ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা

ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা প্রসঙ্গে ভারতে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব, সংগঠন, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের রাজনীতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সংগ্ৰামী সহযোগী কৃষক, শ্রমিক শ্রেণির মূল্যবান অভিজ্ঞতা, সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বনিয়াদ ধ্বংসে শ্রমিকশ্রেণী, বোম্বাইয়ের শ্রমিক শ্রেণির ধর্মঘট সংগ্ৰাম, লেনিনের মন্তব্য, ভারতের শ্রমিক শ্রেণী-সংগ্রামের উজ্জলতম দৃষ্টান্ত ও শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সম্পর্কে জানবো।

ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা

ঐতিহাসিক ঘটনাশ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক ভূমিকা
স্বদেশী আন্দোলন১৯০৫ খ্রি:
বোম্বাইয়ে ধর্মঘট১৯০৮ খ্রি:
বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান১৯৩০ খ্রি:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ১৯৩৯ খ্রি:
ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা

ভূমিকা :- বৈপ্লবিক সংগ্রাম শ্রেণী-সংগ্রাম ব্যতীত অন্য কিছু নয়। ভারতবর্ষের বিংশ শতাব্দীর বৈপ্লবিক সংগ্রামও শ্রেণী-সংগ্রাম। ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রাম হল সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতান্ত্রিক শোষণ- উৎপীড়ন-প্রভুত্বের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক সংগ্রাম।

ভারতে শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে কারখানায় কাজ করা সূত্র ধরে শ্রমিকশ্রেণী ভারতের সমাজে আবির্ভূত হতে থাকে। ১৯০৫-০৮ সালের ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর দেশব্যাপী ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের ফলে বহু নূতন মিল-কারখানা গড়ে ওঠায় শ্রমিকশ্রেণীর সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়।

ভারতে শ্রমিক শ্রেণির সংগঠন

জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রমিক শ্রেণী তার সহজাত চরিত্র হিসাবেই অসংগঠিত অবস্থা সত্ত্বেও বুর্জোয়াশ্রেণীর শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এবং ক্রমশ সংগঠিত হতে থাকে। সংগঠিত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী ক্রমে ক্রমে ভারতের বৈপ্লবিক গণ-সংগ্রামে নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা অর্জন করে।

সাম্রাজ্যবাদী শোষণের রাজনীতিক প্রতিদ্বন্দ্বী

মিল-কারখানার ধর্মঘট সংগ্রাম এবং রাজপথে ব্রিটিশ শাসনের সামরিক শক্তির সাথে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও বুর্জোয়া শোষণ-ব্যবস্থার রাজনীতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে দেখা দেয়।

শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী সহযোগী কৃষক

তাদের পতাকায় অঙ্কিত হতে থাকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণধ্বনি। বিভিন্ন স্থানের যুক্ত-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী কৃষক-সম্প্রদায়কে লাভ করে তাদের সংগ্রামী সহযোগী রূপে, বাস্তবক্ষেত্রে কৃষক-সম্প্রদায় পরিণত হতে থাকে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান বাহিনীতে।

শ্রমিক শ্রেণির মূল্যবান অভিজ্ঞতা

জন্মের পর মাত্র পঁচিশ বৎসরের মধ্যেই শ্রমিকশ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে তার ইতিহাস নির্দিষ্ট কর্তব্য পালনের ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণের পক্ষে মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে।

সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বনিয়াদ ধ্বংসে শ্রমিকশ্রেণী

১৯০৭-০৮ সালে শ্রমিকশ্রেণী পাঞ্জাব ও মাদ্রাজের কৃষক ও ছাত্র-শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের সামরিক শক্তির সাথে রাজপথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং পাঞ্জাব ও ত্রিবাঙ্কুরের সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বনিয়াদ ধ্বংস করতে উদ্যত হয়।

