স্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা

প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্র স্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার সামাজিক কাঠামো, প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার স্বাধীন নাগরিক বা স্প্যার্টিয়েট, প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার ক্রীতদাস হেলট, স্পার্টার ক্রীতদাস হেলটদের কাজ, হেলটদের সঙ্গে স্পার্টার নাগরিকদের সম্পর্ক, স্পার্টার সমাজে পেরিওকয় শ্রেণি, স্পার্টার পেরিওকয়দের কাজ, স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের সঙ্গে পেরিওকয়দের সম্পর্ক ও স্পার্টার পেরিওকয়দের প্রতি বঞ্চনা সম্পর্কে জানবো।

স্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনাস্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা
সামাজিক স্তরতিনটি
স্বাধীন নাগরিকস্প্যার্টিয়েট বা স্পার্টান
ক্রীতদাসহেলট
মধ্যবর্তী শ্রেণিপেরিওকয়
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাইফর
স্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা

ভূমিকা :- প্রাচীন গ্রিস -এর বিভিন্ন ‘পলিস‘ বা নগর-রাষ্ট্র গুলির মধ্যে স্পার্টা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নগর-রাষ্ট্র। পাঁচটি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা এই ক্ষুদ্র নগর- রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের রণনৈপুণ্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলা।

প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার সামাজিক কাঠামো

স্পার্টার সামাজিক কাঠামো অন্যান্য গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ছিল। এখানকার সমাজ প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল – ‘স্প্যার্টিয়েট’ নামে স্বাধীন নাগরিক, হেলট নামে ক্রীতদাস ও পেরিওকয় নামে অর্ধ-স্বাধীন প্রজা। স্পার্টার উক্ত তিনটি শ্রেণির মধ্যে বৈষম্য ছিল অত্যন্ত তীব্র।

প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার স্বাধীন নাগরিক বা স্প্যার্টিয়েট

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) নাগরিকত্ব লাভের শর্ত

স্পার্টা ছিল একটি অভিজাততান্ত্রিক নগর-রাষ্ট্র। এখানকার নাগরিকত্ব লাভের প্রধান শর্ত ছিল নিজ মালিকানায় জমি থাকা। এ ছাড়া সাধারণ ভোজনালয়ের জন্য অর্থ প্রদানের সামর্থ্য এবং যৌবনে সামরিক শিক্ষাগ্রহণ ছিল নাগরিকত্ব লাভের অন্যতম শর্ত। তাই স্বাভাবিকভাবেই স্পার্টায় নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ গণতান্ত্রিক এথেন্সের চেয়ে কম ছিল।

(২) নারীদের অনাগরিকত্ব

নারীরা সেদেশে নাগরিকত্ব পেত না। এর ফলে স্পার্টায় নাগরিকের সংখ্যা হেলট ও পেরিওকয়দের তুলনায় কম ছিল।

(৩) নাগরিকের সংখ্যা

৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টায় মাত্র ৮ হাজার নাগরিক ছিল বলে হেরোডোটাস জানিয়েছেন। ৩৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই সংখ্যা ১ হাজারে নেমে আসে বলে জানা যায়।

(৪) স্প্যার্টিয়েট বা স্বাধীন নাগরিকদের পেশা

সৈনিক হিসেবে কাজ করাই ছিল নাগরিকদের একমাত্র পেশা। প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক এই নাগরিকরা হেলটদের দিয়ে তাদের জমি চাষ করত।

প্রাচীন গ্ৰিসের নগররাষ্ট্র স্পার্টার ক্রীতদাস হেলট

  • (১) স্পার্টায় হেলট নামে ক্রীতদাস শ্রেণিটি ছিল সবচেয়ে নির্যাতিত ও শোষিত শ্রেণি। ঐতিহাসিক অ্যান্ড্রুজ বলেছেন যে, স্পার্টার হেলটরা ছিল পুরোপুরি ক্রীতদাস। ডোরিয়ান বিজয়ের পূর্বেকার অধিবাসীদের বংশধর এই হেলটরা একদা দুর্দশার কবলে পড়ে দাসত্ব বরণে বাধ্য হয়েছিল।
  • (২) তারা সমাজের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হত। হেলটদের প্রকৃত মালিক ছিল রাষ্ট্র, তবে বাস্তবে হেলটদের ব্যাবহারিক মালিক বা প্রভু ছিল কোনো স্বাধীন নাগরিক। প্রভু হেলটদের বিক্রি করতে বা অন্যের কাছে হস্তান্তরিত করতে পারত না ঠিকই, কিন্তু প্রভুর অধীনে তাদের সীমাহীন পরিশ্রম করতে হত এবং সুতীব্র নির্যাতন ভোগ করতে হত।

