প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার -এর জন্ম, বংশ পরিচয়, শৈশব, শিক্ষা, চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের সক্রিয়তা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ছিনতাই, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মনে প্রভাব, বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত, বিপ্লবী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ, দীপালী সঙ্ঘে যোগদান, নারী সম্মেলনে যোগদান, বিপ্লবী আন্দোলনে আগ্ৰহ, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে অংশ গ্ৰহণ, ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

জন্ম৫ মে, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ
পিতা-মাতাজগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ও প্রতিভা দেবী
পরিচিতির কারণব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে প্রথম নারী আত্মদানকারী শহীদ ব্যক্তিত্ব
মৃত্যু২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

ভূমিকা :- আদর্শবোধ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে যারা নিজেদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-৩২ খ্রি.)।

জন্ম

১৯১১ সালের ৫ ই মে চট্টগ্রামের বর্তমান পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্মগ্রহণ করেন।

বংশ পরিচয়

তার পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী এবং মা প্রতিভাদেবী। তাদের ছয় সন্তান – মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা ও সন্তোষ।

ওয়াদ্দেদার উপাধি

তাদের পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। পরিবারের কোন এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে “ওয়াহেদেদার” উপাধি পেয়েছিলেন, এই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার পদবী এসেছে।

চট্টগ্রামে আগমন

পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের আসকার খানের দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন ওয়াদ্দেদার পরিবার।

শৈশব

আদর করে মা প্রতিভাদেবী প্রীতিলতাকে ‘রাণী’ বলে ডাকতেন। অন্তর্মুখী, লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের প্রীতিলতা ছেলেবেলায় ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা ইত্যাদি কাজে মা-কে সাহায্য করতেন।

শিক্ষা

  • (১) প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ডা. খাস্তগীর সরকারী বালিকা বিদ্যালয়। ১৯১৮ সালে তিনি এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রতি ক্লাসে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি সব শিক্ষকের খুব প্রিয় ছিলেন।
  • (২) ইতিহাসের শিক্ষিকা ঊষাদি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাঈ এর ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন।
  • (৩) স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।
  • (৪) স্বপ্নের কথা লিখেছেন কল্পনা দত্তঃ “কোন কোন সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানী হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম।”
  • (৫) স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো।১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন।
  • (৬) ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বন্ধের সময় তিনি নাটক লিখেন এবং মেয়েরা সবাই মিলে সেই নাটক চৌকি দিয়ে তৈরী মঞ্চে পরিবেশন করেন।
  • (৭) আই. এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ়ের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতনও হয়ে যেত।
  • (৮) ১৯৩০ সালে আই. এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান।
  • (৯) বেথুন কলেজে মেয়েদের সাথে তার আন্তরিক সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভাল ফলাফল লাভ করতেন।
  • (১০) তিনি দর্শনে অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে অনার্স পরীক্ষা তার আর দেওয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করেন।
  • (১১) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তার সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তর পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের সক্রিয়তা

প্রীতিলতা যখন সবে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন তখন চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন।

সরকারী কর্মচারীদের বেতন ছিনতাই

১৯২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাসের মোড়ে সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করে। পরে গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী।

প্রীতিলতার মনে প্রভাব

এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই মামলার ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে অনেক কিছুই জানতে পারেন তিনি।

বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত

প্রীতিলতার নিকট-আত্মীয় বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই প্রীতিলতার কাছে রাখেন। তখন লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি পড়েন “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল”। এই সমস্ত গ্রন্থ প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে।

বিপ্লবী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ

প্রীতিলতা দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করার গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু বিপ্লবীদলে তখন মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো মেয়েদের সাথে মেলামেশা করাও বিপ্লবীদের জন্য নিষেধ ছিল।

দীপালী সঙ্ঘে যোগদান

ইডেন কলেজের শিক্ষিকা নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়। তাদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন।

নারী সম্মেলনে যোগদান

মাস্টারদা সূর্য সেনের উদ্দোগে মহিলা কংগ্রেস নেত্রী লতিকা বোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নারী সম্মেলনে প্রীতিলতা ঢাকা থেকে এবং তার বন্ধু ও সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে এসে যোগদান করেন।

ইস্তেহার বিতরণ

বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা গুণু পিসির বাসায় বসে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, রেণুকা রায়, কমলা চ্যাটার্জী প্রমুখ বহু গোপন বৈঠক করেন এবং চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের পর মাষ্টারদার প্রেরিত ইস্তেহার সাইক্লোষ্টাইলে ছাপিয়ে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বিতরন করেন।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাৎ

প্রীতিলতা মৃত্যুপ্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে দেখা করার জন্য আলিপুর জেল কর্তৃপক্ষের কাছে “অমিতা দাস” ছদ্মনামে “কাজিন” পরিচয় দিয়ে দরখাস্ত করেন। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে তিনি প্রায় চল্লিশবার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসী

১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসীর ঘটনা প্রীতিলতার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তার ভাষায় “রামকৃষ্ণদার ফাঁসীর পর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক বেড়ে গেল।”

বিপ্লবী আন্দোলনে আগ্রহ

প্রীতিলতা ছাত্রাবস্থায় ঢাকার দীপালি সংঘে এবং পরে কলকাতায় ছাত্রী সংঘে যোগ দিয়ে লাঠিখেলা, ছোরাখেলা প্রভৃতি শেখেন। তখন থেকেই বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হন। এই আগ্রহ থেকে তিনি সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে যোগ দিয়ে ফুলতার ছদ্মনাম গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন

মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনায় প্রীতিলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর তিনি টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস, পুলিশ লাইন দখল, জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ (১৯৩০ খ্রি.), ধলঘাটের যুদ্ধ (১৯৩২ খ্রি.) প্রভৃতি কর্মসূচিতে অংশ নেন।

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ

প্রীতিলতার নেতৃত্বে শান্তি চক্রবর্তী, কালিকিঙ্কর দে প্রমুখ ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ সেপ্টেম্বর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলির ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করেন। পুলিশ পালটা আক্রমণ চালালে উভয় পক্ষের সম্মুখ যুদ্ধ হয়।

মৃত্যুবরণ

পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে প্রীতিলতা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এই ভাবে দেশমাতার মুক্তিযুদ্ধে নিবেদিতপ্রাণ প্রীতিলতা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

উপসংহার :- প্রীতিলতার মৃত্যু প্রসঙ্গে কল্পনা দত্ত লিখেছেন, “প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন, কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে।” পরিবারের চরম আর্থিক দুর্দশায় ধাত্রীর কাজ করে সংসার চালিয়েও প্রীতিলতার মায়ের গর্বটুকু বড়োই বীরত্বপূর্ণ।

(FAQ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ গ্ৰন্থের লেখক কে?

পুর্ণেন্দু দস্তিদার।

২. পাহাড়তলীর ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দেন কে?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

৩. প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্মরণীয় কেন?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন একজন বিপ্লবী নারী। তিনি ঢাকার দীপালি সঙ্ঘ ও কলকাতার ছাত্রী সঙ্ঘের সদস্যা ছিলেন। পরবর্তী কালে মাষ্টারদা সূর্য্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবী দলের যোগদান করেন এবং চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন অভিযানে অংশ নেন। ইনিই ভারতের মুক্তি সংগ্রামের প্রথম মহিলা শহীদ৷

Leave a Reply

Translate »