আর্কিমিডিস

বিখ্যাত গ্ৰিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস প্রসঙ্গে তার জন্ম, শিক্ষা, গুরু, আর্কিমিডিসের সূত্র আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট, আর্কিমিডিসের সূত্র আবিষ্কার, পুল ও লিভার আবিষ্কার, তার রচনা, হত্যা কাহিনী ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

বিখ্যাত গ্ৰিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস

ঐতিহাসিক চরিত্রআর্কিমিডিস
জন্ম২৮৭ খ্রিস্টপূর্ব
পিতাফেইদিয়াস
পরিচিতিবিখ্যাত বিজ্ঞানী
আবিষ্কারআর্কিমিডিসের সূত্র
মৃত্যু২১২ খ্রিস্টপূর্ব
বিখ্যাত গ্ৰিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস

ভূমিকা :- একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক ছিলেন আর্কিমিডিস। প্রাচীন গ্রিক সভ‍্যতা তার উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল প্রাচীন কালের সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ আর্কিমিডিস এর সময়ে।

আর্কিমিডিসের জন্ম

আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২৮৭ সালে গ্ৰিসের সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত সাইরাকিউস দ্বীপে আর্কিমিডিসের জন্ম হয়। পিতা ফেইদিয়াস ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ।

আর্কিমিডিসের শিক্ষা

কৈশোর ও যৌবনে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে পড়াশুনা করেছেন। সেই সময় আলেকজান্দ্রিয়া ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পীঠস্থান। ছাত্র অবস্থাতেই আর্কিমিডিস তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সুমধুর ব্যক্তিত্বের জন্য সর্বজন পরিচিত হয়ে ওঠেন।

আর্কিমিডিসের গুরু

তাঁর গুরু ছিলেন ক্যানন। ক্যানন ছিলেন জ্যামিতির জনক মহান ইউক্লিডের ছাত্র।

আর্কিমিডিসের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ

পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি চেয়েছিলেন গণিতবিদ হবেন। অঙ্কশাস্ত্র, বিশেষ করে জ্যামিতিতে তাঁর আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ইউক্লিড, ক্যানন যেখানে তাঁদের বিষয় সমাপ্ত করেছিলেন আর্কিমিডিস সেখান থেকেই তাঁর কাজ আরম্ভ করেন।

যুদ্ধের প্রতি আর্কিমিডিসের ঘৃণা

আর্কিমিডিস যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন। কারো আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করাও তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল। কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন সাইরাকিউসের প্রজা, সম্রাট হিয়েরার রাজকর্মচারী তাই নিরুপায় হয়েই তাঁকে সম্রাটের আদেশ মেনে চলতে হত। সম্রাটের আদেশেই তিনি প্রায় ৪০টি আবিষ্কার করেন। তার মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে জিনিস হলেও অধিকাংশই ছিল সামরিক বিভাগের প্রয়োজন।

আর্কিমিডিসের সূত্র আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট

  • (১) সাইরাকিউসের সম্রাট হিয়েরো এক স্বর্ণকারকে দিয়ে একটি সোনার মুকুট তৈরি করেছিলেন। মুকুটটি হাতে পাওয়ার পর সম্রাটের মনে হল এর মধ্যে খাদ মিশানো আছে। কিন্তু স্বর্ণকার খাদের কথা অস্বীকার করল। কিন্তু সম্রাটের মনের সন্দেহ দূর হল না।
  • (২) তিনি প্রকৃত সত্য নিরূপণের ভার দিলেন রাজদরবারের বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের উপর। মহা ভাবনায় পড়ে গেলেন আর্কিমিডিস। সম্রাটের আদেশে মুকুটের কোন ক্ষতি করা যাবে না। আর্কিমিডিস ভেবে পান না মুকুট না ভেঙে কেমন করে তার খাদ নির্ণয় করবেন।
  • (৩) কয়েকদিন কেটে গেল। ক্রমশই অস্থির হয়ে ওঠেন আর্কিমিডিস। একদিন দুপুরবেলায় মুকুটের কথা ভাবতে ভাবতে সমস্ত পোশাক খুলে চৌবাচ্চায় স্নান করতে নেমেছেন। পানিতে শরীর ডুবতেই আর্কিমিডিস লক্ষ্য করলেন কিছুটা পানি চৌবাচ্চা থেকে উপছে পড়ল।
  • (৪) মুহূর্তে তাঁর মাথায় এক নতুন চিন্তার উন্মেষ হল। এক লাফে চৌবাচ্চা থেকে উঠে পড়লেন। তিনি ভুলে গেলেন তাঁর শরীরে কোন পোশাক নেই। সমস্যা সমাধানের আনন্দে নগ্ন অবস্থাতেই ছুটে গেলেন রাজ দরবারে।
  • (৫) মুকুটের সমান ওজনের সোনা নিলেন। একপাত্র পানিতে মুকুটটি ডোবালেন। দেখা গেল খানিকটা পানি উপছে পড়ল। এইবার মুকুটের ওজনের সমান সোনা নিয়ে জলপূর্ণ পাত্রে ডোবানো হল। যে পরিমাণ পানি উপছে পড়ল তা ওজন করে দেখা গেল আগের উপছে পড়া পানি থেকে তার ওজন আলাদা।
  • (৬) আর্কিমিডিস বললেন, মুকুটে খাদ মেশানো আছে। কারণ, যদি মুকুট সম্পূর্ণ সোনার হত তবে দুটি ক্ষেত্রেই উপছে পড়া পানির ওজন সমান হত।