বোম্বাইয়ের শ্রমিক শ্রেণির ধর্মঘট সংগ্ৰাম

১৯০৮ সালে বোম্বাই নগরীতে বাল গঙ্গাধর তিলকের কারাদণ্ডের প্রতিবাদে সাত দিন পর্যন্ত রাজনীতিক ধর্মঘট-সংগ্রাম ও রাজপথে সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শ্রমিকশ্রেণী বোম্বাইয়ের অন্যান্য শ্রেণীকেও সংগ্রামের পথে টেনে আনে, সাত দিন পর্যন্ত বোম্বাই নগরীর রাজপথের যুদ্ধে ব্রিটিশ শাসন ও তার সামরিক শক্তিকে প্রচণ্ড আঘাত করে।

বোম্বাইয়ের শ্রমিকশ্রেণী সম্পর্কে লেনিনের মন্তব্য

বোম্বাইয়ের শ্রমিকশ্রেণীর এই সংগ্রামকেই অভিনন্দিত করে লেনিন লিখেছিলেন, “ভারতের শ্রমিকশ্রেণী এখন রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘনিয়ে এসেছে”।

ভারতের শ্রমিক শ্রেণী-সংগ্রামের উজ্জলতম দৃষ্টান্ত

১৯২৮-২৯ সালে বৎসরাধিক কাল সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং বৈদেশিক ও দেশীয় মালিকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব দৃঢ়তার সাথে ধর্মঘট-সংগ্রাম পরিচালনা করে ভারতের শ্রমিক শ্রেণী-সংগ্রামের উজ্জলতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই সংগ্রামে সমগ্র ভারতের বুকে আপসহীন সংগ্রামের রক্ত-পতাকা উড্ডীন করে শ্রমিকশ্রেণী জনসাধারণকে আসন্ন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতির ইঙ্গিত জানায়।

লেনিনের বাণী সত্যে পরিণত হওয়ার উজ্জ্বলতা

১৯৩০-৩২ সালের জাতীয় সংগ্রামের অংশরূপে সেই বৈপ্লবিক সংগ্রাম আরম্ভ হয়ে যায়। লেনিনের ১৯০৮ সালের ভবিষ্যৎ বাণী সত্যে পরিণত হবার সম্ভাবনা ১৯৩০-৩২ সালেই উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক অভ্যূত্থান

১৯৩০ সালে ভারতের শ্রমিকশ্রেণী কৃষকদের সহায়তায় বৈপ্লবিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পেশোয়ার আর দক্ষিণ-ভারতের শোলাপুর থেকে ভারতে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অবসান ঘোষণা করে এবং এই দুই শহরে যথাক্রমে দশদিন ও সাতদিনের জন্য শ্রমিক-কৃষক রাজ প্রতিষ্ঠা করিয়া ভবিষ্যতের জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আদর্শ স্থাপন করে।

শ্রমিক শ্রেণির উপযুক্ত বিপ্লবী নেতার অভাব

উপযুক্ত বিপ্লবী রাজনীতিক নেতৃত্ব লাভ করিলে ১৯৩০-৩২ সালেই শ্রমিকশ্রেণীর পরিচালনায় জাতীয় স্বাধীনতা-সংগ্রাম সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যশ্রেণীর জনসাধারণের বৈপ্লবিক সংগ্রামে পরিণত হত এবং সেই বৈপ্লবিক সংগ্রামের আগুনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র আর একচেটিয়া মূলধনের শাসন ও শোষণ-ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেত, ভারতের গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হত।

শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী বৈপ্লবিক গণ-অভ্যুত্থান

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভের সঙ্গে সঙ্গে একদিনের যুদ্ধ-বিরোধী রাজনীতিক ধর্মঘট পালন করে বোম্বাইয়ের শ্রমিকশ্রেণী যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের উদ্বোধন করে, তাই বহু ক্ষুদ্র-বৃহৎ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৬ সালে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী বৈপ্লবিক গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

উপসংহার :- ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান উপযুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সচেতন ও সুপরিকল্পিত পরিচালনার অভাবে বার বার ব্যর্থ হয়ে যায়। ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না।

(FAQ) ভারতের শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা কখন হয়?

১৯০৫ সালে।

২. ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক অভ্যূত্থান ঘটে কখন?

১৯৩০ সালে।

৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কখন হয়?

১৯৩৯ সালে।

৪. ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর সম্পর্কে কোন ব্যক্তি তার বিখ্যাত উক্তি করেছেন?

লেনিন।

Leave a Comment