প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী কাশীসুন্দরী

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী কাশীসুন্দরী প্রসঙ্গে কাশীসুন্দরীর পরিচয়, শিক্ষা, সংসারের প্রতি কাশীসুন্দরীর বীতরাগ, কাশীসুন্দরীর সর্বদা উক্তি, অন্তরের কামনা, কাশীসুন্দরীর চিরকৌমার্যব্রত অবলম্বনের সংকল্প, কাশ্যপ ঋষির নিকট কাশীসুন্দরীর বৌদ্ধধর্ম শিক্ষার প্রার্থনা, কাশীসুন্দরীর একান্ত আগ্ৰহে প্রসন্ন কাশ্যপ ঋষি, রাজকুমারগণ কর্তৃক কাশীসুন্দরীকে বলপূর্বক হরণের সংকল্প, কাশীসুন্দরীকে কাশ্যপ ঋষির প্রশ্ন, গর্বিত ভাবে কাশীসুন্দরীর উত্তর, ঋষি কাশ্যপ কর্তৃক কাশীসুন্দরীকে গৃহে ফেরার নির্দেশ, কাশীসুন্দরীর অসামান্য যোগবল, মহাত্মা কনকের নিকট কাশীসুন্দরীর যোগ-সাধন শিক্ষালাভ, কাশীসুন্দরীর তত্ত্বজ্ঞান লাভের ইচ্ছা ও অসাধারণ জ্ঞানবতী কাশীসুন্দরী সম্পর্কে জানবো।

বিদুষী নারী কাশীসুন্দরী

ঐতিহাসিক চরিত্রকাশীসুন্দরী
পরিচিতিকাশী রাজার কন্যা
বিশেষত্বসুন্দরী ও ধর্মশীলা
ধর্মবৌদ্ধ ধর্ম
যোগসাধনা শিক্ষামহাত্মা কণক
তত্ত্বজ্ঞান লাভঋষি কাশ্যপ
বিদুষী নারী কাশীসুন্দরী

ভূমিকা :- শিক্ষার নিমিত্ত যে দান, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ দান আর পৃথিবীতে নেই। বৌদ্ধযুগে অনেক বিদুষী মহিলা নারীজাতির কল্যাণের জন্য বিদ্যা দান করে যশস্বিনী হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন বিদুষী নারী ছিলেন কাশীসুন্দরী।

কাশীসুন্দরীর পরিচয়

কাশী রাজার দুহিতা কাশীসুন্দরী সেকালে সুন্দরী ও ধর্মশীলা মহিলা হিসেবে পরিচিতা ছিলেন।

কাশীসুন্দরীর শিক্ষা

পিতা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন কাজেই তিনি কন্যাকে শৈশব থেকেই বৌদ্ধধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।

সংসারের প্রতি কাশীসুন্দরীর বীতরাগ

বুদ্ধদেবের পুণ্যজীবনকথা এবং বৌদ্ধধর্মের সারতত্ত্বসমূহ পড়তে পড়তে কাশীসুন্দরীর তরুণ যৌবনেই সংসারের প্রতি বীতরাগ জন্মেছিল। সকল সময়েই তাঁর মনে বুদ্ধদেব প্রবুদ্ধ হবার সময় যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন তাহা মনে পড়ত।

কাশীসুন্দরীর সর্বদা উক্তি

কাশীসুন্দরী সর্বদা বলতেন, কত জাতি কত জন্ম ও জন্মান্তরের ভিতর দিয়ে এসেছি, তাঁর সন্ধান পাই নি। যিনি এই দেহরূপ গৃহ নির্মাণ করেছেন, না জানি তিনি কোথায় আছেন। হে গৃহকারক দেবতা, পুনঃ পুনঃ দুঃখযন্ত্রণা সহ্য করে এবার তোমার দেখা পেয়েছি, তুমি আর গৃহকরণা করতে পারবে না। তোমার স্তম্ভ ভেঙেছে, গৃহভিত্তিসমূহ চুরমার হয়েছে, চিত্ত হতে সংস্কার বিগত হয়েছে তৃষ্ণা বিলুপ্ত হয়েছে।