স্পার্টার ক্রীতদাস হেলটদের কাজ

হেলটরা বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত হত। যেমন –

(১) চাষবাস

চাষবাস ছিল তাদের প্রধান কাজ।

(২) সৈনিক

স্পার্টার সেনাবাহিনীতেও ট্রেনিং প্রাপ্ত বহু হেলট ছিল বলে জেনোফোন জানিয়েছেন। স্পার্টার সুদক্ষ স্থলবাহিনী গঠিত হয়েছিল মূলত হেলটনের দ্বারাই।

(৩) রাষ্ট্রীয় কাজ

রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে হেলটদের নিযুক্ত করা হত বলে ঐতিহাসিক টড উল্লেখ করেছেন।

(৪) রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ

পরবর্তীকালে স্পার্টায় স্বাধীন নাগরিকের সংখ্যা কমতে থাকলে হেলটরাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। তবে তারা কোনো উচ্চপদ লাভ করতে পারত না।

হেলটদের সঙ্গে স্পার্টার নাগরিকদের সম্পর্ক

স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের সঙ্গে হেলটদের সম্পর্ক মোটেই মধুর ছিল না। হেলটরা ছিল স্পার্টার সর্বাপেক্ষা নির্যাতিত শ্রেণি। এর বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) হত্যালীলা

হেলটদের সর্বদা আতঙ্কে ও পদানত করে রাখার উদ্দেশ্যে স্পার্টানরা (স্প্যার্টিয়েট) মাঝেমধ্যেই নির্বিচারে হেলটদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালাত। রাতের অন্ধকারে স্পার্টার গোপন পুলিশবাহিনী নির্বিচারে হেলটদের হত্যা করত বলে অ্যারিস্টটল উল্লেখ করেছেন। স্পার্টার ম্যাজিস্ট্রেটরা হেলটদের বিরুদ্ধে বাৎসরিক যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের বিনাশ করত।

(২) সৈনিক হেলটদের ওপর নজরদারি

স্পার্টার সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে নিযুক্ত হেলটদের সামরিক শিবিরে সর্বদা নিরস্ত্র করে রাখা হত এবং তাদের রীতিমতো পাহারা দেওয়া হত।

(৩) মার্শাল ল

হেলটদের বিদ্রোহ অঙ্কুরে বিনাশ করার জন্য ইফর নামে স্পার্টার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা ‘মার্শাল ল’ জারি করতেন। সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়ে হেলটরা মাঝেমধ্যেই বিদ্রোহের পথে পা বাড়াত। অবশেষে ৪৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একটি বড়ো ধরনের হেলট বিদ্রোহের ফলেই স্পার্টার পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

স্পার্টার সমাজে পেরিওকয় শ্রেণি

  • (১) বংশগতভাবে গ্রিক জাতিভুক্ত স্পার্টার পেরিওকয় শ্রেণির সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল সেখানকার স্বাধীন নাগরিক ও হেলটদের মধ্যবর্তী স্তরে। পেরিওকারা স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের বসতির নিকটবর্তী অঞ্চলেই বসবাসের অধিকার পেয়েছিল।
  • (২) সম্ভবত নিজেদের আত্মরক্ষার কথা ভেবে এবং ক্রীতদাস হেলটদের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব ও ব্যবধান বজায় রাখতে নাগরিকরা তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলে পেরিওকয়দের বসবাসের অধিকার দিয়েছিল।
  • (৩) এজন্য ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট বলেছেন যে, ‘পেরিওকয়রা ভৌগোলিকভাবে স্পার্টানদের বেষ্টন করে রেখেছিল এবং সামাজিক দিক থেকে তারা স্পার্টান ও হেলটদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করত।’
  • (৪) স্পার্টার নগর রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার পেরিওকয়ের বসবাস ছিল যা সেখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

