তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা -র পটভূমি, সম্পাদক, প্রকাশকাল, প্রচ্ছদ, লেখক গোষ্ঠী, বিষয়বস্তু, পত্রিকা পরিচালনা, পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানবো।

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা

ধরনসাপ্তাহিক সংবাদপত্র
প্রথম সম্পাদকঅক্ষয়কুমার দত্ত
প্রকাশকাল১৮৪৩
ভাষাবাংলা
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা

ভূমিকা :- ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র ছিল তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। ব্রাহ্মধর্মের প্রচার এবং তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে পত্রিকাটি প্রকাশ করা হয়।

পটভূমি

  • (১) রামমোহন রায় -এর মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়লে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ১৮৩৯ খ্রি ৬ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করেন তত্ত্বরঞ্জিনী সভা।
  • (২) এই সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ সভার নতুন নামকরণ করেন তত্ত্ববোধিনী সভা।
  • (৩) এই সভার মুখপত্র হিসাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার প্রকাশ হয়।

প্রকাশকাল

১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।

সম্পাদক

এই পত্রিকা সম্পাদনা করতেন বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি।

(১) অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ।

প্রচ্ছদ

  • (১) প্রথম প্রকাশের সময় থেকে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার কোনো মলাট বা প্রচ্ছদ ছিল না। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই লেখা ছাপা হত।
  • (২) ১৮৮৪ খ্রি থেকে কালচে সবুজ রঙের প্রচ্ছদ পত্র সংযোজিত হয়।
  • (৩) প্রচ্ছদের মতো অনুপস্থিত থাকত সম্পাদকের নাম‌ও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রীতির পরিবর্তন করেন।
  • (৪) পরবর্তীকালে প্রতিটি সংখ্যায় প্রচ্ছদ, প্রচ্ছদে পত্রিকার নাম, সম্পাদকের নাম ছাপা হতে থাকে। সূচিপত্র‌ও মুদ্রিত হত।

লেখক গোষ্ঠী

উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং তাঁদের লেখার মাধ্যমে তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়।

বিষয়বস্তু

বেদান্ত-প্রতিপাদ্য ব্রহ্মবিদ্যার প্রচার পত্রিকার মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও জ্ঞানবিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব এবং দর্শনবিষয়ক মূল্যবান রচনাও এতে প্রকাশিত হত।

বাণিজ্য ও রাজনীতি

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাঙালিদের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতালাভের উপযুক্ত করে নিজেদের গঠন করার আহ্বান জানিয়ে এই পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হত।

সদর দপ্তর

ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহর থেকে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হত।

ব্রাহ্ম আন্দোলনে ভূমিকা

ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনের বার্তাবহ হিসেবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্মধর্মের প্রচার মূলত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার মাধ্যমেই হয়।

পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্মসমাজ

ঢাকায় ব্রাহ্মসমাজ গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ব্রজসুন্দর মিত্র এই পত্রিকা পড়েই ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ঢাকাতে ব্রাহ্মসমাজ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সহযোগিতা

তখনকার দিনে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মীর স্বল্পতার কারণে ব্রাহ্মসমাজের কাজে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা বিশেষ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

অক্ষয়কুমার দত্ত ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবেন্দ্রনাথের ইচ্ছে ছিল পত্রিকাকে বিশুদ্ধ ধর্মচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, কিন্তু অক্ষয়কুমার চাইতেন বিজ্ঞান ও জড়বাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হতে।

দৃষ্টি আকর্ষণ

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত যেসকল বুদ্ধিজীবী তখন নিম্নমানের বলে বাংলা পত্রিকা পড়তেন না, বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য এবং প্রকাশনার মানের কারণে তত্ত্ববোধিনী তখন তাঁদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

পেপার কমিটি

তত্ত্ববোধিনীতে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলি তখন নির্বাচিত হতো পেপার কমিটির মনোনয়নের মাধ্যমে। এই কমিটির সদস্যরা ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু, আনন্দকৃষ্ণ বসু, শ্রীধর ন্যায়রত্ন, আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ, প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী, রাধাপ্রসাদ রায়, শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ।

পত্রিকা পরিচালনা

  • (১) অক্ষয়কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন ১২ বছর যথাক্রমে ৩০, ৪৫ ও ৬০ টাকার বেতনে।
  • (২) অক্ষয়কুমার দত্তের পর নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, সীতানাথ ঘোষ, হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব সামলেছেন।

মুদ্রণ যন্ত্র প্রদান

রামমোহন রায়ের পুত্র রমাপ্রসাদ রায় তত্ত্ববোধিনী কমিটিকে একটি মুদ্রণ যন্ত্র দান করেছিলেন।

উদ্দেশ্য

ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হলেও বাংলা গদ্যের সুসংগঠনে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য।

  • (১) অক্ষয়কুমার দত্তের চেষ্টায় পত্রিকায় ধর্ম ছাড়াও সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়‌ও প্রকাশিত হত।
  • (২) পত্রিকায় প্রকাশিত বিষয়গুলির মান ঠিক রাখার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটির অনুসরণে দেবেন্দ্রনাথ পাঁচ জনের একটি প্রবন্ধ নির্বাচনী সভা সংস্থাপন করেছিলেন, যাঁরা প্রকাশ্য বিষয় ঠিক করতেন।
  • (৩) বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমুখ পত্রিকার পাতাকে বিশেষ ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
  • (৪) পত্রিকায় ধর্মতত্ত্ব , তার ব্যাখ্যা ও বেদ বেদান্তের অনুবাদের ভার নিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
  • (৫) জ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ক তত্ত্বকথা প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন অক্ষয়কুমার দত্ত।

পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা

এই পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা একসময় ৭০০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

প্রকাশনা বন্ধ

পত্রিকাটি ১৯৩২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ক্ষিতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

উপসংহার :- অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় তত্ত্ববোধিনীতে তাঁর নিজের এবং অন্যান্যদের যেসব যুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর লেখা প্রকাশিত হত, তার ফলে বাংলা সংবাদপত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

(FAQ) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কে কবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ করেন?

অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে।

২. তত্ত্ববোধিনী সভা কে প্রতিষ্ঠা করেন?

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

৩. তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র কি ছিল?

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা।

Leave a Reply

Translate »