দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ

দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ -এর জন্ম, পিতৃপরিচয়, শিক্ষা, শিক্ষকতা, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব, সোমপ্রকাশ পত্রিকা সম্পাদনা, সরকারের বিরোধিতা, বাংলা ভাষার বিকাশে ভূমিকা, পুস্তক রচনা ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ

জন্মএপ্রিল, ১৮১৯
মৃত্যুআগস্ট ২৩, ১৮৮৬
পরিচিতিশিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং সমাজসেবক
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ

ভূমিকা :- একজন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং সমাজসেবক ছিলেন পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। বিদ্যাসাগরের সহায়তায় তিনি সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

জন্ম

১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার চাংড়িপোতা (বর্তমানে সুভাষগ্রাম) গ্রামে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ জন্মগ্রহণ করেন।

পিতৃপরিচয়

তার পিতা ছিলেন হরচন্দ্র ন্যায়রত্ন ভট্টাচার্য। দুই পুত্রের মধ্যে দ্বারকানাথ ছিলেন জ্যেষ্ঠ। কনিষ্ঠ শ্রীনাথ চক্রবর্তী।

  • (১) হরচন্দ্র ন্যায়রত্ন ছিলেন দাক্ষিণাত্য বৈদিক সমাজের একজন বিশিষ্ট স্মৃতিশাস্ত্রজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক পণ্ডিত।
  • (২) হরচন্দ্র ন্যায়রত্ন কলকাতায় টোল চতুষ্পাঠি করে অধ্যাপনা করতেন। এটাই ছিল তার মূল জীবিকা।
  • (৩) হরচন্দ্র ন্যায়রত্নের বহু কৃতী ছাত্রদের মধ্যে রামতনু লাহিড়ী ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত অন্যতম।
  • (৪) ১৮৩১ সালে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকা সম্পাদনার কাজে হরচন্দ্র ন্যায়রত্ন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে সাহায্য করতেন।

শিক্ষা

  • (১) দ্বারকানাথ বাল্যকালে তার পিতার কাছেই ব্যাকারণ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। পরে পণ্ডিত সর্বানন্দ সার্বভৌম বারো বছর বয়স পর্যন্ত দ্বারকানাথকে ব্যাকরণ শিক্ষা দান করেন।
  • (২) ১৮৩২ সালে হরচন্দ্র পুত্র দ্বারকানাথকে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। সংস্কৃত কলেজে ন্যায়, স্মৃতি, বেদান্ত, দর্শন, সাহিত্য, অলংকার, কাব্য ও জ্যোতিষ শিক্ষা গ্রহণ করেন।
  • (৩) কলেজে ছাত্রবৃত্তি চালু হলে দ্বারকানাথ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে প্রধান বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৪৫ সালে তাকে বিদ্যাভূষণ উপাধি দেওয়া হয়।
  • (৪) এই সময় থেকে কলেজে ইংরেজি শিক্ষা ক্রমশ পাঠ্য হয়ে ওঠে। দ্বারকানাথ ইংরেজি শিক্ষাও শুরু করেন। নিজের কঠোর অধ্যবসায় তিনি বেশি বয়সেও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষক

১৮৪৫ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা শেষ করে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ব্রিটিশ প্রসাশকদের বাংলা ভাষা শেখানো তার কাজ ছিল।

গ্ৰন্থাগারিক পদ লাভ

পরে তিনি সংস্কৃত কলেজে প্রথম যোগদান করেন গ্রন্থাগারিক হিসাবে। বেতন ছিল মাসে ৩০ টাকা। পরে পদোন্নতি হয়ে তিনি সাহিত্যশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন। বেতন হয় মাসে ১৫০ টাকা।

বিদ্যাসাগরের সহায়তা

গ্রন্থাগারিক থেকে অধ্যাপক পদে উন্নীত হবার সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ। বিদ্যাসাগরের সুপারিশক্রমেই তার পদোন্নতি হয়।

পায়ে হেঁটে কলকাতা যাতায়াত

দ্বারকানাথ যখন সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন ও পরে অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন তখন নিজ গ্রাম চাংড়িপোতা (বর্তমানে সুভাষগ্রাম) থেকে কলকাতায় যাবার কোনো যানবাহন ছিল না। তিনি পায়ে হেঁটেই কলকাতায় যাতায়াত করতেন।

ছক্কর গাড়ির ব্যবহার

সেকালে অনেক পদস্থ ব্যক্তি একরকম ছক্কর গাড়িতে চেপে সোমবার রাজপুর-হরিনাভি থেকে কলকাতায় যেতেন। আবার শনিবার কলকাতা থেকে ঐ গাড়িতে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু দ্বারকানাথকে ঐ গাড়িতে চড়তে দেখা যায় নি।

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন

বেশ কয়েক বছর সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার পর বিদ্যাসাগর বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে বিদ্যাসাগরের অবর্তমালে কিছুকাল তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।

