এডওয়ার্ড জেনার

চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার প্রসঙ্গে তার জন্ম, বংশ পরিচয়, ছেলেবেলা, শিক্ষা, বসন্ত রোগের চিকিৎসা, বসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কার, বসন্ত টিকার পরীক্ষা, অস্বীকৃতি, প্রবন্ধ প্রকাশ, আলোড়ন সৃষ্টি, চূড়ান্ত সাফল্য, প্রতিভার স্বীকৃতি ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার

ঐতিহাসিক চরিত্রএডওয়ার্ড জেনার
জন্ম১৭ মে, ১৭৪৯ খ্রি:
দেশইংল্যান্ড
পরিচিতিচিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিক
আবিষ্কারবসন্ত রোগের টীকা
মৃত্যু২৬ জানুয়ারি, ১৮২৩ খ্রি:
চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার

ভূমিকা :- একজন ইংরেজ চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক, যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কারের পথিকৃৎ, যা এই পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন। যে মানুষটির নিরলস সাধনার পরাজিত হল ভয়াবহ ব্যাধি বসন্ত, তাঁর নাম এডওয়ার্ড জেনার।

এডওয়ার্ড জেনারের জন্ম

১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মে ইংলন্ডের বার্কলে শহরে এডওয়ার্ড জেনার জন্মগ্ৰহণ করেন।

এডওয়ার্ড জেনারের বংশ পরিচয়

তার বাবা ছিলেন সেখানকার ধর্মযাজক। বার্কলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে স্থানীয় মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি ছিলেন তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। গরীব-দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর ছিল সীমাহীন ভালবাসা।

এডওয়ার্ড জেনারের ছেলেবেলা

  • (১) পিতার মহৎ গুণ শিশুবেলা থেকেই জেনারের চরিত্রে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু পিতার সান্নিধ্য দীর্ঘদিন পাননি জেনার। যখন তাঁর মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন বাবা মারা যান। তাঁর সব ভার এসে পড়ে দাদা রেভারেন্ড স্টিফেন জেনারের উপর। দাদার স্নেহচ্ছায়াতেই বড় হয়ে উঠতে থাকেন জেনার।
  • (২) জেনার যেখানে থাকতেন সেই বার্কলের সংলগ্ন অঞ্চলে ছিল সবুজ মাঠ, গাছপালা, মাঝে মাঝে চাষের জমি, কোথাও গোচারণ ভূমি। চাষীরা চাষ করত; রাখাল ছেলেরা মাঠে গরু নিয়ে আসত।
  • (৩) ছেলেবেলা থেকেই এই উদার মুক্ত প্রকৃতি জেনারকে নেশার মত আকর্ষণ করত, তিনি একা একা ঘুরে বেড়াতেন মাঠের ধারে গাছের তলায়। মনে হত তারা যেন সজীব পদার্থ। প্রতিটি গাছের পাতায় ছোট ছোট ঘাসের মধ্যে তিনি যেন প্রাণের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন।
  • (৪) পাখির ডাক তার কলকাকলি মনে হত সঙ্গীতের মূর্ছনা। প্রকৃতির মুখোমুখি হলেই তন্ময়তার গভীরে ডুব দিতেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন, তার বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য। যা কিছু দেখতেন জানতেন, বাড়ি ফিরে এসে খাতার পাতায় লিখে রাখতেন আর লিখতেন কবিতা।
  • (৫) কবিতার প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল তাঁর আকর্ষণ, পরিণত বয়েসেও তিনি অবসর পেলেই কবিতা লিখতেন। অন্তরে ছিলেন তিনি অবসর পেলেই কবিতা লিখতেন। তিনি অন্তরে ছিলেন কবি, প্ৰকৃতিপ্ৰেমিক, কর্মে বিজ্ঞানী চিকিৎসক।