কাশীসুন্দরীর অন্তরের কামনা

এই মহৎ বাণী কাশীসুন্দরীর প্রাণের উপর এমনই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজের জীবনকে সংসারের সর্বপ্রকার আসক্তিবিহীন করবার জন্যই দৃঢ়সঙ্কল্প হলেন। তাঁর অন্তরের এই কামনা বাইরের কেউই জানতে পারলেন না।

কাশীসুন্দরীর চিরকৌমার্যব্রত অবলম্বনের সংকল্প

এদিকে কাশীসুন্দরীর বিবাহের যোগ্য বয়স হল। নানাদেশের রাজকুমারেরা তাঁর পাণিগ্রহণের জন্য আসতে শুরু করলেন। রাজা কন্যাকে সে কথা বললেন। কাশীসুন্দরী বললেন তিনি চিরকৌমার্যব্রত অবলম্বন করে যোগসাধনা ও ধর্মতত্ত্ব আলোচনায় জীবন অতিবাহিত করবেন। প্রত্যাখ্যাত রাজকুমারেরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেন বটে, কিন্তু তাদের মন হতে রাজকুমারীকে লাভ করবার আশা তিরোহিত হল না।

কাশ্যপ ঋষির নিকট কাশীসুন্দরীর বৌদ্ধধর্ম শিক্ষার প্রার্থনা

কিছুকাল পরে ঋষিপত্তন বা বর্তমান সারনাথ নামক স্থানে ভগবান্ কাশ্যপ বাস করতে এলে, কাশীসুন্দবী তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, “প্রভু! আমি আপনার নিকট বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের জন্য আসিয়াছি।”

কাশীসুন্দরীর একান্ত আগ্ৰহে প্রসন্ন কাশ্যপ ঋষি

কাশ্যপ প্রথমে তাঁহাকে নিরন্ত করিতে চাহিলেন, কিন্তু কাশীসুন্দরীর একান্ত আগ্রহ, চেষ্টা ও যত্ন দেখতে পেয়ে তিনি তাঁর প্রতি প্রসন্ন হলেন এবং রাজকুমারীকে বৌদ্ধধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে প্রবৃত্ত হলেন।

রাজকুমারগণ কর্তৃক কাশীসুন্দরীকে বলপূর্বক হরণের সংকল্প

রাজকুমারীর পাণিপ্রার্থী ব্যর্থ মনোরথ রাজকুমারেরা তাঁকে লাভ করবার জন্য ভগবান্ কাশ্যপের আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। রাজকুমারেরা পণ করে এলেন যে তারা বলপূর্বক রাজকুমারীকে আশ্রম থেকে নিয়ে যাবেন।

কাশীসুন্দরীকে কাশ্যপ ঋষির প্রশ্ন

তাদের এইরূপ সংঙ্কল্প বুঝতে পেরে ভগবান কাশ্যপ কাশীসুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মা, তুমি যদি এই রাজকুমারদিগের মধ্যে কাহাকেও বিবাহ করিতে ইচ্ছা কর, তাহা হইলে তুমি আমাকে অকপটে প্রকাশ করিয়া বল। আমি তোমাকে বিবাহ করিতে অনুমতি দিব।”

গর্বিত ভাবে কাশীসুন্দরীর উত্তর

কাশীসুন্দরী গর্বিত ভাবে উত্তর দিলেন, “দেব, আমি বিবাহ করিব না, এই প্রতিজ্ঞা করিয়াই আপনার নিকট ধর্ম-সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করিবার জন্য আসিয়াছি। বিবাহ করিব না, ইহাই আমার পণ। এই রাজকুমারেরা অন্যায় ভাবে আমাকে পীড়ন করিবার জন্য আশ্রমে আসিয়াছেন।”

