মামুদ গাওয়ান

বাহমনি রাজ্যের মন্ত্রী মামুদ গাওয়ান প্রসঙ্গে উজীরের পদ লাভ, রাজ্যের প্রকৃত শাসক, রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি, বিজয়নগর আক্রমণ, মহম্মদ গাওয়ানের রাজ্য জয়, গোয়া অধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার, বিদ্যোৎসাহী, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও তার পতন সম্পর্কে জানবো।

মন্ত্রী মামুদ গাওয়ান

ঐতিহাসিক চরিত্রমামুদ গাওয়ান
পরিচিতিবাহমনি রাজ্যের মন্ত্রী
রাজাতৃতীয় মহম্মদ শাহ
কীর্তিগোয়া অধিকার
মৃত্যু১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ
মন্ত্রী মামুদ গাওয়ান

ভূমিকা :- বাহমনি রাজ্য -এর নাবালক সম্রাট নিজাম শাহের আমলে প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তার মাতা মকদুমা জাহানের হাতে। তিনি রাজ্য পরিচালনার জন্য একটি অছি পরিষদ গড়েন। এই পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন মহম্মদ বা মামুদ গাওয়ান।

মামুদ গাওয়ানের উজীরের পদ লাভ

নিজাম শাহের অকাল মৃত্যুর পর তার ভ্রাতা তৃতীয় মহম্মদ শাহ সিংহাসনে বসলে মকদুমা জাহান, রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব মহম্মদ গাওয়ানের হাতে কার্যত তুলে দেন। মহম্মদ গাওয়ান উজীরের পদ পান। মহম্মদ শাহ বয়ঃপ্রাপ্ত হলে এই দক্ষ প্রশাসককে তিনি উজীর ও প্রধান সেনাপতির পদের দায়িত্ব দেন।

বাহমনি রাজ্যের প্রকৃত শাসক মামুদ গাওয়ান

এর পর ২০ বছর ধরে মহম্মদ গাওয়ান ছিলেন বাহমনী রাজ্যের প্রকৃত শাসক। প্রায় তিন সুলতানের রাজত্বকাল ধরে তিনি বাহমনী রাজ্যের উন্নতির জন্য বহু কাজ করেন।

মামুদ গাওয়ানের সময় বাহমনি রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি

মহম্মদ গাওয়ান ছিলেন বহিরাগত মুসলমান। অযোগ্য ও অপদার্থ শাসক মহম্মদ শাহের সরকারকে তিনি নিজ যোগ্যতা বলে শক্তিশালী করেন। তিনি ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রশাসক। তার মন্ত্রীত্বকালে বাহমনী রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে।

মামুদ গাওয়ানের বিজয়নগর আক্রমণ

মহম্মদ গাওয়ান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়নগর রাজাকে আক্রমণ করে পশ্চিম উপকূলে গোয়া, পূর্ব উপকূলে রাজমান্দ্রী ও কোন্দারির অধিকার করেন। বুরুহান-ই-মাসির নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, মহম্মদ গাওয়ান বিজয়নগর সাম্রাজ্য থেকে প্রভূত ধনরত্ন, ঘোড়া, হাতি, সুন্দরী নারী, দাসী ও হীরা, জহরত অধিকার করেন।

মহম্মদ গাওয়ানের রাজ্য জয়

মন্ত্রী মহম্মদ গাওয়ান সঙ্গমেশ্বর রাজ্য আক্রমণ করে খালনা দুর্গ অধিকার করেন। উড়িষ্যা আক্রমণ করে বহু ধনরত্ন ও হাতি পান। মহম্মদ গাওয়ান বাহমনী রাজ্যের উত্তর সীমান্তে মালব, গোণ্ডোয়ানা ও বেরার জয়ের চেষ্টা করেন। মালবের খলজি সুলতানদের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের পর বেরার বাহমনীর দখলে আসে। এই যুদ্ধে মহম্মদ গাওয়ান গুজরাটের সহায়তা পান।

মামুদ গাওয়ানের গোয়া অধিকার

গোয়া অধিকার করার ফলে বাহমনী রাজ্য বিশেষ শক্তিশালী হয়। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাহমনী বাণিজ্য গোয়া থেকে চলতে থাকে। যুদ্ধের ঘোড়া পশ্চিম এশিয়া থেকে গোয়ায় আমদানি করার সুবিধা হয়।