এডওয়ার্ড জেনার কর্তৃক বসন্ত রোগের চিকিৎসা

  • (১) শীতের রাত, চারদিকে কনকনে ঠাণ্ডা। পথে ঘাটে একটি মানুষও নেই। অধিকাংশ মানুষই ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে আগুনে পোয়াচ্ছে। যারা বাইরে গিয়েছিল, সকলেই ঘরে ফেরার জন্য উদগ্রীব।
  • (২) ইংল্যান্ডের এক আধা শহর বার্কলেতে থাকতেন এক তরুণ ডাক্তার। বয়সে তরুণ হলেও ডাক্তার হিসাবে ইতিমধ্যে চারিদিকে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে রুগী আসে তাঁর কাছে। বহু দূরের এক রুগী দেখে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।
  • (৩) ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামতেই ডাক্তার দেখলেন তাঁর বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকে ঢাকা এক মহিলা। কছে এগিয়ে গেলেন। সামনে আসতেই মহিলাটি তাঁর পায়ের সামনে বসে পড়ল, আমার ছেলেকে বাঁচান ডাক্তারবাবু ।
  • (৪) ডাক্তার তাড়াতাড়ি মহিলাটিকে তুলে ধরে বললেন, কোথায় আপনার ছেলে? – ছেলেকে বাড়িতে রেখে এসেছি ডাক্তারবাবু। আমার চার চারটি ছেলে আগে মারা গিয়ে এই শেষ সম্বল। সমস্ত দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন ডাক্তার। তবুও মহিলাটির কাতর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না…তার সাথে বাড়িতে গেলেন।
  • (৫) গলির শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি ঘর, ঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বলছিল। এক কোণায় বিছানার উপর শুয়েছিল ছোট একটি বাচ্চা। সারা গায়ে ঢাকা দেওয়া। ডাক্তার গায়ের ঢাকা খুলতেই চমকে উঠলেন। শিশুটির সমস্ত শরীর গুটি বসন্তে ভরে গিয়েছে। জ্বরে বেহুঁশ। ঔষধের বাক্স নিয়ে শিশুটির পাশে সমস্ত রাত জেগে রইলেন।
  • (৬) সামনে উদবেলিত উৎকণ্ঠা ভরা চোখে চেয়ে আছে মহিলাটি। এই ভয়ঙ্কর অসুখ আমার আগের চারটি সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে। একে আপনি বাঁচন। শুরু হল তাঁর সাধনা। একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর।
  • (৭) কোনো ক্লান্তি নেই, অবসন্নতা নেই, এই সাধনায় তাঁকে সিদ্ধিলাভ করতেই হবে। অবশেষে সাফল্য এসে ধরা দিল সাধনার কাছে। জয়ী হল মানুষের সংগ্রাম। বসন্তের ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল পৃথিবী।

এডওয়ার্ড জেনার কর্তৃক বসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কার

  • (১) দীর্ঘ কুড়ি বছরের গবেষণার পর অবশেষে ১৭৯৬ সালের ১৪ই মে জেনার প্রথমে সারা নেলনিসের হাতের গুটি থেকে ইনজেকশন করে সামান্য পুঁজ তুলে নিলেন তারপর ঈশ্বরের নাম করে সেই পুঁজ জেমসের শরীরে টিকা দিলেন।
  • (২) জেমসের আগে কোনোদিন বসন্ত হয়নি। টিকা নেওয়ার দু-একদিন পরেই দেখা গেল যেখানে টিকা নেওয়া হয়েছিল সেই জায়গায় একটা ঘা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিনের চিকিৎসায় সেই ঘা ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষতস্থানের একটা চিহ্ন রয়ে গেল।
  • (৩) কয়েকদিন ধরে জেনার জেমসকে নিয়ে বসন্ত রুদীদের মধ্যে চিকিৎসার কাজ করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় জেমসের বসন্ত হল না। তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন তাঁর কুড়ি বছরের সাধনা অবশেষে সফল হয়েছে।