আর্কিমিডিসের সূত্র

এই আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হল একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র। “তরল পদার্থের মধ্যে কোনো বস্তু নিমজ্জিত করলে সেই বস্তু কিছু পরিমাণে ওজন হারায়। বস্তু যে পরিমাণে ওজন হারায় সেই পরিমাণ ওজন বস্তুর অপসারিত তরল পদার্থের ওজনের সমান।” এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আর্কিমিডিসের সূত্র নামে বিখ্যাত।

পুল ও লিভার আবিষ্কার

  • (১) আর্কিমিডিসের একটি আবিষ্কার পুল ও লিভার। একবার কোনো একটি জাহাজ চরে এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে তাকে আর কোনভাবেই পানিতে ভাসানো সম্ভব হচ্ছিল না।
  • (২) আর্কিমিডিস ভালভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করলেন। তাঁর মনে হল একমাত্র যদি এই জাহাজটাকে উঁচু করে তোলা যায় তবেই জাহাজটাকে পানিতে ভাসান সম্ভব। আর্কিমিডিসের কথা শুনে সকলে হেসেই উড়িয়ে দিল।
  • (৩) অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই উদ্ভাবন করলেন লিডার আর পুলি। জাহাজ ঘাটে এটা উঁচু জায়গার লিভার খাটাবার ব্যবস্থা করলেন। তার মধ্যে বিরাট একটা দড়ি বেঁধে দিলেন। দড়ির একটা প্রান্ত জাহাজের সঙ্গে আষ্টে-পিষ্টে বাঁধা হল।
  • (৪) এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে সম্রাট হিয়েরো নিজেই এলেন জাহাজ ঘাটায়। নগর ভেঙে যেখানে যত মানুষ ছিল সকলে জড় হয়েছে। আর্কিমিডিস সম্রাটকে অনুরোধ করলেন লিভার লাগানো দড়ির আরেকটা প্রান্ত ধরে টানতে।
  • (৫) আর্কিমিডিসের কথায় সম্রাট তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়িটা ধরে টান দিলেন। সাথে সাথে অবাক কাণ্ড। নড়ে উঠল জাহাজটা। চারদিকে চিৎকার উঠল। এবার সম্রাটের সাথে দড়িতে হাত লাগালেন আরো অনেকে।
  • (৬) সকলে মিলে টান দিতেই সত্যি সত্যি জাহাজ শূন্যে উঠতে আরম্ভ করল। সম্রাট আনন্দে বুকে জুড়িয়ে ধরলেন আর্কিমিডিসকে।

আর্কিমিডিসের পুল ও লিভার আবিষ্কারের গুরুত্ব

এই আবিষ্কারের ফলে বড় বড় পাথর, ভারী জিনিস, কুয়া থেকে জল তোলার কাজ সহজ হল।

আর্কিমিডিসের গর্বিত উক্তি

একবার আর্কিমিডিস গর্ব করে বলেছিলেন, আমি যদি পৃথিবীর বাইরে দাঁড়াবার একটু জায়গা পেতাম তবে আমি আমার এই পুল ও লিভারের সাহায়ে পৃথিবীটাকেই নাড়িয়ে দিতাম।

গাণিতিক বিষয়ে আর্কিমিডিসের আগ্ৰহ

মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের আবিষ্কার সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। সামরিক প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করলেও ঐ বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। মূলত গাণিতিক বিষয়েই ছিল তাঁর আগ্রহ।

বাইরের জগৎ থেকে বিস্মৃত আর্কিমিডিস

দিনের অধিকাংশ সময়েই তিনি গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন। বাইরের জগতের সব কথাই তিনি তখন ভুলে যেতেন। এমন বহু সময় গিয়েছে তাঁর কাজের লোক তাঁকে খাবার নিয়ে গিয়েছে, সারাদিনে তিনি সেই খাবার স্পর্শই করেন নি। ভুলেই গিয়েছেন খাবার কথা। আবার কখনো স্নান করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানেই কাটিয়ে দিতেন। খোঁজ করতে দেখা গেল তিনি স্নানাগারের দেওয়ালেই অঙ্ক কষে চলেছেন।

