নজর দেওয়া হয়।
  • (৩) দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খাদ্যদ্রব্যের উপর তিনি উচ্চহারে শুষ্ক আরোপ করেন। এইভাবে ইতালি খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে এবং বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি হ্রাস পায়।

শিল্প

  • (১) অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেকার সমস্যার সমাধানকল্পে মুসোলিনি বেশ কিছু হাসপাতাল, সেতু, রাস্তাঘাট ও রেলপথ নির্মাণ এবং জলাজমি উদ্ধার প্রভৃতির ব্যবস্থা করেন।
  • (২) শিল্পোন্নয়নের উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি ‘শিল্পেময়ন দপ্তর’ স্থাপন করেন। এই দপ্তরের পরামর্শ মতো নতুন কারখানা স্থাপন, পুরোনো কারখানাগুলির সংস্কার ও সম্প্রসারণ, কারখানাগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণদান, শ্রমিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ প্রভৃতি ব্যবস্থানি করা হত।
  • (৩) তাঁর উদ্যোগে দেশে জাহাজ ও বিমান নির্মাণ এবং বেতার, বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, মোটরগাড়ি, সিল্ক প্রভৃতি শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

বাণিজ্য

বাণিজ্যের প্রসার ঘটাবার উদ্দেশ্যে সরকারি অনুদানের সাহায্যে নতুন জাহাজ কোম্পানি খোলা হয়। এর ফলে রাশিয়া, বলকান অঞ্চল ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমুদ্র বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ইতালীয় পণ্য বিদেশে রপ্তানি হতে থাকে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘ফ্যাসিস্ট সিন্ডিক্যালিজম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়।

শিক্ষা

মুসোলিনি শিক্ষাবিস্তারের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এই উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থব্যয় করেন। যেমন –

  • (১) নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারে তিনি যথেষ্ট উদ্যোগ নেন। তাঁর আমলে স্কুল-শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। তাঁর উদ্যোগে দেশে বহু স্কুল ও কলেজ গড়ে ওঠে।
  • (২) তাঁর শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ভাবধারার প্রতি অনুগত নাগরিক তৈরি করা। এই উদ্দেশ্য নিয়েই বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকগুলি রচিত হয়। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিতে ফ্যাসিস্ট ছাড়া অপর কাউকে নিয়োগ করা হত না। শিক্ষায়তনগুলিতে মুসোলিনির ছবি টাঙিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল।

স্বাস্থ্য

দেশবাসীর স্বাস্থ্যের দিকেও সরকার যথেষ্ট নজর দেয়। মশানাশক ওষুধের ব্যবহার ও জলাজমি পরিষ্কার করে ইতালির মারাত্মক ব্যাধি ম্যালেরিয়া দমন করা হয়। এছাড়া, গুণ্ডা ও সমাজবিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করা হয়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয় – মুসোলিনি চাইতেন জনসংখ্যা বৃদ্ধি। যুদ্ধজয়ের জন্য বিশাল সেনাবাহিনীর প্রয়োজন। তাই মুসোলিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধি চাইতেন। এই কারণে সরকার থেকে বাল্যবিবাহ, বৃহৎ পরিবার এবং অধিক সংখ্যক সন্তানের জননীদের উৎসাহ দান করা হত।

পোপের সঙ্গে মীমাংসা

দীর্ঘদিনের বিবাদ মিটিয়ে নিয়ে পোপের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপন মুসোলিনির অন্যতম কৃতিত্ব। গির্জার সাহায্যে জনসাধারণের উপর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পোপের সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তি সম্পাদন করেন। ল্যাটেরান প্রাসাদে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে এর নাম ল্যাটেরান চুক্তি।