এডওয়ার্ড জেনার কর্তৃক বসন্ত রোগের টিকা সম্পর্কে পরীক্ষা

  • (১) এখন প্রয়োজন তাঁর এই সাফল্যের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। কিন্তু তার আগে সর্বসমক্ষে পরীক্ষ দিতে হবে। প্রমাণ করতে হবে তিনি গুটি বসন্তের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছেন।
  • (২) জেনার লন্ডনের বিখ্যাত সব চিকিৎসকদের ডেকে তাঁর গবেষণার কথা জানালেন। ঘোষণা করলেন সর্বসমক্ষে তিনি জেমসের শরীরে বসন্ত রোগের পুঁজ প্রবেশ করাবেন।
  • (৩) চারদিকে গুঞ্জন উঠল, কেউ বলল, জেনার অর্থহীন প্রলাপ বকছেন, কেউ বলল তিনি একটি শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এ জঘন্য অপরাধ, কেউ কেউ মন্তব্য করল জেনার অর্থের লোভে জুয়াচুরি শুরু করেছেন।
  • (৪) কিন্তু জেনার কারো সমালোচনাতেই কান দিলেন না। ১লা জুলাই ১৭৯৬ সাল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য দিন। জেনার উপস্থিত ডাক্তারদের সামনে এক বসন্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে পুঁজ নিয়ে জেমসের শরীরে ঢুকিয়ে দিলেন।
  • (৫) সকলেই উৎকণ্ঠিত কৌতূহলী হয়ে উঠলেন… একদিন দুদিন করে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু জেমসের দেহে বসন্তের সামান্যতম চিহ্ন দেখা গেল না। টিকা নেওয়ার জন্য জেমসের দেহে প্রতিষেধক শক্তি সৃষ্টি হয়েছে।

এডওয়ার্ড জেনারের আবিষ্কারকে অস্বীকৃতি

কিন্তু চিকিৎসকরা কেউই জেনারের এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে চাইল না। এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। একদল তাঁর এই অসাধারণ আবিষ্কারে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল, অন্যদল বিশ্বাস করতে পারছিল না গুটি বসন্তের মত ভয়াবহ অসুখকে নির্মূল করা সম্ভব।

এডওয়ার্ড জেনারের উদ্দেশ্য মানুষের সেবা

  • (১) নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন জেনার। একের পর এক তেইশ জনকে টিকা দিলেন এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি সফল হলেন। এই সময় তাঁর কাছে একাধিক প্রলোভন আসতে থাকে।
  • (২) স্যার ওয়ালটার নামে এক ভদ্রলোক জেনারকে এক লক্ষ পাউন্ড এবং বছরে দশ হাজার পাউন্ড দেবার কথা বলল, বিনিময়ে এই আবিষ্কারের ফর্মুলা তুলে দিতে হবে।
  • (৩) মানব কল্যাণে উৎসর্গীকৃত প্রাণ জেনার হাসিমুখে সেই অর্থ ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, মানুষের কল্যাণে আমি আমার এই আবিষ্কারকে ব্যবহার করতে চাই, অর্থ উপার্জনের জন্য নয়।

এডওয়ার্ড জেনারের প্রবন্ধ প্রকাশ

অবশেষে ১৭৯৮ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর যুগান্তকারী প্রবন্ধ Inquiry into cause and effect of the Variolae Vaccinae। এর পরের বছর প্রকাশ করলেন দ্বিতীয় প্রবন্ধ Further Inquiry… এবং চূড়ান্ত প্রবন্ধ প্রকাশ করলেন ১৮০০ সালে Complete Statement of facts and observations.

এডওয়ার্ড জেনারের আবিষ্কারে আলোড়ন সৃষ্টি

এই সমস্ত প্রবন্ধ প্রকাশের সাথে সাথে শুধু ইংল্যান্ড নয়, পৃথিবীর আরো বহু দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হল। প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক থেকে আরম্ভ করে হাতুড়ে ডাক্তার সকলেই এর বিরুদ্ধে মতামত দিতে আরম্ভ করল। অনেকে অভিমত দিল এ এক নূতন ধরনের অপারেশন। এতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গকৌতুক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হতে লাগল ।

এডওয়ার্ড জেনারের অটল বিশ্বাস

এই প্রচণ্ড বিরোধিতা সমালোচনা বিদ্রূপের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জেনার অটল অবিচলিতভাবে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর অটল বিশ্বাস ছিল মানুষ একদিন না একদিন তাঁর আবিষ্কারকে স্বীকার করে নেবে।

