ভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত

ভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত প্রসঙ্গে রামানুজ, রামানন্দ, কবীর, নামদেব, শ্রীচৈতন্য, চৈতন্যের ধর্মমত প্রচার ও নানক সম্পর্কে জানবো।

ভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত

ঐতিহাসিক ঘটনাভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত
আদি প্রচারকরামানুজ
দোহাকবীর
শিখ ধর্মগুরু নানক
বৈষ্ণব ধর্মশ্রীচৈতন্য
ভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত

ভূমিকা :- চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদের প্রসার ঘটে। ভক্তিবাদের মূল কথা হল ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তির মিলন ও অধ্যাত্মবাদ। বিভিন্ন ধর্মপ্রচারক এই সময়ে ভক্তিবাদের আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছিল।

ভক্তিবাদী গুরু রামানুজ

ভক্তিধর্মের আদি প্রচারক ছিলেন দ্বাদশ শতকের সাধক রামানুজ। অন্ধ্রের তিরুপতিতে তার জন্ম হয়। তিনি বলতেন যে, কর্মের দ্বারা আসক্তি বা মায়ার উদ্ভব হয়। ভক্তিযোগের দ্বারাই প্রকৃত মুক্তি লাভ সম্ভব। তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার নিন্দা করেন।

ভক্তিবাদী গুরু নিম্বার্ক

ত্রয়োদশ শতকে নিম্বার্ক ও মাধবাচার্য নামে ভক্তিমার্গী সাধকদের আবির্ভাব হয়।

ভক্তিবাদী গুরু রামানন্দ

  • (১) চতুর্দশ শতকের প্রধান ভক্তিবাদী গুরু ছিলেন রামানন্দ। তিনি রামানুজের ভাবধারাকে গ্রহণ করেন। তিনি প্রয়াগের এক ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও ভক্তিধর্মকে গ্রহণ করেন। উত্তর ভারত -এ ভক্তিধর্ম প্রচারে তার অবদান ছিল বিশাল।
  • (২) তাঁর ১২ জন প্রধান শিষ্যের মধ্যে ছিলেন নাপিত, মুচি জাতীয় সাধক। তিনি জাতিভেদ প্রথাকে ঘৃণা করতেন এবং রামের প্রতি ভক্তিই মুক্তির পথ বলে প্রচার করতেন। তাঁর অন্যতম শিষ্য ছিলেন সাধক কবীর। রামানন্দ হিন্দী ভাষাকে তার ধর্মপ্রচারের বাহন করেন।

ভক্তিবাদী গুরু কবীর

  • (১) রামানন্দ শিষ্য কবীর ছিলেন জোলা বা তন্তুবায় জাতীয়। তার জন্ম-তারিখ সঠিক জানা যায় নি। বাল্যকাল থেকে তার মনে দিব্যজ্ঞানের উদ্ভব হয়। তিনি পুজো, উপাসনা ছেড়ে ভক্তিধর্মকে সার করার কথা বলেন।
  • (২) তিনি হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতেন না। আল্লাহ ও রাম – তিনি উভয়ের কথাই বলতেন, কারণ তাঁর মতে তারা ছিলেন এক। জাতিভেদ, মূর্তি পুজো, নমাজ পড়াকে তিনি নিন্দা করেন।
  • (৩) কবীর তাঁর বাণীগুলি ছোট গীতি-কবিতা বা দোহার আকারে রচনা করেন, যা সাধারণ লোকের মুখে মুখে ফিরত। তিনি কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় স্থাপন করেন নি। ডঃ তারাচাঁদের মতে “সর্বধর্ম সমন্বয় ও মানব প্রেমের বাণী প্রচার ছিল কবীরের লক্ষ্য।”

মহারাষ্ট্রের ভক্তিবাদী গুরু নামদেব

মহারাষ্ট্রে নামদেব ছিলেন অপর এক ভক্তিধর্মের প্রচারক। পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি ভক্তিবাদ ও মানুষের সাম্যের তত্ত্ব প্রচার করেন। ঈশ্বর এক এবং বহু নামে তাকে ডাকা হয় এই তত্ত্ব তিনি প্রচার করেন।

