মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা

মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা প্রসঙ্গে অপরিকল্পিত নগর সৃষ্টি, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, অপরিকল্পিত ঘর বাড়ি নির্মাণ, বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব প্রাপ্তি, ধনী ও দরিদ্রের অবস্থা, বিদ্যাচর্চা, বিনোদনের উপকরণ, গিল্ড ব্যবস্থা, নগরীর স্বায়ত্তশাসন ও নগর জীবনের দুর্দশা সম্পর্কে জানবো।

মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা

ঐতিহাসিক ঘটনামধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা
শহর কাঠামোঘিঞ্জি
জনবসতিঅত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ
পরিবেশঅস্বাস্থ্যকর
রাস্তাঘাটসরু ও আঁকাবাঁকা
পাহারাচৌকিদার
মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা

ভূমিকা :- ঐতিহাসিক হেনরি পিরেন মনে করেন যে মধ্যযুগে ইউরোপ -এর কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নগরের উৎপত্তির বিষয়টি খুবই সময় সাপেক্ষা ছিল। তবে দশম-একাদশ শতকে বাণিজ্যের প্রসার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ইউরোপে নগর প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

ইউরোপের নগরের জীবনযাত্রা

খ্রিস্টীয় একাদশ থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যে ইউরোপে বহু নগরের প্রতিষ্ঠা হয়। এই নগরগুলিতে মানুষের নগরজীবনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হল –

(ক) অপরিকল্পিত নগর সৃষ্টি

মধ্যযুগে নগরগুলি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রাচীরবেষ্টিত। নগরে প্রবেশের কয়েকটি প্রধান পথ থাকত। শহরগুলির রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়িগুলি অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হওয়ার নগরজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছোট্ট অঞ্চলে প্রচুর মানুষের বসবাসের ফলে নাগরিক জীবন ছিল খুবই নিম্নমানের।

(খ) রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা

শহরের রাস্তাগুলি ছিল সরু ও আঁকাবাঁকা। অধিকাংশ রাস্তা ছিল কাঁচা। বর্ষাকালে এই সব রাস্তায় খুবই কাদা হত। যথাযথ নিকাশি ব্যবস্থার অভাবে নগরগুলির আবর্জনা জমে থাকত। রাস্তায় রাতে আলোর ব্যবস্থা থাকত না। অন্ধকার রাস্তায় নিরাপত্তার জন্য লণ্ঠন ও বল্লমধারী চৌকিদারই ছিল একমাত্র ভরসা।

(গ) অপরিকল্পিত ঘরবাড়ি নির্মাণ

শহরের অধিকাংশ ঘরবাড়ি রাস্তার দুপাশ ঘেঁষে নির্মিত হত। বাড়ির ওপরতলা গুলির বর্ধিত অংশ রাস্তার ওপর এগিয়ে থাকত। বাড়িগুলি খুবই ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকায় শহরগুলি খুবই ঘিঞ্জি হত। ধনীদের বাড়ি ইঁট দিয়ে নির্মিত হলেও দরিদ্রদের বাড়ি কাঠ ও খড় দিয়ে নির্মিত হত। অধিকাংশ একতলা বাড়িতে টালির চাল থাকত।

(ঘ) বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব প্রাপ্তি

মধ্যযুগে ইউরোপের শহরগুলি ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শহরগুলিতে অসংখ্য বণিক ও কারিগর বসবাস করত। শহরে বাণিজ্যিক পণ্যের আদানপ্রদানের পর তা দূরদূরান্তে চলে যেত।

(ঙ) ধনী ও দরিদ্রের অবস্থা

শহরে প্রচুর ধনী বণিক ও উচ্চশ্রেণির লোকজন বাস করত। তারা অত্যন্ত দামী পোশাক পরত, শৌখিনতা, বিলাসিতা ও আড়ম্বরের মধ্যে দিন কাটাত। অন্যদিকে দরিদ্ররা সাধারণ পোশাকে, অনাড়ম্বরভাবে দিন কাটাত। তারা দিনের বেশির ভাগ সময় কাজে নিযুক্ত থাকায় অবসর যাপনের সময় পেত না।

(চ) বিদ্যাচর্চা

শহরে লেখাপড়ার প্রচলন বিশেষ ছিল না। প্রধানত ধনী বণিকরাই শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকত। তারা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করত এবং শিক্ষক হিসেবে মঠের সাধুসন্তদের নিয়ে আসত। মূলত তাদের ছেলেমেয়েরাই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। দরিদ্র ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