এডওয়ার্ড জেনারের সংসারে অভাব অনটন

এই সময় গবেষণার প্রয়োজনে চিকিৎসা করতে পারতেন না। হাতে সামান্য যা অর্থ পেতেন গবেষণার কাজেই তা ব্যয় হত। সংসারে অভাব অনটন প্রকট হয়ে উঠল। দু-এক জন হিতৈষী বন্ধু কিছু অর্থ সাহায্য করতে চাইলে তিনি হাসিমুখে তাদের ফিরিয়ে দিলেন। পরিবারের প্রতিটি মানুষের সাথেই দারিদ্র্যকে ভাগাভাগি করে নিতেন।

এডওয়ার্ড জেনারের লক্ষ্য চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন

একদিকে দারিদ্র্য অন্যদিকে প্রত্যক্ষ বিরোধিতা। এই দুইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাময়িক বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করলেন। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর আরো বাধার সম্মুখীন হতে হবে এবং সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করেই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে হবে।

এডওয়ার্ড জেনারের প্রতি দুই ধরনের বিরোধিতা

  • (১) জেনারকে দুই ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হল। একদল লোক, তাদের বেশির ভাগ মানুষই ছিল ডাক্তার- তারা চারদিকে প্রচার করতে আরম্ভ করল গুটি বসন্তের প্রতিরোধক হিসাবে যে টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানুষের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক, এতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
  • (২) এই ধরনের প্রচারে জেনার বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। কারণ তিনি জানতেন যে মানুষ একবার টিকা গ্রহণ করতে পারবে, সে নিজেই উপলব্ধি করতে পারবে এই টিকা কল্যাণকর না ক্ষতিকারক। কিন্তু বিপদ এল অন্য পথে।

এডওয়ার্ড জেনারের প্রতিভাকে স্বীকৃতি

সম্রাটের আদেশে সমস্ত বন্দীদেরই মুক্তি দেওয়া হল। পার্লামেন্টের সদস্যরা ক্রমশই উপলব্ধি করতে পারছিলেন জেনারের প্রতিভাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। এবার তাঁকে হাজার পাউন্ড সাহায্য দেওয়া হল।

এডওয়ার্ড জেনার কর্তৃক জাতীয় ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউশন গঠন

প্রাপ্ত অর্থে জেনার গড়ে তুললেন জাতীয় ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউশন। (National Vaccine Institution)। এই প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলাবার জন্য শুরু হল তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। কয়েক মাস পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

এডওয়ার্ড জেনারের লণ্ডন ত্যাগ

লন্ডনের পরিবেশ তাঁর ভাল লাগছিল না। বার্কলে, কমওন্ডের সবুজ প্রান্তর, উন্মুক্ত প্রকৃতি ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। লন্ডন ছেড়ে চলে এলেন বার্কলে। লন্ডন ত্যাগ করার পেছনে আরো একটি কারণ ছিল, ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউশনের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কিন্তু তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বেশ কিছু সদস্য নেওয়া হল যাঁরা ছিলেন জেনারের সম্পূর্ণ বিরোধী। কোনো প্রতিবাদ করলেন না জেনার, শুধু নীরবে পদত্যাগ করলেন।

এডওয়ার্ড জেনারের ইচ্ছা

আসলে জেনার ছিলেন একজন প্রকৃতিই বিজ্ঞানী, নম্র বিনয়ী, কোনো অর্থ যশ খ্যাতি সম্মানের প্রতি তাঁর সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর এই আবিষ্কার থেকে লক্ষ লক্ষ পাউন্ড উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই আবিষ্কার মানব কল্যাণের কাজে লাগুক, অর্থ উপার্জনে নয়।

স্বদেশে এডওয়ার্ড জেনার যোগ্য মর্যাদা লাভে ব্যর্থ

১৮০৬ সালে বিখ্যাত সমাজসংস্কারক উইলবারফোর্স লিখেছেন, “জেনারের টিকা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে। সুদূর চীন, ভারতবর্ষে। সমস্ত পৃথিবী তাঁকে সম্মানিত করলেও তাঁর স্বদেশ তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দেয়নি।

এডওয়ার্ড জেনারের এম ডি উপাধি লাভ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে M.D উপাধি দেওয়ার পর সকলেই অনুমান করেছিল তাঁকে রয়াল কলেজ অব ফিজিসিয়ানস (Royal college of Physicians) এর সদস্য করা হবে। কিন্তু কলেজ থেকে জানানো হল তাঁকে এই কলেজের সদস্য হতে গেলে গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। জেনার এই দুটি ভাষার কোনটিই জানতেন না।