ঋষি কাশ্যপ কর্তৃক কাশীসুন্দরীকে গৃহে ফেরার নির্দেশ

কাশ্যপ চিন্তিত হয়ে বললেন, “বৎসে ! এই রাজকুমারেরা তোমাকে বলপূর্বক গ্রহণ করিবে। যদি তুমি আশ্রমে অবস্থান কর, তাহা হইলে আমার আশ্রমেরও শান্তিভঙ্গ করিবে। অতএব তুমি এক্ষণে আশ্রম পরিত্যাগ করিয়া তোমার পিতার নিকট গমন কর।”

কাশীসুন্দরীর অসামান্য যোগবল

তেজস্বিনী কাশীসুন্দরী কাশ্যপকে বললেন, “প্রভূ! আপনার আশীর্বাদ-প্রভাবে এই সকল পাপিষ্ঠ রাজকুমারদের এমন ক্ষমতা নাই যে আমার কেশও স্পর্শ করিতে পারে। এই দেখুন আমি যোগপ্রভাবে শূন্যে আরোহণ করিতেছি।” এই বলিয়া যোগবলে কাশীসুন্দরী শূন্যে উঠিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে তিনি রাজকুমারদের দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া পড়িলেন, আবার দেখা দিলেন। তাহার এইরূপ অপূর্ব যোগশক্তি দেখিতে পাইয়া রাজকুমারেরা আর কাশীসুন্দরীকে লাভ করিবার দুরাকাঙ্ক্ষা পোষণ করিলেন না। তাঁহারা একে একে নিজ নিজ রাজ্যে ফিরিয়া গেলেন ।

মহাত্মা কনকের নিকট কাশীসুন্দরীর যোগ-সাধন শিক্ষালাভ

মহামতি কাশ্যপও কাশীসুন্দরীর এইরূপ যোগশক্তি দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি এই যোগশক্তি কিরূপে লাভ করিলে ?” কাশীসুন্দরী বললেন, “আমি আপনার নিকট শিক্ষা লাভার্থ আসিবার পূর্বে মহাত্মা কনকের নিকট হইতে যোগ-সাধন শিক্ষালাভ করিয়াছিলাম, সেই যোগ প্রভাবেই অদ্য আকাশে উঠিয়া আত্মরক্ষা করিতে পারিলাম।”

কাশীসুন্দরীর তত্ত্বজ্ঞান লাভের ইচ্ছা

কাশ্যপ বললেন, “বৎসে, যোগশক্তি ও তত্ত্বজ্ঞান লাভ এক শ্রেণীর নহে।” রাজকুমারী বলিলেন, “প্রভু, যোগশিক্ষা অপেক্ষা তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা অনেক শ্রেষ্ঠ। আমি আপনার নিকট সেই শিক্ষাই লাভ করিতে আসিয়াছি। আপনি আমাকে সেই মহৎ শিক্ষাই প্রদান করুন।”

অসাধারণ জ্ঞানবতী কাশীসুন্দরী

এরপর কাশ্যপ ঋষি কাশীসুন্দরীকে তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে অসাধারণ জ্ঞানবতী করলেন।

উপসংহার :- বৌদ্ধযুগের নারীসমাজ কঠোর যোগ সাধনা করতেও যে কোনরূপ ইতঃস্তত করতেন না, কাশীসুন্দরীর ন্যায় আরও অনেক মহিলার যোগশিক্ষার ইতিহাস থেকে তা সুস্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।

(FAQ) প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী কাশীসুন্দরী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কাশীসুন্দরী কে ছিলেন?

কাশী রাজার কন্যা।

২. কাশীসুন্দরী কোন ধর্মের অনুরাগিনী ছিলেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৩. কাশীসুন্দরী কার কাছ থেকে যোগসাধনা শিক্ষা লাভ করেন?

মহাত্মা কণক।

৪. কাশীসুন্দরী কার কাছ থেকে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন?

ঋষি কাশ্যপ।

Leave a Comment