ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন

ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন প্রসঙ্গে প্রকৃতি পূজা, পুরুষ দেবতার প্রাধান্য, ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অগ্নি, রুদ্র ও বিষ্ণু, অন্যান্য দেবতা, যজ্ঞপ্রথা ও ধর্মচিন্তা সম্পর্কে জানবো।

ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন

বিষয় ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন
পিতৃ দেবতা দৌ
মাতৃ দেবী পৃথিবী
প্রধান দেবতা ইন্দ্র
প্রথা যজ্ঞ প্রথা
ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন

ভূমিকা :- ঋকবৈদিক মুখে আর্যদের ধর্ম ভাবনা কেমন ছিল তার সঠিক ভাবে বলা দুষ্কর। তবে বেদের স্তোত্রগুলি থেকে আর্যদের ধর্ম জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রকৃতি পূজা

প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিকে আর্যরা পুজো করত। আর্যরা বিশ্বাস করত যে, প্রকৃতির রহস্যের অন্তরালে কোনো দৈবশক্তি কাজ করে। ঋকবৈদিক আর্যরা সকল বস্তুতে প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলে বিশ্বাস করত। এই কারণে তারা প্রকৃতির মধ্যেও প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করত।

পুরুষ দেবতার প্রাধান্য

আর্যদের ধর্মে পুরুষ দেবতাদের প্রাধান্য ছিল। এই পুরুষ দেবতাদের অধিকাংশ আকাশেই থাকতেন। স্ত্রী দেবতাদের সংখ্যা ছিল কম এবং তাদের গুরুত্বও তেমন ছিল না। হরপ্পা সভ্যতায় মাতৃদেবতার প্রাধান্য দেখা গেলেও বৈদিক সভ্যতায় তা দেখা যায় নি। ঋকবেদের সমাজে ছিল পুরুষের প্রাধান্য। তাদের ধর্ম চিন্তার ক্ষেত্রেও পুরুষ দেবতার প্রাধান্য লক্ষণীয়। মানুষের মতই ক্রোধ, দয়া, হিংসা প্রভৃতি গুণ ও দোষগুলি আর্যরা দেবতাদের চরিত্রে আরোপ করেছিল।

দৌ ও পৃথিবী

ঋকবেদে বহু দেবতার উল্লেখ দেখা যায়। কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন যে, আর্যরা বহু দেবতার পুজো করলেও আর্য ধর্ম বিশ্বাসে একেশ্বরবাদের প্রভাব ছিল। ঋকবেদের স্তোত্রগুলির অন্তনির্হিত ভাব হল এই যে, ঈশ্বরের বহু নাম থাকলেও আসলে তিনি এক ও অভিন্ন। অনেক পণ্ডিত এই মত অস্বীকার করেন। ঋকবেদের যুগের গোড়ার দিকে ‘দৌ’ ছিলেন আকাশের দেবতা বা পিতা। ‘পৃথিবী’ ছিলেন মাতা। খাদ্য, জল প্রভৃতির দ্বারা তিনি মানবের ভরণ-পোষণ করতেন। ক্রমে এই সকল দেবতার প্রভাব কমে যায়। এর স্থলে ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি দেবতার জনপ্রিয়তা বাড়ে।

ইন্দ্র

  • (১) ইন্দ্র ছিলেন বজ্রের দেবতা। তিনি বজ্রের দ্বারা অসুর বা দৈত্যদের বিনাশ করতেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন যুদ্ধের দেবতা। ইন্দ্র ছিলেন মহা প্রতাপশালী দেবতা। ঋকবেদে ইন্দ্র হলেন পুরন্দর; কারণ তিনি শত্রু দস্যু বা দাসদের পুর বা দুর্গ ধ্বংস করেন।
  • (২) তার অপর নাম ছিল ‘বৃত্রঘ্ন’, কারণ তিনি বৃত্র বা বাঁধগুলি ধ্বংস করেন। এই ‘পুর’ ও ‘বৃত্র’ বা ধাধের ধ্বংস সিন্ধু সভ্যতার নগর ও নদী বাধের ইঙ্গিত দেয় বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন। ঋকবেদের প্রায় ২০০টি স্তোত্র ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে।
  • (৩) কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, ইন্দ্র আসলে কোনো দেবতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন আর্যদের কোনো বিজয়ী গোষ্ঠীপতি অথবা পুরোহিত রাজা। ক্রমে তার ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয়। ইন্দ্র প্রকৃতপক্ষে কোনো মৌলিক দেবতা ছিলেন কিনা সন্দেহ।
  • (৪) ইন্দ্ৰ যে বৃত্র বা বাঁধ ধ্বংস করেন তা তিনি আর্য গোষ্ঠীর যোদ্ধা বা দলপতি হিসেবেই করেন। অনার্য বা হরপ্পার নদী বাঁধগুলি ধ্বংস করে মাঠগুলিকে পশুচারণ ক্ষেত্রে পরিণত করেন।

