উপসাগরীয় সংকট

উপসাগরীয় সংকট প্রসঙ্গে এর কারণ, বহিঃপ্রকাশ, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলাফল, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলাফল, দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ ও তার ফলাফল সম্পর্কে জানবো।

উপসাগরীয় সংকট

ঐতিহাসিক ঘটনাউপসাগরীয় সংঙ্কট
ইরাক-ইরান যুদ্ধ১৯৮০-৮৮ খ্রি
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ১৯৯০-৯১ খ্রি
দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ২০০৩ খ্রি
সাদ্দাম হুসেনের ফাঁসি৩০ ডিসেম্বর ২০০৬ খ্রি
জর্জ বুশআমেরিকার রাষ্ট্রপতি
উপসাগরীয় সংকট

ভূমিকা :- বিংশ শতকের সত্তরের দশকের শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনা উপসাগরীয় সংকট নামে পরিচিত।

উপসাগরীয় সংকটের কারণ

  • (১) এই উপসাগরীয় সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। এই অঞ্চলের ২/৩ অংশের বেশি মানুষ ইরান ও ইরাকে বসবাস করে। এই অঞ্চলের তেলের ওপর বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ নির্ভর করে।
  • (২) তাই এই অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে আমেরিকা ও রাশিয়া উপসাগরীয় সংকটের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে। এখানকার তৈল সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তারা এই অঞ্চলে ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রসার ঘটায়।

উপসাগরীয় সংকটের বহিঃপ্রকাশ

মূলত যে তিনটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় সংকটের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেগুলি হল – ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮ খ্রি.), ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের ফলে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০-৯১ খ্রি.) এবং দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ (২০০৩ খ্রি.)।

ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮ খ্রি.)

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে ইরানে মহম্মদ রেজা পাহলভির শাসনাধীন শাহিতন্ত্রের পতন এবং শিয়াপন্থী আয়াতুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা (১ এপ্রিল) আমেরিকা ও ইরাকের সঙ্গে ইরানের বিরোধের সূচনা করে। এই যুদ্ধের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) ইরাক-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ইরাক ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট হিসেবে বিভিন্ন ঘটনা কাজ করেছিল। যেমন –

(১) সাদ্দামের ক্ষমতালিপ্সা

ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন ছিলেন সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং ক্ষমতালিপ্পু। তিনি নিজেকে আরব দুনিয়ার একচ্ছত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন।

(২) সম্ভাব্য বিপ্লব প্রতিরোধের চেষ্টা

আয়াতুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইরানে মৌলবাদী শিয়াপন্থীদের উত্থান এবং ইসলামি বিপ্লবের ঘটনায় ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন আশঙ্কিত হয়েছিলেন। ইসলামি বিপ্লবের ঢেউ যাতে ইরাকে প্রবেশ করতে না পারে এবং খোমেইনিকে যাতে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় সেই উদ্দেশ্যে সাদ্দাম হুসেন আগে থেকেই ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষমতা সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

(৩) তেলের ওপর আধিপত্যের চেষ্টা

সাদ্দাম হুসেন উপসাগরীয় অঞ্চল তথা মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর নিজের একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এখানকার তেলের উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সাদ্দামের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরান।

(৪) সাত-এল-আরব প্রণালীর দখল

ইরাক ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত সাত্-এল-আরব প্রণালী দিয়ে উভয় দেশের তেল রপ্তানি চলত। এই প্রণালীতে ইরানের অধিকার ধ্বংস করে নিজের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সাদ্দাম হুসেন ইরান আক্রমণের পরিকল্পনা করেন।

(খ) ইরাক-ইরান যুদ্ধের গতি

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) যুদ্ধের সূত্রপাত

ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর ইরানের বিমানঘাঁটিগুলিতে এবং স্থলপথে আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধের সূত্রপাত করেন। ইরান তার প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে। আমেরিকা, রাশিয়া ও অন্যান্য পশ্চিমি শক্তিগুলি গোপনে ইরাক ও ইরানকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করলে যুদ্ধ আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে।