(ছ) বিনোদনের উপকরণ

শহরের প্রধান আনন্দ-উৎসব ছিল মেলা। দূরদূরান্তের বণিকরা রকমারি সামগ্রী নিয়ে ও ভেলকিবাজির খেলা দেখাতে মেলায় আসত। কুকুর ও মুরগির লড়াই, জুয়াখেলা, মদ্যপান প্রভৃতি ছিল শহরের মানুষের আমোদ-প্রমোদের প্রধান অঙ্গ।

(জ) গিল্ড ব্যবস্থা

ব্যাবসাবাণিজ্য ও শিল্পের প্রসারের জন্য শহরের বণিক ও কারিগরশ্রেণি গিল্ড বা সংঘ গড়ে তোলে। বণিক সংঘগুলি ব্যাবসায়িক প্রতিযোগিতা ও রেষারেষি বন্ধ করা, জিনিসপত্রের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি কাজ করত। অপরদিকে কারিগর সংঘগুলি তাদের সদস্যদের কাজের সময়সীমা ও পণ্যের দাম নির্ধারণের পাশাপাশি কারিগরদের স্বার্থরক্ষা করত।

মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির স্বায়ত্তশাসন

একাদশ শতকের পর থেকে ইউরোপে দ্রুত নগরের প্রসার ঘটতে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নগরগুলি ক্রমে সামন্তপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বায়ত্তশাসন লাভ করতে থাকে। এর বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) অনৈতিক করের বিরোধিতা

সামন্তপ্রভুরা নিজেদের অধীনস্থ অঞ্চলের নগরগুলির বাসিন্দাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর চাপাত। নগরের বাসিন্দারা এই অনৈতিক কর দিতে অস্বীকার করে সামন্তপ্রভুর বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। নগরগুলি এই ভাবে সামন্তপ্রভূর অধীনতা থেকে ছিন্ন হতে থাকে।

(২) প্রতিরোধ

সামন্তপ্রভু, তার বাহিনী ও বহিরাগত আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নগরগুলির চারিদিকে প্রাচীর তৈরি এবং খাল খনন করা হয়। নগরের বাসিন্দারা নিজেরা অস্ত্র ব্যবহার করে এবং বাইরে থেকে ভাড়াটে সৈন্য এনে সামন্তপ্রভু বা অন্য বহিরাগত শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

(৩) নির্বাচিত পৌর বোর্ড

শহরের ধনী বণিক ও কারিগররা সুশাসনের তাগিদে নিজেদের মধ্যে থেকে ‘টাউন কাউন্সিল’ বা পৌর বোর্ড গঠন করত। এই বোর্ডের নির্বাচিত সদস্যরা নিজেরাই নিজেদের শহরের শাসন পরিচালনা করত। এই পৌর বোর্ডের অধীনে প্রশাসন পরিচালনা নগরের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।

(৪) নগরজোট

শক্তিশালী রাজা বা সামন্তপ্রভুর মোকাবিলা করতে অনেক সময় অভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন নিকটবর্তী বিভিন্ন নগরগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে লিগ নামে নগরজোট গড়ে তুলত। ‘ভেরোনা লিগ’, ‘লম্বার্ড লিগ’, ‘হানসিয়াটিক লিগ’ প্রভৃতি ছিল এরকম কয়েকটি নগরজোট যেগুলি পরাক্রমশালী শাসকদের দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিল।

(৫) স্বাধীনতার সনদ

নগরের বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে সংগ্রাম, অর্থসাহায্য বা অন্য কোনো সহায়তা দিয়ে রাজা বা সামন্তপ্রভুদের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায় করত। ইংল্যান্ডের লন্ডন, অক্সফোর্ড, কেম্‌ব্রিজ, ফ্লান্ডার্সের ব্লুজ ও গেন্ট, জার্মানির কোলোন, মাইঞ্জ ইত্যাদি নগর এই জাতীয় অধিকার আদায় করেছিল।

(৬) প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্ব

নগরের বাসিন্দারা অনেক সময় প্রতিপক্ষ রাজা, সামন্তপ্রভু ও গির্জার বিরোধকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করত। অনেক ক্ষেত্রে তারা শত্রুর শত্রুর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে রাজা, সামন্তপ্রভু ও গির্জার আধিপত্য প্রতিহত করত। এই ভাবে নগরের বাসিন্দারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করত।

(৭) প্রকৃত গণতান্ত্রিক নয়

স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করলেও এবং নির্বাচিত ‘টাউন কাউন্সিল’ দ্বারা শাসিত হলেও নগরগুলি কিন্তু সঠিক অর্থে গণতান্ত্রিক ছিল না। কারণ শুধু নগরের বণিক ও ধনী কারিগররাই ‘টাউন কাউন্সিল’-এ নির্বাচিত হওয়ার অধিকার ভোগ করতেন, নগরের সাধারণ মানুষের এই অধিকার একেবারেই ছিল না।

