সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস প্রসঙ্গে সন্ন্যাসী অগম্যগুরুর অবদান, সংঘের নায়ক বিনায়ক সাভারকার, ছাত্র কমিটি গঠন, অভিনব ভারত সংঘ, মিত্রমেলা, অভিনব নব্য ভারত সংঘ, সংঘের শাখা বিস্তার, ম্যাৎসিনির আত্মজীবনী মারাঠী ভাষায় অনুবাদ, পুস্তিকা প্রকাশ সম্পর্কে জানবো।

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস

ঐতিহাসিক ঘটনাসাভারকর ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস
বিনায়ক দামোদর সাভারকার১৮৮৩-১৯৬৬ খ্রি:
গণেশ দামোদর সাভারকার১৮৭৯-১৯৪৫ খ্রি:
মিত্রমেলা১৮৯৯ খ্রি:
মিত্র মেলার প্রধান কেন্দ্রনাসিক
নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা১৯০৯ খ্রি:
সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস

ভূমিকা :- সাভারকর ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রধান কর্মকেন্দ্র ছিল বোম্বাই প্রদেশের নাসিক শহর। পুনার পরেই নাসিক শহর মহারাষ্ট্রের বিপ্লব প্রচেষ্টার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠে।

সন্ন্যাসী অগম্যগুরুর অবদান

  • (১) ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে অগম্যগুরু পরমহংস নামে এক সন্ন্যাসী এক ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। এই সন্ন্যাসী সারা ভারতবর্ষে ঘুরে ঘুরে নির্ভীকভাবে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার কার্য চালাতেন।
  • (২) তিনি তাঁর প্রচারে বলতেন, ব্রিটিশ শাসনকে ভয় করবার কোনো কারণ নেই, ভারতবাসীকে আত্মত্যাগের দ্বারা উদ্বুদ্ধ করে তাদের দ্বারা এই সরকারের উচ্ছেদ করতে হবে।

সংঘের নায়ক বিনায়ক সাভারকার

সন্ন্যাসী অগম্যগুরুর প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল ছাত্র ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম ভাগে পুনা শহরে একটি সংঘ গঠন করে। বিনায়ক সাভারকর এই সংঘের নায়ক নির্বাচিত হলে তিনি সন্ন্যাসীর সাথে সাক্ষাতের জন্য পুনায় আমন্ত্রিত হন।

বিনায়ক সাভারকারের ছাত্র কমিটি গঠন

  • (১) পুনায় উপস্থিত হয়ে সাভারকর সন্ন্যাসীর এই আন্দোলন সফল করে তুলবার উদ্দেশ্যে নয়জন ছাত্র নিয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। পুণার ফার্গুসন কলেজের নয়জন ছাত্র নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়।
  • (২) এই কমিটি পূণার সকল অধিবাসীর নিকট হইতে এক আনা করিয়া চাঁদা সংগ্রহ করে। এই চাদা আদায়ের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ-বিরোধী প্রচার ও সংগ্রামের জন্য তহবিল গঠন।

গণেশ সাভারকারের অভিনব ভারত সংঘ

১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে সাভারকর ইংল্যাণ্ডে চলে এলে এই সংঘটি উঠে যায় এবং এর অধিকাংশ সভ্য ‘অভিনব ভারত সংঘ’ নামে আর একটি সংগঠনে যোগদান করে। বিনায়ক সাভারকরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গণেশ সাভারকর ছিলেন এই সংঘের প্রতিষ্ঠাতা।

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের মিত্রমেলা

  • (১) বিনায়কের ইংল্যাণ্ড যাত্রার পূর্বেই, ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে নাসিক শহরে তিনি ও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গণেশ সাভারকর একত্রে ‘মিত্র মেলা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ‘গণপতি-উৎসব’ উপলক্ষ করে ‘মিত্র মেলা’ গঠিত হলেও কেবল মাত্র ‘গণপতি-উৎসব’ পালন করাই এর উদ্দেশ্য ছিল না।
  • (২) ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের আয়োজন করাই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। গণেশ সাভারকর এই সংঘের সভ্যদের শারীরিক ব্যায়াম, ছোরাখেলা, সামরিক কুচকাওয়াজ শিক্ষা দিতেন।

