হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা

হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা প্রসঙ্গে সাদৃশ্য হিসেবে খাদ্য, সাজ সজ্জা, বয়ন শিল্প, আর্যকঙ্কাল, বৈসাদৃশ্য হিসেবে নগর বনাম গ্ৰামীণ সভ্যতা, জীবিকা, লোহার প্রচলন, ঘোড়ার উপস্থিতি, ধর্মগত প্রভেদ, সামাজিক প্রভেদ, খাদ্য অভ্যাসে পার্থক্য ও মৃৎশিল্পের পার্থক্য সম্পর্কে জানবো।

হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা

বিষয় হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা
হরপ্পা সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক
বৈদিক সভ্যতা গ্ৰামীণ
ঘোড়া অজ্ঞাত হরপ্পা সভ্যতা
লোহার ব্যবহার বৈদিক সভ্যতা
হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা

ভূমিকা:- সিন্ধু-সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত ধারণা ছিল বৈদিক-সভ্যতাই ভারত -এর প্রাচীনতম সভ্যতা। এখনও কোনো কোনো পণ্ডিতের ধারণা, হরপ্পা সভ্যতা (সিন্ধু সভ্যতা) ও বৈদিক সভ্যতা অভিন্ন। কিন্তু অন্য বহু পণ্ডিতের মতে, উভয় সংস্কৃতি বা সভ্যতাকে অভিন্ন ভাবা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ সময়গত ও সংস্কৃতিগত বহু প্রভেদ এদের মধ্যে বর্তমান।

সাদৃশ্য

সিন্ধু-সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার মধ্যে অনেকগুলি ক্ষেত্রেই আপাত সাদৃশ্য দেখা যায়। যেমন –

(১) খাদ্য

সিন্ধুবাসী ও বৈদিক আর্যদের খাদ্য ও পোশাক ছিল প্রায় এক রকম। গম, যব, ছাতু প্রভৃতি উভয় যুগেই খাদ্যরূপে গৃহীত হত।

(২) সাজ সজ্জা

সিন্ধু-সভ্যতার নারীদের মতো বৈদিকযুগের নারীরাও মণিমুক্তাখচিত অলঙ্কার পরিধান করত। উভয় আমলেই কেশবিন্যাসের রীতি ছিল একই রকম।

(৩) বয়নশিল্প

উভয় ক্ষেত্রেই বয়নশিল্পে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সিন্ধুবাসী ও বৈদিক আর্য উভয় সম্প্রদায়ই তুলার চাষ করত। এবং তুলা থেকে সুতা তৈরি করে বস্ত্র বয়ন করত।

(৪) আর্য কঙ্কাল

নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষার দ্বারা সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে বৈদিক সভ্যতার স্রষ্টা আর্যদের কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, ঐ অঞ্চলে আর্যরাও ছিল।

বৈসাদৃশ্য

বেশ কিছু সাদৃশ্য থাকলেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে উভয় সংস্কৃতির মধ্যে বহু বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন –

(১) নগর বনাম গ্রামীণ সভ্যতা

সিন্ধু-সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। হরপ্পা মহেঞ্জোদারোয় আবিষ্কৃত দ্বিতল পাকাবাড়ি, প্রশস্ত রাজপথ, উন্নত পয়ঃপ্রণালী, পরিকল্পিত স্নানাগার ও খাদ্যভাণ্ডার প্রভৃতি উন্নত নাগরিক জীবনের পরিচয় বহন করে। পক্ষান্তরে আর্যরা নগর নির্মাণ করত না, পাকাবাড়ির পরিবর্তে মাটির দেওয়ালযুক্ত বাড়িই ছিল তাদের প্রধান বাসস্থান।

(২) জীবিকা

পশুপালন ছিল আর্যদের প্রধান জীবিকা। স্থানান্তরে ভ্রমণ করে এবং পশুপালন করে তারা জীবননির্বাহ করত। কিন্তু সিন্ধুবাসীরা স্থায়ীভাবে বসবাস করত এবং ব্যাপকভাবে কৃষিকাজ ও বাণিজ্য করে নিজেদের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছিল।

(৩) শর্মার অভিমত

ঐতিহাসিক আর. এস. শর্মার মতে, “Ar best Rigvedic Aryans lived in fortified places protected by mud-walls at the times of floods, and they cannot be regarded as town in Harappan Sense.”