এডওয়ার্ড জেনারের গবেষণা পত্র ত্রুটিপূর্ণ

  • (১) তিনি এই অপমানকর প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে বললেন… আমার কাছে এই সম্মানের কোনো মূল্য নেই। তবে জেনার চেয়েছিলেন ইংলন্ডের রয়াল সোসাইটি তাঁর গবেষণাপত্র অনুমোদন করবে। রয়াল সোসাইটি ছিল বিজ্ঞানীদের প্রধান সংগঠন।
  • (২) বিস্ময়ে অবাক হতে হয় যে আবিষ্কার পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল সেই গবেষণাপত্রকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অমনোনীত করেছিল রয়াল সোসাইটি। এই ঘটনায় জেনার খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন। তবুও তাঁর গবেষণার কাজ বন্ধ হয়নি।

এডওয়ার্ড জেনারের পারিবারিক জীবন

  • (১) বার্কলের নিভৃত প্রান্তরে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে সুখী জীবন যাপন করতেন। কদাচিৎ লন্ডনে যেতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ক্যাথারিন। শান্ত উদার সহৃদয় স্বভাবের মহিলা। জেনারের প্রতিটি গবেষণা কাজের পেছনে ছিল তাঁর অফুরন্ত উৎসাহ অনুপ্রেরণা।
  • (২) স্বামীর বিশ্বাস আদর্শকে তিনি গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রচার করতেন। তাদের সৎ আদর্শবান হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতেন। জেনার যখনই সময় পেতেন স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে দূরে কোথাও ছুটি কাটাতে যেতেন।
  • (৩) ছেলেকে তিনি চিকিৎসক হিসাবেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৮১০ সালে ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এরপর থেকে কদাচিৎ ঘরের বাইরে বার হতেন। ১৮১৫ সালে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হল।

বন্ধুকে এডওয়ার্ড জেনারের চিঠি

এই সময় তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “আমার চারদিকে সব যেন শূন্য হয়ে গেল।”

পাখিদের নিয়ে এডওয়ার্ড জেনারের পড়াশোনা

স্ত্রী, পুত্রের মৃত্যুর বেদনা ভুলতে তিনি ফিরে গেলেন তাঁর প্রকৃতির মধ্যে, যে প্রকৃতিতে তিনি আজন্ম ভালবেসেছিলেন। এই সময় তিনি গাছপালা পাখিদের নিয়ে পড়াশুনা করতেন। মৃত্যুর আগে তিনি শেষ প্রবন্ধ লেখেন দেশান্তরী পাখিদের নিয়ে।

এডওয়ার্ড জেনারের মৃত্যু

১৮২৩ সালের ২৬শে জানুয়ারি সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন কবি, প্রকৃতি প্রেমিক, বিজ্ঞানী, মানবদরদী এডওয়ার্ড জেনার।

উপসংহার :- জীবনের সব কাজ শেষ হয়ে এসেছিল জেনারের। একা একা বসে মনে করতেন পুরনো দিনের স্মৃতিকথা। একটি মানুষের কথা বড় বেশি মনে পড়ে তাঁর। বহু বছর আগে দেখা সেই অসুস্থ সন্তানের মা। কতবার তার খোঁজ করেছেন, কোনো সন্ধান পাননি, কতদিন ঘুমের মধ্যে জেগে উঠেছেন সন্তানহারা সেই মায়ের কান্নায়। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে আর কোনো দুঃখ নেই। মায়ের কান্না তিনি চিরদিনের মত মুছিয়ে দিতে পেরেছেন।

(FAQ) চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. এডওয়ার্ড জেনার কে ছিলেন?

একজন ইংরেজ চিকিৎসক এবং বৈজ্ঞানিক।

২. এডওয়ার্ড জেনার কোন দেশের নাগরিক ছিলেন?

ইংল্যান্ড।

৩. বসন্ত রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন কে?

এডওয়ার্ড জেনার।

৪. জাতীয় ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট কে প্রতিষ্ঠা করেন?

এডওয়ার্ড জেনার।

Leave a Comment