আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম

আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম প্রসঙ্গে মুক্তি সংগ্রামের প্রেক্ষাপট, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা লাভ, প্রথম রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীন আলজেরিয়ার বিকাশের তিনটি পর্যায় সম্পর্কে জানবো।

আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম

ঐতিহাসিক ঘটনাআলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম
নেতৃত্বআহমেদ বেন বেল্লা
জঙ্গী জাতীয়তাবাদী দলন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট
তীব্র দমন নীতি গ্রহণজেনারেল জেকুইস ম্যাসু
স্বাধীনতা লাভ১৯৬২ খ্রি
প্রথম রাষ্ট্রপতিআহমেদ বেন বেল্লা
আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম

ভূমিকা :- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ -এর পরবর্তীকালে আলজেরিয়ায় ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়। ফরাসি অধীতা ছিন্ন করে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদীরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপট

বিভিন্ন ঘটনা ফরাসি শক্তির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা লাভের প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছিল। এগুলি হল –

(ক) ফ্রান্সের কঠোর নীতি

  • (১) আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদীরা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু করলেও আলজেরিয়ার স্বাধীনতা প্রাপ্তির বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে। আলজেরিয়ার ক্ষেত্রে ফ্রান্স কঠোর নীতি গ্রহণ করে।
  • (২) ফ্রান্স কোনো অবস্থাতেই আলজেরিয়ার উপনিবেশটি হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। ফরাসিরা দাবি করত যে, আলজেরিয়া মোটেই ফ্রান্সের উপনিবেশ নয়, এটি ফ্রান্সের নিজস্ব অংশ। ফলে ফ্রান্স যত কঠোর নীতি প্রয়োগ করতে থাকে, আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রাম তত তীব্র হতে থাকে।

(খ) শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দাদের প্রভুত্ব

  • (১) আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকালে বহু শ্বেতাঙ্গ ফরাসি এখানে এসে বসবাস শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আলজেরিয়ায় বসবাসকারী শ্বেতাঙ্গ ফরাসি বাসিন্দাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লক্ষ। এই শ্বেতাঙ্গরাই ছিল আলজেরিয়ার ধনী ও প্রভুত্বকারী জনগোষ্ঠী।
  • (২) শ্বেতাঙ্গরা ছিল আলজেরিয়ার ১/৩ অংশ কৃষিজমির মালিক। সেখানকার রপ্তানি বাণিজ্যের বেশিরভাগটাই তাদের দখলে ছিল। প্রভুত্বকারী এই শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল।

(গ) শ্বেতাঙ্গ ফরাসিদের ভূমিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদীরা তীব্র আন্দোলন শুরু করলেও সেখানকার শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দারা এর বিরোধিতা করে। তারা আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকে সমর্থন করে এবং আলজেরিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সম্পর্ক অটুট রাখার দাবি জানায়। এতে আলজেরিয়ার সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ সেখানকার শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

(ঘ) বঞ্চনার প্রতিবাদ

  • (১) ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে বসবাস করে আলজেরিয়ার শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দারা বহু অধিকার ও সুযোগসুবিধা ভোগ করলেও সেখানকার সাধারণ নাগরিকরা সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।
  • (২) স্বাধীনতার দাবিতে আলজেরিয়ার জনগণ ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১ মে একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করলে ফরাসিরা এই মিছিলের ওপর সুতীব্র দমননীতি চালায়। এতে কয়েকজন আলজেরীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
  • (৩) তার ওপর ফ্রান্স জেনারেল জেকুইস ম্যাসু-কে আলজেরিয়ায় পাঠিয়ে তীব্র দমন চালাতে থাকে। এর ফলে আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন আগুনের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

(ঙ) ইন্দোচিনের সাফল্যের প্রেরণা

  • (১) আফ্রিকার আলজেরিয়ার মতো এশিয়ার ইন্দোচিনও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি উপনিবেশ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইন্দোচিনে ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের ফলে সেখানে ফরাসি আধিপত্য চূর্ণ হয় এবং ইন্দোচিন স্বাধীনতা লাভ করে।
  • (২) ফরাসিদের বিরুদ্ধে ইন্দোচিনের সাফল্য আলজেরিয়ার সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করে। তারা উপলব্ধি করে যে, ইন্দোচিনের মতো সংগ্রামের মাধ্যমে তারাও আলজেরিয়ায় ফরাসি আধিপত্য ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।

আলজেরিয়ার মুক্তি আন্দোলনের প্রসার

ফরাসি অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীনতা লাভের জন্য আলজেরিয়ায় ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। স্বাধীনতার দাবিতে আলজেরিয়ায় ‘ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ (NLF) নামে একটি জঙ্গি জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। বেন বেল্লা-এর নেতৃত্বে আলজেরিয়ার সর্বত্র ফরাসি শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে এই সংগঠন আলজেরিয়ায় ফরাসি শক্তিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা লাভ

ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্য গল ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আলজেরিয়ায় পরিকল্পিত গণভোটের ব্যবস্থা করেও সেখানকার আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হন। শেষপর্যন্ত ফরাসি শক্তি আলজেরিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আলজেরিয়া বহুপ্রতীক্ষিত স্বাধীনতা লাভ করে।

আলজেরিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি

ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের প্রধান নেতা আহমেদ বেন বেল্লা স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আলজেরিয়া স্বাধীন হলে প্রায় আট লক্ষ ফরাসি ঔপনিবেশিক সেই দেশ ত্যাগ করে ফ্রান্সে ফিরে যায়।

স্বাধীন আলজেরিয়ার বিকাশ

আধুনিক আলজেরিয়ার বিকাশ ও জাতি সংগঠনের ধারাকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যথা –

  • (ক) প্রথম পর্যায় (১৯০০-১৯৫৪ খ্রি.),
  • (খ) দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৫৪-১৯৬০ খ্রি.),
  • (গ) তৃতীয় পর্যায় (১৯৬০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত)।

(ক) আলজেরিয়ার বিকাশের প্রথম পর্যায়

  • (১) আফ্রিকার আলজেরিয়া ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি উপনিবেশ। বিংশ শতকের শুরু থেকে আলজেরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার কিছুটা প্রসার ঘটে। কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ধনী আলজেরীয়রা সেখানে বেশ কিছু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় আলজেরীয়রা জাতি হিসেবে সচেতন হতে শুরু করে। তারা ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থা হারিয়ে ফেলে।
  • (২) তারা উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, প্রতিবাদের পথে অগ্রসর না হলে ফরাসিরা চিরকাল আলজেরীয়দের পদানত করে তীব্র শোষণ ও দমনপীড়ন চালিয়ে যাবে। এর ফলে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তারা ক্রমে সরব হতে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসনের বন্ধন ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে তারা ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

(খ) আলজেরিয়ার বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়

  • (১) আলজেরিয়ার জাতি সংগঠনের দ্বিতীয় পর্যায়ে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনে নেতৃত্বের অগ্রভাগে থাকেন বেন বেল্লা। জাতীয় সংহতি ও জাতীয়তাবাদে উদ্‌বুদ্ধ আলজেরিয়ার জনগণ বিদেশি শাসকদের বিতাড়িত করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে জীবন-মরণ সংগ্রামে শামিল হয়।
  • (২) শেষপর্যন্ত ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির পতন ঘটে এবং ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতান্ত্রিক আলজেরিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই পর্বে আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদী মানসিকতার চূড়ান্ত আত্মপ্রকাশ ঘটে।

(গ) আলজেরিয়ার বিকাশের তৃতীয় পর্যায়

  • (১) এই পর্যায়ে আলজেরিয়া একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ন্যাশানাল লিবারেশন ফ্রন্টের প্রধান নেতা আহমেদ বেন বেল্লা স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। অবশ্য বেন বেল্লা রাষ্ট্রপতি পদে বসা মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই তাঁকে উৎখাত করে তাঁর মন্ত্রী হৌয়ারি বৌমডিয়েন আলজেরিয়ার ক্ষমতা দখল করেন।
  • (২) তবে বেন বেল্লার উদ্যোগে সেখানে যেসব সমাজতান্ত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তা তিনি বহাল রাখেন। তাঁর আমলে সেখানকার কৃষি ও শিল্পায়নে যথেষ্ট গতি আসে। কিন্তু তিনি মূলত সামরিক শক্তির সহায়তায় সমগ্র জাতির ওপর নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন। তবে এই সময় আলজেরিয়ায় ইসলামি মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে।

উপসংহার :- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু আগে থেকেই আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে ফরাসি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আফ্রিকার অধিকাংশ ফরাসি উপনিবেশে মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়। আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি উপনিবেশ হিসেবে আলজেরিয়া অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

(FAQ) আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আফ্রিকার আলজেরিয়ায় কাদের উপনিবেশ ছিল?

ফ্রান্সের।

২. আলজেরিয়ায় তীব্র দমননীতি গ্রহণ করেন কে?

ফরাসি জেনারেল জেকুইস ম্যাসু।

৩. ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট নামে জঙ্গি জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয় কোথায়?

আলজেরিয়ায়।

৪. আলজেরিয়ায় কার নেতৃত্বে মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়?

আহমেদ বেন বেল্লা।

৫. আলজেরিয়া কখন স্বাধীনতা লাভ করে?

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে।

৬. স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কে?

আহমেদ বেন বেল্লা।

Leave a Comment