(২) ইরানের অগ্রগতি

১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ইরান তার ভূখণ্ড থেকে ইরাকি বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। এই সময় ইরাক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও ইরান তা নাকচ করে। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।

(৩) ইরাকে কুর্দ বিদ্রোহ

এদিকে ইরানের মদতে ইরাকের কুর্দিস্তান পার্বত্য অঞ্চলে সান্দামবিরোধী শিয়ারা ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু করে। তারা বিস্তৃত অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং ইরাক-তুরস্ক তেলের পাইপ লাইন ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে ইরাকের সংকট বৃদ্ধি পায় এবং ইরান থেকে তারা পিছু হটতে থাকে। সাদ্দাম বিদ্রোহী কুর্দদের ওপর জনবিধ্বংসী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে হাজার হাজার কুর্দকে হত্যা করেন। এরপর ইরান ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়। এর ফলে ইরাক-ইরান যুদ্ধের অবসান হয়।

ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলাফল

দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলাফলগুলি উপসাগরীয় অঞ্চল তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন –

(১) ক্ষয়ক্ষতি

এই যুদ্ধে ইরাক বা ইরান কোনো পক্ষই জয়লাভ করে নি বা বিশেষ সুবিধা করতে পারে নি। দীর্ঘ যুদ্ধে উভয় দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও জনসম্পদ ধ্বংস হয়। উভয় দেশের শিল্পকারখানা ও বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয় এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ হতাহত হয়।

(২) দ্বিধাবিভক্ত আরব দুনিয়া

এই যুদ্ধের ঘটনায় আরবের দেশগুলি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সৌদি আরব, জর্ডন ও কুয়েত ইরাকের পক্ষ নিয়েছিল। অপরদিকে সিরিয়া, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, আলজিরিয়া প্রভৃতি দেশ ইরানের পক্ষ নিয়েছিল।

(৩) ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রসার

ইরাক-ইরান যুদ্ধের সুযোগে বৃহৎ শক্তি আমেরিকা ও রাশিয়া উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায় এবং এই অঞ্চলে ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রসার ঘটায়।

(৪) তেল সরবরাহ ব্যাহত

দীর্ঘকাল ধরে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ যথেষ্ট ব্যাহত হয়।

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০-৯১ খ্রি.)

ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় (১৯৮০-৮৮ খ্রি.) এবং তার পরবর্তীকালে আমেরিকার কাছ থেকে ইরাক বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র লাভ করে নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। কিন্তু কিছুকাল পরেই আমেরিকার সঙ্গে ইরাকের সদ্ভাব নষ্ট হয়। ফলে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোট ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, যা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ বা প্রথম খাঁড়ি যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ইরাক তার প্রতিবেশী কুয়েত আক্রমণ ও দখল করলে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়। বিভিন্ন ঘটনা এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। যেমন –

(১) আর্থিক সমৃদ্ধির চেষ্টা

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৮ বছরব্যাপী যুদ্ধে ইরাকের বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রতিবেশী কুয়েতের তৈল সম্পদ দখল। করে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন নিজ দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি আনতে চেয়েছিলেন।

(২) কুয়েতের তৈলভাণ্ডার

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের খনিগুলির প্রতি পশ্চিমি শক্তিগুলির লোভ সাদ্দাম মানতে রাজি ছিলেন না। সমগ্র বিশ্বের তেল ভাণ্ডারের ৯.৪ শতাংশ কুয়েতে রয়েছে। এজন্য সাদ্দাম হুসেন কুয়েত দখল করে পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলির লোভ দমন করার উদ্যোগ নেন।

(৩) ইরাকের অংশ

কুয়েত অতীতে ইরাকেরই অংশ ছিল। এজন্য সাদ্দাম হুসেন দাবি করেন যে হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করে হলেও তিনি কুয়েত পুনরুদ্ধার করবেন।

