পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা

পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা প্রসঙ্গে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জটিলতা, দেবতা, জন্মান্তরবাদ, আধ্যাত্মবাদী আলোচনা, সন্ন্যাস ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও জড়বাদী দর্শন সম্পর্কে জানবো।

পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা

বিষয় পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা
অনুষ্ঠান যাগযজ্ঞ
দেবতা প্রজাপতি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র
সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি ব্রহ্মা
দেহবাদী দর্শন চার্বাক
পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা

ভূমিকা :- পরবর্তী বৈদিক যুগ বলতে ঋগ্বেদ -এর পরবর্তী যুগ বুঝায়। ঋকবেদের যুগের সঙ্গে পরবর্তী বৈদিক যুগ -এর প্রভূত সময়ের ব্যবধান আছে। আর এই ব্যবধানের মধ্যে ধর্মভাবনার ক্ষেত্রে পরিবর্তনও ঘটে যথেষ্ট পরিমাণে।

যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জটিলতা

  • (১) পরবর্তী বৈদিক যুগে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জটিলতা ঋকবৈদিক যুগ অপেক্ষা বৃদ্ধি পায়। এই জটিল যজ্ঞের প্রক্রিয়া একমাত্র পুরোহিত বা ব্রাহ্মণরা জানত। এর জন্য সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রভাব বেড়ে যায়।
  • (২) যজ্ঞের কাজ এত জটিল হয়ে পড়ে যে, যজ্ঞে কয়েকজন পুরোহিতের দরকার হত। হোত্রী মন্ত্র পড়ে দেবতাকে আবাহন করত, উদগাত্রী সামবেদ গাইত, অধ্বার্ষু পুঁথি ধরে মন্ত্র বলে দিত। পুরোহিত যজ্ঞে মন্ত্র পড়ে হবি বা ঘৃত নিক্ষেপ করত।

দেবতা

  • (১) পরবর্তী বৈদিক যুগে বিভিন্ন দেবতাদের মধ্যে প্রজাপতি ব্রহ্মা, রুদ্র ও বিষ্ণু বিশেষ প্রাধান্য পান। ঋকবেদের যুগের বহু দেবতা ক্রমে ক্রমে লুপ্ত হয়ে যান। প্রজাপতি ব্রহ্মাকে সৃষ্টি কর্তা কল্পনা করে তাকেই সকল কিছুর মূলাধাররূপে গণ্য করা হত। এই যুগের দেবতা রুদ্র ক্রমে শিবে পরিণত হন।
  • (২) মানুষের পাপ-পুণ্য সকল কিছু হতে বিষ্ণুই একমাত্র মুক্তিদাতা এই ধারণা এই যুগে বলবর্তী হয়। বিষ্ণু সৃষ্টিকে পালন করেন, মানুষকে দুঃখ হতে মুক্তি দেন বলে মনে করা হয়। তিনি অকাবনের বরুণের স্থান নেন। তিনি নৈতিক বিধানের নিয়ন্তা, দেবতাদের ত্রাতায় পরিণত হন। তাঁর কৃপা ও পদতলে স্থান সকলের কাম্য হয়।

জন্মান্তরবাদ

  • (১) পরবর্তী বৈদিক যুগে যাগ-যজ্ঞ নির্ভর ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পাশাপাশি একটি দার্শনিক ধর্মচিন্তার উদ্রেক হয়। উপনিষদে এর পরিচয় পাওয়া যায়। কর্মফল ও জন্মান্তরবাদের তত্ত্ব এই যুগে গড়ে ওঠে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে সর্বপ্রথম জন্মান্তরের কথা বলা হয়।
  • (২) কর্মের ফল মানুষকে বর্তমান জন্মে এবং পরজন্মেও ভোগ করতে হয় এই বিশ্বাস তীব্রভাবে দেখা দেয়। মৃত্যুর পর আত্মা পুনরায় নতুন দেহ নিয়ে জন্মায় এই বিশ্বাসও জনপ্রিয় হয়। বর্তমান জন্মের কাজের ফল পরজন্মে ভোগ করতে হয়, এর হাত থেকে মুক্তি নেই, এমন বিশ্বাস সকলকে প্রভাবিত করে।

