রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আইনবিধি, ভাষা ও সাহিত্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা, খ্রিস্ট ধর্মের প্রসার, প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি, ক্রীড়া অনুষ্ঠান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে রোমান সাম্রাজ্যের অবদান সম্পর্কে জানবো।

রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

ঐতিহাসিক ঘটনারোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি
জাস্টিনিয়ান কোডসম্রাট জাস্টিনিয়ান
নাটকটেরেন্স
এনিডভার্জিল
কলোসিয়ামরোম
ধর্মখ্রিস্টান ধর্ম
রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

ভূমিকা :- প্রাচীন যুগে ইউরোপে সুবিশাল রোমান সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল। সাম্রাজ্যের প্রসার, শাসনব্যবস্থার অগ্রগতি, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোমান সাম্রাজ্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিল।

রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি

প্রাচীন ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। ইউরোপ তথা বিশ্বের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে রোমান সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। যেমন –

(ক) আইনবিধি

  • (১) মৌলিক আইন রচনা, আইনের সূক্ষ্ম ধারার প্রণয়ন, আইনের বাস্তব প্রয়োগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রাচীন রোমানরা বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রচলিত প্রথা এবং যুক্তি – উভয়ের সমন্বয়ে রোমান আইন রচিত হত। রোমান আইন প্রথমদিকে অলিখিত ছিল, পরবর্তীকালে লিখিত আইনের প্রণয়ন হয়।
  • (২) এই আইনে দেশে সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রোমান আইনে সাম্যের কথা বলা হলেও তা ক্রীতদাস ও বিদেশিদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত প্রাচীন রোমান আইন প্যাক্স রোমানা (Pax Romana) নামে পরিচিত ছিল।
  • (৩) প্রাচীন রোমান সভ্যতায় যেসব আইনকানুন। প্রচলিত ছিল সেগুলি পরবর্তীকালে জার্মান রাজ্যগুলিতে প্রচলিত হয়। মধ্যযুগের ইউরোপের সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে এই আইনকানুনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই আইনগুলির ভিত্তিতে সম্রাট জাস্টিনিয়ান পরবর্তীকালে প্রায় ৪০০০ আইন সংবলিত ‘জাস্টিনিয়ান কোড’ নামে এক আইনবিধি রচনা করেন।

(খ) ভাষা ও সাহিত্য

  • (১) লাতিন ভাষা ছিল রোমের স্থানীয় ভাষা। তবে রোমের শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত লোকেরা গ্রিক ভাষায় কথা বলত। সাহিত্যও রচিত হত গ্রিক ভাষায়। পরবর্তীকালে রোমান সাম্রাজ্যের উদ্ভব ও প্রসারের ফলে ইউরোপের সুবৃহৎ অঞ্চলে লাতিন ভাষা ছড়িয়ে পড়ে। লাতিন ভাষা থেকে ইতালীয়, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, রোমান প্রভৃতি ভাষার বিকাশ ঘটে।
  • (২) রোমান সাহিত্য আবার গ্রিক লেখকদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। রোমান লেখকরা মহাকাব্য, নাটক, কবিতা প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পাণ্ডিত্য দেখান। এই যুগে টেরেন্সের নাটক, ভার্জিল ও হোরাসের কাব্য বিশেষ জনপ্রিয় ছিল।