(৪) কুয়েতে আমেরিকার আধিপত্য

সাদ্দাম কুয়েতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় কুয়েত তার তেলের খনিগুলির নিরাপত্তার দায়িত্ব আমেরিকার হাতে ছেড়ে দিয়ে মার্কিন আধিপত্যের সুযোগ করে দিয়েছে। কুয়েতের এই কাজের ফলে ওপেক নামে তেল সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলির যথেষ্ট আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।

(৫) ক্ষতিপূরণ দাবি

সাদ্দাম হুসেন কুয়েতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন যে, কুয়েত ইরাকের রুইমালা খনি থেকে চুরি করে তেল উত্তোলন করার ফলে ইরাকের প্রভূত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এজন্য তিনি কুয়েতের কাছে ১৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। কুয়েত ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করলে সাদ্দাম হুসেন কুয়েত আক্রমণ করেন।

(খ) প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের গতি

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) কুয়েত দখল

ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট কুয়েতে প্রায় দুই লক্ষ সেনা পাঠালে দুর্বল কুয়েত তার কোনো প্রতিরোধই করতে পারে নি। সাদ্দাম কুয়েত দখল করে কুয়েতকে ইরাকের ১৯তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন।

(২) আমেরিকার নেতৃত্ব

সাদ্দাম হুসেন মনে করেছিলেন যে, তিনি কুয়েত আক্রমণ করলেও আমেরিকা বা পশ্চিমি শক্তিগুলি খুব একটা বিরোধিতা করবে না। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা হয় নি। আমেরিকা সহ পশ্চিমি দেশগুলি আতঙ্কিত হয়েছিল যে, তৈল সমৃদ্ধ আরব দুনিয়া এভাবে সাদ্দাম হুসেনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তাদের প্রভূত ক্ষতি হবে। এজন্য আমেরিকা সক্রিয়ভাবে ইরাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে নেতৃত্ব দেয়।

(৩) জাতিপুঞ্জের উদ্যোগ

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ৬ আগস্ট ইরাকের সঙ্গে সব দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রস্তাব দেয়। জাতিপুঞ্জ ইরাককে একটি চরমপত্র দিয়ে জানায় যে, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কুয়েত থেকে ইরাক সরে না এলে ইরাকের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

(৪) আমেরিকার অভিযান

ইতিমধ্যে সাদ্দাম ইরাকে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সপরিবারে অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিলে আমেরিকা ইরাকের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিপুঞ্জের সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ১৫ জানুয়ারি ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ইরাক আক্রমণ করে। সাত মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে নির্বিচারে প্রচুর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। শীঘ্রই কুয়েত থেকে ইরাকের বাহিনী সরে আসতে বাধ্য হয় এবং যুদ্ধে ইরাক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

(গ) প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলাফল

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলাফলগুলি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন  –

(১) সাদ্দাম-বিরোধী বিদ্রোহ

যুদ্ধ চলাকালে সাদ্দামের বিরুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরে তীব্র গণ অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাদ্দাম নির্মমভাবে বহু মানুষকে হত্যা করেন।

(২) ইরাকের ক্ষয়ক্ষতি

বহুজাতিক বাহিনীর আক্রমণে ইরাকের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বাগদাদ-সহ ইরাকের বিভিন্ন স্থানের হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিল এবং বহু রাস্তাঘাট, সেতু, সৌধ প্রভৃতি ধ্বংস হয়েছিল।

(৩) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ

আমেরিকার লক্ষ্য ছিল কুয়েতের মুক্তি ঘটিয়ে এবং ইরাকের ক্ষমতা থেকে সাদ্দাম হুসেনকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তৈলসম্পদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। বলা বাহুল্য, এ কাজে আমেরিকা অনেকটাই সফল হয়েছিল।

(৪) ইরাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা

যুদ্ধে পরাজিত ইরাক জাতিপুঞ্জের কয়েকটি শর্ত মানতে বাধ্য হয়েছিল। শর্তে বলা হয়েছিল যে, ইরাকের মজুত করা পরমাণু এবং অন্যান্য মারণাস্ত্র নষ্ট করতে হবে, পরমাণু অস্ত্র গবেষণা বন্ধ রাখতে হবে, কুর্দ জাতি অধ্যুষিত অঞ্চল উড়ানমুক্ত অঞ্চল বলে ইরাক মেনে নেবে।

(৫) আমেরিকার ক্ষমতা বৃদ্ধি

উপসাগরীয় যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের মর্যাদা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এর দ্বারা আমেরিকা এক মেরু বিশ্বের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায়।

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ (২০০০ খ্রি.)