ভক্তিবাদী গুরু শ্রী চৈতন্য

  • (১) ভক্তি ধর্মের অন্যতম প্রধান প্রচারক ছিলেন শ্রীচৈতন্য। ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে নদীয়ার এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তিনি তর্কশাস্ত্র ও দর্শনে সুপণ্ডিত ছিলেন। এজন্য লোকে তাকে নিমাই পণ্ডিত বলত।
  • (২) তিনি প্রচলিত হিন্দুধর্মের এবং জ্ঞানমার্গের সাধনার অসারতা বুঝে, গয়ায় ঈশ্বরপুরীর কাছে কৃষ্ণমন্ত্র নিয়ে ভক্তিধৰ্ম গ্ৰহণ করেন। ২৪ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন নেন। এই সময় থেকে তিনি প্রচণ্ড আবেগ ও উদ্দীপনা সহ ভক্তিধর্ম প্রচার করতে থাকেন।

ভক্তিবাদী গুরু চৈতন্যের ধর্মমত

  • (১) ভারতের নানাস্থানে শ্রীচৈতন্য ধর্ম প্রচার করেন। তবে তিনি বেশীর ভাগ সময় পুরী বা নীলাচলে অবস্থান করতেন। চৈতন্য জাতিভেদ প্রথাকে অগ্রাহ্য করেন। কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি দ্বারাই জীবের মুক্তি আসবে, এই তত্ত্ব তিনি সর্বদা প্রচার করতেন।
  • (২) তাঁর অন্যতম শিষ্য ছিলেন যবন হরিদাস। তিনি কৃষ্ণের নাম গান করে কীর্তন করার প্রথা প্রবর্তন করেন। একত্র সকলে মিলে সমবেত প্রার্থনা ও নামগান ছিল কীর্তনের প্রধান দিক।
  • (৩) চৈতন্য বিশ্বাস করতেন যে, কীর্তনের নামগানের মধ্য দিয়ে ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের আসন পাতা হয়। তার ফলে ভক্তের এক অতীন্দ্রিয় দিব্য অনুভূতি ঘটে। বাংলা, উড়িষ্যা, দাক্ষিণাত্য, বৃন্দাবন সর্বত্র চৈতন্যের শিষ্যগণ ভক্তিধর্মের প্লাবন বইয়ে দেন।

পাঞ্জাবের ভক্তিবাদী গুরু নানক

  • (১) নানক ছিলেন ভক্তিধর্মের অপর প্রধান প্রচারক। তার শিষ্যরা ‘শিখ’ নামে পরিচিত হন। ‘শিখ’ কথাটির অর্থ হল পবিত্র। তিনি পাঞ্জাবের তালবন্দী গ্রামে এক ক্ষাত্র পরিবারে ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিবাহ করে কিছুকাল সংসারধর্ম পালন করেন।
  • (২) পরে তাঁর দিব্য উপলব্ধি হয় এবং সংসার ছেড়ে নানা স্থানে ধর্ম প্রচারের কাজে জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি কোনো বিশেষ দেবতার প্রতি ভক্তি প্রচার করেন নি। নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনাকেই তিনি মুক্তির পথ বলে মনে করতেন।
  • (৩) প্রেম ও ভক্তি নিয়ে ঈশ্বরের নাম করলেই মানুষ মুক্তি পাবে বলে তিনি বলতেন। ঈশ্বরকে লাভ করার জন্য তিনি চরিত্রের পবিত্রতার ওপর জোর দেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও মানুষের সাম্যের কথা বিশেষ ভাবে বলেন।
  • (৪) তিনি জাতিভেদ প্রথার তীব্র নিন্দা করেন। তিনি একেশ্বরবাদ ও ধর্মসহিষ্ণুতার কথা বলেন। তিনি হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অস্পৃশ্যতার বিরোধী ছিলেন। তার শিষ্যদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন।

উপসংহার :- এছাড়াও বল্লভাচার্য, জ্ঞানেশ্বর, রবিদাস, সুরদাস, তুলসীদাস, মীরাবাঈ প্রমুখ আরও বহু ভক্তিমার্গের সাধক-সাধিকা ছিলেন।

(FAQ) ভক্তিবাদী গুরু ও তাদের মতামত সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভক্তি ধর্মের আদি প্রচারক কে ছিলেন?

রামানুজ।

২. প্রধান ভক্তিবাদী গুরু কে ছিলেন?

রামানন্দ।

৩. কবীর কার শিষ্য ছিলেন?

রামানন্দ।

৪. গুরু নানকের শিষ্যদের কি বলা হয়?

শিখ।

৫. বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন কে?

শ্রীচৈতন্য।

Leave a Comment