বিজয়নগর বাহমনি যুদ্ধের ভিত্তি

বাহমনী-বিজয়নগর প্রতিদ্বন্দ্বিতা অথবা বাহমনী-উড়িষ্যা-বরঙ্গল যুদ্ধ কোনো ধর্মের ভিত্তিতে ঘটেনি। নিছক বাণিজ্যিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে এই যুদ্ধগুলি হয়।

মামুদ গাওয়ানের প্রশাসনিক সংস্কার

  • (১) মহম্মদ গাওয়ান বাহমনী প্রশাসন ব্যবস্থার বিশেষ উন্নতি করেন। তিনি প্রশাসনে দুর্নীতি বন্ধ করেন ও সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেন। তিনি বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন করেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে জনকল্যাণমুখী করেন।
  • (২) তিনি বাহমনী রাজ্যকে দশটি তরফ বা প্রদেশে ভাগ করেন। প্রতি তরফের শাসনভার একজন তরফদারের ওপর দেওয়া হয়। প্রতি অভিজাত কর্মচারীর নিদ্দিষ্ট কর্তব্য ও বেতন তিনি স্থির করেন। বেতন কিছুটা নগদে, কিছুটা জাগীরে দেওয়া হত। প্রতি তরফে সুলতানের নিজস্ব খালসা জমি ছিল।

বিদ্যোৎসাহী মামুদ গাওয়ান

মহম্মদ গাওয়ান ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। তিনি বিদরে একটি পাঠভবন স্থাপন করেন। তিনি নিজে চিকিৎসা শাস্ত্র ও গণিতের আগ্রহী ছাত্র ছিলেন। তিনি সরল ও অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল সৎ ও নির্মল।

মামুদ গাওয়ানের প্রধান সমস্যা

স্যার উলসলী হেইগের মতে, মহম্মদ গাওয়ানের প্রধান সমস্যা ছিল। স্থানীয় দক্ষিণী হিন্দু-মুসলিম কর্মচারীদের সঙ্গে বহিরাগত আরব-পারসিক কর্মচারীদের বিরোধের নিষ্পত্তি করা। মহম্মদ গাওয়ান কোনো গোষ্ঠীর পক্ষ না নিয়ে উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য স্থাপনের নীতি নেন। উভয় গোষ্ঠী যাতে তুল্যমূলাভাবে সরকারি কাজ পায় সেদিকে তিনি লক্ষ্য রাখেন।

প্রদেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে মামুদ গাওয়ানের ভূমিকা

তিনি প্রাদেশিক তরফদারদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রাদেশিক কর্মচারীদের নিয়োগ করতেন। তিনি প্রাদেশিক সেনাদলের নিয়োগও সুলতানি দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি রাজস্বেরও নিখুঁত হিসেব রক্ষার ব্যবস্থা করেন।

মামুদ গাওয়ান কর্তৃক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা

মহম্মদ গাওয়ান বিদরে এক বিখ্যাত মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এই মাদ্রাসাটি রঙ্গীন টালিতে শোভিত করা হয়। এক হাজার ছাত্র ও শিক্ষক এখানে বিনামূল্যে খাদ্য ও বাসস্থান পেত।

মামুদ গাওয়ানের পতন

মহম্মদ গাওয়ানের ক্ষমতা দক্ষিণী অভিজাতরা সহ্য করতে পারেন নি। সুলতান তৃতীয় মহম্মদ শাহকে গাওয়ানের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে তারা মিথ্যা খবর দেন। সুলতান অগ্র-পশ্চাৎ বিচার না করে মহম্মদ গাওয়ানকে ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই এপ্রিল প্রাণদণ্ড দেন।

উপসংহার :- মামুদ গাওয়ানের মৃত্যুর ফলে বাহমনী শাসনব্যবস্থায় যে শূন্যতা দেখা দেয়, তা আর পূরণ করা যায় নি। বাহমনী সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে।

(FAQ) বাহমনি রাজ্যের মন্ত্রী মামুদ গাওয়ান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মামুদ গাওয়ান কার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন?

বাহমনি রাজা তৃতীয় মহম্মদ শাহের।

২. কত বছর ধরে মামুদ গাওয়ান বাহমনি রাজ্যের প্রকৃত শাসক ছিলেন?

২০ বছর।

৩. মামুদ গাওয়ান বিজয়নগর আক্রমণ করে কোন কোন স্থান অধিকার করে?

গোয়া, রাজামান্দ্রী।

৪. মামুদ গাওয়ান বাহমনি রাজ্যকে কটি প্রদেশে ভাগ করেন?

১০ টি।

Leave a Comment