বরুণ

ঋকবেদের দেবতা বরুণ ছিলেন পাপ-পুণ্যের ধারক। তিনি পাপীদের শাস্তি দিতেন। বরুণ হলেন বিশ্বজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী। তার আদেশে ঋতুচক্র নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তন করত। বরুণ ন্যায় নীতির রক্ষাকারী মহান দেবতা। বরুণ যেহেতু মহান, তিনি উদার, ক্ষমাশীল। অনুতপ্ত পাপীকে তিনি ক্ষমা করতেন।

মিত্র

মিত্র ছিলেন সন্ধি, শপথ ও প্রতিজ্ঞা রক্ষার দেবতা। তার নাম করে লোকে শপথ নিত এবং তা রক্ষা করত।

অগ্নি

ঋকবেদে অগ্নি ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তিনি ছিলেন আর্যদের নিত্য সঙ্গী। তিনি যজ্ঞে ঘৃত বা হবি গ্রহণ করে তা দেবতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। প্রতি পরিবারে অগ্নিকুণ্ড থাকত, যাতে সর্বদা আগুন জ্বলত।

রুদ্র ও বিষ্ণু

ঋকবেদে রুদ্র ও বিষ্ণু ছিলেন গুরুত্বহীন। অনেকের মতে, রুদ্র ছিলেন মূলত অনার্যদের দেবতা। পরে আর্যরা তাকে গ্রহণ করে। রুদ্র ছিলেন ধ্বংসের দেবতা। তিনি ক্রুদ্ধ হলে তাঁর রোষে সব জ্বলে যেত। তাঁর বান থেকে মহামারী, মৃত্যু ভয়ঙ্কর ভাবে ছড়িয়ে পড়ত। বিষ্ণুরও ঋকবেদে তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। তার উদ্দেশ্যে মাত্র ছয়টি স্তোত্র রচনা করা হয়।

অন্যান্য দেবতা

পর্জন্য ছিলেন বৃষ্টির দেবতা। সূর্য ছিলেন আলোকের দেবতা। সাবিত্রী ছিলেন সূর্য মণ্ডলের অধিষ্ঠাত্রী ও প্রাণদাত্রী। যম ছিলেন মৃত্যুর দেবতা। বায়ু ছিলেন বাতাসের দেবতা। মরুৎ ছিলেন ঝড়ের দেবতা। এছাড়া সোম ছিলেন এক পানীয়ের দেবতা। আর্যরা সোমরস নামে এক মাদক পান করত। ঋকবেদের দশম মণ্ডলে ব্রহ্মা বা সৃষ্টিকর্তার কল্পনা করা হয়।

যজ্ঞপ্রথা

  • (১) ঋকবৈদিক আর্যরা দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য অগ্নিতে ঘৃত আহূতি দিত। পারিবারিকভাবে দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়া হত। এছাড়া গোটা গ্রাম বা উপজাতি বা রাজা মাঝে মাঝে বিরাট যজ্ঞের অনুষ্ঠান করত। পুরোহিতেরা এই যজ্ঞ করত।
  • (২) আর্যরা বিশ্বাস করত যে, এই যজ্ঞের ফলে দেবতারা সন্তুষ্ট হবেন। রাজতন্ত্রের যুগে রাজারা এই যজ্ঞের ব্যয় বহন করতেন এবং ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞে বিরাট দান পেতেন। যজ্ঞে মন্ত্র উচ্চারণ করে আগুনে ঘি আহুতি দেওয়া হত। যজ্ঞের এই জটিল প্রক্রিয়া ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কেহ জানত না।

ধর্মচিন্তা

ঋকবেদের ধর্মচিন্তা ছিল যজ্ঞ-কেন্দ্রিক। লোকে বিশ্বাস করত যে, যজ্ঞ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থিত বর পাওয়া গেলে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়। যজ্ঞে দেবতাদের কাছে সুবৃষ্টি, ভাল ফসল, যুদ্ধে বিজয়, সম্পদ, দীর্ঘ জীবন প্রভৃতি প্রার্থনা করা হত। দেবতাদের স্তুতির জন্য যজ্ঞে নানাবিধ স্তোত্র বা মন্ত্র পড়া হত। মন্ত্র বা স্তোত্রগুলি প্রধানত অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত ছিল।

উপসংহার :- ঋকবেদের যুগে কিছু লোক ছিলেন যারা যজ্ঞের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করতেন না। ঋকবেদের সৃষ্টি স্তোত্রে দেবতা ও যজ্ঞের সঙ্গে বিশ্বের সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক স্বীকার করা হয় নি।

(FAQ) ঋকবৈদিক যুগের ধর্মজীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঋকবৈদিক যুগের প্রধান দেবতা কে ছিলেন?

ইন্দ্র।

২. ঋক বৈদিক যুগে আকাশের দেবতা বা পিতা কে ছিলেন?

দৌ।

৩. ঋক বৈদিক যুগে দেবী বা মাতা কে ছিলেন?

পৃথিবী।

৪. ঋক বৈদিক যুগে সন্ধি, শপথ ও প্রতিজ্ঞা রক্ষার দেবতা কে ছিলেন?

মিত্র।

৫. ঋক বৈদিক যুগে সূর্য দেবতা কে ছিলেন?

সাবিত্রী।

Leave a Reply

Translate »