আধ্যাত্মবাদী আলোচনা

  • (১) উপনিষদে বলা হয় যে, মানব জীবন হল বিশ্ব জীবনের অঙ্গ। মৃত্যুর পর ব্যক্তির জীবন, এই বিশ্বজীবনে বা পরম আত্মায় লীন হয়। দেহের তাপ, পৃথিবীর শক্তিতে মিলিয়ে যায়, দেহের জল, পৃথিবীর জলে মিশে যায়, দেহের প্রাণ বায়ুতে লীন হয়ে যায়।
  • (২) পুনরায় নতুন জীবন নিয়ে তা ফিরে আসে। জীবন সম্পর্কে এই সূক্ষ্ম ও আধ্যাত্মবাদী আলোচনা করেছেন যাজ্ঞবল্ক প্রমুখ ঋষি। এভাবে জন্ম-মৃত্যুর চাপ থেকে বা জন্মান্তরের ও কর্মফলের নাগপাশ থেকে জীবনকে মুক্ত করার কথা ভাবা হয়।

সন্ন্যাস ধর্ম

এই দুঃখবাদ ও নৈরাশ্যবাদ থেকে মুক্তির জন্যে সন্ন্যাসধর্মকে উপযুক্ত পথ বলে মনে করা হত। যাগ-যজ্ঞ ও পুরোহিত দ্বারা কোনো ফল হবে না বলে অনেকে বুঝতে পারেন। আরণ্যকে আত্মার মুক্তির জন্য ধ্যানের কথা, অথর্ববেদে সন্ন্যাস জীবনের কথা বলা হয়। সন্ন্যাস আশ্রম এজন্য বহুলোকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।

আধ্যাত্মিকতা

উপনিষদে আরও এক ধাপ এগিয়ে এই তত্ত্ব প্রচার করা হয় যে মানবাত্মা হল পরমাত্মার অঙ্গ। মৃত্যুর পর জীবের আত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়, দেহের পঞ্চভূত, পাঁচটি অংশে আলাদা হয়ে। প্রকৃতিতে মিশে যায়।

জড়বাদী দর্শন

অধ্যাত্মবাদের পাশাপাশি জড়বাদী দর্শনেরও উপনিষদে উদ্ভব হয়েছিল। জড়বাদী তত্ত্ব প্রচার করেছেন ঋষি উদ্দালক। তিনি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে প্রকৃতিকে তার স্থানে বসিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা হিসেবে। এই জড়বাদী তত্ত্ব থেকে পরবর্তী যুগে আসে চার্বাকের দেহবাদী দর্শন তত্ত্ব।

উপসংহার :- জড়বাদী ও দেহবাদীদের কাছে মৃত্যু হল জীবনের শেষ কথা। এই কারণে জীবনই একমাত্র সত্য বলে উদ্দালক প্রচার করেন। জীবনকে অস্বীকার করে পরলোকের কথা ভেবে লাভ নেই এই কথা তিনি বলেন।

(FAQ) পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মচিন্তা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পরবর্তী বৈদিক যুগে কোন দেবতা প্রাধান্য পায়?

প্রজাপতি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র।

২. পরবর্তী বৈদিক যুগে মন্ত্র পড়ে দেবতাকে আবাহন করত কে?

হোত্রী।

৩. পরবর্তী বৈদিক যুগে যজ্ঞের সময় সামবেদ গাইত কে?

উদগাত্রী।

৪. পরবর্তী বৈদিক যুগে জড়বাদী তত্ত্ব প্রচার করেন কে?

ঋষি উদ্দালক।

৫. দেহবাদী দর্শন তত্ত্বের সূত্রপাত করেন কে?

চার্বাক।

Leave a Reply

Translate »