মধ্যযুগে ইউরোপের নগরজীবনের দুর্দশা

মধ্যযুগে ইউরোপীয় শহরগুলি আয়তনে ছোটো হলেও শহর-গুলিতে অনেক লোক বসবাস করত। কিন্তু নানা কারণে শহরের মানুষের জীবনযাত্রা দুর্দশায় পূর্ণ ছিল। এই কারণগুলি হল –

(১) অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ

নিকাশি ব্যবস্থার অভাবে শহরগুলি আবর্জনায় ভরতি হয়ে, কাঁচা রাস্তাঘাটগুলি বর্ষার কাদায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে শহরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হত। ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা বাড়িগুলির ওপরতলা রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকত। এই বাড়িগুলির ঘুপচি ঘরে আলো-বাতাস ঢুকতে পারত না। এরূপ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে শহরগুলিতে প্রায়ই প্লেগ বা অন্যান্য মহামারির মতো রোগে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হত।

(২) পানীয় জলের সংকট

মধ্যযুগের ইউরোপের শহরগুলি সবসময় জঞ্জালে ভরতি থাকত। এই অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থার ফলে শহরের পানীয় জল দূষিত হত। ফলে বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া খুবই মুশকিল হত। মানুষ দূষিত জল পান করার ফলে তাদের মধ্যে কলেরা বা মহামারির মতো রোগ হত।

(৩) অপরিকল্পিত নগরজীবন

মধ্যযুগের শহরগুলি নির্মাণে কোনো সুচিন্তিত পরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া যায় না। শহরের অপরিকল্পিত বিন্যাস, সরু ও আঁকাবাঁকা রাস্তাঘাট, রাস্তার দু-পাশ ঘেঁষে গৃহনির্মাণ, বাড়ির ওপরতলার বর্ধিত অংশ রাস্তার ওপরে ঝুঁকে আসা প্রভৃতি বিষয়গুলি শহরের মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাচ্ছন্দ্যহীন করে তুলেছিল।

(৪) নিরাপত্তাহীনতা

রাতের শহরের পথঘাট বাসিন্দা বা বাইরের পথিক কারো কাছেই নিরাপদ ছিল না। রাস্তাগুলিতে রাতে আলোর ব্যবস্থা ছিল না। রাস্তায় চোর ডাকাত ও দুষ্কৃতীদের উৎপাত পাহারাদার বা চৌকিদাররা রোধ করতে পারত না।

(৫) জীবিকার অনিশ্চয়তা

শহরে ধনীরা প্রচণ্ড বিলাসিতায় জীবন কাটালেও গরিব শ্রমিক ও কারিগরদের অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। তাদের কাজের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। মানুষ কাজ হারিয়ে চুরি-ডাকাতির পথ গ্রহণ করত, এমনকি ভিক্ষাও করত।

(৬) সামন্তপ্রভুদের অত্যাচার

সামন্তপ্রভুরা নিজ এলাকার নগরগুলিকে সর্বদা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করত। তারা শহরের দরিদ্র শ্রমিক, কারিগর ও ভূমিদাসদের ওপর কর চাপানোর চেষ্টা করত এবং নানা ধরনের শোষণ চালিয়ে তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলত।

উপসংহার :- মধ্যযুগের ইউরোপে নগরগুলির প্রাচীরের সম্ভ্রম জাগানো গঠন, কঠিন মসৃণ পাথরের সৌন্দর্য্য, ধনীদের বিলাস-বৈভব প্রভৃতি দূর থেকে দেখলে নগরগুলিকে ‘সৃষ্টির সংক্ষিপ্তসার’ বলে মনে হত। কিন্তু শহরে বসবাসকারী দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কাছে নগরজীবন ছিল আতঙ্কের শামিল।

(FAQ) মধ্যযুগের ইউরোপের নগরগুলির জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মধ্যযুগের ইউরোপের শহরগুলিতে জনবসতি কেমন ছিল?

 অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ।

২. ইউরোপের শহর গুলির গঠন কেমন ছিল?

ঘিঞ্জি।

৩. ইউরোপের শহরগুলির আনন্দ উৎসবের প্রধান অঙ্গ কি ছিল?

মেলা।

৪. মধ্যযুগের শহরগুলি রাতে পাহারা দিত কারা?

চৌকিদার।

৫. ইউরোপের শহরগুলি দূর থেকে দেখলে কি বলে মনে হতো?

সৃষ্টির সংক্ষিপ্তসার।

Leave a Comment