(৪) লোহার প্রচলন

সিন্ধু-সভ্যতায় লোহার প্রচলন ছিল না। অর্থাৎ লোহা তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু বৈদিকযুগে লোহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু জিনিস এরা লোহা দ্বারা নির্মাণ করত।

(৫) ঘোড়ার উপস্থিতি

লোহার মতো ঘোড়াও সিন্ধু অধিবাসীদের কাছে অজ্ঞাত ছিল। কিন্তু আর্যদের কাছে ঘোড়া ছিল অতি প্রয়োজনীয় একটি পশু।

(৬) ধর্মগত প্রভেদ

উভয় সভ্যতার মধ্যে ধর্ম-ভাবনাগত অনেক প্রভেদ ছিল। সিন্ধু-সভ্যতায় মাতৃপূজা ও লিঙ্গপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কিন্তু আর্যদের মধ্যে মাতৃপুজার প্রচলন ছিল না, এবং তারা লিঙ্গপূজাকে ঘৃণার চোখে দেখত। হরপ্পা-সংস্কৃতির তুলনায় ঋক বৈদিক যুগ -এ ধর্মাচরণ ছিল অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

(৭) মার্শালের অভিমত

প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্শালের মতে, সিন্ধুবাসীরা ষাঁড়ের পূজা করত, কিন্তু আর্যরা গাভীর পূজা করত। সিন্ধু-সভ্যতায় অগ্নিপূজার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, কিন্তু আর্যদের মধ্যে অগ্নিপূজার প্রচলন ছিল।

(৮) সামাজিক প্রভেদ

সামাজিক রীতি-নীতি ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও উভয় সভ্যতার মধ্যে প্রভেদ ছিল। সিন্ধু-সমাজব্যবস্থা ছিল মাতৃকেন্দ্রিক, কিন্তু বৈদিক সমাজব্যবস্থা ছিল পিতৃতান্ত্রিক।

(৯) সমাধি

হরপ্পা-সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলিতে আবিষ্কৃত সমাধিস্থান থেকে বোঝা যায়, ঐ যুগে মৃতদেহকে সমাধিস্থ করা হত। কিন্তু আর্যরা মৃতদেহকে আগুনে ভস্মীভূত করত। পার্থিব জীবনকে সিন্ধুবাসী বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু বৈদিক সভ্যতা ছিল মূলত আধ্যাত্মিক।

(১০) লিখন পদ্ধতি

সিন্ধুবাসীরা লিখন পদ্ধতি আয়ত্ত করেছিল। কিন্তু আর্যরা জ্ঞানচর্চায় অগ্রণী হলেও তাদের মধ্যে লিখন পদ্ধতির প্রচলন ছিল না। সিন্ধুবাসীরা ছিল শান্তিকামী, কিন্তু আর্যরা ছিল যুদ্ধপ্রিয়।

(১১) খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য

উভয় আমলেই খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেও কিছু বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সিন্ধুসভ্যতার যুগে মাছ ছিল অন্যতম প্রধান খাদ্য। তাছাড়া, ঐ যুগে ছোটো জীবজন্তু, যেমন শূকর, ছাগল প্রভৃতির মাংস ভক্ষণ করত। কিন্তু আর্যরা মাছ ভক্ষণ করত না, এরা গোরু, ঘোড়া প্রভৃতির মাংস ভক্ষণ করত।

(১২) মৃৎশিল্পের প্রভেদ

সিন্ধুবাসী ও আর্যদের নির্মিত মৃৎপাত্রের মধ্যেও পার্থক্য ছিল। সিন্ধু-উপত্যকায় আবিস্কৃত মৃৎপাত্রগুলির রং ছিল কালচে-লাল। কিন্তু আর্যদের নির্মিত মৃৎপাত্রগুলির রং ছিল ধূসর। রং ব্যবহারের এই পার্থক্য দুটি সভ্যতার আলাদা অস্তিত্বের নির্দেশ করে।

বর্বর সভ্যতা

উপরিলিখিত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা-সংস্কৃতি ও আর্য-সভ্যতা অভিন্ন ছিল না। একথা পরিষ্কার যে, হরপ্পার তুলনায় আর্য-সভ্যতা ছিল পশ্চাদ্‌পদ। তাই অনেকে একে ‘বর্বর সভ্যতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

উপসংহার:- গর্ডন চাইল্ডের মতে, আর্যরা যেখানেই গেছে, সেখানেই তারা উন্নত সভ্যতাকে ধ্বংস করে তাদের বর্বর-সভ্যতা চাপিয়ে দিয়েছে। ড. অতুল সুরও বলেছেন যে, আর্যরা ধ্বংস করতে পারেনি কেবল ঐতিহ্যসম্পন্ন ভারতীয় সভ্যতাকে। কারণ, সিন্ধু-সভ্যতা-সংস্কৃতিই পরবর্তী হিন্দু-সভ্যতার উপাদান রূপে কাজ করেছে।

(FAQ) হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার তুলনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল?

হরপ্পা সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক কিন্তু বৈদিক সভ্যতা ছিল গ্ৰামীণ।

২. হরপ্পার অধিবাসীরা কোন পশুকে পোষ মানাতে পারে নি?

ঘোড়া।

৩. হরপ্পার অধিবাসীরা কোন ধাতুর ব্যবহার জানত না?

লোহা।

৪. কারা যুদ্ধপ্রিয় জাতি?

আর্যরা।

Leave a Reply

Translate »