(গ) স্থাপত্য

  • (১) রোমান সাম্রাজ্যে স্থাপত্যের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছিল। প্রাচীন ইট্রাস্ক্যান শিল্পের (৯০০ খ্রিস্টপূর্ব) ধারা থেকে রোমান শিল্পের উদ্ভব ঘটেছে বলে মনে করা হয়। তবে রোমান শিল্পে প্রাচীন গ্রিক শিল্পরীতির বিশেষ প্রভাব পড়েছিল। রোমানরা খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কংক্রিটের স্থাপত্যকৌশল উদ্ভাবন করলে স্থাপত্যকর্মের প্রভূত উন্নতি ঘটে।
  • (২) রোমানরাই প্রথম স্থাপত্যে পাথরের ব্যবহার শুরু করেছিল। রোমান সম্রাটরা বহু সুন্দর মন্দির, থিয়েটার হল, গ্রন্থাগার, রাস্তাঘাট, বন্দর, বাজার প্রভৃতি নির্মাণ করেন। প্যান্থিয়ন নামে সুবিশাল অট্টালিকা, উন্মুক্ত অ্যাম্‌ফিথিয়েটার বা কলোসিয়াম, জনগণের সমবেত হওয়ার জন্য নির্মিত ফোরাম প্রভৃতি প্রাচীন রোমের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্ম।
  • (৩) চারতলাবিশিষ্ট অ্যাম্‌ফিথিয়েটারে একত্রে ৫০,০০০ দর্শক বসে গ্ল্যাডিয়েটারের যুদ্ধ, রথের দৌড় প্রভৃতি দেখতে পারত। প্রাচীন রোমে কংক্রিটে নির্মিত বহু রাস্তাঘাটের স্মৃতিচিহ্ন আজও খুঁজে পাওয়া যায়। রোমান স্থাপত্যকর্মের ধ্বংসাবশেষ আজও দর্শকদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
  • (৪) রোমান সম্রাট অগাস্টাস এক সময় বলেছিলেন যে, “আমি রোমকে ইটের নির্মিত নগরী হিসেবে পেয়েছিলাম, কিন্তু আমার বিদায়কালে তা মার্বেলখচিত রেখে গেলাম।”

(ঘ) ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

রোমান শিল্পীরা শিল্পের বাস্তবতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের বোঝাতেও ভাস্কর্য ও চিত্রকলা ব্যবহার করা হত। –

(১) ভাস্কর্য

বাস্তব বিষয়কে ভিত্তি করে রোমান ভাস্কর্যের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল। ভাস্কর্যে মানব প্রতিকৃতি নির্মাণ বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। সুদক্ষ রোমান শিল্পীদের কাজের উৎকর্ষে বিভিন্ন দেবদেবী, সম্রাট ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের মূর্তিগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। রোমান শিল্পে পূর্ণাবয়ব এবং আবক্ষ উভয় ধরনের মূর্তিই নির্মিত হত। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থাপত্যের দেওয়ালে নানা ধরনের কারুকার্যময় অলংকরণ করা হত। রোমান সভ্যতায় আর্কিসিলোয়াস, বোথোস, স্টেটফানোস, জিনোড্রাউস প্রমুখ ছিলেন সুবিখ্যাত ভাস্কর।

(২) চিত্রকলা

ভাস্কর্য ছাড়া রোমান চিত্রশিল্পেরও এই সময় যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল। এই যুগের শিল্পীরা নারী-পুরুষ, শিশু ও নৈসর্গিক দৃশ্য অঙ্কনে খুবই পারদর্শী ছিলেন। কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ থেকে আঁকার তুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন ধরনের পাথর ও গাছপালা থেকে রং তৈরি করা হত। লাল, হলুদ, সাদা, কালো প্রভৃতি রঙের বহুল ব্যবহার ছিল। অট্টালিকার দেওয়াল ও প্রাচীরে দারুন সুন্দর সব চিত্র অঙ্কন করা হত। আলেকজান্দ্রিয়ার ডেমিট্রিয়াস এবং টিমোম্যাচোস ছিলেন রোমের দুজন বিখ্যাত চিত্রকর।

(ঙ) খ্রিস্টধর্মের প্রসার

  • (১) খ্রিস্টধর্মের উত্থানের পূর্বে প্রাচীন রোমে বহুত্ববাদী পেগানধর্মের প্রচলন ছিল। এই যুগে রোমানরা বহু দেবতার উপাসনা করতেন। তাদের আরাধ্য দেবতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অ্যাপোলো, ডায়ানা, জুপিটার, মার্চ, মারকিউরি, মিনার্ভা, ভেনাস প্রমুখ।
  • (২) পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন (৩০৬- ৩৩৭ খ্রি.) আনুমানিক ৩১২ (মতান্তরে ৩১৩) খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেন এবং সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টানধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যের বৈধ ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ফলে সেখানে প্রাচীন পেগানধর্মের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে একেশ্বরবাদী খ্রিস্টধর্ম প্রসার লাভ করে।
  • (৩) রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তীকালেও ইউরোপে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ও প্রভাব অব্যাহত ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন জাতিকে খ্রিস্টধর্ম ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। পরবর্তীকালে খ্রিস্টানদের পরিবভূমি প্যালেস্টাইন মুসলিমদের দখলে চলে গেলে তা পুনরুদ্ধারে মধ্যযুগে যে ক্রুসেডগুলি সংঘটিত হয়েছিল তাতে ইউরোপের খ্রিস্টানদের এই ঐক্যবোধের প্রমাণ পাওয়া যায়।