ল্যাটেরান চুক্তির শর্ত

এই চুক্তি অনুসারে,

  • (১) রোমান ক্যাথলিক ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং রোমের ভ্যাটিকান নগরীকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। ভ্যাটিকান সরকারকে নিজস্ব মুদ্রা, ডাকটিকিট, রেলপথ ও টেলিগ্রাফ স্থাপনের অধিকার দেওয়া হয়।
  • (২) পোপ বিদেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূত গ্রহণের অধিকার লাভ করেন। স্বাধীন রাজার মতো পোপকে ‘পবিত্র’ ও ‘আইনের বর্হিভূত’ বলে ঘোষণা করা হয়।
  • (৩) অপরপক্ষে, পোপ স্যাভয় বংশের অধীনস্থ ইতালি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন। এইভাবে মুসোলিনি ধর্মভীরু ইতালীয়দের সমর্থন লাভ করে নিজ রাজনৈতিক প্রতিপত্তি সুদৃঢ় করেন।

সমালোচনা

মুসোলিনির একনায়কন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ নীতিকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না। কারণ,

(১) প্রতিবাদের উপায়হীন

তাঁর শাসনাধীনে সংসদীয় রীতি-নীতি, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার সব কিছুই পদদলিত হয়। বিরোধী দল না থাকায় এবং সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করায় সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ জানাবার কোনও উপায় ছিল না।

(২) কাজে বাধা প্রদান

সাংবিধানিকভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও, বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন ‘ডিক্টেটর’। সামার ওয়েলস বলেন যে, সরকারি কর্মচারীরা ছিল উর্দিপরা ভৃত্য। রাজা থেকে মন্ত্রী, সেনাপতি থেকে শিল্পপতি – কেউই মুসোলিনির কোনও কাজে বাধা দিতে সাহস পেত না।

(৩) শাস্তির ভয়

তাঁর শাসনাধীনে জনগণের আর্থিক অবস্থার কোনও উন্নতি হয় নি। শ্রমিকদের মজুরি ছিল কম, পরিশ্রম ছিল অনেক বেশি। এছাড়া, এই দলের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করা। শিল্পপতি ও ভূস্বামীদের সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিক-কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়। তাঁর শাসনে শ্রমিকদের অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেও কৃষকদের ক্ষেত্রে কিছুই হয় নি, কিন্তু শাস্তির ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারত না।

(৩) বাণিজ্য ক্ষতিগ্ৰস্ত

মুসোলিনি জলপাই ও অন্যান্য ফলের চাষ কমিয়ে গমের চাষ বাড়াতে সচেষ্ট হন। তাই যে জমিতে জলপাই ফলে সেখানে জোর করে গমের চাষ করাতে গিয়ে জলপাই বা গম কোনওটার ফলনই ঠিকমতো হয় নি। ফলে জলপাই ও অন্যান্য ফলের রপ্তানি-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ইতালি বঞ্চিত হয়।

(৪) কৃষি উৎপাদন হ্রাস

ভূমিসংস্কার করে কৃষকদের হাতে জমি পৌঁছে না দেওয়ায় কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়।

(৫) জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল

তিনি লোকসংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতেন, বহু সংখ্যক সন্তানের জননীদের পুরস্কৃত করা হত, কিন্তু এই বাড়তি লোকসংখ্যার খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য দ্রব্যাদি যোগান দেওয়া সম্ভব ছিল না।

(৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

১৯৩০-এর বিশ্বব্যাপী মন্দার পর থেকে ইতালি ভারসাম্য হারাতে থাকে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইতালির অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের ফলে ইতালির অর্থনৈতিক অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে পড়ে।

উপসংহার:- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মুসোলিনির স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল গণ-বিক্ষোভ শুরু হয় এবং গণরোষে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতেই তার মৃত্যু ঘটে। ক্রুদ্ধ জনতা মুসোলিনি ও তাঁর উপপত্নী ক্লারা পেত্রাচ্চি-র মৃতদেহ দুটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়।

(FAQ) মুসোলিনির অভ্যন্তরীন নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মুসোলিনি পোপের সাথে কোন চুক্তি স্বাক্ষর করেন?

ল্যাটেরান চুক্তি (১৯২৯)।

২. মুসোলিনি কবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন?

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে।

৩. মুসোলিনি কি উপাধি ধারণ করেন?

ইল-ডুচে বা একনায়ক।

৪. কোন যুদ্ধের সময় মুসোলিনির মৃত্যু হয়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

Leave a Reply

Translate »