অবসর গ্রহণ

ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে ১৮৭৩ সালে প্রায় ৫৪ বছর বয়সে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তার স্বাস্থ্যহানির অন্যতম কারণ তার অস্বাভাবিক পরিশ্রম।

শিবনাথ শাস্ত্রীর বর্ণনা

দ্বারকানাথের ভাগিনেয় শিবনাথ শাস্ত্রী তার রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ গ্রন্থে তার মাতুল সম্পর্কে লিখেছেন, “রাত্রি ১১টার সময় শয়ন করিতে যাইবার পূর্বে দেখিয়াছি তিনি কার্যে মগ্ন আছেন, ভোর ৪ টার সময়ে উঠিয়া দেখিয়াছি তিনি কার্যে মগ্ন আছেন। আমার বয়সের মধ্যে প্রত্যূষে উঠিয়া তাহাকে কখনো ঘুমাইতে দেখিয়াছি এরূপ মনে হয় না।”

সোমপ্রকাশ পত্রিকা সম্পাদনা

দ্বারকানাথের শ্রেষ্ঠ কীর্তি সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রকাশ। ১৮৫৮ সালের ১৫ই নভেম্বর কলকাতার চাঁপাতলা থেকে সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।

পত্রিকা তৈরির পরিকল্পনা

সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার সময় সোমপ্রকাশ সৃষ্টির কল্পনা করা হয়। সারদা প্রসাদ নামক এক বধির ব্রাহ্মণের ভরণপোষণ করিবার জন্য বিদ্যাসাগর মশাই এই পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করেন।

পত্রিকার জনপ্রিয়তা

মার্জিত রুচি, প্ৰাঞ্জল ভাষা ও নির্ভীক সমালোচনার জন্য পত্রিকাটি বিশুদ্ধ রাজনীতি ও সুস্থ সাহিত্যের প্রসারে দীর্ঘদিন বাংলা-সংবাদপত্র-জগতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল।

মুদ্রাযন্ত্র প্রতিষ্ঠা

তার পিতা হরচন্দ্র ন্যায়রত্ন ১৮৫৬ সালে পুত্র দ্বারকানাথের জন্য নিজ গ্রাম চাংড়িপোতায় একটি মুদ্রাযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

নিজ গ্রাম থেকে পত্রিকা প্রকাশ

১৮৬২ সালে রেলের শিয়ালদহ-ক্যানিং শাখা চালু হবার পর তিনি সোমপ্রকাশ পত্রিকাটি নিজ গ্রাম থেকে প্রকাশিত করতে থাকেন।

গ্ৰন্থ প্রকাশ

পিতার প্রতিষ্ঠিত মুদ্রাযন্ত্র থেকেই দ্বারকানাথের লিখিত রোম ও গ্রিসের ইতিহাস নামক দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

শ্রেষ্ঠ কীর্তি

সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রকাশ ছিল দ্বারকানাথের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ। একটি পত্রিকা কিভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেরণা আনতে পারে এবং অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে তাই তিনি তুলে ধরেন সর্বসমক্ষে।

প্রকাশনা বন্ধ

১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট জারি করলে দ্বারকানাথ এই অসম্মানজনক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এক বছরের বেশি সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রাখেন।

বাংলা ভাষার বিকাশে ভূমিকা

সোমপ্রকাশ পত্রিকা আগেকার সাহেবি বাংলা, মৈথিলি বাংলা এবং সংস্কৃত, বাংলা প্রভৃতি ভেঙে চুরে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা চালু করে বাংলাভাষা বিকাশে বড় অবদান রাখে।

সরকারের বিরোধিতা

সোমপ্রকাশ সর্বদা সরকার বিরোধী সমালোচনা করে গেছে। তিনি ১৮৭৮ সালে কল্পদ্রুম নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের আর এক হল কীর্তি হল হরিনাভি ইংরাজী-সংস্কৃত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।

রচিত পুস্তক

তার রচিত ছাত্রপাঠ্য পুস্তক গুলি হল ‘নীতিসার’, ‘পাঠামৃত’, ‘ছাত্ৰবোধ’, ‘ভূষণসার ব্যাকরণ’ এবং কাব্যগ্রন্থ হল ‘প্ৰকৃত প্রেম’, ‘প্রকৃত সুখ’, ‘বিশ্বেশ্বর বিলাপ পদ্য’ প্রভৃতি।

বারাণসী গমন

একবার কিছু সময়ের জন্য তিনি বারাণসী গিয়েছিলেন। সেখানে ধর্ম ও নৈতিকতার খারাপ পরিস্থিতি দেখে তিনি হতবাক হয়েছিলেন।

মৃত্যু

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ পরলোক গমন করেন।

উপসংহার :- দ্বারকানাথের লেখার যুক্তি, তীক্ষ্ণ সমালোচনা বোধ এবং শালীনতা বোধের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল, যা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও মুগ্ধ করেছিল।

(FAQ) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সোমপ্রকাশ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কে?

পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ।

২. সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় কখন?

১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর।

৩. সোমপ্রকাশ পত্রিকার প্রধান উদ্যোক্তা কে ছিলেন?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

Leave a Reply

Translate »