(চ) প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি

রোমান সাম্রাজ্যে প্রযুক্তিবিদ্যার যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছিল। যেমন –

(১) জল-প্রণালী

নিকটবর্তী পার্বত্য অঞ্চল থেকে জল আনার উদ্দেশ্যে সেখানে কংক্রিটের জল-প্রণালী নির্মিত হয়।

(২) সেতু

নদী বা নদী-উপত্যকায় নির্মিত এই সব জল-প্রণালীর উপর সেতু তৈরি হয়।

(৩) শৌচাগার

সে যুগে রোমে স্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবস্থারও প্রচলন ঘটেছিল। বহু অভিজাত রোমানদের পরিবারে আধুনিক শৌচাগার ছিল।

(৪) পয়ঃপ্রণালী

শহরের নোংরা জল বাইরে বের করার জন্য পয়ঃপ্রণালী নির্মিত হত।

(৫) স্নানাগার

জনসাধারণের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রোমানরা থার্মি নামে স্নানাগার তৈরি করত।

(৬) বিভিন্ন শিল্প-প্রযুক্তি

এই যুগে ধাতুশিল্প, খোদাই শিল্প, হাতির দাঁতের শিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতিরও দারুন বিকাশ ঘটেছিল। রোমের নির্মাণকার্যে এই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার পরবর্তীকালেও বহুদিন ধরে ইউরোপে প্রচলিত ছিল।

(জ) ক্রীড়ানুষ্ঠান

প্রাচীন রোমে বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরও এইসব ক্রীড়ানুষ্ঠান ইউরোপে প্রচলিত ছিল। রোমানরা দৌড়, লম্ফন, রথের দৌড়, কুস্তি, বক্সিং প্রভৃতি খেলাধুলার চর্চা করত। তখন রোমে বিশেষ একটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক ক্রীড়ানুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। এতে খোলা জায়গায় কোনো ক্রীতদাসকে ক্ষুধার্ত পশুর সঙ্গে লড়াই করতে হত। এটি গ্ল্যাডিয়েটারের প্রতিযোগিতা নামে পরিচিত ছিল। নাগরিকরা এই নিষ্ঠুর ক্রীড়ানুষ্ঠান দেখে আনন্দ উপভোগ করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষুধার্ত পশু ক্রীতদাসটিকে খেয়ে ফেলত।

সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে রোমান সাম্রাজ্যের অবদান

বিশ্বের ইতিহাসে প্রাচীন রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আইনবিধি, ভাষা ও সাহিত্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা, খ্রিস্টানধর্মের প্রসার, প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ও ক্রীড়ানুষ্ঠান প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই সময় অসাধারণ অগ্রগতি ঘটেছিল।

উপসংহার :- প্রাচীন রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমগ্র ইউরোপের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। রোমের লাতিন ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, আইনকানুন প্রভৃতি জার্মানদের মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সংস্কৃত ভাষার উপর ভিত্তি করে যেমন ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলি গড়ে উঠেছে, তেমনি লাতিন ভাষা থেকে ইউরোপের প্রধান ভাষাগুলি গড়ে উঠেছে।

(FAQ) রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

জাস্টিনিয়ান কোড নামে আইনবিধি রচনা করেন কে?

সম্রাট জাস্টিনিয়ান

রোমের বিখ্যাত কবির নাম কি?

ভার্জিল

রোমের বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহের নাম কি?

অ্যামফিথিয়েটার বা কলোসিয়াম প্রেক্ষাগৃহ

গ্ল্যাডিয়েটারের প্রতিযোগিতা কি?

রোমে বিশেষ একটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক ক্রীড়ানুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। এতে খোলা জায়গায় কোনো ক্রীতদাসকে ক্ষুধার্ত পশুর সঙ্গে লড়াই করতে হত। এটি গ্ল্যাডিয়েটারের প্রতিযোগিতা নামে পরিচিত ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষুধার্ত পশু ক্রীতদাসটিকে খেয়ে ফেলত।

Leave a Comment