প্রাচীন ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার

প্রাচীন ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রসঙ্গে নারীদের অধিকার সম্পর্কে সুকুমারী ভট্টাচার্যের মন্তব্য, স্ত্রীধন, নারীর সম্পত্তি বা স্ত্রীধন সম্পর্কে উল্লেখ, ভারতে নারীর সম্পত্তি দান বা বিক্রির অধিকার, নারীর সম্পত্তি বা বিভিন্ন প্রকার স্ত্রীধন, গুরুত্বপূর্ণ ছয় প্রকার স্ত্রীধন, কাত্যায়ন স্মৃতিতে উল্লেখিত স্ত্রীধন, অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত স্ত্রীধন, নারীর সম্পত্তির অধিকারে সীমাবদ্ধতা, নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও নারীর সম্পত্তির অধিকার ভোগ বিষয়ে সন্দেহ বিষয়ে জানবো।

প্রাচীন ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার

ঐতিহাসিক ঘটনানারীর সম্পত্তির অধিকার
নারীর সম্পত্তিস্ত্রীধন
ছয় প্রকার স্ত্রীধনমনুসংহিতা
চার প্রকার স্ত্রীধনঅর্থশাস্ত্র
মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারমেয়েরা
প্রাচীন ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার

ভূমিকা :- প্রাচীন ভারতের অধিকাংশ শাস্ত্রকার নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে নানা বিধিনিষেধের কথা বলেছেন। মনু ও অন্যান্য শাস্ত্রকাররা নারীকে জীবনের প্রতিটি স্তরেই পুরুষের অধীনে থাকার বিধান দিয়েছেন। সমাজে নারীর এরূপ মর্যাদা হ্রাসের পরিস্থিতিতে তাদের অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়টি ছিল কল্পনাতীত।

নারীদের অধিকার সম্পর্কে সুকুমারী ভট্টাচার্যের মন্তব্য

ড. সুকুমারী ভট্টাচার্য বলেছেন যে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়ে নারীসমাজ তখন এক অসম্মানিত সম্প্রদায় হিসেবে জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন।

স্ত্রীধন

অবশ্য অর্থনৈতিক অধিকারের নানা সংকোচন বা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রাচীন যুগের নারী কিছু কিছু অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করত। তারা কিছু সম্পত্তিও রাখার অধিকার পেত। নারীর এই সম্পত্তি ‘স্ত্রীধন’ (Streedhan) নামে পরিচিত।

নারীর সম্পত্তি বা স্ত্রীধন সম্পর্কে উল্লেখ

মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, নারদ, বৃহস্পতি, কাত্যায়ন প্রমুখ শাস্ত্রকার প্রাচীন যুগের নারীর বিভিন্ন সম্পত্তি বা স্ত্রীধনের উল্লেখ করেছেন।

অন্যতম স্ত্রীধন

স্ত্রীধনের মধ্যে অন্যতম ছিল নারীর অলংকার ও পোশাক-পরিচ্ছদ। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, পুত্রহীনা বিধবা তাঁর মৃত স্বামীর যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী হবেন। নারী বিবাহের আগে ও পরে যা কিছু উপহার পেতেন তা সবই তাঁর নিজের সম্পত্তি বা স্ত্রীধন হিসেবে গণ্য হত।

ভারতে নারীর সম্পত্তি দান বা বিক্রির অধিকার

নারীর মালিকানাভুক্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নারী নিজের ইচ্ছামতো দান বা বিক্রি করতে পারত।

নারীর সম্পত্তি বা বিভিন্ন প্রকার স্ত্রীধন

প্রাচীন বিভিন্ন সাহিত্য থেকে নারীর নিজস্ব সম্পত্তি অর্থাৎ স্ত্রীধনের পরিমাণ সম্পর্কে জানা যায়। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রকার তাঁদের আলোচনায় সে যুগের বিভিন্ন স্ত্রীধনের উল্লেখ করেছেন। 

গুরুত্বপূর্ণ ছয় প্রকার স্ত্রীধন

মনুসংহিতায় ও যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছয় প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ রয়েছে। এগুলি হল –

(i) অধ্যগ্নি স্ত্রীধন

বিবাহকালে আগুনকে সাক্ষী রেখে নারীকে প্রদত্ত সম্পদ ‘অধ্যগ্নি’ নামে পরিচিত।

(ii) অধ্যবাহনিক স্ত্রীধন

পতিগৃহে যাত্রাকালে নারী যে সম্পদ উপহার হিসেবে পেত তা অধ্যবাহনিক নামে পরিচিত।

(iii) প্রীতিদত্ত স্ত্রীধন

আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে নারী যে প্রীতির দান লাভ করত তাকে বলা হত ‘প্রীতিদত্ত’।