আর্কিমিডিসের রচনা

বলবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা বারোটি। এছাড়াও তিনি আর যে সমস্ত রচনা করেছিলেন তার কোন সন্ধান পাওয়া যায় না।

গণিত সংক্রান্ত আর্কিমিডিসের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার

  • (১) বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত আবিষ্কার।
  • (২) অধিবৃত্তীয় অংশগুলোর ক্ষেত্রফল নির্ধারণ।
  • (৩) শঙ্কুআকৃতি এবং গোলাকৃতি বস্তুর সম্বন্ধে ৩২টি প্রতিজ্ঞা উদ্ভাবন করেছিলেন।
  • (৪) বলবিদ্যার তত্ত্বের ভিত হিসাবে সমতল ক্ষেত্রের সাম্যতা সম্বন্ধে তত্ত্ব নির্ধারণ করেন।

আর্কিমিডিসের হত্যা কাহিনী

  • (১) রোমের কাছে সাইকিউস রাজ্য পরাজিত হয়। এক রোমান সৈনিক আর্কিমিডিসের কাছে আসে রাজার আদেশ নিয়ে। সৈনিকটি বলে উঠল, তুমি আমার সঙ্গে চল, আমাদের সেনাপতি তোমার খোঁজ করছেন।
  • (২) বৃদ্ধ আর্কিমিডিস বলে উঠলেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারব না। এ ধরণের কথা শোনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না রোমান সৈন্যটি। তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে তা পালন করতেই হবে।
  • (৩) আর্কিমিডিসের হাত ধরতেই এক টানে ছাড়িয়ে নিলেন আর্কিমিডিস। আমার কাজ শেষ না হলে কোথাও যেত পারব না। আর সহ্য করতে পারল না সৈনিক।
  • (৪) পরাজিত দেশের এক নাগরিকের এতদূর স্পর্ধা, তার হুকুম অগ্রাহ্য করে! একটানে কোমরের তলোয়ার বার করে ছিন্ন করল মহা বিজ্ঞানীর দেহ। রক্তের ধারায় শেষ হয়ে গেল তাঁর অসমাপ্ত কাজ।

আর্কিমিডিসের মৃত্যু

আর্কিমিডিসকে হত্য করা হয়েছিল সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ২১২ সালে। বিজ্ঞানীর ছিন্ন মুন্ডু দেখে গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন মার্কিউলাস। তিনি মর্যাদার সাথে আর্কিমিডিসের দেহ সমাহিত করেন।

আর্কিমিডিসের কবর আবিষ্কার

আর্কিমিডিসের মৃত্যুর ১৩৭ বছর পর ৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বক্তা সিসেরো সিরাকিউজের এগ্রিজেনটিন গেইটের কাছে ঝোপঝাড় পরিবেষ্টিত অবস্থায় আর্কিমিডিসের কবর আবিষ্কার করেন।

আর্কিমিডিসের গ্ৰন্থ প্রকাশ

রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময় ১৫৪৪ সালে জোহান হেরওয়াগেন সুইজারল্যান্ডের বাজল শহর থেকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় আর্কিমিডিসের কাজ সহ এডিটিও প্রিন্সেপস (Editio Princeps) বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেন।

গ্যালিলিওর উপর আর্কিমিডিসের প্রভাব

১৫৮৬ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি বাতাস ও জলে ধাতব বস্তুর ওজন নির্ণয়ের জন্য একটি হাইড্রোস্ট্যাটিক নিক্তি উদ্ভাবন করেন, যা আর্কিমিডিসের কাজ দ্বারা অণুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়ে থাকে।

উপসংহার :- জল তোলার জন্য আর্কিমিডিসের স্ক্রু পাম্প, যুদ্ধকালীন আক্রমণের জন্য সীজ ইঞ্জিন ইত্যাদি মৌলিক যন্ত্রপাতির ডিজাইনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। তাঁর বহু আবিষ্কৃত সত্য আজও বিজ্ঞানীদের পথ নির্দেশ করে।

(FAQ) বিখ্যাত গ্ৰিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আর্কিমিডিস কে ছিলেন?

একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক।

২. আর্কিমিডিসের জন্ম কখন হয়?

আনুমানিক ২৮৭ খ্রিস্টপূর্বে।

৩. কোন দেশে আর্কিমিডিসের জন্ম হয়?

গ্ৰিসে।

৪. আর্কিমিডিসের বিখ্যাত আবিষ্কার কি?

আর্কিমিডিসের সূত্র।

৫. আর্কিমিডিসকে হত্যা করেন কে?

জনৈক রোমান সৈনিক।

৬. আর্কিমিডিসের মৃত্যু কখন হয়?

২১২ খ্রিস্টপূর্বে।

Leave a Comment