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের অভিনব নব্য ভারত সংঘ

  • (১) এই সংঘটিই অল্প কিছুদিন পরে ইতালীর সন্ত্রাসবাদী সংগ্রামের নায়ক ম্যাৎসিনির ‘নব্য ইতালী’ নামক সংঘের আদর্শে ‘অভিনব নব্য ভারত সংঘ’ নামে পুনর্গঠিত হয়। বিনায়ক ইংল্যাণ্ড যাত্রার পূর্বেই এই নুতন সংঘটি প্রতিষ্ঠা করেন। নাসিক শহরই ছিল এই সংঘের প্রধান কর্মকেন্দ্র।
  • (২) ‘অভিনব নব্য ভারত সংঘ’-এর আদর্শগত ভিত্তি ছিল চাপেকার ভ্রাতৃদ্বয়ের হিন্দুধর্মের অন্তরায় বিনাশী সংঘ থেকে আরও গভীর ও ব্যাপক। ‘অভিনব নব্য ভারত সংঘ’-এর প্রত্যেকটি সভ্যকে গণপতি ও শিবাজীর নামে কঠিন শপথ গ্রহণ করতে হত।
  • (৩) পরবর্তীকালে এই সংঘের বিভিন্ন দলিলপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে, এর প্রতিষ্ঠাতাগণ ( সাভারকর ভ্রাতৃদ্বয়) রাশিয়ার বিভিন্ন বৈপ্লবিক সংঘের আদর্শেই একে গড়ে তুলবার প্রয়াস করেছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা ফ্রন্টসাহেবের রচিত ‘১৭৭৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপীয় বিপ্লবের গোপন সংঘ’ নামে গ্রন্থের সাহায্য গ্রহণ করতেন।
  • (৪) এই গ্রন্থে সমগ্র রাশিয়াব্যাপী ‘নিহিলিস্ট’দের সংগঠন পদ্ধতির যে বিবরণ দেওয়া আছে তা ‘অভিনব নব্য ভারত-সংঘ’-এর সংগঠন গড়ে তুলবার জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ করা হয়েছিল।
  • (৫) ‘নিহিলিস্ট’রা এক-একটি ক্ষুদ্র এলাকায় এক একটি ক্ষুদ্র ‘চক্র’ বা ক্ষুদ্র দল গঠন করত, সেই ‘চক্র’ বা দল একটি বৃহত্তর অঞ্চলের পরিচালক কমিটির অধীনে পরিচালিত হত। প্রত্যেক চক্র বা দলের সভ্যগণ পরস্পরকে চিনত, কিন্তু অপর কোনো চক্রের সভ্যদের তারা জানতে পারত না।
  • (৬)’অভিনব নব্য ভারত সংঘটি’কেও ঠিক এই সাংগঠনিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়েছিল। বিনায়ক সাভারকর ইংল্যাণ্ডে চলে গেলে এর পরিচালনার ভার পড়ে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গণেশ সাভারকরের উপর।

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের অভিনব নব্য ভারত সংঘের শাখা বিস্তার

গণেশের সুযোগ্য পরিচালনায় শীঘ্রই সমগ্র দাক্ষিণাত্যে এর শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে। ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে যখন ‘নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা’ আরম্ভ হয়, তখন এই সংঘের শাখা-প্রশাখা দাক্ষিণাত্যের বোম্বাই, নাসিক (প্রধান কেন্দ্র), পুণা, ঔরঙ্গাবাদ, হায়দরাবাদ, সাতারা প্রভৃতি স্থানে বিস্তার লাভ করেছিল এবং এই সকল কেন্দ্রের কর্মীরা এই ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন।

বিদেশ থেকে বিনায়ক সাভারকরের নির্দেশ ও প্রবন্ধ প্রেরণ

বিনায়ক সাভারকর বিদেশ থেকে নির্দেশ ও প্রবন্ধ পাঠিয়ে এই সংঘের আদর্শ ও প্রেরণা যোগাতেন। এই সংঘের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও দৃঢ় এবং ব্যাপকতর করে তুলবার জন্য তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বৈপ্লবিক সংগঠন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তা ভারতবর্ষে প্রেরণ করতেন।