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর কাছে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেনের শোচনীয় পরাজয় তাঁর ললাটে পতনের চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। নিজের ললাটের সেই চিহ্ন তিনি নিজের চোখে দেখতে না পেয়ে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধ বিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেন। এই যুদ্ধের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

আমেরিকা ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ আনেন। এগুলি হল –

(১) কুর্দ অঞ্চলে ইরাকি সেনা

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে কুর্দ অঞ্চলের উড়ানমুক্ত অঞ্চলে ইরাকি সেনা পাঠান।

(২) পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার

আমেরিকা দাবি করে যে, সাদ্দাম ইরাকে প্রচুর মারাত্মক পারমাণবিক ও রাসায়নিক মারণাস্ত্র মজুত করেছে।

(৩) আল-কায়দার সঙ্গে সাদ্দামের যোগ

আমেরিকা অভিযোগ করে যে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ওসামা বিন লাদেন এবং তাঁর সংগঠন আল কায়দা’র সঙ্গে সাদ্দাম হুসেনের যোগ আছে।

(৪) আমেরিকার জবরদস্তি

আমেরিকা বেশির ভাগ অভিযোগই প্রমাণ করতে না পারলেও একপ্রকার গায়ের জোরে ইরাককে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আমেরিকার প্রতিটি সিদ্ধান্তে ইংল্যান্ড সম্মতি জানায়।

(খ) দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সূত্রপাত

  • (১) এইসব অভিযোগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ (জুনিয়র) উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা সমাবেশ করেন (২০০৩ খ্রি.)। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তৈলসম্পদের ওপর আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন।
  • (২) লৌহ-দৃঢ় সাদ্দাম হুসেনকে ধ্বংস করতে আমেরিকা ইরাকের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করে এবং ২০ মার্চ ইরাকের ওপর আক্রমণ শুরু করে। এই যুদ্ধ দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ বা দ্বিতীয় খাঁড়ি যুদ্ধ নামে পরিচিত।

(গ) দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলাফল

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলাফলগুলি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন –

(১) ইরাকের পরাজয়

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকার হাতে ইরাকের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।

(২) ইরাকের ক্ষয়ক্ষতি

ইরাকের ওপর মার্কিন আক্রমণে ইরাকের অগণিত মানুষের মৃত্যু হয় এবং বহু অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষতি হয়।

(৩) সাদ্দামের পলায়ন

যুদ্ধে পরাজয়ের পর রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেন পালিয়ে এক ভূগর্ভস্থ গৃহে আশ্রয় নেন। কিন্তু মার্কিন সামরিক শক্তি এই গোপন আশ্রয়স্থল থেকেও সাদ্দাম হুসেনকে খুঁজে বের করে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু করে।

(৪) সাদ্দামের ফাঁসি

বিচারে সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনা হয় এবং তাঁর ফাঁসির সাজা ঘোষণা করা হয়। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

উপসংহার :- সাদ্দাম হুসেনের মৃত্যুর পর ইরাকের তেলের ভাণ্ডারের দখলদারি এবং সেই সঙ্গে ইরাকের ভাগ্য নিয়ে টালমাটাল অবস্থা চলতে থাকে।

(FAQ) উপসাগরীয় সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. উপসাগরীয় সংকট কি?

বিংশ শতকের সত্তরের দশকের শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনা উপসাগরীয় সংকট নামে পরিচিত।

২. উপসাগরীয় সংকটের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কোন তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে?

ইরাক-ইরান যুদ্ধ, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ ও দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ।

৩. ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯৮০-৮৮ খ্রিস্টাব্দ।

৪. প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দ।

৫. দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয় কখন?

২০০৩ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment