প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা

প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতে বর্ণভেদ প্রথা বিষয়ক ধারণা, প্রাক-বৈদিক যুগে ভারতে বর্ণপ্রথা, বৈদিক যুগে ভারতে বর্ণ প্রথা, ভারতে বর্ণ প্রথার উদ্ভব, ভারতের চতুর্বর্ণের পরিচিতি, প্রাচীন ভারতে চতুর্বর্ণের উৎপত্তি, প্রাচীন ভারতে চতুর্বর্ণের কর্মবিভাজন, প্রাচীন ভারতের দ্বিজ শ্রেণি, প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক কিন্তু মুক্ত সমাজ, প্রাচীন ভারতে পঞ্চম শ্রেণীর অস্তিত্ব, প্রাচীন ভারতে বর্ণ থেকে জাতির উদ্ভব, প্রাচীন ভারতের বর্ণ থেকে জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব ও বর্ণ প্রথার বৈশিষ্ট্য গুলি সম্পর্কে জানব।

প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা
প্রাক বৈদিক যুগে অস্তিত্বসুনীল চট্টোপাধ্যায়
গায়ের রং বোঝাতের‍্যাপসন
বর্ণ বিভাগচারটি
সর্বোচ্চ স্থানব্রাহ্মণ
সর্বনিম্ন স্থানশূদ্র
দ্বিজব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য
প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা

ভূমিকা :- আর্যরা আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগে ভারতবর্ষের সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে বসতির বিস্তার ঘটায়। ভারতে আগমনকালে আর্য সমাজে বর্ণপ্রথা বা জাতিভেদ প্রথার অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়।

প্রাক-বৈদিক যুগে ভারতে বর্ণপ্রথা

কেউ কেউ মনে করেন যে, প্রাক-বৈদিক যুগেও আর্য সমাজে বর্ণপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘ভারতে বর্ণ বৈষম্যের সূচনা, ঋকবৈদিক যুগের পূর্বে, আর্য ইতিহাসের ইন্দো-ইরানীয় পর্বে হয়েছিল।’

প্রাচীন ভারতে বর্ণভেদ প্রথা বিষয়ক ধারণা

  • (১) আর্যদের গায়ের রং ছিল ফরসা এবং অনার্যদের গায়ের রং ছিল কালো। এই ব্যবধানকে স্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আর্যরা সমাজজীবনে বিভিন্ন পেশা বা বৃত্তি অনুসারে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। এভাবে বৈদিক সমাজে বর্ণভেদ প্রথার উত্থান ঘটে।
  • (২) তাই ইতিহাসবিদ র‍্যাপসন বলেছেন যে, আর্য সমাজে ‘বর্ণ’ শব্দটি গায়ের রং বোঝাতেই ব্যবহৃত হত। আর্যরা ভারতীয় কৃষ্ণাঙ্গদের অনার্য বা দস্যু বলত। তারা নিজেদের বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সামাজিক রীতিনীতি, বিবাহ প্রভৃতি সম্পর্ক নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল।

বৈদিক যুগে ভারতে বর্ণপ্রথা

  • (১) অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, আর্যদের ভারতে আগমনকালে বৈদিক সমাজব্যবস্থায় কোনো ধরনের বর্ণপ্রথার অস্তিত্ব ছিল না। পরবর্তীকালে ভারতের অভ্যন্তরভাগে ‘সপ্তসিন্ধু’ অঞ্চলে তাদের বসতির প্রসার ঘটলে গৌরবর্ণ আর্যরা ভারতের কৃষ্ণকায় অনার্যদের থেকে নিজেদের পৃথক রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
  • (২) এই প্রয়োজন থেকে আর্য বা বৈদিক সমাজে বিভিন্ন পেশা বা বৃত্তির উপর নির্ভর করে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। এই বিভিন্ন সম্প্রদায় থেকেই বৈদিক সমাজে বর্ণ বা বর্ণভেদপ্রথার উদ্ভব হয়। ভারতে বৈদিক যুগের সমাজব্যবস্থায় বর্ণভেদপ্রথার অস্তিত্ব থাকলেও সে যুগে জাতিভেদপ্রথার অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে বিতর্ক আছে।

ভারতে বর্ণপ্রথার উদ্ভব

আর্য সমাজে বর্ণপ্রথা উদ্ভবের পেছনে কিছু কারণ ছিল। যেমন –

(ক) আর্যজাতির মৌলিকত্ব বজায় রাখা

  • (১) গৌরবর্ণ ও দীর্ঘকায় আর্যরা কৃষ্ণবর্ণ ও খর্বকায় অনার্যদের হীন বা নিকৃষ্ট বলে মনে করত। এই নিকৃষ্ট অনার্যদের থেকে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব ও মৌলিকত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনেই বর্ণপ্রথার সূচনা হয়েছিল। ঐতিহাসিক র‍্যাপসন বলেছেন যে, ‘আর্য সমাজে ‘বর্ণ” শব্দটি গায়ের রং অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
  • (২) আর্যদের গৌরবর্ণ ও অনার্যদের কৃষ্ণবর্ণের পার্থক্য বজায় রাখতে আর্যরা তাদের সমাজে বর্ণভেদপ্রথা চালু করে। ঐতিহাসিক সেনার্ট মনে করেন যে, বৈদিক যুগের ‘গোষ্ঠী- স্বাতন্ত্র্য’ থেকে আর্য সমাজে বর্ণভেদপ্রথার প্রচলন ঘটেছে।

(খ) শ্রমবিভাজনের প্রয়োজনীয়তা

অনার্যদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংঘর্ষের মাধ্যমে আর্যরা ভারতের অভ্যন্তরে বসতির প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। সারাদিন সংঘর্ষ বা যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার ফলে কোনো একক আর্য পুরুষের পক্ষে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত থাকা সম্ভব ছিল না। ফলে সমাজে বংশানুক্রমিক শ্রমবিভাজন ও বিভিন্ন পেশার সূত্রপাত ঘটে।

প্রাচীন ভারতে চতুর্বর্ণের পরিচিতি

সাধারণভাবে ‘বর্ণ’ বলতে বৈদিক সমাজের চতুর্বর্ণকে বোঝানো হয়। বৈদিক সমাজ চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। এগুলি হল (i) ব্রাহ্মণ, (ii) ক্ষত্রিয়, (iii) বৈশ্য ও (iv) শূদ্র। ঋগবেদের পুরুষসূক্তে বলা হয়েছে যে, একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজের দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে এই চারটি বর্ণের সৃষ্টি করেছিলেন।

প্রাচীন ভারতে চতুর্বর্ণের উৎপত্তি

ঋগবেদের পুরুষসূক্তের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে যে, আদি পুরুষ ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণ, বাহুদ্বয় থেকে ক্ষত্রিয়, ঊরুদেশ থেকে বৈশ্য ও চরণযুগল থেকে শূদ্রের উৎপত্তি হয়েছে। উৎপত্তি অনুসারে সমাজে সবার ওপরে ব্রাহ্মণদের এবং সবার নীচে শূদ্রের স্থান।

প্রাচীন ভারতে চতুর্বর্ণের কর্মবিভাজন

বেদে চতুর্বর্ণের জন্য পৃথক পৃথক কাজেরও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুসারে –

  • (১) ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল যাগযজ্ঞ, পূজার্চনা ও অধ্যয়ন-অধ্যাপনা করা।
  • (২) ক্ষত্রিয়দের কাজ ছিল দেশ শাসন ও দেশ রক্ষা করা।
  • (৩) বৈশ্যদের কাজ ছিল ব্যাবসাবাণিজ্য, কৃষিকার্য ও পশুপালন করা।
  • (৪) শূদ্রদের কাজ ছিল উপরোক্ত তিনটি শ্রেণির সেবা করা। ভৃত্য, কায়িক শ্রমজীবী ও কৃষকরা ছিল শূদ্র বর্ণের অন্তর্ভুক্ত।

প্রাচীন ভারতের দ্বিজ শ্রেণি

চতুর্বর্ণের মধ্যে প্রথম তিনটি বর্ণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা উপবীত ধারণ করতেন এবং এই সংস্কারকে তাঁদের দ্বিতীয় জন্ম বলে মনে করা হত। এজন্য তাঁরা ‘দ্বিজ’ নামে পরিচিত হতেন ।

প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক কিন্তু মুক্ত সমাজ

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ঋকবৈদিক যুগের সমাজ বদ্ধসমাজ ছিল না, এক বর্ণ থেকে তখন অন্য বর্ণে যাওয়া যেত। অধ্যাপক বটোমোর বলেছেন যে, “এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে যাওয়ার সুযোগ সকলেরই ছিল। নিম্নবর্ণের কোনো ব্যক্তি তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে উচ্চ বর্ণে উন্নীত হতে পারত।” সমাজে অসবর্ণ বিবাহও স্বীকৃত ছিল।

প্রাচীন ভারতে পঞ্চম শ্রেণির অস্তিত্ব

বৈদিক চতুর্বর্ণ কাঠামোর বাইরেও অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্য বহু মানুষ বাস করত। তারা মুচি, মেথর ও অন্যান্য নীচু কাজে নিয়োজিত হত। এই শ্রেণিকে অধ্যাপক শ্যামচরণ দুবে সমাজের পঞ্চম শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রাচীন ভারতে বর্ণ থেকে জাতির উদ্ভব

ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, ঋগ্‌বৈদিক যুগে ‘বর্ণ’ বলতে কখনোই ‘জাতি’-কে বোঝাত না। ‘বর্ণ’ ও ‘জাতি’ দুটি পৃথক সত্তা। বৈদিক যুগের প্রথমদিকে চতুর্বর্ণকে ভিত্তি করে অল্প কয়েকটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও পরবর্তীকালে নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হলে পুরোনো বর্ণভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলি থেকেই নতুন নতুন জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। এই পুরোনো ও নতুন জনগোষ্ঠীগুলিই এক-একটি ‘জাতি’ হিসেবে গণ্য হতে থাকে।

প্রাচীন ভারতে বর্ণ থেকে জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব

এক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত গুলি হল –

(১) বাসামের অভিমত

ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, ঋকবৈদিক যুগে ‘বর্ণ’ বলতে কখনোই ‘জাতি’-কে বোঝাত না। ‘বর্ণ’ ও ‘জাতি’ দুটি পৃথক সত্তা জাতিপ্রথার বাস্তব ভিত্তি ভারতীয় সমাজে সুস্পষ্ট। তবে বর্ণপ্রথার ধারা থেকেই পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে জাতিপ্রথার উদ্ভব ঘটে।

(২) ড. ডি. ডি. কোশাম্বীর মত

ইতিহাসবিদ ড. ডি. ডি. কোশাম্বী মনে করেন যে, ঋগ্‌বৈদিক যুগে উপজাতিগুলির মধ্যে জাতিবৈষম্য বা শ্রেণিবৈষম্য ছিল না। পরবর্তীকালে উপজাতিগুলি ভেঙে পড়তে থাকে এবং তখনই জাতিভেদপ্রথার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

(৩) রিজলের অভিমত

হার্বার্ট রিজলে মনে করেন যে, সমাজে শ্রমভিত্তিক প্রয়োজন থেকেই পেশাভিত্তিক জাতির উদ্ভব হয়েছিল। তিনি জাতিভেদ প্রথার উদ্ভবের পশ্চাতে পেশা, সম্প্রদায়, ভাষা প্রভৃতি উপাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথার বৈশিষ্ট্য

ভারতে ঋগকবৈদিক যুগে আর্য সমাজে বর্ণপ্রথা প্রচলিত ছিল। এই প্রথার বৈশিষ্ট্য গুলি হল –

(১) উদ্ভব

অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন যে, ভারতে আগমনের পূর্বে আর্য সমাজে বর্ণপ্রথা প্রচলিত ছিল না। আর্যরা ভারতে আসার পর ঋকবৈদিক যুগে আর্য সমাজে বর্ণপ্রথার প্রচলন ঘটে।

(২) সামাজিক ক্ষেত্র

প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা মূলত আর্যদের সমাজেই প্রচলিত হয়েছিল। আর্য সমাজের বাইরে অবস্থানকারী জনসমাজে এই প্রথার প্রচলন ছিল না।

(৩) ভিত্তি

বৈদিক বর্ণপ্রথা মূলত বৃত্তি বা কাজের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। যাগযজ্ঞ পূজার্চনার পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ ব্ৰাহ্মণ, দেশশাসক ও যোদ্ধারা ক্ষত্রিয়, ব্যাবসায়ীরা বৈশ্য এবং উপরিউক্ত তিন বর্ণকে সেবাদানকারীরা শূদ্র বলে পরিচিত হত। ধীরে ধীরে বর্ণব্যবস্থা একটি শ্রেণিবাচক ধারণায় পরিণত হয়।

(৪) জাতিব্যবস্থার ভিত্তি

প্রাচীনকালে ঋকবৈদিক যুগের বর্ণপ্রথা থেকে পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে জাতিব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে।

উপসংহার :- ঋকবৈদিক যুগের বর্ণপ্রথা থেকে পরবর্তীকালে যে জাতিব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে তা পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন মিশ্রজাতির জন্ম দেয়। ফলে বৈদিক সমাজের চতুর্বর্ণ প্রথার বিশুদ্ধতা পরবর্তী বিভিন্ন যুগে লোপ পায় এবং তা ক্রমে জাতিগত সমন্বয়ের পথ প্রস্তুত করে।

(FAQ) প্রাচীন ভারতে বর্ণপ্রথা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতে প্রাকবৈদিক যুগে বর্ণ প্রথার অস্তিত্বের কথা কে বলেছেন?

অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায়।

২. আর্যরা ভারতের কোন অঞ্চলে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল?

সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে।

৩. কার মতে আর্য সমাজে বর্ণ শব্দটি গায়ের রং অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

ঐতিহাসিক র‍্যাপসন।

৪. বৈদিক যুগে চারটি বর্ণ কি কি ছিল?

 ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র।

Leave a Comment