স্পার্টার পেরিওকয়দের কাজ

পেরিওকয় শ্রেণি নিম্নলিখিত কাজ গুলি করত। যেমন –

(১) নানাবিধ কার্য সম্পাদন

পেরিওকয়রা শাসকগোষ্ঠীর রাজকীয় জমিজমা চাষ করত, শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যের কাজ সম্পন্ন করত। পেরিওকয়রা রাষ্ট্র -এর কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত কাজগুলি সম্পন্ন করার ফলে স্বাধীন নাগরিকরা নিশ্চিন্তে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসনে পূর্ণ সময় ব্যয় করতে পেরেছিল।

(২) সেনাবাহিনীতে নিয়োগ

পেরিওকয়রা নাগরিকদের তত্ত্বাবধানে স্পার্টার সেনাবাহিনীতে কাজ করারও সুযোগ পেয়েছিল। ফিনলে বলেছেন যে, স্পার্টার সেনাবাহিনীতে স্বাধীন নাগরিক ও পেরিওকয়দের সংখ্যা প্রায় সমান ছিল।

স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের সঙ্গে পেরিওকয়দের সম্পর্ক

পেরিওকয়দের সঙ্গে স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের মোটামুটি সুসম্পর্ক বজায় ছিল। যেমন –

  • (১) নাগরিকদের কাছ থেকে তারা যথেষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সহানুভূতি পেত।
  • (২) দেশের কৃষি, শিল্প, সামরিক কাজকর্ম প্রভৃতিতে অংশ নিয়ে পেরিওকয়রা দেশের নাগরিকদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত।
  • (৩) পেরিওকয়দের সহযোগিতার বিনিময়ে নাগরিকরাও তাদের রক্ষার দায়িত্ব পালন করত।

স্পার্টার পেরিওকয়দের প্রতি বঞ্চনা

অবশ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেরিওকয়রা স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের দ্বারা বৈষম্যের শিকারও হত। যেমন –

(১) শোষণ

তারা নানাভাবে শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়েছিল। পেরিওকয়দের হাতে থাকা কৃষিজমিগুলি ছিল নাগরিকদের জমির তুলনায় খুবই অনুর্বর।

(২) করের বোঝা

তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের করের বোঝা চাপিয়ে সর্বদা তাদের দুর্বল করে রাখার চেষ্টা চলত।

(৩) অধিকার-বঞ্চিত

তারা স্পার্টায় রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার লাভে বঞ্চিত ছিল।

(৪) সামাজিক সম্পর্কহীনতা

স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকদের সঙ্গে পেরিওকয়দের কোনো সামাজিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে নি। তারা নাগরিকদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারত না।

(৫) অনাগরিক

স্পার্টার পেরিওকয়রা এথেন্সের মেটিকদের সমপর্যায়ভুক্ত ছিল। কিন্তু মেটিকরা এথেন্সে স্বাধীন নাগরিক শ্রেণিতে উন্নীত হতে পারলেও পেরিওকয়রা স্পার্টায় তা পারত না। তা সত্ত্বেও পেরিওকয়রা স্পার্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায় নি।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক ফিনলে বলেছেন যে, ‘স্পার্টানদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে পেরিওকয়রা বুদ্ধিমানের কাজ করেছিল। কারণ, স্পার্টা তাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছিল।’

(FAQ) স্পার্টার সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. স্পার্টার স্বাধীন নাগরিকরা কি নামে পরিচিত ছিল?

স্প্যার্টিয়েট বা স্পার্টান।

২. স্পার্টার ক্রীতদাসরা কি নামে পরিচিত ছিল?

হেলট।

৩. নির্বিচারে হেলটদের হত্যার কথা কে উল্লেখ করেছেন?

অ্যারিস্টটল।

৪. স্পার্টায় স্বাধীন নাগরিক ও হেলটদের মধ্যবর্তী স্তরে কারা ছিল?

পেরিওকয়।

Leave a Comment