বিনায়ক সাভারকার কর্তৃক ম্যাৎসিনির আত্মজীবনী মারাঠী ভাষায় অনুবাদ

  • (১) ইংল্যাণ্ডে থাকা কালেই বিনায়ক ইতালীর বিখ্যাত সন্ত্রাসবাদী নায়ক ম্যাৎসিনির ‘আত্মজীবনী’ মারাঠী ভাষায় অনুবাদ করে তা তাঁর ভ্রাতা গণেশের নিকট প্রেরণ করেন। ১৯০৭ খ্ৰীষ্টাব্দে গণেশ এই গ্রন্থখানি ছাপিয়ে সংঘের সভ্যদের মধ্যে বিতরণ করেন।
  • (২) এই অনুবাদের ভূমিকায় বিনায়ক উক্ত সংঘের আদর্শ ও সংগঠন সম্পর্কে তাঁর মত ব্যক্ত করেন। তিনি তাঁর এই ভূমিকায় লিখেছিলেন যে, রাজনীতিকে একটি ধর্ম বলে গ্রহণ করে এর জন্য আত্মোৎসর্গ করতে হবে।
  • (৩) তিনি শিবাজীর গুরু রামদাস স্বামীকে “ভারতবর্ষের ম্যাৎসিনি” আখ্যা দান করেন। তিনি তার ভূমিকায় আরও লিখেছিলেন যে, ম্যাৎসিনি যেমন ইতালীর স্বাধীনতার জন্য যুব সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর করেছিলেন, ভারতবর্ষেও সেরূপ করতে হবে।

বিনায়ক সাভারকার কর্তৃক দ্বিবিধ কার্যসূচী ঘোষণা

বিনায়ক ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-সংগ্রামের দ্বিবিধ কার্যসূচী ব্যাখ্যা করে বলেন যে, স্বাধীনতা-সংগ্রামের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করে মজুত করতে হবে এবং যখনই সময় আসবে তখনই তা ব্যবহার করতে হবে, ক্ষুদ্র ও গোপন কারখানায় অস্ত্র তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে, কারখানাগুলি দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে, ইত্যাদি।

বিনায়ক সাভারকার কর্তৃক পুস্তিকা প্রকাশ

১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে ভারতীয় শহীদ মদনলাল ধিংড়ার ফাঁসি উপলক্ষে রচিত ‘বন্দেমাতরম্’ নামক একখানি পুস্তিকায় বিনায়ক দামোদর সাভারকর স্পষ্ট ভাষায় ভারতীয় সন্ত্রাসবাদের কর্মপন্থা এবং বৈপ্লবিক কার্যসূচী ও বিপ্লবের ভবিষ্যৎ চিত্র ব্যাখ্যা করেন।

পুস্তিকায় বিনায়ক সাভারকারের লেখনী

‘বন্দেমাতরম্’ পুস্তিকায় তিনি লিখেছিলেন, “ইংরেজ ও ভারতীয় সরকারী কর্মচারীদের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি কর, সরকারের উৎপীড়ন-যন্ত্রের ধ্বংস আর বেশি দূরে নয়। ক্ষুদিরাম বসু, কানাইলাল দত্ত ও অন্যান্য শহীদগণ অব্যাহতভাবে যে নীতি কার্যকরী করে এসেছে, সেই নীতি অব্যাহতভাবে কার্যে পরিণত করতে থাকলেই অচিরে ভারতের ব্রিটিশ সরকার পঙ্গু হয়ে পড়বে।”

উপসংহার :- সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের মতে বিচ্ছিন্ন হত্যার আন্দোলনই আমলাতন্ত্রকে নির্জীব ও জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে তুলবার পক্ষে সর্বাপেক্ষা সুচিন্তিত উপায়। বিপ্লবের প্রথম স্তরের নীতি হবে বিচ্ছিন্ন হত্যার নীতি।

(FAQ) সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াস সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয় নামে কারা পরিচিত?

বিনায়ক দামোদর সাভারকার ও গণেশ সাভারকার।

২. কারা, কখন মিত্র মেলা প্রতিষ্ঠা করেন?

সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে।

৩. নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা কখন হয়?

১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে।

৪. বন্দেমাতরম পুস্তিকাটি কার রচনা?

বিনায়ক দামোদর সাভারকার।

Leave a Comment