(iv) পিতৃদত্ত স্ত্রীধন

পিতার দেওয়া উপহার ‘পিতৃদত্ত’ স্ত্রীধন নামে পরিচিত।

(v) মাতৃদত্ত স্ত্রীধন

মাতার দেওয়া উপহার ‘মাতৃদত্ত’ স্ত্রীধন নামে পরিচিত।

(vi) ভ্রাতৃদত্ত স্ত্রীধন

ভ্রাতার দেওয়া উপহার ‘ভ্রাতৃদত্ত’ স্ত্রীধন নামে পরিচিত ছিল।

কাত্যায়ন স্মৃতিতে উল্লেখিত স্ত্রীধন

মনুসংহিতার ছয় প্রকার স্ত্রীধন ছাড়াও কাত্যায়নস্মৃতিতে আরও কয়েকটি স্ত্রীধনের উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি হল –

(i) সৌদায়িক

কুমারী অবস্থায় প্রাপ্ত উপহার হল সৌদায়িক স্ত্রীধন।

(ii) অন্বাধেয়

পিতা-মাতা, স্বামী ও আত্মীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপহার হল অন্বাধেয় স্ত্রীধন।

(iii) শুল্ক

বিবাহের সময় পাত্রপক্ষ কর্তৃক কন্যাকে দেয় মূল্য হল শুল্ক স্ত্রীধন।

অর্থশাস্ত্রে উল্লিখিত স্ত্রীধন

অর্থশাস্ত্রে চার প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ আছে। এগুলি হল ‘শুল্ক’, ‘অধিবেদনিক’, ‘অন্বাধেয়’ এবং ‘বন্ধুদত্ত’।

নারীর সম্পত্তির অধিকারে সীমাবদ্ধতা

নারী সম্পত্তি বা স্ত্রীধন রাখার অধিকারী হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অধিকারে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যেমন –

(১) স্ত্রীধনে নারীর অধিকার হ্রাস

কাত্যায়নস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, বিবাহিতা নারী ২০০০ পণের (তৎকালীন রৌপ্যমুদ্রা) বেশি নিজের কাছে রাখার অধিকারিণী নন। কাত্যায়ন স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রাপ্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিকে স্ত্রীধন হিসেবে মেনে নিলেও তিনি নারীর নিজের উপার্জিত অর্থকে স্ত্রীধন হিসেবে মেনে নেন নি। পারিবারিক বা পৈত্রিক সম্পত্তিতেও নারীর কোনো অধিকার ছিল না।

(২) স্ত্রীধনের ওপর স্বামীর অধিকার

স্ত্রীধনের উপর স্বামীরও কিছু কিছু অধিকার ছিল। স্ত্রী যথেচ্ছভাবে নিজের সম্পত্তি দান করতে চাইলে স্বামী তাতে বাধা দিতে পারত। স্বামীর অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় স্ত্রীর সম্পত্তি সে নিজে গ্রহণ ও বিক্রি করতে পারত। তা ছাড়া স্ত্রীর কাছে ২০০০ পণের বেশি অর্থ জমে গেলে অতিরিক্ত অর্থ তার স্বামীর হেফাজতে রক্ষিত হত।

নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার

  • (১) স্ত্রীধনের ওপর পিতা, স্বামী বা পুত্রের কোনো অধিকার ছিল না বলে যাজ্ঞবল্ক্য উল্লেখ করেছেন।
  • (২) তবে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার মেয়েরা মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে বলে নারদস্মৃতিতে বলা হয়েছে।
  • (৩) কাত্যায়নস্মৃতিতে বলা হয়েছে যে, স্ত্রীর কন্যাসন্তান না থাকলে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে তার পুত্র। স্ত্রী নিঃসন্তান হলে মৃত স্ত্রীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে তার স্বামী।

নারীর সম্পত্তির অধিকার ভোগ বিষয়ে সন্দেহ

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রাচীন কালে যখন নারীর সার্বিক অধিকার নানাভাবে সংকুচিত হয়েছিল তখন তাদের বিধিবদ্ধ অর্থনৈতিক অধিকারভোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। সমাজের উচ্চস্তরের নারীরা এই বিষয়ে যতটা অধিকার ভোগ করতে পারত নিম্নস্তরের নারীরা তার অধিকাংশই ভোগ করতে পারত না।

উপসংহার :- ড. এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সংকুচিত হলেও অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় ভারতীয় সভ্যতায় নারীর এই অধিকার অনেক বেশি ছিল।

(FAQ) প্রাচীন ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মনুসংহিতায় কয় প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ আছে?

ছয় প্রকার।

২. কাত্যায়নস্মৃতিতে কয় প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ আছে?

চার প্রকার।

৩. অর্থশাস্ত্রে কয় প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ আছে?

চার প্রকার।

৪. নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার কে হতে পারে?

মেয়েরা।

Leave a Comment